অনেক সময় হঠাৎ মনে হয় মনোযোগ কমে গেছে, আগের মতো কিছুতেই ঠিকভাবে মন বসে না এবং সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এর পিছনে থাকতে পারে ব্রেন রট নামে পরিচিত একটি মানসিক ও অভ্যাসগত সমস্যা, যা অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত। সময়মতো সচেতন হলে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত মানসিক চর্চার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
অনেক সময়ই হঠাৎ মনে হতে পারে যে আগের মতো আর মাথা কাজ করছে না। খুব সহজ বিষয়ও মনে রাখতে সমস্যা হচ্ছে। কোনও কাজ শুরু করলেও মনোযোগ ধরে রাখা যাচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নিতে গেলেও দ্বিধা তৈরি হচ্ছে। এই ধরনের অভিজ্ঞতা আজকাল অনেক মানুষের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এই অবস্থাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্রেন রট বলে থাকেন। আক্ষরিক অর্থে যার মানে মস্তিষ্কে পচন ধরা। যদিও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি কোনও স্বীকৃত রোগের নাম নয়, তবু আধুনিক সমাজে এই শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মানসিক ও জ্ঞানগত অবনতির একটি প্রবণতা বোঝাতে।
আধুনিক জীবনযাপনের ধরন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। দিনের বড় একটি সময় এখন কাটছে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা টিভির সামনে। সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের ছোট ভিডিও, দ্রুত বদলে যাওয়া তথ্য এবং অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিষয়বস্তুর মধ্যে ডুবে থাকছে মানুষ। এর ফলে মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে এবং চিন্তা করার ক্ষমতাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক গবেষক মনে করেন এই পরিবর্তিত জীবনধারা মানুষের মননশীলতা এবং গভীরভাবে ভাবার অভ্যাসকে কমিয়ে দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটেই ব্রেন রট শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি ২০২৪ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস এই শব্দবন্ধটিকে ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার হিসেবে উল্লেখ করে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে ডিজিটাল যুগে মানুষের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তাশক্তির ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি সরাসরি কোনও রোগ নয়, বরং এক ধরনের জীবনযাত্রা এবং অভ্যাসজনিত সমস্যা যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মানসিক দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রেন রট বলতে মূলত এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝানো হয় যেখানে মানুষের মনোযোগের ক্ষমতা কমে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহও কমে যেতে থাকে। মানুষ অনেক সময় ছোট ছোট তথ্য মনে রাখতে পারে না। কাজের মধ্যে সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায়। একই সঙ্গে মানসিক ক্লান্তি ও অনুপ্রেরণার অভাবও দেখা দেয়।
এমন অবস্থায় অনেকেই মনে করেন তাদের বুদ্ধি যেন আগের মতো ধারালো নেই। কিন্তু বাস্তবে মস্তিষ্কের গঠন নষ্ট হয়ে যায় এমনটা সাধারণত ঘটে না। বরং অতিরিক্ত তথ্যের চাপ, ঘুমের অভাব, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।
ব্রেন রটের লক্ষণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা। কোনও বই পড়তে গেলে বা কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মন অন্যদিকে চলে যায়। অনেক সময় একই বিষয় বারবার পড়েও মনে থাকে না। স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়াও একটি বড় লক্ষণ।
এর পাশাপাশি মানসিক ক্লান্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই জানান যে দিনভর তেমন কোনও কঠিন কাজ না করলেও মাথা ভার লাগছে বা মন ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। কোনও নতুন কাজ বা সৃজনশীল চিন্তার প্রতি আগ্রহও কমে যেতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক উদ্দীপনার অভাব থাকলে ভবিষ্যতে স্মৃতিভ্রংশজনিত সমস্যা যেমন ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা বাড়তে পারে। যদিও ব্রেন রট সরাসরি ডিমেনশিয়ার কারণ নয়, তবু যেসব অভ্যাস মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করে তোলে সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সচেতনতা। দৈনন্দিন অভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনলেই অনেক সময় মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন স্ক্রিন টাইম কমানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।
দিনভর মোবাইল স্ক্রোল করা বা টিভি দেখার অভ্যাস মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উদ্দীপনায় অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয় এমন কাজ করতে গেলে সমস্যা হয়। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি স্ক্রিন ব্যবহার না করাই ভালো। অনেক বিশেষজ্ঞ দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম না রাখার পরামর্শ দেন।
স্ক্রিনের সময় কমিয়ে তার পরিবর্তে বই পড়া, নতুন কিছু শেখা বা সৃজনশীল কাজে সময় দেওয়া যেতে পারে। বই পড়া মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং চিন্তার গভীরতা বাড়ায়। একই সঙ্গে ভাষা এবং কল্পনাশক্তিও উন্নত হয়।
মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার জন্য ধাঁধা সমাধান করা, দাবা খেলা, নতুন ভাষা শেখা বা কোনও বাদ্যযন্ত্র শেখার মতো কাজও খুব উপকারী। এসব কাজ মস্তিষ্ককে নতুন চ্যালেঞ্জ দেয় এবং নিউরনের কার্যকলাপ বাড়ায়।
নিয়মিত শরীরচর্চাও মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম করলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কে বেশি অক্সিজেন পৌঁছায়। এর ফলে মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত হতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ত্রিশ মিনিট হাঁটা, দৌড়ানো বা হালকা ব্যায়াম করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
খাদ্যাভ্যাসও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্ককে প্রয়োজনীয় শক্তি এবং পুষ্টি জোগায়। সবুজ শাকসবজি যেমন পালং শাক, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, দানা শস্য এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ মস্তিষ্কের জন্য খুব উপকারী।
এছাড়া অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল যেমন বেরি জাতীয় ফল, আপেল বা কমলাও মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। এসব খাবার কোষের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে।
ঘুমের গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মনোযোগ কমে যায়। তাই প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে অন্তত এক ঘণ্টা মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার না করাই ভালো। স্ক্রিনের নীল আলো ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করতে পারে। তার বদলে ঘুমানোর আগে বই পড়া বা শান্ত সঙ্গীত শোনা ভালো অভ্যাস হতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্রেন রট কোনও ভয়াবহ বা স্থায়ী রোগ নয়। বরং এটি আধুনিক জীবনযাত্রার কিছু ভুল অভ্যাসের ফল। সময়মতো সচেতন হয়ে জীবনধারায় সামান্য পরিবর্তন আনলে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার অভ্যাসই সুস্থ ও সতেজ মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ প্রায় সব কাজই প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে করছেন। অফিসের কাজ থেকে শুরু করে বিনোদন সবকিছুই এখন মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে হচ্ছে। এর ফলে মানুষের শারীরিক নড়াচড়া কমে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে মনোযোগের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। তাই সচেতনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা খুবই জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা উচিত। এই সময়টুকু নিজের জন্য রাখা যেতে পারে। পরিবারে সঙ্গে কথা বলা, প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো বা কোনও সৃজনশীল কাজে মন দেওয়া মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয় এবং মানসিক চাপ কমায়।
একই সঙ্গে নিয়মিত পড়াশোনা বা নতুন কিছু শেখার অভ্যাসও মস্তিষ্ককে সচল রাখে। অনেকেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু গবেষণা বলছে নতুন দক্ষতা শেখা বা নতুন বিষয় জানার চেষ্টা করলে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বাড়ে এবং স্মৃতিশক্তিও উন্নত হয়।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য সামাজিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটালে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। হাসি আনন্দ এবং ইতিবাচক সম্পর্ক মানুষের মনকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
এছাড়া মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও খুব জরুরি। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নিয়মিত ধ্যান করা, শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা বা নিজের পছন্দের কোনও কাজ করা মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত পানি পান করাও অনেক সময় উপেক্ষিত একটি বিষয়। শরীরে পানির অভাব হলে ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। তাই সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন।
সবশেষে মনে রাখা দরকার যে মস্তিষ্ক শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। তাই এর যত্ন নেওয়াও সমানভাবে জরুরি। সঠিক জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখতে পারলে মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন সক্রিয় ও সুস্থ থাকতে পারে। আর এই ছোট ছোট অভ্যাসই ভবিষ্যতে সুস্থ ও সচেতন জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।