বয়সের ফারাক, সমাজের কটাক্ষ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিং কোনও কিছুকেই নিজেদের সম্পর্কের পথে বাধা হতে দেননি অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ও তাঁর স্বামী সপ্তর্ষি মৌলিক। টলিপাড়ার এই ব্যতিক্রমী জুটি দেখতে দেখতে দাম্পত্য জীবনের ১৩ বছর পূর্ণ করেছেন, আর এই দীর্ঘ সময়টাই তাঁদের ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নাট্যদল নান্দিকারে কাজ করতে গিয়েই আলাপ হয় দুজনের। সেখান থেকেই বন্ধুত্ব, আর ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক প্রেমে রূপ নেয়। নাচনী নাটকের সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা আরও গভীর হয়। মাত্র তিন মাসের প্রেমের পরেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা যা অনেকের কাছেই অবাক করার মতো ছিল। কিন্তু সোহিনী ও সপ্তর্ষির কাছে সম্পর্ক মানে সামাজিক নিয়ম মানা নয়, বরং নিজেদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া। সোহিনী বয়সে স্বামীর থেকে ১৪ বছরের বড়, তার উপর তাঁর আগের একটি ভাঙা বিয়ে ছিল। এই সব কারণেই তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে শুরু থেকেই নানা মন্তব্য, কটাক্ষ আর ট্রোলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে অভিনেত্রীকে। কখনও কখনও সপ্তর্ষিকে তাঁর ছেলে বলেও বিদ্রুপ করা হয়েছে। তবে এই সব নেতিবাচক মন্তব্য কোনও দিনই তাঁদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেনি। সোহিনী বরাবরই স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি অন্যের মতামতের চেয়ে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ভালোবাসার কোনও নির্দিষ্ট বয়স, নির্দিষ্ট নিয়ম বা সমাজ নির্ধারিত ছক থাকে না এই কথাটাই বারবার প্রমাণ করে দিয়েছেন অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ও তাঁর স্বামী সপ্তর্ষি মৌলিক। টলিপাড়ার এই ব্যতিক্রমী দম্পতি নিজেদের সম্পর্ক, জীবনদর্শন এবং সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে সুখী হওয়ার জন্য সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করাই শেষ কথা নয়। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং মানসিক স্বচ্ছতাই তাঁদের কাছে দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি। দেখতে দেখতে তাঁদের দাম্পত্যের ১৩ বছর পূর্ণ হয়েছে, অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বয়সের ফারাক, অতীতের সম্পর্ক কিংবা সমাজের কটাক্ষ কোনও কিছুই তাঁদের ভালোবাসাকে টলাতে পারেনি।
সোহিনী সেনগুপ্ত দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা থিয়েটার ও টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। নাট্যদল নান্দিকারের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদেই তাঁর পরিচয় হয় সপ্তর্ষি মৌলিকের সঙ্গে। সেই সময় দুজনের জীবন একেবারেই আলাদা পর্যায়ে ছিল। কাজের সূত্রে আলাপ হলেও প্রথমে তা শুধুই সহকর্মীসুলভ সম্পর্ক ছিল। ধীরে ধীরে কাজের ফাঁকে কথা, আলোচনা, মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় বন্ধুত্ব। থিয়েটারের পরিবেশ এমনই, যেখানে মানুষের মনের গভীর দিকগুলো ধরা পড়ে খুব সহজে। মঞ্চের আলো-আঁধারিতে, চরিত্রের আবরণে একে অপরকে জানতে জানতে তাঁদের সম্পর্ক আরও গভীর হতে থাকে।
‘নাচনী’ নাটকের সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বিশেষভাবে বাড়ে। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একে অপরের ভাবনা, অনুভূতি ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে শুরু করেন তাঁরা। এই বোঝাপড়াই তাঁদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। মাত্র তিন মাসের প্রেমের পরেই তাঁরা জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করার সিদ্ধান্ত। অনেকের কাছেই এই সিদ্ধান্ত ছিল তাড়াহুড়ো, অপরিণত কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সোহিনী ও সপ্তর্ষির কাছে এটি ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সচেতন একটি পদক্ষেপ। তাঁরা জানতেন, সমাজ কী বলবে, মানুষ কী ভাববে এসবের চেয়ে তাঁদের নিজেদের অনুভূতি ও বিশ্বাস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় আলোচনা, সমালোচনা এবং কটাক্ষ। সোহিনী বয়সে সপ্তর্ষির থেকে ১৪ বছরের বড়, তার উপর তাঁর আগের একটি ভাঙা বিয়ের ইতিহাস রয়েছে। এই সব বিষয় সমাজের চোখে এখনও অনেক ক্ষেত্রেই ‘গ্রহণযোগ্য’ নয়। ফলত তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা রকম মন্তব্য ভেসে আসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় ট্রোলিং। কখনও সোহিনীকে আক্রমণ করে বলা হয় তিনি নাকি নিজের বয়স লুকোচ্ছেন, কখনও আবার সপ্তর্ষিকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিকর মন্তব্য করা হয়। সবচেয়ে কষ্টকর বিষয় ছিল, অনেক সময় সপ্তর্ষিকে সোহিনীর ছেলে বলেও বিদ্রুপ করা হয়েছে।
কিন্তু এই সমস্ত মন্তব্যকে কখনওই গুরুত্ব দেননি সোহিনী। বরাবরই তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর জীবনের দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন, সেখানে সমাজের অনুমোদন প্রয়োজন নেই। সপ্তর্ষিও এই বিষয়ে একইরকম দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা দু’জনেই জানতেন, এই সম্পর্ক সহজ হবে না, কিন্তু তবুও তাঁরা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক আরও পরিণত হয়েছে, আরও গভীর হয়েছে।
দাম্পত্য জীবনের এতগুলো বছর পার করেও তাঁদের সম্পর্কে কোনও বড় টানাপোড়েন বা অশান্তির খবর সামনে আসেনি। বরং নানা সাক্ষাৎকারে, আলোচনায় তাঁরা একে অপরের প্রতি সম্মান এবং বন্ধুত্বের কথা বারবার তুলে ধরেছেন। তাঁদের কাছে স্বামী স্ত্রী হওয়া মানে শুধুই সামাজিক পরিচয় নয়, বরং দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সমানাধিকারের সম্পর্ক। সেখানে কারও উপর কারও কর্তৃত্ব নেই, নেই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনও প্রত্যাশা।
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে সোহিনী তাঁদের জীবনের আর একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন মা না হওয়ার সিদ্ধান্ত। এই বিষয়টি নিয়েও সমাজে নানা রকম ধারণা ও চাপ কাজ করে। বিশেষ করে একজন নারী যদি মা না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাঁকে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। সোহিনী সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন অত্যন্ত স্পষ্ট ও সৎভাবে। তাঁর কথায়, বায়োলজিক্যাল সন্তান না নেওয়াটা তাঁদের দু’জনেরই যৌথ ও সচেতন সিদ্ধান্ত।
সোহিনী জানান, সপ্তর্ষি কোনও দিনই বাবা হতে চায় না। তাঁর মধ্যে সেই মানসিক প্রস্তুতি বা ইচ্ছা কখনওই তৈরি হয়নি। অনেকের কাছে এই কথা অস্বাভাবিক মনে হলেও, সোহিনীর কাছে এটি ছিল সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য। তিনি মনে করেন, বাবা বা মা হওয়া কোনও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়, বরং এটি হওয়া উচিত গভীর ইচ্ছা ও প্রস্তুতির ফল। যদি সেই ইচ্ছা না থাকে, তাহলে শুধুমাত্র সমাজের চাপে সন্তান জন্ম দেওয়া অন্যায়। তিনি স্বামীর এই অনুভূতিকে সম্মান করেন এবং সেই কারণেই এই বিষয়ে কোনও দ্বন্দ্ব তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়নি।
নিজের অনুভূতি প্রসঙ্গে সোহিনী আরও বলেন, একসময় অন্যদের দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, মা হওয়াটা হয়তো খুব সুন্দর এবং আবেগঘন অভিজ্ঞতা হতে পারে। চারপাশে বন্ধুদের সন্তান, আত্মীয়দের পরিবার দেখে মাঝেমধ্যে তাঁর মনেও প্রশ্ন জেগেছে। কিন্তু গভীরভাবে নিজের মনকে বোঝার চেষ্টা করে তিনি বুঝেছেন, তিনি কখনওই প্রবলভাবে মা হতে চাননি। সন্তান লালন-পালনের যে বিশাল দায়িত্ব, তার জন্য তিনি নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত মনে করেননি।
তিনি সোজাসাপটা স্বীকার করেছেন, প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, তার পড়াশোনা, শরীর স্বাস্থ্য, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এই সমস্ত কিছু সামলানোর কথা ভেবেই তাঁর মনে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেছেন, যদি তিনি এই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে না পারেন, তাহলে সেই শিশুর প্রতি অবিচার করা হবে। এই বাস্তববোধ থেকেই তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। তাঁর মতে, সন্তান নেওয়া কোনও সামাজিক অর্জন নয়, বরং এটি একটি আজীবনের দায়বদ্ধতা।
এই সিদ্ধান্ত নিয়েও তাঁদের দিকে আঙুল উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে তাঁদের সংসার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে না কি। কেউ কেউ আবার সহানুভূতির সুরে বলেছেন, পরে নাকি আফসোস হবে। কিন্তু এই সব মন্তব্যেও বিচলিত নন সোহিনী ও সপ্তর্ষি। তাঁরা জানেন, প্রত্যেক মানুষের সুখের সংজ্ঞা আলাদা। কারও কাছে সন্তানই জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ, আবার কারও কাছে নিজের কাজ, সম্পর্ক বা স্বাধীনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সোহিনী ও সপ্তর্ষি সমাজের বাঁধাধরা ধারণাকে দূরে সরিয়ে রেখে নিজেদের মতো করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের জীবনে ভালোবাসা মানে শুধু রোমান্টিক অনুভূতি নয়, বরং গভীর বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সমর্থন এবং একে অপরের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা। তাঁরা বিশ্বাস করেন, একটি সম্পর্ক টিকে থাকে তখনই, যখন দু’জন মানুষ একে অপরকে বদলানোর চেষ্টা না করে গ্রহণ করতে শেখে।
এই দম্পতির জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বয়সের ফারাক কোনও সম্পর্কের মান নির্ধারণ করে না। আগের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানেই নতুন সম্পর্ক ব্যর্থ হবে এই ধারণাও ভুল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দু’জন মানুষের মানসিক মিল এবং একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা। সমাজের চোখে যা স্বাভাবিক সেই ছকের বাইরে গিয়েও যে শান্তি ও সুখ পাওয়া যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ সোহিনী ও সপ্তর্ষি।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের গল্প অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে সেই সব মানুষদের জন্য, যারা সমাজের চাপ, পরিবার বা পরিচিতদের মন্তব্যে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। সোহিনী ও সপ্তর্ষি দেখিয়েছেন, নিজের জীবনের লাগাম নিজের হাতে রাখাই সবচেয়ে বড় সাহস। সুখ মানে সকলের মতো হওয়া নয়, বরং নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা পাওয়া।
দাম্পত্যের ১৩ বছর পেরিয়েও তাঁদের সম্পর্কে সেই উষ্ণতা, শ্রদ্ধা এবং স্বচ্ছতা অটুট। তাঁরা জানেন, ভবিষ্যতেও নানা প্রশ্ন, নানা মন্তব্য আসবে। কিন্তু সেই সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে তাঁরা নিজেদের পথেই হাঁটবেন। কারণ তাঁদের কাছে ভালোবাসা মানে সামাজিক স্বীকৃতি নয়, বরং একে অপরের পাশে নির্ভরতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা। আর এই বিশ্বাসই তাঁদের সম্পর্ককে করে তুলেছে দৃঢ়, গভীর এবং সত্যিকারের সুখের।