প্রাথমিক স্কুলের মিড-ডে মিল ব্যবস্থায় বড় সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। আগামী ১ আগস্ট থেকে প্রতিটি পড়ুয়ার জন্য দৈনিক বরাদ্দ ৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে মিড-ডে মিল ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। আগামী ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি পড়ুয়ার জন্য মিড-ডে মিলের দৈনিক উপকরণ ও রান্নার বরাদ্দ ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করার ঘোষণা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, রান্নার জ্বালানির খরচ এবং নির্ধারিত অর্থের মধ্যে পুষ্টিকর খাবার পরিবেশনের সমস্যা নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক ও মিড-ডে মিল কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা ও পুষ্টি ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
সরকারি PM-POSHAN পোর্টাল অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ মে থেকে বালবাটিকা ও প্রাথমিক স্তরে পড়ুয়াপিছু দৈনিক রান্নার উপকরণের নির্ধারিত মোট খরচ ছিল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। এর মধ্যে কেন্দ্র ও রাজ্যের অংশ যথাক্রমে ৪ টাকা ৭ পয়সা এবং ২ টাকা ৭১ পয়সা। এবার রাজ্যের অতিরিক্ত আর্থিক সহযোগিতায় প্রাথমিক স্তরের মোট বরাদ্দ ১০ টাকায় উন্নীত করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
এই বৃদ্ধি অঙ্কের বিচারে মাথাপিছু দৈনিক ৩ টাকা ২২ পয়সা। শতাংশের হিসাবে বর্তমান বরাদ্দের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ৪৭ শতাংশ। প্রতিদিন একটি স্কুলে শতাধিক পড়ুয়াকে খাবার পরিবেশন করা হলে সম্মিলিতভাবে অতিরিক্ত বরাদ্দের পরিমাণ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, প্রত্যন্ত এলাকা এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুরা যেসব স্কুলে পড়াশোনা করে, সেখানে এই বাড়তি অর্থ খাবারের মান ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
মিড-ডে মিল কেবলমাত্র স্কুলে দুপুরের খাবার পরিবেশনের একটি ব্যবস্থা নয়। এটি শিশুদের পুষ্টি, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি, পড়াশোনায় মনোযোগ এবং সামাজিক সমতার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। অনেক পরিবারের শিশুর কাছে স্কুলে পাওয়া এই খাবার দিনের অন্যতম প্রধান পুষ্টিকর আহার। ফলে বরাদ্দের পরিমাণ কম হলে তার প্রভাব সরাসরি খাবারের পরিমাণ, উপকরণের মান এবং মেনুর বৈচিত্র্যের উপর পড়ে।
চাল সাধারণত সরকারি ব্যবস্থায় সরবরাহ করা হলেও ডাল, শাকসবজি, ভোজ্য তেল, মশলা, নুন এবং রান্নার জ্বালানির খরচ নির্ধারিত রান্নার বরাদ্দ থেকেই বহন করতে হয়। সরকারি খাদ্যমান অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি শিশুর জন্য দৈনিক ১০০ গ্রাম খাদ্যশস্য, ২০ গ্রাম ডাল, ৫০ গ্রাম শাকসবজি এবং ৫ গ্রাম তেল বা চর্বির সংস্থান রাখা হয়। নির্ধারিত রান্নার খরচের মধ্যে ডাল, শাকসবজি, তেল, নুন, মশলা এবং জ্বালানির ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
কিন্তু বাজারে ডাল, আলু, পেঁয়াজ, টমেটো, বিভিন্ন সবজি, সর্ষের তেল, ডিম ও রান্নার গ্যাসের দাম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত বরাদ্দের মধ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টিমান বজায় রেখে খাবার দেওয়া স্কুলগুলির পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই স্কুল কর্তৃপক্ষকে স্থানীয়ভাবে সহায়তা সংগ্রহ করতে হয় অথবা তুলনামূলক কম দামের উপকরণ বেছে নিতে হয়। বরাদ্দ বৃদ্ধি হলে বাজারদরের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্য রেখে খাবার প্রস্তুত করার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের বয়স সাধারণত এমন একটি পর্যায়ে থাকে যখন তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সুষম পুষ্টি অত্যন্ত জরুরি। শরীরের বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শেখার দক্ষতার সঙ্গে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি না পেলে শিশুরা দুর্বলতা, ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাবে ভুগতে পারে।
বরাদ্দ বৃদ্ধি সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে মেনুতে পর্যাপ্ত ডাল, মৌসুমি শাকসবজি, সয়াবিন, ছোলা, রাজমা বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ উপকরণ অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ বাড়তে পারে। স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস ও সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে ডিম, ফল অথবা পুষ্টিকর বিকল্প খাবার দেওয়ার ব্যবস্থাও আরও নিয়মিত করা সম্ভব হতে পারে।
তবে শুধুমাত্র অর্থ বৃদ্ধি হলেই পুষ্টির মান নিশ্চিত হয়ে যাবে—এমনটি বলা যায় না। বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার, মানসম্মত উপকরণ ক্রয়, নির্ধারিত পরিমাণ বজায় রাখা এবং শিশুদের বয়স অনুযায়ী খাবারের পুষ্টিমান নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক স্কুলে খাবারের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা হলে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত সুফল পড়ুয়াদের কাছে পৌঁছাবে।
অনেক স্কুলে পড়ুয়াদের অভিযোগ থাকে যে খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাল বা সবজি থাকে না। কখনও আবার রান্নার স্বাদ, চাল বা সবজির মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর একটি কারণ সীমিত বরাদ্দের মধ্যে সমস্ত উপকরণ কেনা ও রান্নার জ্বালানি পরিচালনা করার চাপ। নতুন বরাদ্দ কার্যকর হলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তুলনামূলক উন্নতমানের ডাল, তেল ও সবজি কেনার সুযোগ পেতে পারে।
খাবারে সবজির পরিমাণ বাড়ানো, সপ্তাহের মেনুতে বৈচিত্র্য আনা এবং একই ধরনের খাবার বারবার দেওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে। যেমন, খিচুড়ি, ভাত-ডাল-সবজি, সয়াবিনের তরকারি, ছোলার ডাল, মিশ্র সবজি বা স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য পুষ্টিকর উপকরণ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।
একটি নির্দিষ্ট মেনু সব জেলার জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। পাহাড়, জঙ্গলমহল, উপকূলীয় এলাকা ও দক্ষিণবঙ্গের সমতল অঞ্চলে খাদ্যাভ্যাস এবং উপকরণের প্রাপ্যতা আলাদা। তাই স্থানীয় বাজার ও খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুষ্টিবিদদের পরামর্শে মেনু নির্ধারণ করা হলে বরাদ্দ বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য এবং রান্নার উপকরণের দামে ওঠানামা দেখা গেছে। একটি স্কুলে প্রতিদিন অনেক শিশুর জন্য রান্না করতে হলে অল্প মূল্যবৃদ্ধিও মাসিক হিসাবে বড় অঙ্কে পরিণত হয়। পুরনো বরাদ্দ নির্ধারণের পর বাজারদর বেড়ে গেলে বিদ্যালয়গুলির ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দৈনিক ১০০ জন পড়ুয়াকে খাবার দেওয়া হলে পুরনো ৬ টাকা ৭৮ পয়সা হারে রান্নার উপকরণের জন্য বরাদ্দ হতো ৬৭৮ টাকা। নতুন ১০ টাকা হারে সেই বরাদ্দ হবে এক হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন অতিরিক্ত ৩২২ টাকা এবং ২০টি কার্যদিবস ধরে মাসে প্রায় ৬ হাজার ৪৪০ টাকা অতিরিক্ত পাওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়ের পড়ুয়ার সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণও সেই অনুপাতে বাড়বে।
এই বাড়তি অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে জ্বালানি, ডাল, সবজি, তেল এবং অন্যান্য উপকরণের খরচ সামলানো তুলনামূলক সহজ হবে। পাশাপাশি বাজারে হঠাৎ কোনও পণ্যের দাম বেড়ে গেলে মেনু সম্পূর্ণ বদলে ফেলার প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে।
মিড-ডে মিল প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুদের স্কুলমুখী করা এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি বাড়ানো। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্যেও এই কর্মসূচিকে শিশুদের ক্ষুধা ও শিক্ষার সমস্যা একসঙ্গে মোকাবিলার একটি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলের বহু পরিবার কৃষিকাজ, দিনমজুরি বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের কাজের উপর নির্ভরশীল। পরিবারের আয় অনিয়মিত হলে শিশুদের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হতে পারে। স্কুলে ভালো মানের খাবার পাওয়া গেলে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাতে আরও উৎসাহিত হন।
খাবারের মান উন্নত হলে পড়ুয়াদের আগ্রহও বাড়তে পারে। শিশুরা বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় কাটায়। খালি পেটে থাকলে দুপুরের পর ক্লাসে মনোযোগ কমে যাওয়া স্বাভাবিক। পর্যাপ্ত খাবার পেলে তারা তুলনামূলক সক্রিয় থাকতে পারে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।
তবে উপস্থিতি বৃদ্ধির জন্য খাবারের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, শিক্ষক উপস্থিতি, নিরাপদ পরিবেশ, পানীয় জল, শৌচাগার এবং শিক্ষার মানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি সেই বৃহত্তর শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
অনেক পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খাদ্য কিনতে খরচ হয়। শিশু বিদ্যালয়ে একটি পরিপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাবার পেলে পরিবারের উপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমে। একাধিক স্কুলপড়ুয়া সন্তান রয়েছে এমন পরিবারে এই সুবিধার গুরুত্ব আরও বেশি।
মিড-ডে মিল প্রকল্পে সমস্ত যোগ্য পড়ুয়া একই খাবার খায়। ফলে কোনও শিশুর পারিবারিক আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে তাকে আলাদা করা হয় না। এতে শিশুদের মধ্যে সমতা, একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সরকারি PM-POSHAN ব্যবস্থার ঘোষিত উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতি উৎসাহিত করা, লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান কমানো এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর শিশুদের একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার সুযোগ তৈরি করার বিষয়ও রয়েছে।
নতুন বরাদ্দের ফলে খাবারের মান বাড়লে সরকারি ও সরকারপোষিত বিদ্যালয়ের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এই আস্থা ধরে রাখতে প্রতিদিন নিয়মমাফিক রান্না, নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পরিবেশন এবং খাবারের পরিমাণে কোনও বৈষম্য না রাখা জরুরি।