শনিবার কলকাতায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। সঙ্গে বইবে ঝোড়ো হাওয়া। দক্ষিণবঙ্গের ছ’টি জেলায় কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় শিলাবৃষ্টিও হতে পারে।শুক্রবার রাতে প্রবল ঝড়বৃষ্টি হয়েছে কলকাতা এবং শহরতলিতে। ঝড়ের তাণ্ডবে একাধিক রাস্তায় গাছ উপড়ে পড়েছে। রাতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল কিছু এলাকা। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু জেলায় রাত ১২টার পর লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। দুর্যোগের কারণে কলকাতা বিমানবন্দরে সময়ে অবতরণ করতে পারেনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিমানও। প্রায় ৫৫ মিনিট সেটি আকাশে চক্কর কেটেছে। শেষ পর্যন্ত রাত ১টা ২০ মিনিট নাগাদ শাহ কলকাতায় নামেন। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, শনিবারও শহরে কালবৈশাখীর সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বইতে পারে ঝোড়ো হাওয়া।
শনিবার কলকাতায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে। একই পূর্বাভাস হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদিয়ায়। এই জেলাগুলিতে কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও শনিবার ঝড়বৃষ্টি হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাওয়ার বেগ থাকবে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। জারি রয়েছে হলুদ সতর্কতা। শিলাবৃষ্টি হতে পারে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া এবং হুগলির কোনও কোনও জায়গায়।
শনিবারের পর দক্ষিণবঙ্গে ঝড়বৃষ্টি বাড়তে পারে মঙ্গলবার। সে দিন সব জেলায় ৪০-৫০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। সমুদ্রে মাঝেমধ্যেই ঝোড়ো হাওয়া বইছে। দমকা হাওয়ার বেগ পৌঁছে যাচ্ছে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটারেও। শনিবার পর্যন্ত তাই উত্তর ওড়িশা এবং সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে মৎস্যজীবীদের না-যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঝড়বৃষ্টির কারণে দক্ষিণবঙ্গে আগামী দু’দিনে দিনের তাপমাত্রা দুই থেকে চার ডিগ্রি কমবে। তার পর ধীরে ধীরে বাড়বে তিন থেকে পাঁচ ডিগ্রি পর্যন্ত।
শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত টানা ঝড়বৃষ্টি চলবে উত্তরবঙ্গে। জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারের কিছু অংশে বিক্ষিপ্ত ভাবে ভারী বর্ষণ (৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার) হতে পারে। বাকি জেলাগুলিতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঝোড়ো হাওয়ার বেগ থাকতে পারে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। আপাতত দু’দিন তাপমাত্রা কিছুটা কমে ফের উত্তরবঙ্গের পারদও ঊর্ধ্বমুখী হবে।
হাওয়া অফিস জানিয়েছে, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং সংলগ্ন বাংলাদেশের উপর একটি ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তার উচ্চতা ০.৯ কিলোমিটার। এ ছাড়া, উত্তর-পশ্চিম বিহার থেকে মণিপুর পর্যন্ত একটি অক্ষরেখা বিস্তৃত রয়েছে। তা ঘূর্ণাবর্তের উপর দিয়ে গিয়েছে। এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ঢুকছে স্থলভাগে। তাই বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শনিবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৪ ডিগ্রি কম। শুক্রবার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া প্রায়শই পরিবর্তনশীল এবং ঋতুভেদে তার বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে গ্রীষ্মের শুরুতে দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে যে ধরনের বজ্রঝড় ও বৃষ্টিপাত হয়, তা একদিকে যেমন স্বস্তি এনে দেয়, অন্যদিকে তেমনই নানা সমস্যারও সৃষ্টি করে। সম্প্রতি আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শনিবারের পর থেকে দক্ষিণবঙ্গে ঝড়বৃষ্টি বাড়তে পারে এবং মঙ্গলবারে তা আরও তীব্র রূপ নিতে পারে। এই পরিস্থিতিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন কৌতূহল, তেমনই কিছুটা উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—এই ঝড়বৃষ্টির কারণ কী, এর প্রভাব কী হতে পারে, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার পার্থক্য কীভাবে দেখা যাচ্ছে, এবং এই পরিস্থিতিতে কী কী সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন।
আবহাওয়া দফতরের মতে, মঙ্গলবার দক্ষিণবঙ্গের সব জেলাতেই ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। এর সঙ্গে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে। এই ধরনের আবহাওয়া সাধারণত গ্রীষ্মের শুরুতে দেখা যায়, যখন গরমের তীব্রতা বাড়তে থাকে এবং বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা তৈরি হয়।
সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি আরও কিছুটা উদ্বেগজনক। সেখানে মাঝে মাঝেই ঝোড়ো হাওয়ার বেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। এই কারণে উত্তর ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী অঞ্চলে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গে এই ঝড়বৃষ্টির প্রভাবে দিনের তাপমাত্রা আগামী দু’দিনে ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই তাপমাত্রা হ্রাস সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনলেও, এর পরে আবার ধীরে ধীরে তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এই ওঠানামা মূলত বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার কারণে ঘটে। যখন বৃষ্টি হয়, তখন পরিবেশ ঠান্ডা হয়, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার হলে আবার সূর্যের তাপে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
উত্তরবঙ্গে শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত টানা ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার জেলার কিছু অংশে ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
বাকি জেলাগুলিতেও বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে ঝোড়ো হাওয়ার বেগ ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার থাকতে পারে।
উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেখানে পাহাড়ি ও বনাঞ্চল বেশি হওয়ায় ভারী বৃষ্টির ফলে ভূমিধস বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রশাসন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশেষ সতর্ক থাকার প্রয়োজন।
এই ঝড়বৃষ্টির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়াগত কারণ রয়েছে:
গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং সংলগ্ন বাংলাদেশের উপর একটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ০.৯ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থান করছে। এই ঘূর্ণাবর্ত বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা তৈরি করে, যার ফলে মেঘ তৈরি হয় এবং বৃষ্টিপাত ঘটে।
উত্তর-পশ্চিম বিহার থেকে মণিপুর পর্যন্ত একটি অক্ষরেখা বিস্তৃত রয়েছে। এটি ঘূর্ণাবর্তের উপর দিয়ে গেছে। এই অক্ষরেখা মূলত নিম্নচাপের একটি দীর্ঘায়িত অঞ্চল, যা বায়ুর গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করে।
বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশ করছে। এই আর্দ্রতা মেঘ তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন এই আর্দ্রতা উপরের ঠান্ডা বায়ুর সঙ্গে মেশে, তখন বৃষ্টিপাত শুরু হয়।
এই ধরনের আবহাওয়ায় বজ্রপাত একটি বড় বিপদ। বজ্রপাতের কারণে প্রতি বছর বহু মানুষ আহত বা নিহত হন। বিশেষ করে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক বা নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ঝোড়ো হাওয়া বাড়িঘর, গাছপালা এবং বিদ্যুৎ লাইনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় গাছ ভেঙে পড়ে রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে যায়, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়, এবং যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়।
সমুদ্র উপকূলে ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠছে। তাই মৎস্যজীবীদের জন্য সমুদ্রে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই শনিবার পর্যন্ত সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
এই ধরনের সতর্কবার্তা অমান্য করলে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে, তাই এটি গুরুত্ব সহকারে মেনে চলা উচিত।
এই বৃষ্টিপাত কৃষিক্ষেত্রে মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে, গ্রীষ্মের শুরুতে এই বৃষ্টি জমির আর্দ্রতা বাড়িয়ে ফসলের জন্য উপকারী হতে পারে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত বৃষ্টি বা ঝড়ের কারণে ফসলের ক্ষতিও হতে পারে।
বিশেষ করে আম, লিচু বা অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে ঝোড়ো হাওয়া বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, কারণ এতে ফল ঝরে পড়ে।
কলকাতা ও অন্যান্য শহরে এই ঝড়বৃষ্টির ফলে জল জমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করলে রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়ে, যার ফলে যানজট সৃষ্টি হয়।
এছাড়া অফিস যাতায়াত, স্কুল, এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটে।
শনিবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৪ ডিগ্রি কম। এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
শুক্রবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই পার্থক্য থেকেই বোঝা যায় যে আবহাওয়ায় কতটা দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে।
এই ধরনের আবহাওয়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত:
দক্ষিণবঙ্গ এবং উত্তরবঙ্গে আসন্ন ঝড়বৃষ্টি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এটি যেমন গরম থেকে স্বস্তি এনে দেয়, তেমনই বিভিন্ন ঝুঁকিও তৈরি করে।
ঘূর্ণাবর্ত, অক্ষরেখা এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্প—এই তিনটি প্রধান কারণ মিলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই সময়ে সচেতনতা এবং সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক প্রস্তুতি এবং সচেতন আচরণের মাধ্যমে আমরা এই প্রাকৃতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারি।