হকার উচ্ছেদ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিলেন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে কোনওভাবেই হকারদের উচ্ছেদ করা উচিত নয়। জীবিকা ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে হকারদের পাশে থাকার বার্তাও দেন তিনি।
হকার উচ্ছেদ ইস্যুতে ফের সরব হলেন সিপিআই(এম)-এর যুব নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটপাত ও রাস্তার ধারে বসা হকারদের উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেই আবহেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। মীনাক্ষীর বক্তব্য, কোনওভাবেই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হকারদের উচ্ছেদ করা উচিত নয়। কারণ হকাররা শুধুমাত্র রাস্তার ধারে ব্যবসা করা কিছু মানুষ নন, তাঁরা সমাজের সেই বৃহৎ অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাঁদের জীবিকা প্রতিদিনের আয়ের উপর নির্ভরশীল। তাই তাঁদের রুজি-রোজগারের বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করলে হাজার হাজার পরিবার চরম সংকটের মুখে পড়বে।
মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেন, শহরকে সুন্দর বা যানজটমুক্ত করার নামে গরিব মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়া কোনও সভ্য প্রশাসনের কাজ হতে পারে না। প্রশাসন যদি মনে করে কোনও নির্দিষ্ট এলাকা থেকে হকারদের সরাতে হবে, তাহলে প্রথমেই তাদের জন্য উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কোথায় তাঁরা ব্যবসা করবেন, কীভাবে তাঁদের আয় বজায় থাকবে, সেই বিষয়গুলি নিশ্চিত না করে উচ্ছেদের পথে হাঁটা অন্যায়। তাঁর মতে, উন্নয়নের অর্থ কখনওই গরিব মানুষকে বঞ্চিত করা নয়; বরং উন্নয়নের সুফল সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই প্রশাসনের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, হকারদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবসা করে আসছেন। অনেকেরই সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য খরচ এই ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। একদিনের জন্য দোকান বন্ধ থাকলেও তাঁদের পরিবার সমস্যায় পড়ে। সেই মানুষদের হঠাৎ করে উচ্ছেদ করে দিলে তাঁদের জীবনে গভীর অনিশ্চয়তা নেমে আসবে। তাই প্রশাসনের উচিত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি দেখা।
মীনাক্ষীর দাবি, শহরের ফুটপাত ও রাস্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। প্রশাসন, হকার সংগঠন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন ব্যবস্থা করা যেতে পারে যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলও স্বাভাবিক থাকে এবং হকারদের জীবিকাও রক্ষা পায়। তিনি মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজাই সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। জোরপূর্বক উচ্ছেদ কখনওই স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে না।
হকারদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শহরের অর্থনীতিতে হকারদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ মানুষ কম দামে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হকারদের উপর নির্ভর করেন। অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে হকাররাই সবচেয়ে সহজলভ্য বিকল্প। তাই হকারদের শুধু অবৈধ দখলদার হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, প্রায়শই দেখা যায় বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে প্রশাসন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু গরিব মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে একই রকম সক্রিয়তা দেখা যায় না। তাঁর মতে, যে কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের কেন্দ্রে মানুষের স্বার্থ থাকা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা সমাজের প্রান্তিক অংশে রয়েছেন, তাঁদের অধিকার রক্ষা করা সরকারের সাংবিধানিক এবং নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন আদালত এবং নীতিনির্ধারণী সংস্থাও বহুবার হকারদের জীবিকার অধিকারের বিষয়টি স্বীকার করেছে। রাস্তা ও ফুটপাতের ব্যবহার নিয়ে নিয়মকানুন থাকলেও, সেই নিয়ম প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিকতা বজায় রাখা জরুরি। হকারদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া, কোনও রকম বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে তা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
রাজ্যের বিভিন্ন হকার সংগঠনও পুনর্বাসনের দাবি তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। অনেক হকারই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে রাজি আছেন, যদি তাঁদের জন্য স্থায়ী বা বিকল্প বাজারের ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রসঙ্গেই মীনাক্ষী বলেন, সরকারের উচিত সংঘাতের পথ এড়িয়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের রাস্তা খোঁজা।
তিনি হকারদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলেন, জীবিকা ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে বামপন্থীরা সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কোনও পরিবারের মুখের অন্ন কেড়ে নিয়ে উন্নয়নের গল্প লেখা যায় না। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নীতির বিরোধিতা করে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে, মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি সর্বাগ্রে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
রাজনৈতিক মহলেও মীনাক্ষীর এই মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে শহরাঞ্চলে হকার উচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হয়েছে। একদিকে নাগরিক পরিকাঠামো ও যান চলাচলের সুবিধার প্রশ্ন, অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষের জীবিকার প্রশ্ন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তিনি শেষ পর্যন্ত এ কথাই স্পষ্ট করেন যে, কোনও অবস্থাতেই গরিব মানুষের উপর উন্নয়নের বোঝা চাপানো উচিত নয়। আগে পুনর্বাসন, তারপর প্রয়োজনে উচ্ছেদ—এই নীতিতেই সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে তাঁর মত। মানবিকতা, সামাজিক ন্যায় এবং জীবিকার অধিকারের প্রশ্নে আপস না করার বার্তাই দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই অবস্থান হকারদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় আরও বলেন, হকারদের সমস্যা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন। রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও মফস্বলে হাজার হাজার পরিবার হকারি পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। একজন হকারের আয়ের উপর নির্ভর করে তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যের জীবনযাত্রা। তাই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই সামাজিক বাস্তবতাকে মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি মনে করেন, শহরের পরিকল্পনা এমনভাবে করা উচিত যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধা বজায় থাকে এবং একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকাও সুরক্ষিত থাকে।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রসঙ্গও। মীনাক্ষীর অভিযোগ, বড় ব্যবসায়ী বা কর্পোরেট সংস্থার স্বার্থে প্রশাসন অনেক সময় দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও, গরিব ও প্রান্তিক মানুষের সমস্যার ক্ষেত্রে সেই একই সংবেদনশীলতা দেখা যায় না। অথচ হকাররা শহরের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা শুধু নিজেদের পরিবারের জন্য আয়ের ব্যবস্থা করেন না, বরং সাধারণ মানুষের কাছে কম দামে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেন। ফলে তাঁদের উচ্ছেদ করা হলে তার প্রভাব শুধুমাত্র হকারদের উপর নয়, সাধারণ ক্রেতাদের উপরও পড়তে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, বহু ক্ষেত্রে হকাররা বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় ব্যবসা করে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁদের একটি সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় হকারদের উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করে। তাই হঠাৎ করে কোনও বিকল্প ছাড়াই তাঁদের সরিয়ে দিলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণে প্রশাসনের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং সমস্ত পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। হকারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা উচিত। তাঁদের সমস্যার কথা শুনতে হবে এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। একতরফা সিদ্ধান্ত কখনওই স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। বরং আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথ খুঁজলে সমস্যার সমাধান অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
তিনি আরও জানান, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট বাজার, ভেন্ডিং জোন বা বিকল্প ব্যবসার জায়গা তৈরি করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই মডেল অনুসরণ করে পরিকল্পনা করা যেতে পারে বলে তাঁর মত। এতে যেমন শহরের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, তেমনই হকারদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।
সবশেষে মীনাক্ষী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, উন্নয়ন ও মানবিকতার মধ্যে কোনও সংঘাত থাকা উচিত নয়। প্রকৃত উন্নয়ন সেইটিই, যেখানে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা পায় এবং কেউ জীবিকা হারানোর ভয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে না। তাই পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয় বলেই তিনি মনে করেন। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং হকারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে।