Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মহাকাশে ভাসতে থাকা গ্রহাণুতে রকেট দিয়ে ধাক্কা, বদলে গেল কক্ষপথটাই! বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথম বার

ডিডিমস এবং ডিমরফস নামের দু’টি গ্রহাণু সৌরজগতের মধ্যেই ঘুরে বেড়ায়। ২০২২ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে এসেছিল তারা। সেই সময় পৃথিবী থেকে মহাকাশযান পাঠিয়ে তাদের ধাক্কা মারা হয়েছিল। বদলে গিয়েছে তাদের কক্ষপথ।মহাকাশের একটি গ্রহাণুকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন বিজ্ঞানীরা! আঘাতের জেরে বদলে গেল তার কক্ষপথ! মহাকাশ বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এমন সাফল্য আগে কখনও আসেনি। ইচ্ছাকৃত ভাবেই গ্রহাণুটিকে ধাক্কা মারা হয়েছিল। ২০২২ সালের সেই ঘটনায় যে গ্রহাণুর কক্ষপথও বদলে গিয়েছে, এত দিনে সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন। এই সাফল্যকে মহাকাশ বিজ্ঞানে বড়সড় মাইলফলক হিসাবে দেখা হচ্ছে।

ডিডিমস এবং ডিমরফস নামের দু’টি গ্রহাণু সৌরজগতের মধ্যেই ঘুরে বেড়ায়। ২০২২ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে এসেছিল তারা। সেই সময় পৃথিবী থেকে এই গ্রহাণুদ্বয়ের দূরত্ব ছিল প্রায় ৬৮ লক্ষ মাইল (১.১ কোটি কিলোমিটার)। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা সেই সময় একটি মহাকাশযান পাঠিয়েছিল। উদ্দেশ্য: ইচ্ছাকৃত ভাবে ডিমরফসকে আঘাত করা। বাইরে থেকে আঘাত করে গ্রহাণুর অবস্থান বদল করা যায় কি না, তা-ই দেখতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। নাসার সেই ডার্ট অভিযান (ডবল অ্যাসটেরয়েড রিডিরেক্‌শন টেস্ট) সফল হয়। নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে আঘাত করে পৃথিবীর মহাকাশযান। ডিমরফসের সঙ্গে সংঘর্ষে তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এমনকি, ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়েছিল মহাশূন্যেও।

বিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন, কক্ষপথ পরিবর্তন না হলেও দুই গ্রহাণুর কাক্ষিক সময়কাল কিছুটা বদলাবে। ডিডিমস এবং ডিমরফস মহাকর্ষীয় আকর্ষণে একে অপরের সঙ্গে আবদ্ধ। তুলনামূলক বড় ডিডিমস (প্রায় ৭৮০ মিটার চওড়া)। তার চারপাশে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে ডিমরফস, যা চওড়ায় ১৬০ মিটার মাত্র। এই দুই গ্রহাণু আবার নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। পরীক্ষামূলক আঘাতের জন্য ছোট গ্রহাণুটিকেই বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। সূর্যের চারপাশে ঘুরে তারা ফের পৃথিবীর কাছাকাছি আসবে ২০৬২ সালে।

ডার্ট অভিযানের জন্য ডিডিমস এবং ডিমরফসকে বেছে নেওয়ার আরও কারণ ছিল। এই গ্রহাণুদ্বয়ের কাক্ষিক সময়কাল খুব ভাল ভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ফলে তার যে কোনও পরিবর্তন পরিমাপ করাও সহজ ছিল। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, ডিডিমসকে প্রদক্ষিণ করতে ডিমরফস যে সময় নেয়, তাতে হয়তো সাত মিনিটের তারতম্য ঘটবে সংঘর্ষের পর। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কাজ হয়েছে তার চেয়েও বেশি। কাক্ষিক সময়কাল ৩৩ মিনিট বদলেছে। এতেই উচ্ছ্বসিত ছিলেন বিজ্ঞানীরা। সাফল্য এসেছিল আশাতীত। তবে মূল অভিযানের চার বছর পরে আরও সাফল্য চোখে পড়ল। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন, শুধু কাক্ষিক সময়কালই বদলায়নি, বদলে গিয়েছে ডিমরফসের কক্ষপথও!

নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, ডার্ট অভিযান পৃথিবীর রক্ষণাত্মক পদক্ষেপ। ভবিষ্যতের কোনও মহাজাগতিক আঘাতের মোকাবিলা পৃথিবী কী ভাবে করবে, তা-ই পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে ডিমরফস গ্রহাণুকে ধাক্কা মেরে। আসলে এই ব্রহ্মাণ্ড অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু গ্রহাণুতে ঠাসা। সৌরজগতের ভিতরে এবং বাইরে নাম না-জানা মহাজাগতিক বস্তুরাও ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে। ভাসতে ভাসতে তাদের কোনও একটি যদি আচমকা চলে আসে পৃথিবীর কাছে, তবে পৃথিবীর অস্তিত্ব সঙ্কট তৈরি হতে পারে। হতে পারে বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতি, বিপর্যয়। এই সম্ভাবনা প্রথম থেকেই বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। তার প্রতিকারের উপায়ও খুঁজতে গিয়েই ডার্ট অভিযানের পরিকল্পনা। প্রযুক্তি দিয়ে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা কোনও মহাজাগতিক বস্তুর মোকাবিলা যে করা যাবে, ডার্ট তার ইঙ্গিত দিল মাত্র। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এটা সবে শুরু। আগামী দিনে প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা দরকার। প্রকাণ্ড শক্তিশালী কোনও গ্রহাণুর মোকাবিলা করতে হবে পৃথিবীর প্রযুক্তি কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়ে এখনও সন্দিহান অনেকে। তাঁরা মানছেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ডার্ট অভিযানের আর কী কী প্রভাব ডিমরফস গ্রহাণুর উপর পড়েছে, তা খুঁটিয়ে দেখতে আগ্রহী বিজ্ঞানীরা। চলতি দশকের শেষে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তাদের হেরা মহাকাশযানকে পাঠাবে ডিডিমস-ডিমরফস গ্রহাণুদ্বয়ের কাছে। ধাক্কার ফলে ডিমরফসে কী ধরনের গর্ত তৈরি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। আরও তথ্য মিলতে পারে সেই পর্যবেক্ষণ থেকে।

ডার্ট অভিযান: পৃথিবীকে রক্ষা করার এক ঐতিহাসিক মহাকাশ পরীক্ষা

ব্রহ্মাণ্ড এক বিস্ময়কর এবং রহস্যময় জগৎ। অসংখ্য গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু এবং গ্রহাণু দিয়ে ভরা এই মহাবিশ্বে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের মহাজাগতিক ঘটনা ঘটছে। এই বিশাল মহাকাশের মধ্যে আমাদের পৃথিবী একটি ছোট্ট গ্রহ মাত্র। কিন্তু এই ছোট্ট গ্রহেই রয়েছে জীবন, সভ্যতা এবং কোটি কোটি মানুষের বসবাস। তাই পৃথিবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানবজাতির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

মহাজাগতিক বিপদের মধ্যে অন্যতম বড় বিপদ হল গ্রহাণু বা অ্যাস্টেরয়েডের আঘাত। ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে যে বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটেছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে ভবিষ্যতেও যদি এমন কোনও মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তাহলে তা মানব সভ্যতার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এই সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখেই বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে গবেষণা করে চলেছেন। পৃথিবীকে কীভাবে এমন মহাজাগতিক বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়, সেই উপায় খুঁজতে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধারণা—“প্ল্যানেটারি ডিফেন্স” বা গ্রহগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল নাসার পরিচালিত ডার্ট অভিযান।

ডার্ট অভিযান কী?

ডার্টের পূর্ণরূপ হল “ডাবল অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেকশন টেস্ট” (Double Asteroid Redirection Test)। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মহাকাশ মিশন, যার উদ্দেশ্য ছিল কোনও গ্রহাণুর গতিপথ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা। এই মিশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন যে প্রযুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা কোনও গ্রহাণুর পথ পরিবর্তন করা সম্ভব কি না।

২০২১ সালের নভেম্বরে ডার্ট মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল ডিডিমস নামের একটি দ্বৈত গ্রহাণু ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় দুটি গ্রহাণু রয়েছে—ডিডিমস এবং তার ছোট উপগ্রহ ডিমরফস। বিজ্ঞানীরা ডিমরফসকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেন, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং পরীক্ষার জন্য নিরাপদ।

২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ডার্ট মহাকাশযান প্রায় ২২,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে ডিমরফস গ্রহাণুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষ ছিল পরিকল্পিত এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত। মহাকাশযানটি ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু তার ধাক্কায় ডিমরফসের কক্ষপথে পরিবর্তন ঘটে।

কেন এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ?

ডার্ট মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল পরীক্ষা করা। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছিলেন যে ভবিষ্যতে কোনও বড় গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে পারে। যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে আগে থেকেই সেই গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তন করতে পারলে পৃথিবীকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

এই ধারণাকে বলা হয় “কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর টেকনিক”। অর্থাৎ একটি মহাকাশযানকে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে গ্রহাণুর সঙ্গে ধাক্কা খাইয়ে তার গতিপথ সামান্য পরিবর্তন করা। যদিও এই পরিবর্তন খুবই ছোট হতে পারে, কিন্তু যদি অনেক আগে থেকে এই পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলে সেই ছোট পরিবর্তনই গ্রহাণুকে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

ডার্ট অভিযান এই প্রযুক্তির বাস্তব পরীক্ষা ছিল।

ডিমরফস গ্রহাণু কী?

ডিমরফস একটি ছোট গ্রহাণু, যার ব্যাস প্রায় ১৬০ মিটার। এটি ডিডিমস নামের একটি বড় গ্রহাণুর চারদিকে ঘুরছে। ডিডিমসের ব্যাস প্রায় ৭৮০ মিটার। এই দুই গ্রহাণুর সমন্বয়ে একটি দ্বৈত গ্রহাণু ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

ডার্ট মিশনের আগে ডিমরফস ডিডিমসকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ১১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট সময় নিত। ডার্টের ধাক্কার পর এই সময় কমে যায়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে কক্ষপথের সময় প্রায় ৩২ মিনিট কমে গেছে। অর্থাৎ ডার্ট মিশন সফলভাবে ডিমরফসের কক্ষপথ পরিবর্তন করতে পেরেছে।

এটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় সাফল্য।

ডার্ট মিশনের প্রযুক্তি

ডার্ট মহাকাশযানটি খুব বড় ছিল না। এর ওজন ছিল প্রায় ৬১০ কিলোগ্রাম। কিন্তু এতে অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন সিস্টেম, ক্যামেরা এবং বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার।

ডার্টের প্রধান ক্যামেরার নাম ছিল DRACO (Didymos Reconnaissance and Asteroid Camera for Optical Navigation)। এই ক্যামেরা ব্যবহার করে মহাকাশযানটি নিজেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারত।

মিশনের শেষ মুহূর্তে ডার্ট সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিমরফসকে লক্ষ্য করে ধাক্কা দেয়। পৃথিবী থেকে তখন প্রায় ১১ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে ছিল এই ঘটনা।

সংঘর্ষের ফলাফল

ডার্টের ধাক্কায় ডিমরফসের উপর বিশাল পরিমাণ ধুলো এবং পাথরের টুকরো ছিটকে যায়। এই ধ্বংসাবশেষ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি লম্বা ধুলোর লেজ তৈরি করে, যা অনেকটা ধূমকেতুর মতো দেখতে ছিল।

এই সংঘর্ষের ফলে ডিমরফসের পৃষ্ঠে একটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ঠিক কত বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। এজন্য বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে আরও পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করেছেন।

হেরা মিশন: পরবর্তী ধাপ

ডার্ট মিশনের ফলাফল আরও ভালোভাবে বুঝতে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ESA) একটি নতুন মিশনের পরিকল্পনা করেছে। এই মিশনের নাম হেরা।

news image
আরও খবর

হেরা মহাকাশযান চলতি দশকের শেষের দিকে ডিডিমস এবং ডিমরফস গ্রহাণুর কাছে পৌঁছাবে। এর উদ্দেশ্য হবে ডার্টের ধাক্কার ফলে ডিমরফসে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে তা বিশদভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

হেরা মিশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন—

  • ডিমরফসে কত বড় গর্ত তৈরি হয়েছে

  • গ্রহাণুর গঠন কেমন

  • ডার্টের ধাক্কায় কতটা শক্তি স্থানান্তর হয়েছে

  • ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হতে পারে

এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতের প্ল্যানেটারি ডিফেন্স প্রযুক্তি উন্নত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

গ্রহাণুর সম্ভাব্য বিপদ

পৃথিবীর আশেপাশে হাজার হাজার গ্রহাণু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের মধ্যে অনেককে “নিয়ার-আর্থ অ্যাস্টেরয়েড” বলা হয়। অর্থাৎ তারা পৃথিবীর কক্ষপথের কাছাকাছি দিয়ে যায়।

নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা নিয়মিতভাবে এই গ্রহাণুগুলো পর্যবেক্ষণ করে। এখন পর্যন্ত হাজার হাজার সম্ভাব্য বিপজ্জনক গ্রহাণু শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত করেছেন যে আগামী একশো বছরে কোনও বড় গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হানার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও প্রস্তুত থাকা জরুরি।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

ডার্ট মিশন সফল হলেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন এটি কেবলমাত্র একটি সূচনা। ভবিষ্যতে যদি অনেক বড় বা অত্যন্ত শক্তিশালী কোনও গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে আসে, তাহলে বর্তমান প্রযুক্তি যথেষ্ট হবে কি না তা নিয়ে এখনও সন্দেহ রয়েছে।

কিছু বিজ্ঞানীর মতে, আরও উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে। সম্ভাব্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে—

  • কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর

  • গ্র্যাভিটি ট্র্যাক্টর

  • নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ

  • লেজার প্রযুক্তি

এই পদ্ধতিগুলো নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

প্ল্যানেটারি ডিফেন্সের ভবিষ্যৎ

ডার্ট মিশন প্রমাণ করেছে যে মানুষ প্রযুক্তির সাহায্যে মহাজাগতিক বিপদের মোকাবিলা করতে সক্ষম। যদিও এখনও অনেক পথ বাকি, তবুও এই মিশন মানবজাতির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।

ভবিষ্যতে পৃথিবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা, জাপান, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মহাকাশ সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করছে।

এই সহযোগিতার ফলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি তৈরি হবে এবং পৃথিবীকে সম্ভাব্য মহাজাগতিক বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

উপসংহার

ডার্ট অভিযান মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই মিশন দেখিয়ে দিয়েছে যে প্রযুক্তির মাধ্যমে মহাজাগতিক বিপদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

যদিও এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি রয়েছে, তবুও ডার্ট আমাদের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির মাধ্যমে পৃথিবীকে আরও নিরাপদ করে তোলা সম্ভব হবে।

এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে আমরা খুব ছোট হলেও, আমাদের জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি আমাদেরকে শক্তিশালী করে তুলেছে। ডার্ট মিশন সেই শক্তিরই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ—যেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো সচেতনভাবে একটি গ্রহাণুর পথ পরিবর্তন করে পৃথিবীর সুরক্ষার দিকে এক নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে।

Preview image