গাজিয়াবাদে পুলিশের এক আজব ঘটনার ভিডিও ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই করতে পুলিশ একটি যন্ত্র ব্যবহার করে তাকে বাংলাদেশি বলে দাবি করে। এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ক্ষমতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে।
ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকত্ব একটি সাংবিধানিক অধিকার। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট, জন্ম শংসাপত্র—এই সব নথির ভিত্তিতেই একজন মানুষের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে পুলিশের একটি ভিডিও সামনে আসার পর সেই প্রতিষ্ঠিত ধারণাই যেন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গাজিয়াবাদের রাস্তায় ঘটে যাওয়া একটি seemingly ছোট ঘটনা আজ বৃহত্তর এক জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। একটি যন্ত্র দেখিয়ে এক ব্যক্তিকে “বাংলাদেশি” বলে ঘোষণা—এই দৃশ্য শুধু ভাইরাল ভিডিও নয়, বরং আধুনিক ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক ভয়ংকর ফাঁকফোকরকে সামনে এনে দিয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক পুলিশকর্মী একটি যন্ত্র বা ডিভাইস ব্যবহার করে এক ব্যক্তির ‘নাগরিকত্ব পরীক্ষা’ করছেন এবং সেই যন্ত্রের স্ক্রিন দেখে দাবি করছেন—ব্যক্তিটি নাকি বাংলাদেশি। এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে—
পুলিশের হাতে এমন কোনও যন্ত্র আদৌ আছে কি?
প্রযুক্তির নামে কি নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা যায়?
আইন ও সংবিধানের জায়গায় কি যন্ত্র বসতে পারে?
এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ভুল নয়, বরং নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, গাজিয়াবাদের এক রাস্তায় পুলিশ এক ব্যক্তিকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এরপর এক পুলিশকর্মী একটি হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস বা মোবাইল সদৃশ যন্ত্র বের করেন। সেই যন্ত্রটি ব্যক্তির দিকে ধরে কিছু একটা ‘স্ক্যান’ করার মতো ভঙ্গিতে ব্যবহার করা হয়।
এরপর পুলিশকর্মী বলেন,
“দেখো, এখানে লেখা আছে—বাংলাদেশ।”
এই কথার পরেই ওই ব্যক্তিকে বাংলাদেশি বলে দাবি করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি বারবার বলছেন তিনি ভারতীয়, তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় নথি রয়েছে। কিন্তু তাতেও পুলিশকর্মীর বক্তব্য বদলায় না।
এই দৃশ্যই মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিও ভাইরাল হতেই একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন, তেমনই অন্যদিকে শুরু হয় বিদ্রূপ ও ব্যঙ্গ।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—
“নাগরিকত্ব কি এখন ব্লুটুথে ধরা পড়ে?”
“কাল যদি যন্ত্র বলে আমি মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দা, সেটাও কি মেনে নিতে হবে?”
আবার অনেক মানবাধিকার কর্মী এই ঘটনাকে ভয়ঙ্কর নজির বলে আখ্যা দেন। তাঁদের মতে, যদি পুলিশ নিজের ইচ্ছেমতো কোনও যন্ত্র দেখিয়ে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে শুরু করে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
অনেকে বলছেন, এটি হয়তো একজন পুলিশকর্মীর ব্যক্তিগত ভুল বা অজ্ঞতা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি আরও গভীর।
কারণ—
ওই পুলিশকর্মী একা নন, তিনি একটি সিস্টেমের অংশ
তিনি প্রকাশ্যে, ক্যামেরার সামনে এই কাজ করেছেন
আশপাশের কেউ তাতে আপত্তি তোলেননি
এতে বোঝা যায়, এই ধরনের আচরণ হয়তো অজান্তে নয়—বরং একটি ভ্রান্ত ধারণা বা প্রশিক্ষণগত ঘাটতির ফল।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গাজিয়াবাদ পুলিশ প্রশাসনের তরফে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। পুলিশের দাবি,
ওই ডিভাইস কোনওভাবেই নাগরিকত্ব নির্ধারণের যন্ত্র নয়
পুলিশকর্মী ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন
ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে
পুলিশ আরও জানায়, ভিডিওতে দেখা পুলিশকর্মীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এই ব্যাখ্যা বিতর্ক থামাতে পারেনি। কারণ প্রশ্ন একটাই—যদি যন্ত্রটি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য নয়, তবে একজন পুলিশকর্মী কীভাবে এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাউকে বাংলাদেশি ঘোষণা করলেন?
ভারতের আইনি কাঠামো অনুযায়ী পুলিশ—
সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে
নথি দেখতে চাইতে পারে
আইনভঙ্গ হলে গ্রেপ্তার করতে পারে
কিন্তু পুলিশ কখনই—
নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারে না
কাউকে বিদেশি ঘোষণা করতে পারে না
আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তকমা দিতে পারে না
এই কাজগুলির জন্য নির্দিষ্ট ট্রাইবুনাল, আদালত এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে।
গাজিয়াবাদের ঘটনায় এই সমস্ত সীমা কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকত্ব নির্ধারণ হয় নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায়। এর মধ্যে রয়েছে—
Citizenship Act, 1955
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব
বংশানুক্রমিক নাগরিকত্ব
বৈধ নথিপত্র
কোনও ক্ষেত্রেই পুলিশের হাতে একতরফা ভাবে কাউকে বিদেশি বা অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করার ক্ষমতা নেই। সে ক্ষমতা থাকে শুধুমাত্র আদালত বা নির্দিষ্ট ট্রাইবুনালের হাতে।
আইনজীবীদের মতে,
“একজন পুলিশ যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনও যন্ত্র দেখিয়ে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক।”
এই ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—পুলিশ কি প্রযুক্তির সীমা সম্পর্কে অবগত?
বর্তমানে পুলিশ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে—
মুখ শনাক্তকরণ (Face Recognition)
আধার যাচাই
গাড়ির নম্বর প্লেট স্ক্যান
অপরাধীদের ডাটাবেস মিল
কিন্তু নাগরিকত্ব শনাক্ত করার কোনও যন্ত্র বিশ্বের কোথাও নেই—এ কথা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে,
“নাগরিকত্ব কোনও বায়োমেট্রিক ডেটা নয়। এটি একটি আইনি পরিচয়। কোনও সেন্সর বা অ্যাপ দিয়ে তা ধরা অসম্ভব।”
এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো—এটি সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন—
নাম, ভাষা বা চেহারার ভিত্তিতে মানুষকে টার্গেট করা হবে
পুলিশি হয়রানি বাড়বে
নথি থাকা সত্ত্বেও মানুষকে বিদেশি তকমা দেওয়া হবে
মানবাধিকার সংগঠনগুলির বক্তব্য,
“এই ধরনের ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। আইন রক্ষক যখন আইনের সীমা ছাড়িয়ে যান, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়।”
ভারতে নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। NRC, CAA ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আগেও বহু বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু সেই সব ক্ষেত্রেও অন্তত একটি আইনি কাঠামো ছিল।
গাজিয়াবাদের ঘটনা আলাদা, কারণ এখানে—
কোনও আইনি প্রক্রিয়া নেই
কোনও নোটিস নেই
কোনও ট্রাইবুনাল নেই
শুধু একটি যন্ত্র আর পুলিশের মুখের কথা
এই দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যার জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিরোধী দলের নেতারা দাবি করেছেন—
অবিলম্বে দোষী পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে
নাগরিক অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে
অন্যদিকে শাসক দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—
এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা
তদন্তের আগে সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়
তবে সাধারণ মানুষের একাংশের প্রশ্ন—
“বিচ্ছিন্ন ঘটনা যদি বারবার ঘটে, তবে সেটাই কি নিয়ম হয়ে যায় না?”
এই ঘটনার পর অনেক সাধারণ নাগরিক বলছেন—
“কাল রাস্তায় বের হলে আমার সঙ্গে কী হবে?”
“নথি থাকলেও যদি পুলিশ না মানে, তাহলে কী করব?”
বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও দরিদ্র মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি।
আইনবিদ, মানবাধিকার কর্মী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন জরুরি—
স্পষ্ট তদন্ত ও প্রকাশ্য রিপোর্ট
দোষী পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
পুলিশের প্রশিক্ষণে নাগরিক অধিকার বিষয়ক শিক্ষা
প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট গাইডলাইন
নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি
গাজিয়াবাদের এই ঘটনা একটি ছোট ভিডিও দিয়ে শুরু হলেও, তা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সামনে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
যদি—
আইনের জায়গায় যন্ত্র বসে
প্রমাণের জায়গায় অনুমান চলে
সংবিধানের জায়গায় ক্ষমতা কাজ করে
তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
গাজিয়াবাদের এই ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। এটি শুধু একটি ভুল নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য এক বিপজ্জনক নজির হতে পারে।
নাগরিকত্ব কোনও যন্ত্রের স্ক্রিনে লেখা শব্দ নয়।
এটি সংবিধানের দেওয়া অধিকার।
এই অধিকার রক্ষা করা শুধু আদালত বা সরকারের নয়—সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।