ইন্টার মায়ামির পারফরম্যান্স হতাশ করলেও মেসির পায়ে এখনও অটুট গোলের জাদু। চলতি MLS-এ ২১তম গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। বয়স ৩৯। কিন্তু লিয়োনেল মেসির পায়ের জাদুতে এখনও বিন্দুমাত্র মরচে পড়েনি। বরং বয়স যত বাড়ছে, ততই যেন আরও বিশেষ হয়ে উঠছে আর্জেন্টাইন মহাতারকার কিছু মুহূর্ত। কলম্বাস ক্রুর বিরুদ্ধে ইন্টার মায়ামির ২-১ গোলে হেরে যাওয়া ম্যাচেও তারই প্রমাণ মিলল। প্রায় অসম্ভব এক কোণ থেকে দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে সরাসরি গোল করে সবাইকে চমকে দিলেন মেসি।
ম্যাচে শুরু থেকেই খুব একটা স্বস্তিতে ছিল না ইন্টার মায়ামি। ঘরের মাঠে নয়, কলম্বাসের বিরুদ্ধে অ্যাওয়ে ম্যাচে শুরু থেকেই চাপ সামলাতে হচ্ছিল মেসিদের। ২৮ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল করে কলম্বাস ক্রুকে এগিয়ে দেন জোসেফ মার্তিনেজ। পিছিয়ে পড়ার পর সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মায়ামি।
এর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য ম্যাচটি আলাদা করে মনে রাখবেন ফুটবলপ্রেমীরা।
৩৩ মিনিটের মাথায় ফ্রি-কিক পায় ইন্টার মায়ামি। বল রাখা হয়েছিল মাঠের ডান দিকে, কর্নার ফ্ল্যাগের একেবারে কাছাকাছি। জায়গাটি এমন ছিল, যেখান থেকে সাধারণত সরাসরি গোল করার কথা খুব কম ফুটবলারই ভাবেন। স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হতে পারত বক্সের মধ্যে বল ভাসিয়ে দেওয়া। সতীর্থদের মাথা খুঁজে নেওয়া। সেখান থেকে হেডে গোলের সুযোগ তৈরি করা।
কিন্তু বল যখন মেসির পায়ে, তখন স্বাভাবিক হিসাব অনেক সময়ই বদলে যায়।
মেসি শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অসম্ভব কঠিন কোণ থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত ফ্রি-কিক নিলেন তিনি। বলটি বাঁক খেতে খেতে এগিয়ে গেল গোলের দ্বিতীয় পোস্টের দিকে। কলম্বাস ক্রুর গোলরক্ষক প্যাট্রিক শাল্টে বলের গতিপথ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁর নাগালের বাইরে দিয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে।
সমতা ফেরাল ইন্টার মায়ামি।
গোলটির সৌন্দর্য শুধু তার বাঁক বা নিখুঁত প্লেসমেন্টে নয়। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে শট নেওয়ার সিদ্ধান্তটিই। এতটা সরু কোণ থেকে সরাসরি গোল করার ঝুঁকি নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবে পরিণত করার দক্ষতা—দুটিই মেসির বিশেষত্বের পরিচয়। MLS-ও ম্যাচের হাইলাইটে এই গোলটিকে আলাদা করে তুলে ধরেছে।
মেসির জন্য এই গোলের আর একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ২০২৬ সালের MLS মরসুমে এর আগেই তিনি ২০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন এবং লিগের গোলের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন। কলম্বাসের বিরুদ্ধে গোলটি তাঁর লিগ গোলসংখ্যাকে ২১-এ নিয়ে যায়। MLS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ গোল করার পরও তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন।
তবে মেসির গোল শেষ পর্যন্ত ইন্টার মায়ামিকে হার থেকে বাঁচাতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে দু’দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। মেসিও আরও একবার গোলের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। তাঁর নেওয়া শট কোনও রকমে আটকে দেন কলম্বাসের গোলরক্ষক। মায়ামির সামনে জয়ের সুযোগ তৈরি হলেও সেটিকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
ম্যাচ যখন ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন যোগ করা সময়ে ঘটে যায় নাটকীয় ঘটনা। ৯০+৮ মিনিটে গোল করে কলম্বাস ক্রুকে আবার এগিয়ে দেন জামাল থিয়ারে। শেষ মুহূর্তের সেই গোলেই ২-১ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয় কলম্বাস। ফলে মেসির অসাধারণ গোলও শেষ পর্যন্ত মায়ামিকে পয়েন্ট এনে দিতে পারেনি।
ফুটবলের সৌন্দর্য অনেক সময় এখানেই। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এবং দলের ফলাফল সবসময় একই গল্প বলে না। কলম্বাসের বিরুদ্ধে মেসি এমন একটি গোল করলেন, যা ম্যাচের ফলাফলের বাইরেও আলাদা করে আলোচনায় থাকবে। কিন্তু দলের রক্ষণভাগ শেষ মুহূর্তে গোল হজম করায় সেই ব্যক্তিগত কীর্তি তিন পয়েন্টে পরিণত হল না।
মেসির বয়স এখন ৩৯। ২০২৬ সালের আগস্টে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও ক্লাব ফুটবলে তাঁর পথচলা এখনও অব্যাহত।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ অধ্যায়টিও ছিল ঘটনাবহুল। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে গেলেও মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সিদ্ধান্ত নেন। রেকর্ড ১২৫টি আন্তর্জাতিক গোল ও ২০৭টি ম্যাচের পর শেষ হয় তাঁর আর্জেন্টিনা অধ্যায়।
কিন্তু জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর ক্লাব ফুটবলে যেন নতুন করে নিজের গল্প লিখছেন তিনি।
ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মেসি মার্কিন ফুটবলে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন। ২০২৬ মরসুমেও তাঁর গোল ও অ্যাসিস্টের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। কলম্বাসের বিরুদ্ধে গোলটি করার কিছুদিন আগেই তিনি ইন্টার মায়ামির হয়ে ১০০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন। ক্রুজ় আজ়ুলের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের ক্যাম্পেওনেস কাপ ম্যাচে গোল করে সেই মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
এমনকি বয়স ৩৯ হয়ে যাওয়ার পরও মেসির পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ফুটবলবিশ্বকে অবাক করে চলেছে। MLS-এর অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ মরসুমে ২০ গোল করার সঙ্গে তাঁর অ্যাসিস্টের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল। তার আগের মরসুমেও তিনি ২৯টি লিগ গোল করেছিলেন। অর্থাৎ বয়সের সঙ্গে তাঁর খেলার ধরন বদলালেও আক্রমণে তাঁর প্রভাব কমেনি।
কলম্বাসের বিরুদ্ধে ম্যাচটিও সেই পরিবর্তনের একটি সুন্দর উদাহরণ। মেসি এখন আর তরুণ বয়সের মতো পুরো ম্যাচে একই গতিতে ছুটে বেড়ান না। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর বাঁ পা এখনও ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। একটি ফ্রি-কিক, কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত এবং নিখুঁত টেকনিক—এই তিনটি জিনিস দিয়েই তিনি আবারও দেখিয়ে দিলেন, কেন তাঁকে নিয়ে এত বছর ধরে ফুটবলবিশ্বের আগ্রহ শেষ হয়নি।
এই গোলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল দূরত্ব নয়, কোণ।
কর্নার ফ্ল্যাগের কাছাকাছি জায়গা থেকে সরাসরি গোল করার সম্ভাবনা সাধারণত অত্যন্ত কম। কারণ গোলের সামনে বল ভাসিয়ে দেওয়াই সেখানে প্রচলিত কৌশল। ডিফেন্ডারদের মাথার উপর দিয়ে বল পাঠিয়ে সতীর্থের হেডের সুযোগ তৈরি করা যায়। কিন্তু মেসি সেই প্রচলিত পথ বেছে নেননি।
তিনি দেখেছিলেন অন্য একটি সম্ভাবনা।
বলকে এমনভাবে বাঁকিয়ে নেওয়া, যাতে সেটি গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে গিয়ে দ্বিতীয় পোস্টের ভিতরের দিকে ঢুকে পড়ে। বাস্তবে ঠিক সেটিই হলো। বলের গতিপথ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোলরক্ষকের জন্য কঠিন ছিল এবং মেসির নিখুঁত ফ্রি-কিক সমতায় ফেরায় ইন্টার মায়ামিকে।
ফুটবলে অসাধারণ গোলের তালিকায় অনেক ধরনের গোল থাকে। দূরপাল্লার শট, একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল, ভলি, বাইসাইকেল কিক, কিংবা শেষ মুহূর্তের হেড। কিন্তু মেসির এই গোলটি আলাদা হয়ে থাকবে তার কৌশলগত সাহসের কারণে।
যে জায়গা থেকে অধিকাংশ ফুটবলার ক্রস করার কথা ভাববেন, সেখান থেকে সরাসরি গোলের চেষ্টা করা—এটাই মেসির বিশেষত্ব।
আর সেই চেষ্টা সফল হলে মুহূর্তটি আরও স্মরণীয় হয়ে ওঠে।
তবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের এই আলোচনার পাশাপাশি ইন্টার মায়ামির সামগ্রিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। কলম্বাসের বিরুদ্ধে হারের ফলে দলটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হারিয়েছে। MLS-এর নিয়মিত মরসুমের শেষ পর্যায় এগিয়ে আসায় প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্বও বাড়ছে। কলম্বাসের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তের গোল মায়ামির জন্য সেই অর্থে বড় ধাক্কা।
তবু মেসির জন্য রাতটি সম্পূর্ণ ব্যর্থতার নয়।
দলের স্কোরলাইনে তাঁর গোল যোগ হয়েছে। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানেও আরও একটি গোল যুক্ত হয়েছে। আর ফুটবলপ্রেমীদের জন্য রেখে গিয়েছেন এমন একটি মুহূর্ত, যা ম্যাচের ফলাফলের বাইরেও আলোচনায় থাকবে।
৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানো একজন ফুটবলার যখন এখনও MLS-এর গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষে থাকেন, তখন সেটি নিঃসন্দেহে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী দক্ষতার একটি পরিসংখ্যানগত প্রমাণ। আর যখন সেই গোল আসে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছাকাছি প্রায় অসম্ভব কোণ থেকে, তখন সেটি শুধুই একটি গোল থাকে না—হয়ে ওঠে মেসি-ম্যাজিকের আর একটি অধ্যায়।
আর্জেন্টিনার জার্সি হয়তো আর নিয়মিত দেখা যাবে না। আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চেও তাঁর পথচলা শেষ। কিন্তু ক্লাব ফুটবলে এখনও তাঁর বাঁ পায়ে গল্প লেখা হচ্ছে।
কলম্বাস ক্রুর বিরুদ্ধে সেই গল্পের আর একটি অধ্যায় ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের।
একটি ফ্রি-কিক।
একটি বাঁক।
একটি জাল কাঁপানো মুহূর্ত।
আর সেই মুহূর্তের কেন্দ্রে—লিয়োনেল মেসি।