নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ১৫ বলে অর্ধশতরান করে ঝড় তুললেন শিবম দুবে। ২৩ বলে ৬৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংসেও দুর্ভাগ্যজনক রান আউট ভারতের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল।
ডাগ আউটে বসে থাকা তাঁর কাছে কোনও দিনই স্বস্তির ছিল না। ম্যাচের পর ম্যাচ বাইরে বসে দলের জয়-পরাজয় দেখা— এই অভিজ্ঞতা একজন ক্রিকেটারের আত্মবিশ্বাসে কী প্রভাব ফেলে, তা খুব ভাল করেই জানেন শিবম দুবে। তাই যখন নিয়মিত একাদশে জায়গা পেতে শুরু করেছেন, তখন সেটাকেই নিজের সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করছেন তিনি। কোচ গৌতম গম্ভীরের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা— “আমাকে রোজ খেলান। তাহলেই আমি নিজের সেরাটা দিতে পারব।”
নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে শিবমের বিধ্বংসী ইনিংস সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করে তুলেছে। মাত্র ১৫ বলে অর্ধশতরান— যা ভারতীয় ব্যাটারদের দ্রুততম হাফ-সেঞ্চুরির তালিকায় তৃতীয় দ্রুততম— আর শেষ পর্যন্ত ২৩ বলে ৬৫ রানের ঝোড়ো ইনিংস। যদিও তাঁর ইনিংস সত্ত্বেও ভারত ম্যাচটি জিততে পারেনি, কিন্তু ১৫তম ওভারে দুর্ভাগ্যজনক রান আউট না হলে সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন দল যে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যেত, তা মানছেন বিশেষজ্ঞরাও।
এই ইনিংস কেবল একটি ব্যক্তিগত মাইলস্টোন নয়, বরং শিবম দুবের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলেই মনে করছেন ক্রিকেট মহল। নিয়মিত খেলার সুযোগ, দায়িত্ব পাওয়া, চাপের মধ্যে পারফর্ম করা— এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে মিলেই তাঁকে নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ঝোড়ো ইনিংস, তবু হার
বুধবারের ম্যাচে ভারতের লক্ষ্য ছিল বড় স্কোর তাড়া করা। শুরুতেই টপ অর্ডার ব্যাটাররা ফিরে যাওয়ায় চাপ বেড়ে যায় মিডল অর্ডারের উপর। সেই পরিস্থিতিতে মাঠে নামেন শিবম দুবে। শুরু থেকেই তিনি আগ্রাসী মেজাজে ছিলেন। নিউ জ়িল্যান্ডের বোলারদের উপর কার্যত ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাটিং বিশেষভাবে নজর কাড়ে। সাতটি বিশাল ছক্কা, কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন কভার ড্রাইভ এবং মিড উইকেটের উপর দিয়ে শক্তিশালী শট— সব মিলিয়ে যেন এক সম্পূর্ণ টি-টোয়েন্টি প্যাকেজ উপহার দেন শিবম। মাত্র ১৫ বলে হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করে তিনি বোঝান, এই ফরম্যাটে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে।
শেষ পর্যন্ত ২৩ বলে ৬৫ রান করে রান আউট হন তিনি। সেই মুহূর্তে ভারতের প্রয়োজনীয় রান রেট নিয়ন্ত্রণে চলে আসছিল। তাঁর বিদায়ের পর ম্যাচের মোড় আবার ঘুরে যায়। ভারত ৫০ রানে হেরে যায়, কিন্তু ম্যাচের নায়ক হিসেবে উঠে আসেন শিবম দুবে।
“নিয়মিত খেলছি বলেই মানসিকতা বদলেছে”
ম্যাচের পর শিবম নিজের পারফরম্যান্সের রহস্য খুলে বলেন, নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগই তাঁকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখিয়েছে।
তিনি বলেন,
“আমি এখন নিয়মিত ম্যাচ খেলছি বলে আমার মানসিকতা আরও উন্নত হচ্ছে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যাটিং করছি, তাই বুঝতে পারছি বোলাররা কী ধরনের বল করতে পারে। এটাই আমার ব্যাটিংয়ের মূল চাবিকাঠি, এবং বোলিংয়েরও।”
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একজন অলরাউন্ডারের আত্মবিশ্বাস। শুধু ব্যাটিং নয়, দলের প্রয়োজনে বোলিং করেও অবদান রাখছেন তিনি। কোচ গৌতম গম্ভীর এবং অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব তাঁর উপর যে ভরসা রেখেছেন, সেটার প্রতিদান দিতে প্রস্তুত শিবম।
“গৌতি ভাই এবং সূর্যের জন্য আমি বল করার সুযোগ পাচ্ছি। ম্যাচে সব কিছু করছি— এটাকেই তো অভিজ্ঞতা বলে। সেই অভিজ্ঞতা এখন আমার ঝুলিতে আসছে, ফলে সব কিছু সঠিক পথেই এগোচ্ছে,” বলেন তিনি।
ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের গল্প
শিবম দুবের ক্রিকেট যাত্রা কখনওই মসৃণ ছিল না। ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফরম্যান্স সত্ত্বেও জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল তাঁর জন্য। মাঝেমধ্যেই দলে ঢোকা, আবার বাদ পড়া— এই ওঠানামার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন তিনি।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলেছে। আইপিএল এবং জাতীয় দলের নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তাঁর ব্যাটিংয়ের মধ্যে এখন স্পষ্ট এক ধরনের স্থিরতা দেখা যাচ্ছে— কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন ইনিংস গড়ে নিতে হবে, সেই বোধ তৈরি হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে শিবম বলেন,
“আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। কিন্তু শুধু পরিশ্রমই নয়, ম্যাচে নিয়মিত সুযোগ পাওয়াটাই আসল। বোলিং এবং ব্যাটিং— দুই ক্ষেত্রেই সুযোগ পাচ্ছি। এই অভিজ্ঞতাই আমাকে আরও ভালো খেলোয়াড় করে তুলছে।”
অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে নতুনভাবে গড়া
শিবম দুবের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বহুমুখিতা। তিনি শুধু পাওয়ার হিটার নন, প্রয়োজনে ইনিংস গড়তেও পারেন। আবার দলের দরকারে মিডিয়াম পেস বোলিং করে গুরুত্বপূর্ণ ওভারও সামলাতে পারেন।
নিজের খেলার ধরণ নিয়ে তিনি বলেন,
“সবাই নিজেকে আপগ্রেড করে। আমার জন্যও সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আগে যা ছিলাম, তেমনটাই থেকে যেতে পারি না। পরের ম্যাচে আরও একটু ভালো এবং চতুর হওয়ার চেষ্টা করি।”
তিনি আরও বলেন,
“শিখছি কীভাবে কৌশলী হতে হয় এবং আমার শক্তির জায়গাগুলো কোথায় ব্যবহার করা যায়। দলের চাহিদা অনুযায়ী স্পিনারদের আক্রমণ করা এবং মিডল ওভারে স্ট্রাইক রেট বাড়িয়ে দেওয়াই আমার কাজ।”
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, শিবম নিজেকে কেবল একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে দেখছেন না। বরং তিনি একজন ম্যাচ উইনার অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
ম্যাচ পরিকল্পনা: সহজাত প্রবৃত্তির উপর ভরসা
নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই বিধ্বংসী ইনিংসের সময় তাঁর পরিকল্পনা কী ছিল, জানতে চাইলে শিবম বলেন,
“তখন কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। আমার সহজাত প্রবৃত্তিই কাজ করছিল।”
তিনি জানান, স্পিনারদের বিরুদ্ধে ব্যাটিং করা কঠিন হতে পারে, সেটা জানতেন। সোধি ভালো বল করছিলেন, কিন্তু শিবম বিশ্বাস করতেন যে চাপের মধ্যে বোলাররা ভুল করবেই।
“জানতাম ও নিজে কিছুটা ভয়ে আছে এবং খারাপ বল দেবেই। তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। সেই সময় আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিলাম এবং সেটা পেরেছি,” বলেন শিবম।
এই আত্মবিশ্বাসই একজন টি-টোয়েন্টি ব্যাটারকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ঝুঁকি নিতে ভয় না পাওয়া, কিন্তু সেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা— শিবম এখন ঠিক সেটাই করছেন।
পরিসংখ্যানের চোখে শিবম দুবে
শিবমের এই ইনিংস শুধু দর্শকদের আনন্দ দেয়নি, পরিসংখ্যানের খাতাতেও জায়গা করে নিয়েছে। ১৫ বলে হাফ-সেঞ্চুরি ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে দ্রুততমের তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল প্রায় ২৮৩— যা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বিরল।
এই ইনিংস প্রমাণ করে দিয়েছে, মিডল অর্ডারে নেমে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। বিশেষ করে বড় ম্যাচে বা কঠিন পরিস্থিতিতে এমন পারফরম্যান্সই দলকে আত্মবিশ্বাস দেয়।
গম্ভীর ও সূর্যের ভরসা
কোচ গৌতম গম্ভীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলে তরুণদের উপর ভরসা রাখার কথা বলেছেন। শিবম দুবে তাঁর সেই দর্শনের অন্যতম উদাহরণ। নিয়মিত সুযোগ পেয়ে শিবম যেমন আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন, তেমনই দলের ব্যালান্সও শক্তিশালী হয়েছে।
অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবও শিবমের উপর আস্থা রেখেছেন। মিডল অর্ডারে তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে খেলাচ্ছেন, প্রয়োজনে বোলিংও করাচ্ছেন। এই আস্থা শিবমের খেলার মধ্যে স্পষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে।
দলের জন্য কী অর্থ বহন করে এই ইনিংস?
ভারত পাঁচ ম্যাচের সিরিজ় আগেই জিতে নিয়েছে। শনিবার তিরুঅনন্তপুরমে শেষ ম্যাচ। সিরিজ় জয়ের পরও শিবমের এই ইনিংস দলকে নতুন এক বার্তা দিয়েছে— মিডল অর্ডারে এখন এমন একজন ব্যাটার রয়েছেন, যিনি একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
বিশেষ করে আসন্ন আইসিসি ইভেন্টের কথা মাথায় রাখলে, শিবম দুবের এই ফর্ম ভারতীয় দলের জন্য বড় স্বস্তির খবর। একজন পাওয়ার হিটার অলরাউন্ডার হিসেবে তিনি দলে ভারসাম্য এনে দিচ্ছেন।
“আমাকে রোজ খেলান”— এক আত্মবিশ্বাসী বার্তা
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শিবমের স্পষ্ট বার্তা— “আমাকে রোজ খেলান।” এটি কোনও দাবি নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। তিনি জানেন, নিয়মিত সুযোগ পেলে তিনি দলের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারেন।
ডাগ আউটে বসে থাকার বদলে মাঠে নেমে পারফর্ম করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আর সাম্প্রতিক ইনিংসগুলো সেই দাবিরই বাস্তব প্রমাণ।
ভবিষ্যতের পথে শিবম দুবে
শিবম দুবের সামনে এখন বড় সুযোগ। নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে নিজেকে আরও পরিণত অলরাউন্ডার হিসেবে গড়ে তোলার সময় এসেছে। তাঁর ব্যাটিংয়ের মধ্যে শক্তি যেমন আছে, তেমনই আছে সচেতনতা ও পরিণত মানসিকতা।
এই ম্যাচের পর তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। কোচ ও অধিনায়কের ভরসা, দর্শকদের ভালোবাসা এবং নিজের পারফরম্যান্স— সব মিলিয়ে শিবম এখন এক নতুন অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছেন।