ভাইরাস নিজেরা জীবিত নয় এবং তারা একা একা বাঁচতে বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। বংশবৃদ্ধি করার জন্য তাদের মানুষ প্রাণী বা উদ্ভিদের জীবন্ত কোষের ভিতরে প্রবেশ করতে হয় এবং সেই কোষের সাহায্যেই তারা নতুন ভাইরাস তৈরি করে।
মানুষের শরীরে বিভিন্ন ধরনের অণুজীব বাস করে। এদের মধ্যে কিছু আমাদের শরীরের জন্য উপকারী হলেও কিছু আবার গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে। এই অণুজীবগুলির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত দুটি হল ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া।
অনেক সময় মানুষ মনে করে ভাইরাসই সবচেয়ে বিপজ্জনক জীবাণু। কারণ কোভিড-১৯, নিপা বা এইচআইভির মতো ভাইরাসজনিত রোগের খবর আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, তুলনা করলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাকটেরিয়ার মারণ ক্ষমতা ভাইরাসের চেয়ে বেশি হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভাইরাস নিরীহ। ভাইরাসের সংক্রমণও মানুষের জন্য মারাত্মক হতে পারে এবং সঠিক সময়ে প্রতিরোধ না করলে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার প্রকৃতি, পার্থক্য এবং তাদের সংক্রমণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাইরাসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল—এরা নিজেরা সম্পূর্ণ জীবিত নয়। তারা স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে না এবং নিজেরা বংশবৃদ্ধিও করতে পারে না।
বংশবৃদ্ধির জন্য ভাইরাসকে অবশ্যই একটি জীবন্ত কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। সেই কোষটি মানুষ, প্রাণী অথবা উদ্ভিদের হতে পারে। ভাইরাস যখন সেই কোষে ঢুকে পড়ে তখন কোষের নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিজের কপি তৈরি করে।
এই কারণে ভাইরাসকে অনেক সময় “obligate intracellular parasite” বলা হয়, অর্থাৎ এমন পরজীবী যা কোষের বাইরে কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভাইরাসের রিসেপ্টর নির্ভরতা। প্রতিটি ভাইরাসের নিজস্ব কিছু বিশেষ রিসেপ্টর থাকে। এই রিসেপ্টরগুলি শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গ বা কোষের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এর ফলে ভাইরাসের আক্রমণের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ
হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস মূলত লিভার কোষে আক্রমণ করে
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস সাধারণত শ্বাসনালীতে সক্রিয় হয়
কিছু ভাইরাস স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে
এর মানে হল একটি ভাইরাস শরীরের সব অঙ্গকে একসঙ্গে আক্রমণ করতে পারে না।
অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অনেক ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দ্রুত মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
মানবদেহে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে ইমিউন সিস্টেম বলা হয়। এই ব্যবস্থা শরীরে প্রবেশ করা জীবাণুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
যখন কোনো ভাইরাস শরীরে ঢোকে তখন ইমিউন সিস্টেম সেই ভাইরাসের রিসেপ্টর বা প্রোটিনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করে। একবার এই শনাক্তকরণ হয়ে গেলে শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে।
অ্যান্টিবডি হল বিশেষ ধরনের প্রোটিন যা ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করে। ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমে যায়।
এই কারণেই অনেক ভাইরাস সংক্রমণ একবার হলে শরীরে দীর্ঘদিনের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে টিকাও এই একই পদ্ধতিতে কাজ করে।
যখন সম্পূর্ণ নতুন কোনো ভাইরাস পৃথিবীতে আসে তখন মানুষের শরীর সেই ভাইরাসকে আগে কখনো দেখেনি। ফলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম শুরুতে সেই ভাইরাসকে দ্রুত চিনতে পারে না।
এই সময় ভাইরাস সহজেই শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
কিন্তু কিছুদিন পরে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটির গঠন ও রিসেপ্টর সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে মানুষের শরীরও ধীরে ধীরে সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে।
এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা কমে যেতে দেখা যায়।
কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে আমরা এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছি।
মহামারির শুরুতে যখন ভাইরাসের আলফা স্ট্রেন ছড়িয়েছিল তখন মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি ছিল। কারণ তখন মানুষের শরীরের কাছে ভাইরাসটি সম্পূর্ণ নতুন ছিল।
পরবর্তীকালে ভাইরাসটি বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট যেমন ডেল্টা বা অন্য স্ট্রেন দেখা যায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগের তীব্রতা কমে যায়।
নিপা ভাইরাস বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ভাইরাসগুলির মধ্যে একটি। এই ভাইরাস মূলত বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুহারও বেশি।
তবে ইতিহাস বলছে বেশিরভাগ ভাইরাসই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং তাদের মারণ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়।
ভবিষ্যতে নিপা ভাইরাসও হয়তো তুলনামূলক কম মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। যদিও এখনই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তাই সতর্কতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
অনেক সময় দেখা যায় কোনো ভাইরাসের মৃত্যুহার কমে গেলে মানুষ সতর্কতা ভুলে যায়। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি প্রবণতা।
কারণ ভাইরাসের তাৎক্ষণিক প্রভাব কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
উদাহরণস্বরূপ
কোভিড সংক্রমণের পরে অনেকের লং কোভিড সমস্যা দেখা গেছে
এইচআইভি সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে
তাই ভাইরাসকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
র্যাবিস পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক ভাইরাসগুলির মধ্যে একটি। একবার এর লক্ষণ প্রকাশ পেলে প্রায় ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।
এই ভাইরাস সাধারণত সংক্রমিত কুকুর, বিড়াল বা বাদুড়ের কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।
তবে সুখবর হল দ্রুত ভ্যাকসিন নিলে এই রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এইচআইভি এমন একটি ভাইরাস যা সরাসরি মানুষের ইমিউন সিস্টেমকে আক্রমণ করে।
চিকিৎসা না করলে এটি ধীরে ধীরে এইডস রোগে পরিণত হয়। একসময় এটি প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ ছিল।
বর্তমানে উন্নত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি ব্যবহারের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।
ভাইরাসের তুলনায় ব্যাকটেরিয়া অনেক বেশি স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে।
ব্যাকটেরিয়া নিজে নিজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে কঠিন পরিবেশেও দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।
কিছু ব্যাকটেরিয়া
বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়
খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়
ত্বকের সংস্পর্শে ছড়ায়
এই কারণে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দ্রুত বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চিঠির মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া ছড়ানোর ঘটনা বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া অনেক সময় জৈব অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।
এই ব্যাকটেরিয়া অ্যানথ্রাক্স রোগ সৃষ্টি করে। ত্বকে সংক্রমণ তুলনামূলক কম মারাত্মক হলেও ফুসফুসে সংক্রমণ হলে তা দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
প্লেগ ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মহামারির জন্য দায়ী। নিউমোনিক প্লেগ অত্যন্ত সংক্রামক এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী নিউরোটক্সিন তৈরি করে। অল্প পরিমাণ টক্সিনই মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করতে পারে।
ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢুকলে বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তীব্র শ্বাসকষ্ট
বুকে ব্যথা
জ্বর
যখন ব্যাকটেরিয়া রক্তে ছড়িয়ে পড়ে তখন শরীরের একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে।
কিছু ব্যাকটেরিয়া টক্সিন তৈরি করে যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
নিয়মিত হাত ধোয়া
প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করা
অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
নিরাপদ খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা
স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে আরও উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থা যেমন
PPE
গগলস
উচ্চ মানের মাস্ক
ব্যবহার করা প্রয়োজন।
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
ডক্সিসাইক্লিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন বা লিভোফ্লক্সাসিনের মতো ওষুধ অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
কিছু রোগের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন অত্যন্ত কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
প্লেগ বা কলেরার মতো রোগে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকা দেওয়া হয়।
কিছু ক্ষেত্রে শরীরে তৈরি হওয়া টক্সিন নিষ্ক্রিয় করতে গামাগ্লোবিউলিন বা বিশেষ অ্যান্টিবডিও ব্যবহার করা হয়।
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া—দু’টিই মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তবে তাদের প্রকৃতি, সংক্রমণের পদ্ধতি এবং মারণ ক্ষমতা ভিন্ন।
ভাইরাস সাধারণত নির্দিষ্ট কোষে আক্রমণ করে এবং শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক সময় দ্রুত তা শনাক্ত করতে পারে। অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়া অনেক বেশি স্বাধীনভাবে ছড়াতে পারে এবং কখনো কখনো অত্যন্ত মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সচেতনতা।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ সংক্রমণই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মানুষের সচেতনতা এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিই ভবিষ্যতে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।