বিদেশ থেকে ভারতীয়দের ফেরত পাঠানো নিয়ে সংসদে প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংহ একাধিক দেশের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছেন। সেই তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ভারতীয়দের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আমেরিকার অবস্থান অনেক নীচে
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসন নীতি নিয়ে যে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, তার প্রভাব বিশ্বজুড়েই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ছিল অবৈধ অভিবাসন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আরও জোরদার করা। সেই লক্ষ্য পূরণে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আনা হয় এবং ভিসা সংক্রান্ত নিয়মকানুন আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর করা হয়। বিশেষ করে কাজের ভিসা, অস্থায়ী ভিসা ও আশ্রয়প্রার্থী সংক্রান্ত নিয়মে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়, যার ফলে বিদেশি নাগরিকদের জন্য আমেরিকায় থাকা ও কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই নীতির সরাসরি প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের উপর। ভারতীয় নাগরিকরাও এর বাইরে ছিলেন না। উচ্চশিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য পরিষেবা কিংবা অন্যান্য পেশায় যুক্ত বহু ভারতীয় দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকায় বসবাস করেন। কিন্তু ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও দেশে না ফেরা, কাজের অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করা, কিংবা বেআইনি উপায়ে দেশে প্রবেশ করার অভিযোগে অনেক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেফতার ও পরে ফেরত পাঠানো হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কালে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ফলে এসব ক্ষেত্রে কোনও রকম শিথিলতা দেখানো হয়নি।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে আমেরিকার অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই) এবং সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানো হয়। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করা হতো। যাঁদের বিরুদ্ধে আইনি কাগজপত্রে ত্রুটি পাওয়া যেত, তাঁদের দ্রুত ডিপোর্টেশনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এর ফলে বহু ভারতীয় পরিবারকে হঠাৎ করেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়, যা তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বড় ধাক্কা দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতির উদ্দেশ্য শুধুমাত্র কোনও একটি দেশের নাগরিকদের নিশানা করা ছিল না। বরং সামগ্রিকভাবে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত করাই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য। তবুও বাস্তবে এর প্রভাব পড়ে মূলত সেই সব অভিবাসীদের উপর, যাঁরা নিয়মের ফাঁকফোকর দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশে অবস্থান করছিলেন বা যাঁদের ভিসা ও কাজের অনুমতির অবস্থান স্পষ্ট ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকারও বিদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে বারবার সতর্ক করেছে। বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, যে কোনও দেশে দীর্ঘদিন থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন ও শ্রম আইন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। নচেৎ, কড়া আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়ে দেশে ফেরত আসতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলেছিল। ভারতীয়দের ক্ষেত্রে সেই প্রভাব ডিপোর্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সচেতনতা, সঠিক তথ্য ও আইনি পথেই বিদেশে যাওয়া—এই বার্তাই উঠে আসছে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায়।
তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ভারতীয়দের ফেরত পাঠানোর নিরিখে আমেরিকা আদৌ শীর্ষে নেই। বরং গত পাঁচ বছরে ভারতীয় নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি তাড়িয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। এই তথ্য সামনে এনেছে কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রক। সংসদে একটি প্রশ্নের লিখিত উত্তরে কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংহ সৌদি আরব-সহ একাধিক দেশের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছেন। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ভারতীয়দের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আমেরিকা অনেক নীচের দিকে রয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে সৌদি আরব থেকেই সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। রিয়াধে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলির হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে সৌদি আরব থেকে ৮,৮৮৭ জন ভারতীয়কে ফেরত পাঠানো হয়। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০,২৭৭ জনে। ২০২৩ সালে আরও বৃদ্ধি পেয়ে সংখ্যাটি হয় ১১,৪৮৬। ২০২৪ সালে কিছুটা কমে ৯,২০৬ হলেও ২০২৫ সালে এখনও পর্যন্ত ৭,০১৯ জন ভারতীয় নাগরিককে সৌদি সরকার দেশছাড়া করেছে।
এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় শ্রমিক ও কর্মীদের একটি বড় গন্তব্য। নির্মাণ, তেল-গ্যাস, পরিষেবা, গৃহকর্মী ও বিভিন্ন ব্লু-কলার পেশায় বিপুল সংখ্যক ভারতীয় সেখানে কাজ করেন। ফলে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা, কাজের অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া কিংবা স্থানীয় শ্রম আইনের কড়া প্রয়োগের ফলে ভারতীয়দের ফেরত পাঠানোর সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে বেশি।
আমেরিকাকে সাধারণত ভারতীয় অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে ধরা হয়। উচ্চশিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বহু ভারতীয় নাগরিক আমেরিকায় যান। তবে সংখ্যার বিচারে সৌদির তুলনায় আমেরিকা থেকে ফেরত পাঠানো ভারতীয়দের সংখ্যা অনেক কম।
আমেরিকার ভারতীয় মিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি এলাকা থেকে। ২০২১ সালে ওয়াশিংটন থেকে ৮০৫ জন ভারতীয়কে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৬২। ২০২৩ সালে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৬১৭ জনে। ২০২৪ সালে ফের বেড়ে হয় ১,৩৬৮ জন। ২০২৫ সালে এখনও পর্যন্ত ওয়াশিংটন অঞ্চল থেকেই ৩,৪১৪ জন ভারতীয় নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়াও সান ফ্রান্সিসকো, নিউ ইয়র্ক, আটলান্টা, হিউস্টন এবং শিকাগো—এই শহরগুলির আওতাধীন ভারতীয় মিশন থেকেও ভারতীয় নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সংখ্যা ৫০০-এর নীচে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে দেখলে, আমেরিকা থেকে ফেরত পাঠানো ভারতীয়দের মোট সংখ্যা সৌদি আরবের তুলনায় অনেক কম।
বিদেশ মন্ত্রকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতীয় নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল—
ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থান করা
কাজের অনুমতির (ওয়ার্ক পারমিট) মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া
নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার বাইরে অন্যত্র কাজ করা
স্থানীয় শ্রম আইন বা অভিবাসন আইন লঙ্ঘন
বেআইনি অনুপ্রবেশ বা ভুয়ো নথির ব্যবহার
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে শ্রম আইন অত্যন্ত কড়া। নির্দিষ্ট স্পনসর বা নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করার নিয়ম ভাঙলে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বা বাহরিনের মতো দেশে ভারতীয় শ্রমিকদের ফেরত পাঠানোর ঘটনা তুলনামূলক বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী সৌদি আরব শীর্ষে থাকলেও, ভারত ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, শক্তি, প্রতিরক্ষা এবং শ্রম সংক্রান্ত সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। সৌদি আরব ভারতের অন্যতম প্রধান অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ। পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিক সৌদি আরবের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সশস্ত্র সংঘাতের সময় সৌদি আরব মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসে। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে সৌদি সরকারের প্রতিনিধিরা ভারতেও এসেছিলেন। দুই দেশকেই সংযম বজায় রাখার এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
তবে এর কিছুদিন পরেই সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তিতে বলা হয়, তৃতীয় কোনও দেশ যদি এই দুই দেশের মধ্যে একটিকে আক্রমণ করে, তবে তা উভয় দেশের উপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এই চুক্তি নিয়ে ভারতের কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠলেও পরে সৌদি সরকার স্পষ্ট করে জানায়, ওই চুক্তির নিশানায় ভারত নেই।
সৌদি আরব ও আমেরিকা ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি দেশ থেকে ভারতীয় নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
মালয়েশিয়া
মায়ানমার
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি
বাহরিন
তাইল্যান্ড
কম্বোডিয়া
এই দেশগুলিতেও মূলত অভিবাসন আইন ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের কারণেই ভারতীয় নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে পর্যটন ভিসায় গিয়ে অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগে ভারতীয়দের দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও সামনে এসেছে।
বিদেশ মন্ত্রক বারবার ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়েছে যে, বিদেশে যাওয়ার আগে ভিসা ও কাজের অনুমতি সংক্রান্ত সমস্ত নিয়ম ভালোভাবে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। বেআইনি পথে বা দালালের মাধ্যমে বিদেশে গেলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের জন্য ভারতীয় মিশনগুলিকে আরও সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য পাওয়া যায়।
বিদেশ মন্ত্রকের মতে, ফেরত পাঠানোর ঘটনা কূটনৈতিক সম্পর্কের মানদণ্ড নয়। এটি মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন ও শ্রম আইনের প্রয়োগের ফল। তবু এই পরিসংখ্যান ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা—বিদেশে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা, সচেতনতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির উপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ভারতীয়দের ফেরত পাঠানোর তালিকায় আমেরিকা শীর্ষে নেই। বরং সৌদি আরব থেকেই সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে শ্রমিকের বিপুল সংখ্যা, কড়া শ্রম আইন এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা। আমেরিকার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি আলোচনায় থাকলেও সংখ্যার বিচারে সেই দেশ অনেক নীচের দিকে রয়েছে।
এই তথ্য একদিকে যেমন বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে, তেমনই অন্যদিকে বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার আগে আইনি নিয়ম মেনে চলার গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা কমাতে ভারত সরকার ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে শ্রম ও অভিবাসন সংক্রান্ত সহযোগিতা আরও জোরদার করা হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।