Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি’! কী এই রহস্যময় ভাইরাস, কেন সতর্ক করল হু?

ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ও বি-র পর এবার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি’ ভাইরাস। মূলত পশুদের মধ্যে ছড়ালেও, ভবিষ্যতে মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। নতুন এই ভাইরাস নিয়ে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে নজরদারি ও গবেষণা।

বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক কি ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি? কী এই ভাইরাস, কেন উদ্বেগ বাড়ছে বিজ্ঞানীদের?

বিশ্বজুড়ে একের পর এক ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনার পরে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে অজানা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগও। করোনা অতিমারির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনও মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। ঠিক সেই সময়েই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি’ ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তরফে এই ভাইরাস নিয়ে বাড়তি নজরদারি শুরু হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের নাম শুনলেই সাধারণত মানুষের মনে আসে মরসুমি ফ্লু, সর্দি-কাশি, জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা। এতদিন পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জা এ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা বি ভাইরাসই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিল। সোয়াইন ফ্লু বা এইচ১এন১ এবং বার্ড ফ্লু বা এইচ৫এন১-ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসেরই আলাদা রূপ। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিবারের আর এক সদস্য— ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস।

এই ভাইরাস নতুন নয়, তবে এতদিন এটি মূলত গবাদি পশুর শরীরেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিশেষ করে গরু, শূকর এবং অন্যান্য পশুর মধ্যে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানুষের শরীরেও এই ভাইরাসের সংক্রমণের ইঙ্গিত মিলছে। আর এখানেই বাড়ছে উদ্বেগ।

আমেরিকার হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল, ইউনিভার্সিটি অফ মিসিসিপি এবং জার্মানির ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজির গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, এই ভাইরাসের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংক্রমণের কারণ হতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত এটি মহামারির আকার নেয়নি, তবুও বিজ্ঞানীরা এটিকে হালকাভাবে নিতে নারাজ।

কী এই ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস?

ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি হল এক ধরনের আরএনএ ভাইরাস। করোনাভাইরাসের মতোই এই ভাইরাসও দ্রুত নিজের গঠন বদলাতে সক্ষম। ভাইরাসটির সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল এর অভিযোজন ক্ষমতা। অর্থাৎ, এটি পরিবেশ অনুযায়ী নিজের চরিত্র বদলাতে পারে এবং নতুন জীবদেহে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, এই ভাইরাস শুধুমাত্র পশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, পশু খামারে কাজ করেন এমন বহু মানুষের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ, তাঁরা কোনও না কোনও সময়ে এই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছিলেন বা আক্রান্ত হয়েছিলেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, ভাইরাসটি পশু থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে অজান্তেই। ঠিক যেমন ভাবে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণের তত্ত্ব সামনে এসেছিল। যদিও ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি এখনও মানুষ থেকে মানুষে ব্যাপক হারে ছড়ানোর প্রমাণ মেলেনি, তবুও ভবিষ্যতে এই ক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কেন এত উদ্বেগ?

গবেষকদের মতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস অত্যন্ত স্থিতিশীল। সাধারণ অনেক ভাইরাস উচ্চ তাপমাত্রা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি বিভিন্ন পরিবেশে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে সক্ষম। ফলে গরম, ঠান্ডা বা আর্দ্র— প্রায় সব ধরনের আবহাওয়াতেই এটি টিকে থাকতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হল, ভাইরাসটি মানুষের শ্বাসনালির কোষে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ, সংক্রমিত ব্যক্তি হাঁচি, কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অন্যের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন। যদিও এই সংক্রমণ এখনও সীমিত, তবুও ভবিষ্যতে এটি ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর মিউটেশন ক্ষমতা। ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিবারের ভাইরাসগুলি খুব দ্রুত নিজেদের জিনগত গঠন বদলাতে পারে। ফলে নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা সব সময় থেকেই যায়।

কী কী উপসর্গ দেখা দিতে পারে?

ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কী ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। তবে বিজ্ঞানীদের অনুমান, সাধারণ ফ্লুর মতোই কিছু উপসর্গ দেখা যেতে পারে। যেমন—

জ্বর
সর্দি-কাশি
গলা ব্যথা
শরীরে ব্যথা
দুর্বলতা
শ্বাসকষ্ট
ক্লান্তি
মাথাব্যথা

কিছু ক্ষেত্রে ফুসফুসে সংক্রমণও হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, বয়স্ক ব্যক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

‘অ্যাপোলিপোপ্রোটিন ডি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। মানুষের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই একটি বিশেষ প্রোটিন তৈরি হয়, যার নাম ‘অ্যাপোলিপোপ্রোটিন ডি’। এই প্রোটিনটি মূলত লিভারে তৈরি হয় এবং রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে যায়।

বিজ্ঞানীদের দাবি, এই প্রোটিন কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাস সংক্রমণকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি শরীরের সুস্থ কোষের ক্ষতি করে এবং ভাইরাসের বৃদ্ধি ও বিস্তারে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে লিভার ও ফুসফুসের কোষে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।

গবেষকেরা মনে করছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস যদি এই প্রোটিনের সাহায্যে দ্রুত ছড়াতে শুরু করে, তাহলে তা গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। এমনকি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।

করোনা অতিমারির সঙ্গে মিল কোথায়?

ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হল, এর সঙ্গে করোনাভাইরাসের কিছু আচরণগত মিল রয়েছে। দু’টিই আরএনএ ভাইরাস এবং দ্রুত মিউটেশন ঘটাতে সক্ষম। এছাড়া পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণের সম্ভাবনাও দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে।

করোনা অতিমারি বিশ্বকে শিখিয়েছে, কোনও ভাইরাসকে প্রথম দিকে হালকাভাবে নিলে পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এবার আগেভাগেই সতর্ক থাকতে চাইছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী বলছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি-কে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেনি। তবে ভাইরাসটির উপর কড়া নজরদারি চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশে পশু খামার, দুগ্ধ শিল্প এবং পশু পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

গবেষকেরা নিয়মিত ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করছেন, যাতে ভবিষ্যতে এটি মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করছে কি না, তা আগে থেকেই বোঝা যায়।

কী ভাবে সতর্ক থাকবেন?

যদিও এখনই আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবুও কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।

নিয়মিত হাত ধোয়া
অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়ানো
পশু খামারে কাজ করলে মাস্ক ব্যবহার
জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এই ধরনের ভাইরাস সংক্রমণ রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ভবিষ্যতে কি মহামারির আশঙ্কা আছে?

news image
আরও খবর

এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও কারও কাছে নেই। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটির বিবর্তন কোন দিকে যাবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। যদি এটি মানুষের শরীরে সহজে সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় বিপদ তৈরি হতে পারে।

তবে ইতিবাচক দিক হল, করোনা অতিমারির পরে বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। নতুন ভাইরাস শনাক্তকরণ, জিনোম বিশ্লেষণ এবং ভ্যাকসিন গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। ফলে কোনও নতুন সংক্রমণ দেখা দিলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতে পারে।   

ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে নজরদারি

বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে সংক্রামক রোগের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বনাঞ্চল ধ্বংস, পশুপাখির আবাসস্থলে মানুষের হস্তক্ষেপ এবং বিশ্বায়নের কারণে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া এখন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত কয়েক দশকে যত নতুন ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে, তার অধিকাংশই এসেছে পশুপাখির শরীর থেকে। এই ধরনের সংক্রমণকে বলা হয় ‘জুনোটিক ট্রান্সমিশন’। ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসকেও সেই তালিকায় রাখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গবাদি পশুর সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ যত বাড়ছে, ততই এই ধরনের ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়ছে। পশু খামার, দুগ্ধ শিল্প এবং পশু পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পশু খামারে কর্মরত বহু মানুষের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। যদিও তাঁরা গুরুতর অসুস্থ হননি, তবুও এটি প্রমাণ করে যে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে সক্ষম।

ভাইরাসের মিউটেশন কেন এত ভয়ঙ্কর?

ভাইরাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল তার পরিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা। বিশেষ করে আরএনএ ভাইরাসগুলি খুব দ্রুত নিজেদের জিনগত গঠন বদলাতে পারে। এই পরিবর্তন বা ‘মিউটেশন’-এর ফলে ভাইরাস আরও সংক্রামক হয়ে উঠতে পারে অথবা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে।

করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল, একের পর এক নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হয়েছে। আলফা, ডেল্টা, ওমিক্রনের মতো ভ্যারিয়েন্ট গোটা বিশ্বের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। যদিও বর্তমানে এটি সীমিত পর্যায়ে রয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে যদি ভাইরাসটি আরও শক্তিশালী রূপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ভাইরাস যখন এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে, তখন তার জিনগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। এই কারণেই পশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসগুলিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কতটা?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি ভবিষ্যতে ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়াতে শুরু করে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা বা ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও জটিলতা বাড়তে পারে।

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ শক্তিশালী না হওয়ায় ভাইরাস দ্রুত শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বয়স্কদের শরীরও অনেক সময় সংক্রমণের বিরুদ্ধে দ্রুত লড়াই করতে পারে না। ফলে ভবিষ্যতে যদি এই ভাইরাস ব্যাপক আকার নেয়, তাহলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

এখনও কি ভ্যাকসিন রয়েছে?

বর্তমানে ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনও ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে নেই। কারণ ভাইরাসটি এখনও পর্যন্ত মানুষের মধ্যে বড় আকারে সংক্রমণ ঘটায়নি। তবে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা অতিমারির পরে বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন প্রযুক্তিতে বিপুল উন্নতি হয়েছে। এমআরএনএ প্রযুক্তি, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং দ্রুত ভ্যাকসিন তৈরির পদ্ধতি এখন অনেক উন্নত। ফলে ভবিষ্যতে প্রয়োজন পড়লে ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি-র বিরুদ্ধেও তুলনামূলক দ্রুত প্রতিষেধক তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

ভারতেও কি উদ্বেগ বাড়ছে?

ভারত একটি কৃষিনির্ভর দেশ এবং এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের ভাইরাসের উপর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা, পশুর হাট, দুগ্ধ শিল্প এবং খামারগুলিতে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সচেতন থাকা জরুরি। জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দীর্ঘদিন থাকলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে পশুদের মধ্যে অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখা গেলে তা দ্রুত প্রশাসনকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা?

বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও নতুন নতুন ভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ গলা, বনভূমি ধ্বংস এবং পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে বহু অজানা জীবাণু ও ভাইরাস নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস উচ্চ তাপমাত্রাতেও টিকে থাকতে পারে বলে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা বিজ্ঞানীদের আরও চিন্তায় ফেলেছে। কারণ ভবিষ্যতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ভাইরাসের বিস্তারের ক্ষেত্রও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় কী উঠে আসছে?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাসের সংক্রমণ এখনও সীমিত হলেও এর আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। গবেষকেরা ভাইরাসটির জিনগত গঠন বিশ্লেষণ করছেন, যাতে বোঝা যায় এটি মানুষের শরীরে কত দ্রুত অভিযোজিত হতে পারে।

কিছু গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এই ভাইরাসের বাইরের আবরণ এমনভাবে তৈরি, যা পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে সাহায্য করে। ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি কতটা জরুরি?

করোনা অতিমারি বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো শক্তিশালী না হলে একটি ভাইরাস কত দ্রুত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই এখন থেকেই বিভিন্ন দেশ ভবিষ্যতের সংক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজন গবেষণা, দ্রুত পরীক্ষা ব্যবস্থা, ভাইরাস শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ কোনও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র

ইনফ্লুয়েঞ্জা ডি ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও এখনই ভয় পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিজ্ঞানীরা মূলত আগাম সতর্কতার কথা বলছেন। কারণ ভাইরাসটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং এর সম্পূর্ণ আচরণ সম্পর্কে অনেক তথ্যই অজানা।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কোনও সংক্রমণকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়ানো এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলি পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। ফলে ভবিষ্যতে যদি কোনও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে দ্রুত সতর্কবার্তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

Preview image