Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মদ্যপান না করেও ফ্যাটি লিভার ভারতে ৪০ শতাংশ মানুষই ভুগছেন এই রোগে সতর্ক করল আইসিএমআর

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। কী ভাবে এই রোগে আক্রান্ত হন মানুষ? কী কী সমস্যা দেখা যায়? নিরাময়ের রাস্তা কী?

সময়ের স্রোতে বদলেছে আমাদের জীবনযাত্রা। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন বেড়েছে, তেমনই কমেছে শারীরিক পরিশ্রম। বাড়ছে ফাস্টফুড, প্রসেসড খাবার, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ—আর তারই হাত ধরে নীরবে বাড়ছে এক বিপজ্জনক অসুখ, নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD)। একসময় মনে করা হত, লিভারে মেদ জমা মানেই অতিরিক্ত মদ্যপান। কিন্তু এখন প্রমাণিত—মদ না খেলেও লিভারে চর্বি জমতে পারে এবং তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

Indian Council of Medical Research-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনও পর্যায়ে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। একইভাবে European Journal of Cardiovascular Medicine-এ প্রকাশিত গবেষণায়ও বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে এই রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ এটি এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসমস্যা নয়, বরং একটি জনস্বাস্থ্য সংকট।


নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার কী?

আমাদের লিভার শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি খাবার হজমে সাহায্য করে, রক্ত পরিষ্কার রাখে, টক্সিন বের করে দেয় এবং শরীরের শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু যখন লিভারের কোষে অস্বাভাবিকভাবে চর্বি জমতে শুরু করে, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। যদি এই চর্বি জমার পেছনে মদ্যপানের ভূমিকা না থাকে, তখন সেটি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ নামে পরিচিত।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের তেমন কোনও উপসর্গ থাকে না। অনেকেই জানতেই পারেন না যে তাঁদের লিভারে মেদ জমছে। সাধারণত অন্য কোনও কারণে রক্তপরীক্ষা বা আল্ট্রাসাউন্ড করতে গিয়ে ধরা পড়ে এই সমস্যা।


কেন বাড়ছে এই রোগ?

বর্তমান জীবনযাত্রার কয়েকটি অভ্যাস এই রোগের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত:

১. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

অতিরিক্ত তেল-ঝাল, ভাজাভুজি, প্রসেসড ফুড, সফট ড্রিঙ্ক, অতিরিক্ত চিনি—এসব নিয়মিত খেলে শরীরে ক্যালোরির আধিক্য তৈরি হয়। শরীর সেই অতিরিক্ত শক্তিকে চর্বি হিসেবে জমা করতে শুরু করে। শুধু পেট বা কোমরেই নয়, সেই চর্বি লিভারেও জমে।

২. স্থূলতা

ওজন বেশি হলে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এর ফলে শরীর ঠিকমতো গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না। রক্তে শর্করা এবং ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়তে থাকে, যা লিভারে মেদ জমার পথ তৈরি করে।

৩. টাইপ-২ ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের প্রবণতা অনেক বেশি। ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে লিভারে চর্বি জমার হার বাড়ে।

৪. উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড

খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি হলে তা লিভারের কোষে জমা হয়ে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।

৫. অনিয়মিত জীবনযাপন

রাত জাগা, কম ঘুম, মানসিক চাপ, ব্যায়ামের অভাব—সবই বিপাকক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়।


শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলে?

প্রথমে লিভারে শুধু চর্বি জমে—এটিকে বলা হয় ‘সিম্পল ফ্যাটি লিভার’। এই পর্যায়ে তেমন সমস্যা না হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি প্রদাহ তৈরি করতে পারে, যাকে বলা হয় নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো-হেপাটাইটিস (NASH)।

এই প্রদাহ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে লিভারের কোষে ক্ষত তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেই ক্ষত বাড়তে বাড়তে লিভার শক্ত ও সংকুচিত হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই বলা হয় লিভার সিরোসিস। সিরোসিস মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছলে লিভার তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ফেলিওর বা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়।


উপসর্গ কী কী?

প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তবে রোগ বাড়লে দেখা দিতে পারে—

  • ডান দিকের পেটে ভারী বা অস্বস্তি

  • অতিরিক্ত ক্লান্তি

  • হজমে সমস্যা

  • ক্ষুধামন্দা

  • ওজন দ্রুত বৃদ্ধি

  • ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া (গুরুতর ক্ষেত্রে)

সমস্যা হল, উপসর্গ স্পষ্ট না হওয়ায় অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ ধরা পড়তে পড়তে অনেক দেরি হয়ে যায়।


কারা বেশি ঝুঁকিতে?

  • যাঁদের ওজন বেশি

  • ডায়াবেটিস রোগী

  • উচ্চ রক্তচাপের রোগী

  • পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS)-এ আক্রান্ত নারী

  • যাঁদের পরিবারে লিভারের রোগের ইতিহাস রয়েছে

  • যারা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খান


কীভাবে ধরা পড়ে?

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।


চিকিৎসা কী?

এই রোগের নির্দিষ্ট কোনও ওষুধ এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। মূল চিকিৎসা জীবনযাত্রার পরিবর্তন।

১. ওজন কমানো

শরীরের মোট ওজনের ৭-১০ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের মেদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

২. সুষম খাদ্য

  • কম তেল ও কম চিনি

  • বেশি শাকসবজি ও ফল

  • গোটা শস্য

  • ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার

  • প্রসেসড ফুড এড়ানো

৩. নিয়মিত ব্যায়াম

প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম।

৪. ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

রক্তে শর্করা ও লিপিড প্রোফাইল নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

৫. পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ

৭-৮ ঘণ্টা ঘুম এবং যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন উপকারী।


শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ

বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও স্থূলতা বাড়ছে। ফাস্টফুড ও মোবাইল-নির্ভর জীবন তাদের ঝুঁকিতে ফেলছে। অল্প বয়সেই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ছে বহু ক্ষেত্রে। এটি ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।


প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় উপায়

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার নীরব ঘাতকের মতো কাজ করে। শুরুতে কোনও বড় উপসর্গ না থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই—

  • বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্যপরীক্ষা

  • BMI নিয়ন্ত্রণে রাখা

  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম

  • অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড বর্জন

  • ধূমপান এড়ানো

    উপসংহার

    নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার আজ শুধু একটি রোগের নাম নয়, এটি আমাদের সময়ের জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তিনির্ভর আরামদায়ক জীবন, অল্প পরিশ্রম, ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে শরীরের ভিতরে যে নীরব বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে, তার অন্যতম উদাহরণ এই রোগ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এটি শুরুতে প্রায় নিঃশব্দ। ব্যথা নেই, বড় কোনও লক্ষণ নেই, তবুও লিভারের কোষে কোষে জমতে থাকে চর্বি, তৈরি হয় প্রদাহ, ধীরে ধীরে ক্ষত। অনেকেই বুঝতেই পারেন না, ভিতরে ভিতরে তাঁদের লিভার তার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারাচ্ছে।

    Indian Council of Medical Research-এর তথ্য অনুযায়ী দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত—যা প্রমাণ করে এটি আর ব্যতিক্রমী অসুখ নয়, বরং অত্যন্ত সাধারণ হয়ে উঠেছে। একইভাবে European Journal of Cardiovascular Medicine-এ প্রকাশিত গবেষণাও সতর্ক করছে যে বিশ্বজুড়ে এর প্রকোপ বাড়ছে। অর্থাৎ এটি কেবল ব্যক্তিগত অসাবধানতার ফল নয়, বরং সামাজিক ও জীবনযাত্রাগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব।

    ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল এর সম্ভাব্য পরিণতি। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধুমাত্র চর্বি জমলেও, সময়ের সঙ্গে তা প্রদাহে রূপ নিতে পারে। প্রদাহ থেকে তৈরি হতে পারে ফাইব্রোসিস, তারপর সিরোসিস। সিরোসিস মানে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি—যেখান থেকে আর পুরোপুরি সুস্থ হওয়া যায় না। আরও ভয়ঙ্কর হল, এই সিরোসিস থেকেই ভবিষ্যতে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একটি ‘নিরীহ’ মনে হওয়া সমস্যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী রূপ নিতে সক্ষম।

    তবে এই অন্ধকার ছবির মাঝেও আশার আলো রয়েছে। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার এমন একটি অবস্থা, যা সময়মতো ধরা পড়লে এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ওজন কমানো, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম—এগুলো কোনও কঠিন চিকিৎসা নয়, বরং দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৭-১০ শতাংশ কমাতে পারলেও লিভারের উপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ ছোট ছোট পরিবর্তনও বড় ফল আনতে পারে।

    এই রোগ আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—স্বাস্থ্যকে অবহেলা করলে তার মূল্য দিতে হয়। কাজের চাপে, ব্যস্ততার অজুহাতে আমরা শরীরের সংকেতকে উপেক্ষা করি। কিন্তু শরীর কখনও ভুলে যায় না। তাই বছরে অন্তত একবার নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, রক্তের শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসাউন্ড করানো—এসব অভ্যাসে পরিণত করা জরুরি।

    শিশু ও তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রেও সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। কম বয়সে স্থূলতা ও ফ্যাটি লিভারের বৃদ্ধি ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক সংকেত। তাই পরিবার থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমের সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। স্কুল, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজ—সব জায়গাতেই এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

    সবশেষে বলা যায়, লিভার আমাদের শরীরের নীরব কর্মী। আমরা ঘুমোলেও সে কাজ করে যায়—রক্ত বিশুদ্ধ করে, শক্তি সঞ্চয় করে, টক্সিন দূর করে। সেই অঙ্গটির প্রতি যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার আমাদের সতর্কবার্তা দেয় যে আধুনিকতার সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে যেন আমরা নিজের শরীরকে বিসর্জন না দিই।

    স্বাস্থ্য কোনও বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজন। আর সুস্থ লিভার মানেই সুস্থ ভবিষ্যৎ। আজই যদি আমরা সচেতন হই, সঠিক জীবনযাত্রা বেছে নিই এবং নিয়মিত পরীক্ষা করি, তবে এই নীরব রোগকে হারানো সম্ভব। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য—সচেতনতা ও শৃঙ্খলিত জীবনই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

Preview image