বর্তমানে ভারত আমেরিকা থেকে বছরে মাত্র দেড় লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টন সয়াবিন তেল আমদানি করে। এই তেল আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মোট ১৬.৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত সেসও দিতে হয়, যার ফলে আমদানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং বাজারে দামের উপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ভারত ও আমেরিকার মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য-সমঝোতাকে সামগ্রিক ভাবে স্বাগত জানালেও, ভোজ্য তেল ও সয়াবিন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত দেশীয় ব্যবসায়ীরা এখনই খুব আশাবাদী হতে চাইছেন না। বরং শুল্ক ছাড়ের খুঁটিনাটি শর্ত, বিশেষ করে সেস সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কী হয়, তার দিকেই সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন তাঁরা। কারণ, শুধু আমদানি শুল্ক কমলেই যে বাস্তবে খরচ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমবে—এমন নিশ্চয়তা এখনও নেই।
বর্তমানে ভারত প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে ভোজ্য তেল আমদানি করে। তার মধ্যে সয়াবিন তেলের অংশ উল্লেখযোগ্য। দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় আমদানির উপর নির্ভরতা বাড়ছেই। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য-সমঝোতা কার্যকর হলে আমদানি শুল্কে ছাড় পাওয়া যাবে—এই আশায় অনেকেই প্রাথমিক ভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন।
সমঝোতা অনুযায়ী, আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামাচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতও আমেরিকা থেকে আমদানি হওয়া একাধিক পণ্যের উপর শুল্ক ছাড় দিতে চলেছে। সেই তালিকায় রয়েছে শিল্পজাত দ্রব্য, বিভিন্ন খাদ্যপণ্য ও কৃষিজাত সামগ্রী। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য—সয়াবিন তেল, পশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত লাল সরঘুম, বাদাম, তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, ওয়াইন এবং মদ।
এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলেই দেখছে ভোজ্য তেল শিল্পের শীর্ষ সংগঠনগুলি। বিশেষ করে সলভেন্ট এক্সট্র্যাক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (SEA) জানিয়েছে, যেহেতু ভারতকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে সয়াবিন তেল আমদানি করতে হয়, তাই নীতিগত ভাবে এই সমঝোতা আমদানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর—এই এক বছরে ভারত প্রায় ৫৪ লক্ষ ৭০ হাজার টন সয়াবিন তেল আমদানি করেছে। এই আমদানির সিংহভাগ এসেছে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা থেকে। তুলনায় আমেরিকা থেকে আমদানির পরিমাণ এখনও খুবই কম—মাত্র দেড় লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এর অন্যতম কারণ খরচ। বর্তমানে আমেরিকা থেকে সয়াবিন তেল আমদানি করতে গেলে ব্যবসায়ীদের ১৬.৫ শতাংশ মৌলিক আমদানি শুল্ক দিতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় একাধিক অতিরিক্ত কর—১০ শতাংশ অভিবাসন শুল্ক, ৫ শতাংশ কৃষি সেস এবং ১.৫ শতাংশ শিক্ষা সেস। সব মিলিয়ে কার্যত মোট করের বোঝা অনেকটাই বেড়ে যায়।
এসইএ-র এগ্জিকিউটিভ ডিরেক্টর বিভি মেহতার বক্তব্য, আমেরিকার সয়াবিন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারেই তুলনামূলক ভাবে বেশি। প্রতি টনে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার তুলনায় আমেরিকার সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ডলার বেশি পড়ে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,৬০০ টাকা। তার উপর যোগ হয় জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য আমদানিজনিত খরচ। ফলে শুধুমাত্র শুল্ক কমলেও প্রকৃত লাভ খুব বেশি নাও হতে পারে।
এই কারণেই ব্যবসায়ীদের মূল প্রশ্ন—শুল্ক ছাড়ের সঙ্গে কি সেসের ক্ষেত্রেও কোনও ছাড় দেওয়া হবে? যদি সেসের বোঝা একই রকম থাকে, তা হলে আমেরিকা থেকে সয়াবিন তেল আমদানির খরচ খুব একটা কমবে না বলেই মনে করছেন শিল্পের একাংশ।
মেহতার মতে, যদি শুল্কের পাশাপাশি সেসেও ছাড় মেলে, তা হলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলাতে পারে। সে ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা থেকে তেল আমদানির জন্য যে বিপুল জাহাজ ভাড়া দিতে হয়, তার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। আমেরিকা থেকে তুলনামূলক কম দূরত্বে এবং কম সময়ের মধ্যে তেল আনা সম্ভব হবে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।
তবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা থেকে সয়াবিন তেল আমদানি বেড়ে গেলে পাম তেলের বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। দাম ওঠানামার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি নেপাল থেকে সয়াবিন তেল আমদানিকে ঘিরে যে নানা বাণিজ্যিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তারও কিছুটা সমাধান হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু ভোজ্য তেল নয়, বাণিজ্য সমঝোতার প্রভাব পড়তে পারে পশুখাদ্য শিল্পেও। বিশেষ করে ড্রায়েড ডিসটিলার্স গ্রেন (DDG) আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো হলে তার জোগান বাড়বে। DDG মূলত পশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং বর্তমানে ভারত বছরে প্রায় ৭৫ লক্ষ থেকে ৮০ লক্ষ টন DDG উৎপন্ন করে। চাল ও ভুট্টার ছাট থেকে এই উপাদান তৈরি হয়।
এখানেই স্থানীয় শিল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এসইএ-র প্রতিনিধিরা। মেহতার আশঙ্কা, DDG আমদানি বেড়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশীয় উৎপাদকদের উপর। স্থানীয় বাজারে দাম কমে গেলে ছোট ও মাঝারি উৎপাদকরা চাপে পড়বেন।
সব মিলিয়ে ভারত–আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতা নীতিগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বাস্তব প্রয়োগে কতটা লাভ হবে তা নির্ভর করছে শুল্ক ছাড়ের প্রকৃত কাঠামো এবং সেস সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের উপর। তাই আপাতত স্বাগত জানালেও, বণিকমহল এখন চূড়ান্ত নোটিফিকেশনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
এখানেই স্থানীয় শিল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভোজ্য তেল ও পশুখাদ্য শিল্পের প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে ড্রায়েড ডিসটিলার্স গ্রেন (DDG) আমদানির সম্ভাব্য বৃদ্ধি নিয়ে দুশ্চিন্তায় দেশীয় উৎপাদকরা। এসইএ-র এগ্জিকিউটিভ ডিরেক্টর বিভি মেহতার মতে, আমদানির দরজা খুলে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনামূলক সস্তা DDG ভারতের বাজারে ঢুকতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশীয় উৎপাদনের উপর।
বর্তমানে ভারত নিজেই বছরে প্রায় ৭৫ লক্ষ থেকে ৮০ লক্ষ টন DDG উৎপাদন করে। মূলত চাল এবং ভুট্টার ছাট থেকে এই উপপণ্য তৈরি হয়, যা গবাদি পশু এবং পোলট্রি শিল্পে খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। দেশের বহু ছোট ও মাঝারি মিল, বিশেষ করে গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলে গড়ে ওঠা ইউনিটগুলি এই DDG উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। আমদানি বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে স্থানীয় বাজারে DDG-এর দাম কমতে বাধ্য হবে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পপতিরা।
দাম কমলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ছোট ও মাঝারি উৎপাদকরা। বড় সংস্থাগুলি হয়তো কিছুটা সময় টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু ছোট মিলগুলির জন্য উৎপাদন খরচ তুলে আনা কঠিন হয়ে উঠবে। এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থানের উপরও। অনেক ক্ষেত্রে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা বিকল্প কাজের সুযোগ না পেয়ে আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন।
শুধু পশুখাদ্য নয়, ভোজ্য তেল শিল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে। একদিকে আমদানি শুল্ক কমলে ভোক্তাদের জন্য দাম কিছুটা কমতে পারে—এই আশা রয়েছে। অন্য দিকে, অতিরিক্ত আমদানি দেশীয় তেলবীজ উৎপাদকদের উপর চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে সয়াবিন চাষের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আমেরিকা থেকে সয়াবিন তেল আমদানি বেড়ে গেলে তা সরাসরি পাম তেলের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে পাম তেল ভারতের ভোজ্য তেল বাজারে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। সয়াবিন তেলের দাম কমলে পাম তেলের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে, যার ফলে সামগ্রিক বাজারে দামের ওঠানামা বাড়বে।
এছাড়াও, নেপাল হয়ে সয়াবিন তেল আমদানিকে ঘিরে যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, তা কিছুটা মিটতে পারে বলে মনে করছেন শিল্প মহলের একাংশ। আমেরিকা থেকে সরাসরি আমদানি বাড়লে বিকল্প সরবরাহ পথ তৈরি হবে, যা ভারতের জন্য কৌশলগত ভাবে সুবিধাজনক হতে পারে।
তবে সব সুবিধার চাবিকাঠি এক জায়গাতেই আটকে রয়েছে—শুল্কের পাশাপাশি সেসের ভবিষ্যৎ কী হবে। ব্যবসায়ীদের মতে, যদি শুধু মৌলিক আমদানি শুল্ক কমানো হয়, কিন্তু কৃষি সেস, শিক্ষা সেস এবং অন্যান্য অতিরিক্ত কর একই থাকে, তা হলে প্রকৃত অর্থে আমদানির খরচ খুব বেশি কমবে না। ফলে নীতিগত ঘোষণা আর বাস্তব বাজারের মধ্যে ফারাক থেকেই যাবে।
এই কারণেই বণিকমহল এখন চূড়ান্ত নোটিফিকেশন প্রকাশের অপেক্ষায়। কোন পণ্যে কত শতাংশ শুল্ক ছাড় মিলবে, সেসের ক্ষেত্রে কোনও ছাড় থাকবে কি না, এবং সেই ছাড় কতদিন কার্যকর থাকবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর না মিললে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে ভারত–আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতা কূটনৈতিক ও নীতিগত দিক থেকে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তব ময়দানে এর সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সূক্ষ্ম নীতিনির্ধারণের উপর। তাই আপাতত স্বাগত জানালেও, ভোজ্য তেল ও কৃষিজাত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বণিকরা এখন খুব হিসেব করে পা ফেলতে চাইছেন। তাঁদের দৃষ্টি এখন একটাই—সরকারি বিজ্ঞপ্তির প্রতিটি লাইন।