অবসরের পর মাসে ১ লক্ষ টাকা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই পরিকল্পিত সঞ্চয় ও সঠিক কর্পাস গঠন অত্যন্ত জরুরি কত টাকার ফান্ড দরকার এবং কীভাবে ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্য পূরণ করা যায় তার সহজ হিসাব জেনে নিন।
একটি আরামদায়ক অবসর জীবন মানে শুধু কাজ থেকে বিরতি নেওয়া নয় বরং মানসিক শান্তি আর্থিক নিরাপত্তা এবং নিজের পছন্দের জীবনযাপন নিশ্চিত করা। কর্মজীবনের ব্যস্ত সময় শেষ হওয়ার পর মানুষ চায় অবশিষ্ট জীবনটা কাটুক চাপহীনভাবে। কিন্তু বাস্তবতা হল আর্থিক প্রস্তুতি ছাড়া এই স্বপ্ন পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অবসর পরিকল্পনা আর বিলাসিতা নয় বরং সময়ের দাবি। বিশেষ করে যারা অবসর গ্রহণের পর প্রতি মাসে ১ লক্ষ টাকা নিয়মিত আয় চান তাঁদের জন্য আগাম পরিকল্পনা করা অত্যন্ত জরুরি।
অবসর জীবনের আর্থিক পরিকল্পনা শুরু হয় একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে। অবসরের পরে ঠিক কত টাকা প্রয়োজন হবে। এই প্রশ্নের উত্তর সবার জন্য এক নয় কারণ জীবনধারা পারিবারিক দায়িত্ব স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত পছন্দের উপর এই অঙ্ক নির্ভর করে। তবে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে একটি স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনযাপনের জন্য মাসে প্রায় ১ লক্ষ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এই অঙ্কের মধ্যে থাকে দৈনন্দিন খরচ চিকিৎসা খরচ ভ্রমণ সামাজিক অনুষ্ঠান এবং হঠাৎ প্রয়োজনীয় ব্যয়।
ধরা যাক একজন ব্যক্তি ৬০ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করছেন এবং তাঁর প্রত্যাশিত আয়ু ৮৫ বছর। অর্থাৎ অবসর জীবনের সময়কাল প্রায় ২৫ বছর। এই ২৫ বছর ধরে যদি প্রতি মাসে ১ লক্ষ টাকা করে প্রয়োজন হয় তাহলে মোট প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি টাকার কাছাকাছি। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এই হিসাব সরল যোগ বিয়োগের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে যেখানে বিনিয়োগের রিটার্ন বা মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব ধরা হয়নি।
বাস্তবে অবসর পরিকল্পনা করতে গেলে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব বোঝা সবচেয়ে জরুরি। আজকের দিনে ১ লক্ষ টাকায় যে জীবনযাপন সম্ভব তা ২০ বা ২৫ বছর পরে একই রকম থাকবে না। পণ্যের দাম চিকিৎসা খরচ পরিষেবা খরচ সবই সময়ের সঙ্গে বাড়বে। ইতিহাস বলছে ভারতে গড় মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। অর্থাৎ আজকের ১ লক্ষ টাকার ক্রয়ক্ষমতা ২০ বছর পরে অনেকটাই কমে যাবে।
যদি ধরা হয় বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশ তাহলে আজকের ১ লক্ষ টাকা ২০ বছর পরে প্রায় ৩.২ লক্ষ টাকার সমান হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ অবসর নেওয়ার সময় যদি আপনার মাসিক খরচের লক্ষ্য হয় আজকের মূল্যে ১ লক্ষ টাকা তাহলে ভবিষ্যতে সেই একই জীবনধারা বজায় রাখতে মাসে প্রায় ৩ লক্ষ টাকারও বেশি প্রয়োজন হতে পারে। এখান থেকেই বোঝা যায় কেন অবসর পরিকল্পনায় মুদ্রাস্ফীতি উপেক্ষা করা একটি বড় ভুল।
এবার আসা যাক কর্পাস বা তহবিলের অঙ্কে। বিশেষজ্ঞদের মতে যদি অবসরকালীন সময়ে বিনিয়োগ থেকে গড় ৬ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া যায় এবং একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ৫ শতাংশের আশেপাশে থাকে তাহলে প্রায় ২.৫ কোটি টাকার একটি কর্পাস থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মাসে প্রায় ১ লক্ষ টাকা তোলা সম্ভব। এই টাকা প্রথম দিকে প্রয়োজন মেটাবে এবং ধীরে ধীরে উত্তোলনের অঙ্ক বাড়ানো যাবে যাতে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখা যায়।
এখানে অনেকেই প্রশ্ন করেন এত বড় অঙ্কের টাকা কি আদৌ তৈরি করা সম্ভব। উত্তর হল হ্যাঁ সম্ভব তবে তার জন্য সময় শৃঙ্খলা এবং সঠিক কৌশল প্রয়োজন। অবসর তহবিল এক দিনে তৈরি হয় না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া যেখানে নিয়মিত বিনিয়োগ এবং চক্রবৃদ্ধির শক্তি মূল ভূমিকা নেয়।
চক্রবৃদ্ধি মানে সুদের উপর সুদ। সময় যত বেশি পাওয়া যায় চক্রবৃদ্ধির প্রভাব তত বেশি হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যদি একজন ব্যক্তি ৩০ বছর বয়স থেকে অবসর তহবিলের জন্য বিনিয়োগ শুরু করেন তাহলে তাঁর হাতে প্রায় ৩০ বছর সময় থাকে। এই দীর্ঘ সময় চক্রবৃদ্ধিকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে। কিন্তু একই ব্যক্তি যদি ৪৫ বছর বয়সে শুরু করেন তাহলে সময় কমে যায় এবং একই লক্ষ্যে পৌঁছাতে মাসিক বিনিয়োগের অঙ্ক অনেক বেশি হয়ে যায়।
এই কারণেই অবসর পরিকল্পনায় যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায় ততই ভালো। মাসিক অল্প অল্প বিনিয়োগও দীর্ঘ সময় ধরে বড় কর্পাসে পরিণত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যদি কেউ ৩০ বছর ধরে প্রতি মাসে নিয়মিত বিনিয়োগ করেন এবং গড় রিটার্ন ১০ থেকে ১২ শতাংশ হয় তাহলে কয়েক কোটি টাকার কর্পাস তৈরি করা সম্ভব।
অবসর তহবিল তৈরির ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ধরন নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব টাকা এক জায়গায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ইক্যুইটি ডেবট এবং নিরাপদ স্কিমের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। কর্মজীবনের প্রথম দিকের বছরগুলিতে ইক্যুইটির দিকে ঝোঁক বেশি রাখা যেতে পারে কারণ তখন ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা থাকে এবং সময়ও বেশি থাকে। ইক্যুইটি দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতিকে হারিয়ে ভালো রিটার্ন দিতে সক্ষম।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে ডেবট এবং কম ঝুঁকির বিনিয়োগের দিকে ঝোঁক বাড়ানো উচিত। এর ফলে কর্পাসের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং বাজারের অস্থিরতায় বড় ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা কমে যায়। অবসর গ্রহণের কাছাকাছি সময়ে মূল লক্ষ্য হয় মূলধন সুরক্ষা এবং স্থায়ী আয় নিশ্চিত করা।
মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে SIP বা সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান অবসর তহবিল গঠনের একটি জনপ্রিয় এবং কার্যকর উপায়। SIP এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্দিষ্ট অঙ্ক বিনিয়োগ করা হয় যা বাজারের ওঠানামার প্রভাব কমায়। বাজার নিচে থাকলে বেশি ইউনিট কেনা যায় আর বাজার উপরে থাকলে কম ইউনিট কেনা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর গড় ফলাফল বেশ ইতিবাচক হয়।
এছাড়াও সরকারের বিভিন্ন কর সুবিধাপ্রাপ্ত স্কিম অবসর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা বা NPS একটি দীর্ঘমেয়াদি অবসর পরিকল্পনা স্কিম যেখানে ইক্যুইটি এবং ডেবট উভয় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ থাকে। এতে কর ছাড়ের সুবিধাও পাওয়া যায় এবং অবসরকালে নিয়মিত পেনশন আয়ের ব্যবস্থা করা যায়।
পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড বা PPF আরেকটি জনপ্রিয় বিকল্প যেখানে ঝুঁকি খুব কম এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রিটার্ন পাওয়া যায়। যদিও এর রিটার্ন ইক্যুইটির তুলনায় কম তবে এটি নিরাপত্তা এবং কর সুবিধার কারণে অবসর তহবিলের একটি শক্ত ভিত তৈরি করতে সাহায্য করে।
অনেকেই অবসর পরিকল্পনায় বিমা পণ্য বা অ্যানুইটির কথাও ভাবেন। অ্যানুইটির মাধ্যমে এককালীন টাকা জমা দিয়ে আজীবন বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাসিক আয় পাওয়া যায়। তবে অ্যানুইটির ক্ষেত্রে রিটার্ন সাধারণত কম হয় এবং মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে সমস্যা হতে পারে। তাই অ্যানুইটিকে সম্পূর্ণ সমাধান না ধরে বরং একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে দেখা ভালো।
একটি বিষয় সবসময় মনে রাখা জরুরি যে অবসর পরিকল্পনা একবার করে রেখে ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আয় খরচ লক্ষ্য এবং বাজার পরিস্থিতি বদলায়। তাই নিয়মিতভাবে নিজের পোর্টফোলিও পর্যালোচনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। বছরে অন্তত একবার দেখে নেওয়া উচিত বিনিয়োগের বণ্টন ঠিক আছে কিনা লক্ষ্য অনুযায়ী এগোচ্ছে কিনা এবং প্রয়োজন হলে পুনর্বিন্যাস করা দরকার কিনা।
স্বাস্থ্য খরচ অবসর জীবনের একটি বড় অনিশ্চয়তা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা খরচ বেড়ে যায়। তাই অবসর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য বিমা রাখা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র কর্পাসের উপর নির্ভর করলে হঠাৎ বড় চিকিৎসা খরচ পুরো পরিকল্পনাকে এলোমেলো করে দিতে পারে।
অবসর জীবনে অনেকেই ভ্রমণ সামাজিক কাজ বা শখের জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে চান। এই ইচ্ছেগুলিকেও পরিকল্পনার মধ্যে রাখা উচিত। অবসর মানে শুধু বেঁচে থাকা নয় বরং জীবন উপভোগ করা। তাই পরিকল্পনায় বাস্তববাদী হওয়া জরুরি।
সবশেষে বলা যায় আরামদায়ক অবসর জীবন কোনও অলীক কল্পনা নয়। সঠিক পরিকল্পনা সময়মতো শুরু করা শৃঙ্খলাবদ্ধ বিনিয়োগ এবং নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। প্রতি মাসে ১ লক্ষ টাকা অবসর আয়ের লক্ষ্য শুনতে বড় মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সঠিক পথে এগোলে তা বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়। আজকের ছোট সিদ্ধান্তই আগামী দিনের আর্থিক স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে দেয়। তাই অবসরকে ভয় না পেয়ে বরং পরিকল্পনার মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিই হল বুদ্ধিমানের কাজ।