ইটালির দলে যেমন দেশীয় ক্রিকেটার রয়েছেন, তেমনই বিভিন্ন দেশের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়ও আছেন—যাঁদের অনেকেরই পেশা ক্রিকেট নয়, তবু বিশ্বমঞ্চে তাঁরা ইতিহাস গড়ছেন।
সোমবার সকালে ইডেন গার্ডেন্সের পাশ দিয়ে হাঁটলে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন। নীল জার্সিতে ভরা সমর্থক, গ্যালারিতে উড়ছে ইতালির পতাকা—দেখে মনে হতেই পারে, বুঝি ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে! চারবারের বিশ্বজয়ী আজুরি ফুটবল দল কি তবে কলকাতায়? কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই আলাদা। ফুটবল নয়, ক্রিকেটের টি২০ বিশ্বকাপে নামছে ইটালি—এই প্রথম বার কোনও আইসিসি বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে তাদের উপস্থিতি। ফুটবলের দেশ হিসেবে পরিচিত একটি জাতি যখন ক্রিকেটের মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করে, তখন শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকা এক খেলাধুলোর সংস্কৃতির পুনর্জন্মের গল্প লেখা হয়।
এই আত্মপ্রকাশ শুধু পরিসংখ্যানের পাতায় নাম তোলার ঘটনা নয়। এটি সেইসব মানুষের গল্প, যাঁরা ক্রিকেটার হয়েও শিক্ষক, ট্যাক্সিচালক, ফিজ়িওথেরাপিস্ট কিংবা হোটেলকর্মী। যারা পেশাদার লিগের ঝলমলে আলো থেকে বহু দূরে থেকেও বিশ্বাস রেখেছেন—একদিন তাঁদের খেলার দেশও ক্রিকেটবিশ্বে নিজের জায়গা করে নেবে। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব।
ফুটবলের দেশ, ক্রিকেটের স্বপ্ন
ইটালিকে বিশ্ব চেনে ফুটবলের দেশ হিসেবে। চারটি ফুটবল বিশ্বকাপ জয়, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সাফল্য, এসি মিলান, জুভেন্টাস, ইন্টার মিলানের মতো কিংবদন্তি ক্লাব—সব মিলিয়ে ইতালিয়ান ক্রীড়া সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফুটবলই ছিল এবং এখনও রয়েছে। ক্রিকেট সেখানে কখনও মূলধারার খেলা হয়ে উঠতে পারেনি। স্কুলপাঠ্যক্রমে ফুটবল যেখানে অবিচ্ছেদ্য, সেখানে ক্রিকেট বহু বছর ধরে ছিল অভিবাসী সমাজের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, ক্রিকেট ইটালিতে এসেছে ফুটবলেরও আগে। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ সৈনিক ও নৌবাহিনীর অফিসার অ্যাডমিরাল হোরাশিয়ো নেলসনের হাত ধরেই প্রথম ক্রিকেট বল গড়িয়েছিল নাপোলির মাটিতে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহের জন্য নাপোলিতে থাকা অবস্থায় অবসর সময়ে নেলসন ও তাঁর সঙ্গীরা ক্রিকেট খেলতেন। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল ইতালির ক্রিকেট যাত্রা।
এর এক শতাব্দী পরে, ১৮৯৩ সালে, জেনোয়ায় ইংল্যান্ডের দূতাবাসের কর্মীরা গড়ে তুলেছিলেন জেনোয়া ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিক ক্লাব। কিছুদিনের মধ্যেই ফুটবল জনপ্রিয়তা পেয়ে ক্রিকেটকে ছাপিয়ে যায়। জেমস রিচার্ডসন জেনোয়ায় ফুটবল ক্লাব চালু করেন, যা ১৮৯৮ সালে ইটালির প্রথম ফুটবল প্রতিযোগিতা জেতে। ১৮৯৯ সালে হারবার্ট কিলপিন বিদেশে গিয়ে ইটালিতে ক্লাব গড়ার উদ্যোগ নেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন মিলান ক্রিকেট ও ফুটবল ক্লাব—যা পরে এসি মিলান নামে পরিচিত হয়। আশ্চর্যজনক ভাবে, ১৯১৯ সাল পর্যন্ত সেখানে ফুটবল ও ক্রিকেট—দু’টিই খেলা হত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ক্রিকেট হারিয়ে যেতে বসে ফুটবলের স্রোতে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা ক্রিকেট
১৯১৯ সালের পর প্রায় কয়েক দশক ধরে ইটালিতে ক্রিকেট কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। তবে ১৯৬০-এর দশকে আবার ধীরে ধীরে ক্রিকেটের পুনর্জন্ম ঘটে। রোম ও আশপাশের অঞ্চলে কিছু প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অভিবাসী সমাজের হাত ধরে ক্রিকেট আবার শিকড় গাড়তে থাকে। পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ কাজের সূত্রে ইটালিতে এসে ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখেন।
ইটালি ক্রিকেট সংস্থার সিইও লুকা ব্রুনো মালাসপিনা জানিয়েছেন, ফুটবলের পর দ্বিতীয় কোনও খেলা যাতে দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে, সেই স্বপ্ন থেকেই তাঁরা স্কুলস্তর থেকে ক্রিকেট ছড়ানোর উদ্যোগ নেন। স্কুলের মাঠে ব্যাট-বলের পরিচয় করানো, স্থানীয় ক্লাব গড়া, কোচিং প্রোগ্রাম চালু করা—এই সবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ক্রিকেট আবার ইতালিয়ান সমাজে জায়গা করে নেয়। ক্রিকেট আর শুধু অভিবাসীদের খেলা থাকল না, স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হতে লাগল।
এই দীর্ঘ যাত্রার ফল আজকের এই মুহূর্ত—টি২০ বিশ্বকাপে ইটালির অভিষেক।
ইডেনে ঐতিহাসিক দিন
৯ ফেব্রুয়ারি, ইডেন গার্ডেন্সে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে ইটালি। ঘটনাচক্রে তাদের প্রথম ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ায় স্কটল্যান্ড সুযোগ পেয়ে যায়। গ্রুপ সি-তে এই দুই দল ছাড়াও রয়েছে ইংল্যান্ড, নেপাল ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের মতো শক্তিশালী ক্রিকেটশক্তি।
ইডেন শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। সেখানে আজুরি জার্সিতে ইতালিয়ান ক্রিকেটারদের নামা মানে শুধু একটি ম্যাচ নয়—এটি ইউরোপীয় ক্রিকেট ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়। ফুটবলের জন্য পরিচিত এক দেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পা রাখছে—এই দৃশ্য নিজেই এক প্রতীক।
বহু সংস্কৃতির মিলনমেলা: ইটালির দল
ইটালির বর্তমান দলটি এক কথায় আন্তর্জাতিকতার প্রতিচ্ছবি। দলে যেমন ইটালিতে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটার রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়। এই বহুজাতিক চরিত্রই ইটালির ক্রিকেটকে আলাদা করে তুলেছে।
আরও বিশেষ বিষয় হল—এই খেলোয়াড়দের অনেকের পেশাই ক্রিকেট নয়। কেউ শিক্ষক, কেউ ফিজ়িওথেরাপিস্ট, কেউ হোটেলকর্মী, কেউ বা কর্পোরেট চাকরিজীবী। কেউ কেউ সারা বছর ক্রিকেট খেললেও অনেকেই কাজের ফাঁকে অনুশীলন চালিয়ে যান। পেশাদার ক্রিকেটারদের মতো পূর্ণকালীন অনুশীলনের সুযোগ তাঁদের নেই। তবু আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নে তাঁরা নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন।
দলের অধিনায়ক ৪২ বছর বয়সি ওয়েন ম্যাডসন। অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার দলের ভিতরে একতার প্রতীক। তিনি জানিয়েছেন, “আমরা ম্যাচ জিততে চাই। ভাল ক্রিকেট খেলতে চাই। ছেলেরা অনেক দিন ধরে একসঙ্গে খেলছে। বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। আমরা আত্মবিশ্বাসী।”
১৫ জনের দলে সবচেয়ে বড় তারকা জেজে স্মাটস। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা এই দলের জন্য অমূল্য সম্পদ। রয়েছেন দু’জোড়া ভাই—হ্যারি ও বেঞ্জামিন মানেনটি এবং অ্যান্থনি ও জাস্টিন মস্কা—যাঁরা ইতালির ক্রিকেটকে পারিবারিক বন্ধনের মতো করে দেখেন।
ট্যাক্সিচালক থেকে বিশ্বকাপ ক্রিকেটার: জসপ্রীতের গল্প
এই দলে সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক গল্পটি সম্ভবত জসপ্রীত সিংহের। পঞ্জাবের ফাগওয়ারার বাসিন্দা জসপ্রীত ২০০৬ সালে কাজের সূত্রে ইটালিতে যান। ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ছোটবেলা থেকেই, কিন্তু ইউরোপের এক দেশে এসে ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন দেখাটা তখন অনেকটাই দূরের বিষয় ছিল।
প্রথমে টেপ বলে খেলা শুরু করেন তিনি। পরে বেরগামো ক্রিকেট ক্লাবে যোগ দেন। মিলানের ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে টেলগেট নামের একটি ছোট শহরে থাকেন জসপ্রীত, সেখানেই ক্লাবটি অবস্থিত। ২০১৬-১৭ সালে ইটালি ক্রিকেট সংস্থা আয়োজিত বিভিন্ন ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স করে নজর কাড়েন তিনি। ২০১৯ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হয় তাঁর।
বর্তমানে তিনি বছরের বেশিরভাগ সময় ইংল্যান্ডের বার্মিংহ্যামে থাকেন। সেখানে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য ট্যাক্সি চালান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হয়েও দৈনন্দিন জীবনে ট্যাক্সিচালকের কাজ করা—এই বাস্তবতা ইউরোপীয় ক্রিকেটের সংগ্রামকেই তুলে ধরে।
৯ ফেব্রুয়ারি ইডেনে তাঁর স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে। জসপ্রীত বলেন, “নভেম্বরে দুবাইয়ে খুব ভালো শিবির হয়েছিল। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কায় কয়েক জন খেলতে গিয়েছিল। জানুয়ারিতে আবার দুবাই গিয়ে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলেছি। ওদের হারিয়েছি। কোনও টেস্ট খেলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে সেটাই আমাদের প্রথম জয়। পরে নামিবিয়াকেও হারিয়েছি।” এই জয়গুলোই ইটালির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে বিশ্বকাপের আগে।
যোগ্যতা অর্জনের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
ইটালির বিশ্বকাপে ওঠার যাত্রা ছিল আবেগঘন। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচে শেষ বল করেছিলেন জসপ্রীতই। যদিও সেই ম্যাচে ইটালি ৯ উইকেটে হেরে যায়, তবু সামগ্রিক ফলাফলে তারা প্রথমবার বিশ্বকাপের টিকিট পায়। সেই মুহূর্ত ছিল ইটালির ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
ইটালি ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি লোরিয়া হাজ় পাজ় জানিয়েছেন, “১১ জুলাই দিনটা ভোলার নয়। সেদিনই আমরা বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম। এটা গোটা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী জনতার জয়। বছরের পর বছর ধরে ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফল পাচ্ছি।”
এই যোগ্যতা অর্জন শুধু একটি দল বা সংস্থার সাফল্য নয়—এটি ইটালিতে ক্রিকেট খেলে যাওয়া হাজার হাজার অভিবাসী ও স্থানীয় খেলোয়াড়দের দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি।
ফুটবল বিশ্বকাপে না, ক্রিকেট বিশ্বকাপে
এক অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা হল—যে বছরে ইটালি ক্রিকেট বিশ্বকাপে নামছে, সেই বছরেই তাদের ফুটবল দল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ১৯৫৮ সালের পর ২০১৮ ও ২০২২ সালে পর পর দু’বার ফুটবল বিশ্বকাপে ছিল না ইটালি। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও খেলার সম্ভাবনা অনিশ্চিত।
ফুটবলের দেশ হিসেবে পরিচিত একটি জাতির জন্য এই তথ্য নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। কিন্তু একই সময়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপে ইটালির অভিষেক যেন সেই হতাশার মধ্যে এক নতুন আশার আলো। এটি দেখিয়ে দেয়—ক্রীড়াসংস্কৃতির বৈচিত্র্য শুধু ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নতুন অধ্যায়ের দরজাও খুলে দেয়।
শিক্ষক থেকে ফিজ়িওথেরাপিস্ট: মাঠের বাইরের জীবন
ইটালির ক্রিকেট দলকে আলাদা করে তোলে তাদের খেলোয়াড়দের বহুমাত্রিক জীবনযাপন। অনেকেই পূর্ণকালীন পেশাদার ক্রিকেটার নন। কেউ শিক্ষকতা করেন, কেউ ফিজ়িওথেরাপিস্ট, কেউ হোটেল ম্যানেজমেন্টে যুক্ত, কেউ বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করেন। অনুশীলন ও ম্যাচের বাইরে তাঁদের জীবন চলে অফিস, স্কুল বা হাসপাতালের নিয়মিত দায়িত্বে।
এই বাস্তবতা তাঁদের সংগ্রামকে আরও গভীর করে তোলে। পেশাদার ক্রিকেটারদের মতো পূর্ণ সময় অনুশীলনের সুযোগ না থাকলেও তাঁরা রাতের পর রাত অনুশীলন করেন, ছুটির দিনে ম্যাচ খেলেন, পারিবারিক সময় কমিয়ে ক্রিকেটকে জায়গা দেন। তাঁদের কাছে ক্রিকেট শুধুই খেলা নয়—এটি পরিচয়, এটি স্বপ্ন, এটি একটি জাতির প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ।
কোচিং স্টাফ: অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার
ইটালির ক্রিকেট উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফ। দলের প্রধান কোচ জন ডেভিসন কানাডার হয়ে ২০০৩ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ খেলেছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে ৬৭ বলে শতরান করেছিলেন তিনি—যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংস হিসেবে পরিচিত। তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ইটালির খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা গড়তে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ব্যাটিং কোচ কেভিন ও’ব্রায়ান আয়ারল্যান্ডের হয়ে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক শতরান করেছিলেন। ৫০ বলে শতরান করে তিনি দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দিয়েছিলেন। তাঁর মতো ক্রিকেটারের উপস্থিতি ইটালির ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
দলের মিডিয়া ম্যানেজার রাকবির হাসান বাংলাদেশের ঢাকার বাসিন্দা। তাঁর দেশ বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না থাকলেও তিনি থাকবেন ইটালির সঙ্গে। তিনি বলেন, “ডেভিসন ও ও’ব্রায়ানেরা জানেন বিশ্বকাপে খেলতে গেলে কতটা পেশাদারিত্ব দরকার। চাপ সামলে কীভাবে খেলতে হয়, সেই শিক্ষা ওরা দিয়েছে। ফলে ইটালি প্রথমবার নামলেও কেউ যদি আমাদের হালকা ভাবে নেয়, তারা ভুল করবে।”
তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ
ইটালির ক্রিকেট সংস্থার মূল লক্ষ্য শুধু বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নয়—দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ানো। স্কুলস্তর থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্লাব গঠন, কোচিং প্রোগ্রাম চালু, যুব লিগ আয়োজন—এই সবের মাধ্যমে তাঁরা ক্রিকেটকে ইতালিয়ান সমাজে স্থায়ী জায়গা করে দিতে চান।
লুকা ব্রুনো মালাসপিনা জানিয়েছেন, “একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে সবটা শুরু হয়েছিল। স্কুলগুলোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল। তার পর পাড়ায় পাড়ায় ক্রিকেটের প্রসারের চেষ্টা হয়। অপরিচিত একটি খেলা থেকে ধীরে ধীরে ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।”
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সেই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। এখন লক্ষ্য—এই সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মকে ক্রিকেটের প্রতি আকৃষ্ট করা।
ইউরোপীয় ক্রিকেটে ইটালির অবস্থান
ইউরোপে ক্রিকেট বলতে সাধারণত ইংল্যান্ডের নামই প্রথমে আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ডের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হল ইটালি।
ইটালির বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ইউরোপীয় ক্রিকেটের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখিয়ে দেয়—ক্রিকেট আর শুধু কমনওয়েলথ বা উপনিবেশিক ইতিহাসসম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফুটবলের আধিপত্য থাকা দেশেও ক্রিকেট ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে পারে, যদি তৃণমূল স্তরে সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিশ্বকাপে প্রত্যাশা ও লক্ষ্য
ইটালির অধিনায়ক ওয়েন ম্যাডসন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধুই অংশগ্রহণ নয়—তাঁরা ম্যাচ জিততে চান। শক্তিশালী গ্রুপে পড়লেও তাঁরা আত্মবিশ্বাসী। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে তাঁরা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে চান। ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের মতো দলের বিরুদ্ধে খেলা তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য অমূল্য হবে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ভালো পারফরম্যান্স ইটালির ক্রিকেটের জন্য নতুন দরজা খুলে দিতে পারে—বড় স্পনসরশিপ, উন্নত অবকাঠামো, আরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচের সুযোগ।
ক্রিকেট ও পরিচয়ের রাজনীতি
ইটালির ক্রিকেট দল শুধু খেলোয়াড়দের নয়, বরং অভিবাসী সমাজের পরিচয়ের প্রতীকও। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষরা ক্রিকেটের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে ইতালিয়ান সমাজের মূলধারায় যুক্ত করেছেন।
এই দল দেখিয়ে দেয়—জাতীয় পরিচয় শুধু জন্মভূমির ওপর নির্ভর করে না, বরং অংশগ্রহণ, অবদান ও স্বপ্নের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে। আজুরিদের জার্সিতে যখন বিভিন্ন দেশের বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররা মাঠে নামছেন, তখন তাঁরা শুধু ইটালির প্রতিনিধিত্ব করছেন না—তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করছেন বহুসংস্কৃতির ইতালির।
ইতিহাসের পাতায় আজুরি ক্রিকেট
২৩৩ বছর আগে নাপোলির উপকূলে ব্রিটিশ নাবিকদের হাতে যে ক্রিকেট বল গড়িয়েছিল, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি যে একদিন সেই বল গড়াবে বিশ্বকাপের মঞ্চে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্রিকেট ইটালিতে ছিল যেন আইসিইউতে—জীবন ছিল, কিন্তু প্রাণ ছিল না। আজ সেই খেলাই নতুন উদ্যমে বিশ্বক্রিকেটের মানচিত্রে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে।
এই যাত্রা শুধু একটি দলের নয়—এটি একটি খেলাধুলোর সংস্কৃতির পুনর্জন্মের গল্প। ফুটবলের দেশে ক্রিকেট যে টিকে থাকতে পারে, বেড়ে উঠতে পারে এবং একদিন বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে—ইটালি সেই সম্ভাবনার জীবন্ত উদাহরণ।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
ইটালি ক্রিকেট সংস্থার লক্ষ্য শুধু একটি বিশ্বকাপে খেলা নয়। তাঁদের স্বপ্ন—আগামী দিনে নিয়মিত আইসিসি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ, ঘরোয়া লিগ শক্তিশালী করা, স্কুল ও কলেজ স্তরে ক্রিকেট চালু করা এবং স্থানীয় ইতালিয়ান তরুণদের মধ্যে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তোলা।
লোরিয়া হাজ় পাজ় বলেন, “এবার চাই, দেশ জুড়ে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পাক।” বিশ্বকাপ সেই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। যদি ইটালি এখানে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারে, তবে ক্রিকেট আর শুধু অভিবাসীদের খেলা হয়ে থাকবে না—এটি হয়ে উঠবে ইতালিয়ান ক্রীড়াসংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায়।