Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মায়াপুরে গোমাতা সেবায় শুভেন্দু অধিকারী, “হরে কৃষ্ণ” ধ্বনিতে মুখরিত ইসকন চত্বর

নদীয়ার মায়াপুরে গোমাতা সেবা ও আধ্যাত্মিক কর্মসূচিতে যোগ দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ইসকন মন্দিরে বিশেষ পূজা, যজ্ঞ ও গরুদের লাড্ডু খাওয়ানোর মাধ্যমে এক ভিন্ন বার্তা দিলেন তিনি। রাজনৈতিক সভা নয়, সম্পূর্ণ ধর্মীয় আবহেই কাটল তাঁর সফর।

নদীয়ার মায়াপুরে বৃহস্পতিবার এক বিশেষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নজর কাড়লেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। “গোমাতা”র পুজো ও সেবাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি সরাসরি হেলিকপ্টারে করে পৌঁছে যান আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকন মায়াপুর মন্দিরে। রাজনৈতিক সভা, প্রশাসনিক বৈঠক বা দলীয় কর্মসূচির বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভক্তিমূলক আবহে তাঁর এই সফর ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে জোর চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় সাড়ে ১১টা নাগাদ শুভেন্দু অধিকারীর হেলিকপ্টার মায়াপুরের নির্ধারিত হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। সেখান থেকে তিনি সরাসরি ইসকন মন্দিরে যান। মন্দির প্রাঙ্গণে তাঁকে স্বাগত জানান ইসকনের সন্ন্যাসী, ভক্ত ও কর্তৃপক্ষরা। শঙ্খধ্বনি, ফুলের মালা এবং “হরে কৃষ্ণ” মহামন্ত্রের মধ্য দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। মন্দিরে প্রবেশের পর তিনি প্রথমে বিশেষ পূজায় অংশ নেন এবং পরে যজ্ঞ মণ্ডপে উপস্থিত থেকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

এই সফরের মূল আকর্ষণ ছিল গোমাতা সেবা কর্মসূচি। ইসকনের গোশালায় গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী নিজ হাতে গরুদের লাড্ডু খাওয়ান এবং কিছু সময় সেখানে কাটান। গোশালায় উপস্থিত ভক্তদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলতে দেখা যায় তাঁকে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী গোমাতাকে হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। বহু ভক্তের মতে, গোমাতা সেবা এক ধরনের পুণ্য অর্জনের পথ। সেই ভাবধারাকেই সামনে রেখে এদিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল।

মায়াপুর এমনিতেই বিশ্বব্যাপী বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত এখানে আসেন। ইসকনের আন্তর্জাতিক সদর দফতর হওয়ায় এই অঞ্চলের ধর্মীয় গুরুত্ব আলাদা মাত্রা পেয়েছে। সেই মায়াপুরেই শুভেন্দু অধিকারীর এই সফরকে অনেকেই রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। যদিও এদিন তাঁর সফরে কোনও রাজনৈতিক ভাষণ বা দলীয় কর্মসূচি ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলার রাজনীতিতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবেগ এখন একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আবেগের সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছেন। শুভেন্দু অধিকারীর এই সফরকেও অনেকেই সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সফর ছিল এবং এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই।

মন্দির চত্বরে উপস্থিত বহু ভক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দা শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে ছবি তোলেন, আবার অনেকে শুভেচ্ছা জানান। গোটা এলাকাজুড়ে “হরে কৃষ্ণ” ধ্বনি ও ভক্তিমূলক সংগীতের আবহ তৈরি হয়। ইসকনের তরফেও এই কর্মসূচিকে সফল বলে দাবি করা হয়েছে।

এদিন মায়াপুরে নিরাপত্তার দিকেও ছিল কড়া নজর। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। হেলিপ্যাড থেকে মন্দির পর্যন্ত রাস্তা নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়। যদিও সাধারণ ভক্তদের প্রবেশে খুব বেশি বাধা দেওয়া হয়নি বলে জানা গিয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বাংলার গ্রামীণ ও ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলি আরও বেশি করে ধর্মীয় মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে গোমাতা সেবা, মন্দির দর্শন বা আধ্যাত্মিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জনসংযোগ তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। শুভেন্দু অধিকারীর মায়াপুর সফর সেই প্রবণতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের একাংশ এই সফরকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক নেতাদের শুধুমাত্র রাজনৈতিক মঞ্চেই নয়, সমাজ ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও সক্রিয় থাকা উচিত। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক বার্তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মত প্রকাশ করেছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে, নদীয়ার মায়াপুরে শুভেন্দু অধিকারীর এই সফর শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করেছে, তেমনই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গোমাতা সেবা, ইসকনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং “হরে কৃষ্ণ” ধ্বনিতে মুখরিত মায়াপুরের পরিবেশ এদিন এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল।

মায়াপুর সফরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলার রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ঘিরে রাজনৈতিক কৌশল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণেই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে বিভিন্ন সময়ে মন্দির, মঠ, মসজিদ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর এই সফরও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকে।

news image
আরও খবর

বিশেষ করে মায়াপুরের মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন বৈষ্ণব তীর্থস্থানে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইসকন শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ভক্তের সঙ্গে যুক্ত একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সংগঠন। দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ও ভক্ত প্রতিবছর মায়াপুরে আসেন। ফলে এই ধরনের একটি জায়গায় কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

এদিনের অনুষ্ঠানে গোমাতা সেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে গোমাতাকে মাতৃরূপে দেখা হয় এবং বহু মানুষ গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে মানেন। সেই ভাবধারার প্রতিফলন দেখা যায় ইসকনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও। গরুর সুরক্ষা, পরিচর্যা এবং গোশালার উন্নয়নে ইসকন দীর্ঘদিন ধরেই নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করেছে বলে মত অনেকের।

শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, এদিন মায়াপুরের পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। মন্দির চত্বরে সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড় জমতে শুরু করে। অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে এসেছিলেন এই বিশেষ কর্মসূচির সাক্ষী থাকতে। কেউ কীর্তনে অংশ নেন, কেউ আবার যজ্ঞ ও পূজার আচার দেখেন। ভক্তিমূলক সংগীত, কীর্তন এবং “হরে কৃষ্ণ” নামসংকীর্তনে গোটা এলাকা আধ্যাত্মিক আবহে ভরে ওঠে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এদিনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আশাবাদী ছিলেন। কারণ বড় কোনও অনুষ্ঠান বা বিশিষ্ট ব্যক্তির আগমন হলে মায়াপুরে পর্যটক ও দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় দোকানপাট এবং পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের ধর্মীয় পর্যটন আরও বাড়লে নদীয়ার অর্থনীতিতেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে, শুভেন্দু অধিকারীর সফরকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের তরফে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল নজরকাড়া। হেলিপ্যাড এলাকা থেকে মন্দির চত্বর পর্যন্ত একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। পুলিশ, সিভিক ভলান্টিয়ার এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন ছিল গোটা এলাকায়। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়া হলেও সাধারণ দর্শনার্থীদের খুব বেশি অসুবিধার মুখে পড়তে হয়নি বলে জানা যায়। প্রশাসনের তরফে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

শুভেন্দু অধিকারীর এই সফরকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়াতেও ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। বিশেষ করে গোমাতাকে নিজ হাতে লাড্ডু খাওয়ানোর দৃশ্য বহু মানুষের নজর কেড়েছে। কেউ এই উদ্যোগকে আধ্যাত্মিক ও মানবিক বার্তা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে সব বিতর্কের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট—এই সফর মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি করতে সফল হয়েছে।

ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়াপুরের মতো জায়গায় এই ধরনের অনুষ্ঠান শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৈষ্ণব দর্শনের মূল ভিত্তি হল প্রেম, ভক্তি ও মানবসেবা। সেই আদর্শকে সামনে রেখেই ইসকন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। গোমাতা সেবা সেই বৃহত্তর মানবিক ও আধ্যাত্মিক ভাবনারই একটি অংশ।

একাংশের মতে, বাংলায় ধর্মীয় পর্যটনের সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। মায়াপুর, তারাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট, বেলুড় মঠের মতো জায়গাগুলিকে কেন্দ্র করে পর্যটন আরও বাড়ানো সম্ভব। সেই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুভেন্দু অধিকারীর এই সফর সেই প্রসঙ্গকেও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, মায়াপুরে শুভেন্দু অধিকারীর এই সফর শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার ঘটনা নয়, বরং এটি ধর্ম, সংস্কৃতি, জনসংযোগ এবং সামাজিক আবেগ—এই চারটি বিষয়ের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একজন নেতার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ সাধারণ মানুষের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। গোমাতা সেবা, যজ্ঞ, পূজা এবং “হরে কৃষ্ণ” ধ্বনিতে মুখরিত ইসকন মায়াপুর এদিন যেন এক বৃহত্তর আধ্যাত্মিক উৎসবে পরিণত হয়েছিল।

আগামী দিনেও এই ধরনের কর্মসূচি বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ধর্মীয় আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে মানুষের অংশগ্রহণ যেমন বাড়ছে, তেমনই রাজনৈতিক নেতৃত্বও সেই আবেগের সঙ্গে নিজেদের আরও বেশি করে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। মায়াপুরের এই কর্মসূচি সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল।

Preview image