Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মাঝ সমুদ্রে হান্টা ভাইরাসের হানা: আর্জেন্টিনা থেকে আসা জাহাজ যেন এক মৃত্যুপুরী, অবশেষে শুরু হলো উদ্ধারকাজ

আর্জেন্টিনার কেপ ভার্দে থেকে যাত্রা শুরু করা একটি যাত্রীবাহী জাহাজে হান্টা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। মাঝ সমুদ্রে বেশ কিছু যাত্রী রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিশ্চিত করেছে যে এটি হান্টা ভাইরাস সংক্রমণ। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যেই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর অবশেষে জাহাজটি থেকে আক্রান্ত ও আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল।

ভয়াবহ ভাইরাস আতঙ্ক মাঝ সমুদ্রে: কেপ ভার্দে থেকে আসা জাহাজে উদ্ধার অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদন: প্রশান্ত মহাসাগরের বুক চিরে এগিয়ে চলা একটি বিশাল যাত্রীবাহী জাহাজ এখন আতঙ্কের অন্য নাম। গত মাসে আর্জেন্টিনার কেপ ভার্দে বন্দর থেকে যখন জাহাজটি তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল, তখন যাত্রীদের চোখেমুখে ছিল আনন্দের আভা। কিন্তু সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মাঝ সমুদ্রেই জাহাজের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে এক মরণঘাতী ভাইরাস, যার কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন এবং কয়েক ডজন যাত্রী এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এই মরণব্যাধির নাম হান্টা ভাইরাস।

ঘটনার সূত্রপাত ও রহস্যময় অসুস্থতা আর্জেন্টিনার কেপ ভার্দে থেকে যাত্রা শুরু করার প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই জাহাজের নিচের ডেক থেকে অসুস্থতার খবর আসতে শুরু করে। যাত্রীদের মধ্যে তীব্র জ্বর, পেশিতে ব্যথা এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়। প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ সামুদ্রিক অসুস্থতা বা সি-সিকনেস বলে মনে করা হলেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জাহাজের চিকিৎসক দল যখন বুঝতে পারে এটি কোনো সাধারণ ফ্লু নয়, ততক্ষণে বেশ কয়েকজন যাত্রীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে।

হান্টা ভাইরাসের থাবা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বেগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা 'হু' এই ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত তদন্ত শুরু করে। জাহাজের অসুস্থ যাত্রীদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে তারা নিশ্চিত করেন যে এটি আসলে হান্টা ভাইরাস সিনড্রোম। সাধারণত ইঁদুর বা বন্য নেংটি ইঁদুরের লালা, মল বা মূত্র থেকে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়ায়। জাহাজের মতো একটি বদ্ধ পরিবেশে কীভাবে এই ভাইরাস প্রবেশ করল, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজের রসদ বা খাদ্যের গুদামে কোনোভাবে সংক্রমিত ইঁদুর প্রবেশ করেছিল, যা থেকে এই বিপর্যয় ঘটে থাকতে পারে।

তিনজনের মৃত্যু ও বর্তমান পরিস্থিতি দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সঠিক চিকিৎসার অভাবে এবং মাঝ সমুদ্রে আটকা পড়ায় তিনজন যাত্রী ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মৃত্যুর পর জাহাজের ভেতরে আতঙ্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। অন্যান্য যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে এবং সংক্রমণের বিস্তার রোধে জাহাজের বেশ কিছু অংশ সিল করে দেওয়া হয়েছে। তবে সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে জাহাজের চিকিৎসকদের পক্ষে এত বড় প্রাদুর্ভাব সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

উদ্ধার অভিযানের চ্যালেঞ্জ অবশেষে আন্তর্জাতিক মহলের চাপে এবং মানবিক কারণে জাহাজটি থেকে যাত্রীদের উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ সুরক্ষা স্যুট বা পিপিই কিট পরে উদ্ধারকারী দল জাহাজে প্রবেশ করছে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া, কারণ উদ্ধারকারীদের নিজেদের সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি সংক্রমণের উৎস জাহাজ থেকে উপকূলে ছড়িয়ে পড়ার ভয়ও রয়েছে। হেলিকপ্টার এবং বিশেষায়িত ছোট নৌকার মাধ্যমে অসুস্থদের প্রথমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তাদের সরাসরি কঠোর আইসোলেশন ইউনিটে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে।

হান্টা ভাইরাস কী এবং কতটা বিপজ্জনক? হান্টা ভাইরাস মূলত জুনোটিক রোগ, যা প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। এটি কোনো সাধারণ ভাইরাস নয়। মানুষের ফুসফুসে এই ভাইরাস আক্রমণ করলে তাকে বলা হয় হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (HPS)। এর লক্ষণগুলো অনেকটা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো হলেও এটি দ্রুত কিডনি ফেলিওর বা ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। বিশেষ করে জাহাজের মতো আবদ্ধ জায়গায় যেখানে মানুষে-মানুষে দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন, সেখানে এর ভয়াবহতা অনেক গুণ বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক জাহাজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সতর্কতা এই ঘটনা আবারও আন্তর্জাতিক নৌ-পথের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একটি জাহাজ ছাড়ার আগে তার স্বাস্থ্যবিধি এবং পেস্ট কন্ট্রোল সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে এখন তদন্ত হবে। আর্জেন্টিনার বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং জাহাজ কোম্পানির বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠছে। যদি সঠিক সময়ে জাহাজের পরিচ্ছন্নতা পরীক্ষা করা হতো, তবে হয়তো এই তিনটি প্রাণ অকালে ঝরে যেত না।

সমুদ্রের বুকে বিচ্ছিন্ন এক কারাগার: যাত্রীদের বয়ান জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি এখন কোনো বিভীষিকার চেয়ে কম নয়। যারা সুস্থ আছেন, তারাও প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। জাহাজের এক যাত্রী স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে জানিয়েছেন, "আমরা জানি না আমাদের পাশের কেবিনে থাকা মানুষটি বেঁচে আছে না কি মারা গেছে। রুমের বাইরে বের হওয়া নিষেধ। দরজার নিচ দিয়ে খাবার দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চারদিকে শুধু সমুদ্র আর ভেতরে মৃত্যুর নিঃশব্দ পদচারণা।" এই মানসিক চাপ যাত্রীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে।

news image
আরও খবর

হান্টা ভাইরাসের জৈবিক গঠন ও সংক্রমণের ধরন হান্টা ভাইরাস মূলত 'বুনিয়াহভেরিডি' (Bunyaviridae) পরিবারের অন্তর্গত। বিজ্ঞানীরা একে অত্যন্ত ধূর্ত ভাইরাস হিসেবে গণ্য করেন। এটি সরাসরি ফুসফুসের কৈশিক জালিকাগুলোকে আক্রমণ করে, ফলে রক্তরস ফুসফুসে জমা হতে শুরু করে। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি এক পর্যায়ে নিজের শরীরের ভেতরেই 'ডুবে' মারা যান (যাকে পালমোনারি এডিমা বলা হয়)। জাহাজের মতো সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং যুক্ত জায়গায় এই ভাইরাসের কণা বা অ্যারোসল বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও, সাধারণ স্পর্শ বা সংক্রমিত বস্তুর মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়াতে পারে।

আর্জেন্টিনার কেপ ভার্দে বন্দরের ভূমিকা ও গাফিলতি তদন্তকারী দল এখন নজর দিচ্ছে কেপ ভার্দে বন্দরের দিকে। জাহাজটি যখন যাত্রা শুরু করে, তখন সেখানে খাদ্যসামগ্রী তোলার সময় কি যথাযথ পরীক্ষা করা হয়েছিল? দক্ষিণ আমেরিকার অনেক বন্দরে ইঁদুরের উপদ্রব একটি বড় সমস্যা। যদি জাহাজে রাখা চাল, ডাল বা অন্যান্য শুকনো খাবারের বস্তায় ইঁদুরের মলমূত্র থেকে থাকে, তবে সেখান থেকেই এই প্রলয়ঙ্কারী ভাইরাসের সূত্রপাত। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি জাহাজ ছাড়ার আগে 'ডিরেটিং সার্টিফিকেট' (ইঁদুর মুক্ত সনদ) বাধ্যতামূলক। এই জাহাজটির ক্ষেত্রে সেই সনদ কি জাল ছিল? এই প্রশ্নটি এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

উদ্ধারকারী দলের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া দলগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছে। জাহাজটি উপকূল থেকে কয়েকশ মাইল দূরে থাকায় প্রতিকূল আবহাওয়ার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা 'লেভেল সি' বায়োহ্যাজার্ড স্যুট পরে জাহাজে নামছেন। প্রতিটি উদ্ধারকৃত রোগীকে একটি 'আইসোলেশন পড'-এ রাখা হচ্ছে যাতে বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। হেলিকপ্টার দিয়ে গুরুতর অসুস্থদের নিকটবর্তী আইল্যান্ড হাসপাতালের বিশেষ ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব এই ঘটনার পর সারা বিশ্বে সমুদ্র ভ্রমণের ওপর এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্রুজ শিপ ইন্ডাস্ট্রিতে শেয়ার বাজারে বড় ধস নেমেছে। অনেক দেশ আর্জেন্টিনা থেকে আসা কার্গো জাহাজগুলোকে তাদের বন্দরে ভিড়তে বাধা দিচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) আশঙ্কা করছে যে, যদি এই ভাইরাস দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে পারে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: জাহাজে মহামারি ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, জাহাজ বরাবরই মহামারির অন্যতম বাহক হিসেবে কাজ করেছে। ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ থেকে শুরু করে আধুনিক কালের করোনা ভাইরাস—সবক্ষেত্রেই জাহাজের ভূমিকা ছিল নেতিবাচক। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু-র সময়ও জাহাজের মাধ্যমেই এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। বর্তমানের এই হান্টা ভাইরাস সংক্রমণ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা যতই উন্নত হই না কেন, প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম সৃষ্টির কাছে আমরা কতটা অসহায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও আগাম সতর্কতা ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হান্টা ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন এখনো সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য নয়। তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। জাহাজে যারা ভ্রমণ করবেন, তাদের জন্য নির্দেশিকা জারি করা হচ্ছে: ১. কাঁচা বা আধাসিদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলা। ২. হাতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। ৩. জাহাজের কোনো স্টোর রুম বা অন্ধকার অংশে প্রবেশ না করা। ৪. শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত মেডিকেল টিমকে জানানো।

উদ্ধার পরবর্তী পরিকল্পনা ও স্যানিটাইজেশন যাত্রীদের উদ্ধারের পর জাহাজটিকে একটি নির্জন বন্দরে নিয়ে গিয়ে পুরোপুরি 'ডিকন্টামিনেশন' করা হবে। শক্তিশালী রাসায়নিক ব্যবহার করে পুরো জাহাজের প্রতিটি কোনা জীবাণুমুক্ত করা হবে। জাহাজে থাকা সমস্ত খাদ্যদ্রব্য পুড়িয়ে ফেলা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া শেষ হতে অন্তত তিন মাস সময় লাগবে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও শিক্ষা এই ঘটনা শুধু একটি উদ্ধার অভিযান নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্য প্রাণীরা তাদের আবাসস্থল হারিয়ে মানুষের কাছাকাছি চলে আসছে, যার ফলে এই ধরনের 'জুনোটিক' রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। ভবিষ্যতে সামুদ্রিক ভ্রমণে আরও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি প্রণয়ন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

উপসংহার: আশার আলো এত কিছুর পরেও উদ্ধার কাজ সফলভাবে এগোচ্ছে। অধিকাংশ যাত্রীকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দিনরাত কাজ করছেন এই নির্দিষ্ট হান্টা ভাইরাসের স্ট্রেইনটি শনাক্ত করতে, যাতে এর সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা যায়। আর্জেন্টিনার সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। এখন শুধু অপেক্ষা সেই মুহূর্তের যখন শেষ যাত্রীটি সুস্থভাবে তীরে ফিরে আসবেন এবং এই বিভীষিকাময় সমুদ্র যাত্রা ইতিহাসের পাতায় একটি সাবধানবাণী হয়ে টিকে থাকবে।

Preview image