দুর্গাপুজোর মুখে বঙ্গোপসাগরে নতুন নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা ঘিরে বাংলার আবহাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, পুজোর শুরুর দিকে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। সপ্তমী ও অষ্টমীতেও কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা বা পুজোর দিনগুলিতে আবহাওয়ার চূড়ান্ত চিত্র এখনও নিশ্চিত নয়।
বর্ষার বিদায়বেলায় ফের বদলাতে পারে আবহাওয়ার মেজাজ। বঙ্গোপসাগরে নতুন করে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হওয়ায় দেশের একাধিক রাজ্যে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গেও। ফলে উৎসবের মরসুমে পুজোর পরিকল্পনা করে রাখা মানুষের মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বৃষ্টিতে কি ভেস্তে যাবে আনন্দ? আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছে আবহাওয়া দফতর।
প্রদত্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর থেকে দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তর ভারত থেকে পূর্ব ভারত এবং দক্ষিণ ভারতের কিছু এলাকাতেও বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, অসম, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের পাশাপাশি পাহাড়ি রাজ্যগুলিতেও বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়া বইতে পারে।
বাংলার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির দিকে বিশেষ নজর রয়েছে। কলকাতা-সহ একাধিক জেলায় মেঘলা আকাশ, বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, নদিয়া ও বীরভূমের মতো জেলাতেও আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে। তবে সব জেলায় একই রকম বৃষ্টি হবে, এমন নয়। বৃষ্টির সময়, পরিমাণ এবং ঝোড়ো হাওয়ার তীব্রতা স্থানীয় পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে।
উৎসবের মরসুমে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন স্বাভাবিক ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। পুজোর কেনাকাটা, ঠাকুর দেখা, বাইরে খাওয়াদাওয়া কিংবা ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা—সব ক্ষেত্রেই বৃষ্টি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পূর্বাভাস মানেই সর্বত্র দুর্যোগ হবে, এমন নয়। তাই আবহাওয়া দফতরের পরবর্তী আপডেটের দিকে নজর রাখা জরুরি।
আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের পিছনে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণাবর্তের পাশাপাশি আরও কয়েকটি আবহাওয়াগত পরিস্থিতি কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম উত্তর প্রদেশের উপর একটি ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। অন্য দিকে, দক্ষিণ বাংলাদেশ সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের উপরেও ঘূর্ণাবর্তের প্রভাব বজায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বঙ্গোপসাগর থেকে পূর্ব উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অক্ষরেখা এবং দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণাবর্ত আবহাওয়ার পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই সব ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের জোগান এবং বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হলেই তা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে, এমন নয়। ঘূর্ণাবর্ত, নিম্নচাপ এবং ঘূর্ণিঝড়—এগুলি আবহাওয়ার পৃথক পর্যায় বা ব্যবস্থা। কোনও ঘূর্ণাবর্ত থেকে নিম্নচাপ তৈরি হতে পারে, কিন্তু তার পরের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের অবস্থা, বাতাসের গতিপথ এবং অন্যান্য একাধিক বিষয়ের উপর। তাই নতুন কোনও শক্তিশালী আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে কি না, তা বুঝতে পরবর্তী পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে নতুন করে নিম্নচাপ অঞ্চল ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। তবে নিম্নচাপের অবস্থান, শক্তি এবং গতিপথ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আবহাওয়া দফতরের হালনাগাদ বুলেটিনের উপর নির্ভর করতে হবে।
কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া নিয়ে উৎসবের আগে কৌতূহল রয়েছে। আকাশ মেঘলা থাকলে কিংবা বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হলে ঠাকুর দেখতে বেরোনো থেকে শুরু করে কেনাকাটা—সব ক্ষেত্রেই কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। তবে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেই যে শহরজুড়ে ভারী বর্ষণ হবে, এমন নয়।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের ১৩ অক্টোবরের প্রকাশিত পূর্বাভাসে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের জন্য ওই দিন থেকে পরবর্তী কয়েক দিনে কোনও আবহাওয়া সতর্কতা দেখানো হয়নি। অন্য দিকে, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা থাকলেও তার সরাসরি প্রভাব বাংলায় কতটা পড়বে, তা নির্ভর করছে আবহাওয়া ব্যবস্থার গতিপথের উপর।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, পুজোর দিনগুলিতে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। তবে আপাতত বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা নিয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তী বুলেটিনের উপর নির্ভর করেই বৃষ্টির প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তাই যাঁরা ঠাকুর দেখতে বেরোনোর পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের সঙ্গে ছাতা রাখা এবং বেরোনোর আগে স্থানীয় আবহাওয়ার খবর দেখে নেওয়া ভাল। বিশেষ করে আকাশে কালো মেঘ জমলে কিংবা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি শুরু হলে খোলা জায়গায় না থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা উচিত।
উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারের আবহাওয়ার দিকেও নজর রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। কোথাও মেঘলা আকাশ, কোথাও হালকা বৃষ্টি—এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে শুধু বৃষ্টির সম্ভাবনা নয়, রাস্তার পরিস্থিতি এবং দৃশ্যমানতার দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। বৃষ্টির সময় পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। তবে সব জায়গায় ভারী বৃষ্টি হবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া ব্যবস্থা এবং দেশের বিভিন্ন অংশে সক্রিয় অন্যান্য বায়ুপ্রবাহের প্রভাব আলাদা আলাদা অঞ্চলে পড়তে পারে। তবে দিল্লি থেকে উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ—সব জায়গায় একই রকম বৃষ্টি হবে, এমন নয়। প্রতিটি রাজ্যের জন্য আলাদা পূর্বাভাস ও সতর্কতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়ার যে আশঙ্কার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ বুলেটিন দেখা জরুরি। একই ভাবে, পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে বৃষ্টি বা তুষারপাতের সম্ভাবনা থাকলে ভ্রমণকারীদের স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা উচিত।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কতার রং, যেমন হলুদ, কমলা বা লাল, নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বাভাসের উপর নির্ভর করে। তাই কোনও রাজ্যে সতর্কতা জারি হয়েছে শুনেই অন্য রাজ্যের আবহাওয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
উৎসবের মরসুমে আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এখনই পুজোর আনন্দ মাটি হওয়ার আশঙ্কা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হলে তার প্রভাব একেক এলাকায় একেক রকম হতে পারে। কোথাও অল্প সময়ের জন্য বৃষ্টি হতে পারে, আবার অন্যত্র আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি নাও হতে পারে।
আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে পুজোর সময় দক্ষিণবঙ্গের কিছু এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে ভারী বৃষ্টি বা বড়সড় দুর্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস নেই। নিম্নচাপের গতিপথ এবং জলীয় বাষ্পের জোগানের পরিবর্তনের সঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণও বদলাতে পারে।
তাই পুজোর পরিকল্পনা বাতিল করার আগে আবহাওয়ার সর্বশেষ খবর দেখে নেওয়াই ভাল। প্রতিদিনের পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনা, সময় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সতর্কতার তথ্য খেয়াল রাখলে বাইরে বেরোনোর পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে।
বর্ষার বিদায়পর্বে বৃষ্টি হলে কৃষিকাজের উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে সেই প্রভাব ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে, তা নির্ভর করে কোন এলাকায় কতটা বৃষ্টি হচ্ছে, জমিতে কী ফসল রয়েছে এবং ফসলের বর্তমান পর্যায় কী—তার উপর।
যেখানে জমিতে অতিরিক্ত জল জমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে ভারী বৃষ্টি ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টির অভাব থাকা এলাকায় কিছুটা বৃষ্টি উপকারেও আসতে পারে। তাই কৃষকদের জন্য স্থানীয় আবহাওয়া দফতরের কৃষি-সংক্রান্ত পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের পূর্বাভাস থাকলে কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা মেনে চলা যায়।
বাইরে বেরোনোর আগে স্থানীয় আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস দেখে নিন।
বৃষ্টি হলে সঙ্গে ছাতা বা রেনকোট রাখুন।
বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সময় খোলা মাঠ, জলাশয়ের ধার ও উঁচু গাছের নিচে দাঁড়াবেন না।
ঝোড়ো হাওয়ার সময় দুর্বল গাছ, অস্থায়ী কাঠামো ও ঝুলন্ত তার থেকে দূরে থাকুন।
পাহাড়ে বেড়াতে গেলে রাস্তার অবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ সম্পর্কে খোঁজ রাখুন।
কৃষিকাজের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ অনুসরণ করুন।
সব মিলিয়ে, বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণাবর্ত ও সম্ভাব্য নিম্নচাপকে ঘিরে আবহাওয়ার দিকে নজর রাখা জরুরি। তবে ১৩ অক্টোবরের সরকারি পূর্বাভাসে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের জন্য কোনও সতর্কতা দেখানো হয়নি। ফলে পুজোর আনন্দ পুরোপুরি ভেস্তে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো ঠিক হবে না। পরবর্তী কয়েক দিনে আবহাওয়া ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি এবং আবহাওয়া দফতরের নতুন বুলেটিনই জানাবে বাংলায় বৃষ্টির প্রভাব কতটা পড়তে পারে।