ভারতের সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতে গাঙ্গুলি পরিবার একটি উজ্জ্বল নাম। এই পরিবারের এক কিংবদন্তি শিল্পী হলেন রুমা গুহঠাকুরতা, যাঁর কণ্ঠ এবং অভিনয় আজও মানুষের হৃদয়ে স্থান পায়। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল— তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ মা, যিনি তিন সন্তানকে একাই বড় করেছিলেন। অমিতকুমার বড়দা সম্প্রতি তাঁর মায়ের সংগ্রামী জীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন, যা শুধু তাঁর শৈশবের স্মৃতি নয়, বরং ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অমূল্য অংশ। তিনি বলেন, মা আমাদের যেভাবে বড় করেছেন, তা আজ ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়। রুমা গুহঠাকুরতার জীবন ছিল এক সংগ্রামের গল্প। তিনি ছিলেন একজন সফল শিল্পী, কিন্তু তাঁর প্রতিদিনের জীবন ছিল এক যুদ্ধে। একজন মায়ের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি নিজের কেরিয়ারও সামলেছিলেন। বিচ্ছেদের পর সমাজে নানা প্রশ্ন এবং তির্যক মন্তব্যের মুখে তিনি কখনোই ভেঙে পড়েননি, বরং সন্তানদের সেই শক্তি ও সাহস দিয়েছেন, যাতে তারা জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। অমিতকুমার তাঁর মায়ের সঙ্গে কিশোরকুমারের সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছেন। যদিও রুমা গুহঠাকুরতা এবং কিশোরকুমারের দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ ঘটেছিল, তবু তাঁদের সম্পর্কের মানবিক দিক কখনও ভাঙেনি। অমিতকুমারের স্মৃতিচারণে উঠে আসে রুমা গুহঠাকুরতার সেই দৃষ্টান্ত, যেখানে তিনি বুঝিয়েছেন, সম্পর্ক কখনও তিক্ততা গ্রহণ করতে পারে না, বরং মানবিকতার মধ্য দিয়ে তা পরিচালিত হওয়া উচিত।
ভারতের সংগীত ও চলচ্চিত্রজগতের ইতিহাসে গাঙ্গুলি পরিবার এক বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। সেই পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী, যাঁর কণ্ঠ, অভিনয় এবং ব্যক্তিত্ব আজও সমানভাবে আলোচিত— রুমা গুহঠাকুরতা। তাঁর জীবন ছিল একদিকে সৃজনশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে মা হিসেবে এক অসাধারণ সংগ্রামের গল্প। তাঁর ছেলে অমিতকুমার বড়দা সম্প্রতি তাঁদের পারিবারিক স্মৃতি ও মায়ের অবিশ্বাস্য জীবনযুদ্ধ নিয়ে মুখ খুলেছেন। তাঁর কথায় উঠে এসেছে এমন বহু ঘটনা, যা শুধু তাঁর শৈশবের স্মৃতি নয়, বরং ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে গভীরভাবে মূল্যবান। তিনি বললেন, “আমরা তিন ভাইবোন। মা আমাদের যে ভাবে বড় করেছেন, তা আজ ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়।” এই একটি বাক্য যেন রুমা গুহঠাকুরতার কর্মযজ্ঞের সারকথা তুলে ধরে। অমিতকুমারের স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে তাঁর মায়ের সেই অদম্য মনোবল। রুমা গুহঠাকুরতা যখন সন্তানদের মানুষ করছেন, তখন তিনি শুধু ঘরের মা ছিলেন না, ছিলেন এক সফল শিল্পী। বাংলা সিনেমায় তাঁর অভিনয় একদিকে যেমন দর্শকদের মন ছুঁয়েছে, তেমনই সংগীতে তাঁর কোরাল গ্রুপ বাংলা গানকে এক নতুন পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু শিল্পীসত্তার পাশাপাশি তাঁর আরেক পরিচয় ছিল— যোদ্ধা মা। এমন এক মা, যিনি সমাজের সকল বাধা উপেক্ষা করে, নিজের কেরিয়ার সামলে, তিন সন্তানকে নিজের হাতে বড় করে তুলেছিলেন। বিচ্ছেদের পর একজন নারী হিসেবে যে ধরনের চাপ, প্রশ্ন, কটু মন্তব্য, সমাজের তির্যক দৃষ্টি তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল, তা আজও অনেকেই অনুমান করতে পারেন না। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং তিনি তাঁর সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যাতে তারা পৃথিবীর কোনও পরিস্থিতিতেই নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়াতে পারে। এই প্রসঙ্গে অমিতকুমারের দেওয়া এক আবেগঘন স্মৃতি বিশেষভাবে নজরকাড়া। তিনি বলেন, “কিশোরকুমারকে আমরা ডাকতাম ‘বাপি’। আমাদের কাছে তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি গায়ক বা অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিবারের মতো।” যদিও রুমা গুহঠাকুরতা এবং কিশোরকুমারের দাম্পত্য বেশিদিন টেকেনি, কিন্তু তা তাঁদের সম্পর্কের মানবিক দিককে কখনও ভাঙতে পারেনি। বিচ্ছেদের পরেও যে বন্ধুত্ব বজায় রাখা যায়, সেই উদাহরণ তখনকার সময়ে ছিল অত্যন্ত বিরল। অমিতকুমার শেয়ার করেছেন, তাঁদের মা কখনও সম্পর্ককে তিক্ত হতে দেননি। তিনি কখনও সন্তানদের সামনে নেতিবাচক কথা বলেননি। বরং সবসময় বলতেন যে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক মানবিকতা দিয়ে বিচার করতে হয়। এ কথা শুনলে বোঝা যায়, রুমা গুহঠাকুরতা কেমন উদার, বিচক্ষণ ও শক্তিশালী একজন নারী ছিলেন। অমিতকুমারের স্মৃতিতে উঠে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র— অশোককুমার। ভারতীয় সিনেমার মহারথী এই অভিনেতা বহুবার এসেছেন তাঁদের বাড়িতে। ছোটবেলায় তাঁকে দেখে শিশুমনে কোনও ভক্তির অনুভূতি কাজ করত না, কারণ তারা জানত না তিনি কত বড় তারকা। তাঁর উপস্থিতিতে বাড়িতে তৈরি হত এক উষ্ণ, আরামদায়ক পরিবেশ। আড্ডা, গল্প, হাসি— সব মিলিয়ে তাঁদের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল শিল্পীদের মিলনমঞ্চ। বিচ্ছেদের পরেও এমন নিখাদ সম্পর্ক বজায় রাখা যে কতটা দুর্লভ, তা ভাবলেই আজও অনেকে অবাক হয়ে যান। তবে এই সমস্ত উজ্জ্বল স্মৃতির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর সংগ্রামের অধ্যায়। রুমা গুহঠাকুরতার জীবনে আর্থিক চাপ ছিল, সামাজিক চাপও ছিল। একা হাতে সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তবুও তিনি শিল্পকে ছাড়েননি, সন্তানদের অবহেলাও করেননি। তাঁর দিন শুরু হতো ভোরে এবং শেষ হতো গভীর রাতে। সন্তানদের পড়াশোনা, গান শেখানো, সময়মতো খাবার, আবার নিজে শুটিংয়ে যাওয়া, মঞ্চে পারফর্ম করা, রিহার্সালের আয়োজন— সব একাই সামলাতেন তিনি। তাঁর প্রতিটি দিন ছিল যুদ্ধের মতো, কিন্তু সেই যুদ্ধে তিনি কখনও পরাজিত হননি। এই বিষয়ে অমিতকুমার বলেন, তাঁদের মা খুব কঠোর ছিলেন। তিনি সন্তানদের কখনও অলস হতে দিতেন না। জীবনকে কীভাবে উপভোগ করতে হয়, তার থেকেও বেশি শেখাতেন দায়িত্ব কীভাবে নিতে হয়। তিনি বলতেন, “মানুষ হও, তার পর শিল্পী হও।” তাঁর মতে, একজন শিল্পী যদি মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, তবে তার প্রতিভা কোনও দিনই সম্পূর্ণ রূপে ফুটে ওঠে না। সন্তানদের জীবনে এই শিক্ষাই রেখে গিয়েছিলেন তিনি। শৈশবের বহু স্মৃতি অমিতকুমারের কণ্ঠে আজও ভাসে। তিনি মনে করেন, তাঁদের বাড়িতে আসা তারকাদের ভিড় কোনওদিন তাঁদের অহংকার শেখায়নি। বরং তাঁরা শিখেছেন বিনয় এবং সম্মান কীভাবে বজায় রাখতে হয়। বাড়িতে অতিথি মানেই আনন্দ। তাতে সে অশোককুমার হোন বা সাধারণ কোনও কর্মী— সকলকেই সমান মমতায় দেখতেন রুমা গুহঠাকুরতা। এই মূল্যবোধই সন্তানদের মনে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। বিচ্ছেদের পর সমাজ রুমা গুহঠাকুরতাকে সহজে গ্রহণ করেনি। একা মহিলা, তিন সন্তানের মা— অনেকেই নানা প্রশ্ন করেছেন, মন্তব্য করেছেন, তবু তিনি মাথা উঁচু করে নিজের পথে হাঁটেছেন। সন্তানদের সাহস জুগিয়েছেন, বলেছেন যে দুর্বলতা নয়, শক্তিই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি কখনও সমাজের সামনে নিজেকে অসহায় করে তুলতে চাননি, বরং দেখিয়েছেন— ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন নারী সমস্ত বাধা জয় করতে পারে। কিশোরকুমারের সঙ্গে বিচ্ছেদের পরও যে বন্ধুত্ব বজায় থাকে, তা আজকের সময়ে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অমিতকুমার বলেন, তাঁদের মা সবসময় সম্মান দিয়ে কথা বলতেন, কখনও কোনও তিক্ত বাক্য উচ্চারণ করেননি। এ থেকে তিনি শিখেছেন যে সম্পর্ক ভাঙতে পারে, কিন্তু সম্মান ভাঙা উচিত নয়। এই একটাই শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ সমাজে আমরা দেখেছি বিচ্ছেদের পর তিক্ততা, অপমান, প্রতিশোধ— কিন্তু রুমা গুহঠাকুরতা সেই গণ্ডির বাইরে ছিলেন। অমিতকুমার তাঁর স্মৃতিতে আরও জানান, তাঁদের বাড়িতে শিল্প ছিল নিত্যসঙ্গী। সকালবেলা গান শেখা, দুপুরে বই পড়া, সন্ধ্যায় রিহার্সালের শব্দ— তাঁদের জীবন ছিল শিল্পে মোড়া। সন্তানদের উপর কোনওদিন জোর খাটানো হয়নি, তবে শৃঙ্খলা ছিল কঠোর। সবাইকে নিজের কাজ নিজে করতে হতো। বাড়িতে কোনও চাকর বা সহকারী সবসময় থাকত না। ফলে রুমা গুহঠাকুরতা সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখান আত্মনির্ভরশীলতা। কিশোরকুমারের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে অমিতকুমার বলেন, তিনি তাঁদের ভালবাসতেন। মাঝে মাঝে দেখা হলে গল্প করতেন, হাসাতেন। তাঁদের প্রতি তাঁর স্নেহ কখনও কমেনি। তাঁরা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন এক নির্ভেজাল, বন্ধুসুলভ আচরণ। কিশোরকুমার তাঁদের কাছে কখনও বড় তারকা ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন বাবা-সম মানুষ, একজন বাপি। আজ অমিতকুমার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, মা রুমা গুহঠাকুরতা ছিলেন জীবনের পাঠশালা। তিনি প্রতিটি কাজ করতেন নিখুঁতভাবে, মানসিক শক্তি নিয়ে। তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী চাইলেই পরপর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। তাঁর সন্তানদের আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত দেখে তিনি নিশ্চয়ই খুশি হতেন। কারণ তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন— তা তাঁদের সারা জীবনের সম্পদ। এই দীর্ঘ গল্প আসলে শুধুই একটি পরিবারের ইতিহাস নয়। এটি একজন নারীর সংগ্রামের গল্প, একজন শিল্পীর আদর্শের গল্প, একজন মায়ের নিখাদ মমতার গল্প। রুমা গুহঠাকুরতা আজ যদিও আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবোধ, তাঁর মানবিকতা, তাঁর শিল্পীসত্তা আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। আর অমিতকুমার বড়দার স্মৃতিচারণ সেই ইতিহাসকে আরও একবার সামনে এনে দেয়, প্রমাণ করে যে সম্পর্কের সৌন্দর্য কখনও বিচ্ছেদের মাঝে হারিয়ে যায় না। বরং সত্যিকার সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও মূল্যবান হয়। রুমা গুহঠাকুরতার সন্তানদের শৈশব কেমন ছিল? এ প্রসঙ্গে অমিতকুমারের বর্ণনা শুনলে বোঝা যায়, তাঁদের বড় হওয়া ছিল যেমন ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ, তেমনই শিল্প ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে ভরপুর।
মা খুব কঠোর ছিলেন, কিন্তু সেই কঠোরতার মধ্যে ছিল অসীম ভালবাসা। তিনি চাননি আমরা কখনও অলস হয়ে পড়ি। সকাল থেকে রাত— আমাদের রুটিন ছিল ঠিক। গান, পড়াশোনা, নাটক, বই— সবকিছুতেই আমাদের জড়িয়ে রাখতেন।এত শক্তিশালী একটি নারী ঘরের দায়িত্ব, বাইরে কাজ, সমাজের বিচার— সব সামলে সন্তানদের জীবনে এনে দিয়েছেন স্থিরতা।