Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নিষ্কৃতিমৃত্যু ইথানের জীবনে ছবি হরীশের জীবনে ঘোরতর বাস্তব

অরুণা দুর্ভাগা ছিলেন। হরীশ সৌভাগ্যবান। তাঁকে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অনুমতি দিয়েছে তাঁর শরীরে যুক্ত জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার। ঝপ করে ১৬ বছর আগের গুজ়ারিশ ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল।

২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া Guzaarish ভারতীয় সিনেমার এমন এক সৃষ্টি, যেখানে জীবন, মৃত্যু, মানবিকতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো গভীর ও জটিল প্রশ্নকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটির পরিচালক Sanjay Leela Bhansali, যিনি তাঁর ভিজ্যুয়াল স্টাইল, আবেগঘন গল্প এবং মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম উপস্থাপনার জন্য পরিচিত। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ইথান মাসকারেনহাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন Hrithik Roshan এবং তাঁর সঙ্গী সোফিয়ার চরিত্রে ছিলেন Aishwarya Rai Bachchan।

এই ছবির গল্প শুধু একটি মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; বরং এটি এমন এক প্রশ্নকে সামনে আনে, যা সমাজ, আইন, নৈতিকতা এবং মানবিকতার মধ্যে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়—নিষ্কৃতিমৃত্যু বা ইউথানেশিয়া। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি ইথান মাসকারেনহাস একসময় ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান জাদুকর। তাঁর ম্যাজিক শো মানুষকে বিস্মিত করত, দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে দেখত তাঁর অভিনব কৌশল। কিন্তু এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে দেয়। সেই দুর্ঘটনার ফলে ইথান হয়ে পড়েন চতুর্দিক থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত—চলাফেরা, নিজের শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ, এমনকি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ক্ষমতাও তিনি হারিয়ে ফেলেন।

দুর্ঘটনার পরে টানা ১৪ বছর ধরে ইথান বিছানায় বন্দি। তাঁর শরীর আর তাঁর কথা শোনে না, কিন্তু তাঁর মন সচল। সেই সচেতন মনই তাঁকে প্রতিদিন নিজের অসহায়তার মুখোমুখি দাঁড় করায়। একজন মানুষ, যিনি একসময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার মানুষের সামনে জাদু দেখাতেন, তিনি এখন নিজের শরীরের বন্দি। এই বাস্তবতা তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়, কিন্তু তিনি সম্পূর্ণভাবে হার মানেন না।

এই জায়গাতেই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—ইথানের রেডিয়ো শো। বিছানায় শুয়ে থেকেও তিনি হয়ে ওঠেন একজন রেডিয়ো জকি। তাঁর অনুষ্ঠান “রেডিয়ো জিন্দেগি” যেন হয়ে ওঠে জীবনের প্রতি এক ব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। রেডিয়োর মাধ্যমে তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, জীবন নিয়ে ভাবতে শেখান, কখনও কৌতুক করেন, আবার কখনও নিজের যন্ত্রণার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যিটা তুলে ধরেন।

কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে যখন তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেন—তাঁকে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অধিকার দেওয়া হোক। তিনি যুক্তি দেন, তাঁর জীবন আর জীবনের মতো নয়; এটি কেবল যন্ত্রণা, অসহায়তা এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকা একটি অস্তিত্ব। একজন মানুষের কি নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই? এই প্রশ্নই ছবির মূল সুর হয়ে ওঠে।

নিষ্কৃতিমৃত্যু বা ইউথানেশিয়া বিষয়টি ভারতীয় সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আইনি জটিলতা—সব মিলিয়ে এটি একটি জটিল বিতর্ক। ছবিতে দেখা যায়, ইথানের আবেদন আদালতে পৌঁছানোর পর শুরু হয় নানা মতামত, যুক্তি এবং পাল্টা যুক্তির লড়াই। আইনজীবী, বিচারক, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ—সবাই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকে।

ইথানের পক্ষে যুক্তি হল, তিনি একটি অর্থহীন যন্ত্রণাময় জীবন বয়ে নিয়ে চলেছেন। তাঁর শরীর কার্যত মৃত, শুধু মস্তিষ্ক সচল। প্রতিদিন তাঁকে অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়—খাওয়া, নড়াচড়া, এমনকি শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রেও। তাঁর কাছে এটি আর জীবন নয়, বরং ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি অসহায় সময়।

অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের যুক্তি হল—জীবন ঈশ্বরের দেওয়া, তাই তা শেষ করার অধিকার মানুষের নেই। যদি নিষ্কৃতিমৃত্যু বৈধ করা হয়, তাহলে তা অপব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজের চাপেও মানুষকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হতে পারে।

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই ছবিটি তুলে ধরে মানবিক সম্পর্কের গভীরতা। ইথানের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সোফিয়া, যিনি তাঁর নার্স হলেও বাস্তবে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সোফিয়া শুধু একজন পরিচর্যাকারী নন; তিনি ইথানের বন্ধু, সঙ্গী এবং আশ্রয়। প্রতিদিন তিনি ইথানের যত্ন নেন, তাঁর সঙ্গে হাসেন, কাঁদেন এবং তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

সোফিয়ার চরিত্রটি ছবিতে এক অসাধারণ মানবিক দৃষ্টান্ত। তিনি ইথানকে ভালোবাসেন, কিন্তু তাঁর যন্ত্রণা বুঝতেও পারেন। যখন ইথান মৃত্যুর অধিকার চাইতে শুরু করেন, তখন সোফিয়া দ্বিধায় পড়ে যান। তিনি চান ইথান বেঁচে থাকুক, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি জানেন—এই বেঁচে থাকা হয়তো ইথানের জন্য যন্ত্রণার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইথানের অতীত। একসময় তাঁর জীবন ছিল উচ্ছ্বাসে ভরা। ম্যাজিক ছিল তাঁর নেশা এবং পেশা। মানুষকে বিস্মিত করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই উজ্জ্বল জীবনই এক মুহূর্তে থেমে যায়। দুর্ঘটনার পেছনে ছিল বিশ্বাসঘাতকতা—যা তাঁর মানসিক ক্ষতকে আরও গভীর করে তোলে।

এই অতীত এবং বর্তমানের দ্বন্দ্ব ইথানের চরিত্রকে আরও জটিল ও মানবিক করে তোলে। তিনি কেবল একজন অসহায় রোগী নন; তিনি একজন চিন্তাশীল মানুষ, যিনি নিজের জীবনের অর্থ খুঁজতে চেষ্টা করছেন।

পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভন্সালী ছবিটিকে শুধু একটি আদালতকেন্দ্রিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি এটিকে এক ধরনের দার্শনিক যাত্রা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ছবির দৃশ্যায়ন, সংগীত এবং সংলাপ—সবকিছু মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক আবেগঘন অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে ছবির ভিজ্যুয়াল স্টাইল অত্যন্ত কাব্যিক। অন্ধকার ঘর, পুরোনো পর্তুগিজ ধাঁচের বাড়ি, জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া আলো—সবকিছু যেন ইথানের বন্দি জীবনের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর চারপাশের পৃথিবী সুন্দর, কিন্তু তিনি সেই সৌন্দর্যকে স্পর্শ করতে পারেন না।

রেডিয়ো শোর মাধ্যমে দর্শকরা দেখতে পায় ইথানের আরেকটি দিক—তাঁর রসবোধ। তিনি প্রায়ই নিজের পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গ করে কথা বলেন। এই হাস্যরস আসলে তাঁর বেঁচে থাকার একটি উপায়।

ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হল আদালতের বিতর্ক। এখানে শুধু আইন নয়, মানবিক মূল্যবোধও প্রশ্নের মুখে পড়ে। একজন মানুষের কি নিজের মৃত্যুর অধিকার থাকা উচিত? জীবন কি শুধু শ্বাস নেওয়ার নাম, নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু?

এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর ছবিটি দেয় না। বরং দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে। ছবির শেষ অংশে ইথান তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন কি না, সেটি পরিচালক স্পষ্টভাবে দেখাননি। এই অস্পষ্ট সমাপ্তি আসলে ছবির মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

২০১০ সালের ভারতীয় সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সমাপ্তি ছিল স্বাভাবিক। সেই সময় নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে খোলাখুলি সমর্থন দেখানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সেন্সর বোর্ডের কঠোর নিয়মের কারণে ছবির নির্মাতাদের অনেক সময় গল্পের উপসংহারে সতর্ক থাকতে হত।

news image
আরও খবর

তবুও “গুজ়ারিশ” সাহসিকতার সঙ্গে এমন একটি বিষয়কে সামনে এনেছিল, যা নিয়ে তখন খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে কথা বলত। ছবিটি দর্শকদের শুধু আবেগতাড়িত করেনি, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিতর্ককে সামনে এনেছিল।

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এই ছবিটি সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন শুধু বেঁচে থাকার নাম নয়; এটি মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং মানবিকতার প্রশ্নও বটে।

ইথান মাসকারেনহাসের গল্প তাই শুধু একটি চরিত্রের গল্প নয়। এটি প্রতিটি মানুষের প্রশ্ন—আমরা কেমন জীবন চাই, এবং সেই জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি আমাদের থাকা উচিত?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সহজ নয়। কিন্তু “গুজ়ারিশ” আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—এটাই এই ছবির সবচেয়ে বড় সাফল্য।
 

উপসংহার

সব মিলিয়ে Guzaarish কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি এক গভীর মানবিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক শিল্পসৃষ্টি। পরিচালক Sanjay Leela Bhansali এই ছবির মাধ্যমে এমন একটি বিষয়কে স্পর্শ করেছিলেন, যা নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক, দ্বিধা এবং নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। জীবনকে আমরা সাধারণত এক অমূল্য উপহার হিসেবে দেখি—যা যত কষ্টই হোক, শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে রাখাই আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অংশ। কিন্তু এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ইথান মাসকারেনহাসের জীবন আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—যদি সেই জীবন আর বেঁচে থাকার মতো না থাকে, যদি প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা, অসহায়তা এবং অন্যের উপর নির্ভরতার প্রতীক, তাহলে কি সেই জীবনকে জোর করে ধরে রাখা সত্যিই মানবিক?

ইথানের গল্প তাই কেবল একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের গল্প নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং নিজের জীবনের উপর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিয়ে এক গভীর দার্শনিক আলোচনা। দুর্ঘটনার আগে তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান জাদুকর—যার প্রতিটি শো মানুষকে বিস্ময়ে ভরিয়ে দিত। কিন্তু এক মুহূর্তের দুর্ঘটনা তাঁর সেই আলো ঝলমলে জীবনকে অন্ধকারের গভীরে ঠেলে দেয়। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি বন্দি হয়ে থাকেন একটি বিছানা এবং হুইলচেয়ারের মধ্যে। তাঁর শরীর অচল, কিন্তু তাঁর মন সচল। আর সেই সচল মনই তাঁকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় তাঁর সীমাবদ্ধতার কথা।

এই মানসিক যন্ত্রণাই তাঁকে এক সময় আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করে। তিনি চান একটি অধিকার—নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। তাঁর আবেদন সমাজকে এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই একজন মানুষকে এমন জীবনে বাঁচতে বাধ্য করতে পারি, যা তাঁর কাছে আর জীবন নয়, বরং একটি অবিরাম যন্ত্রণার চক্র?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। সমাজের একাংশ মনে করে, জীবন ঈশ্বরপ্রদত্ত—তাই তা শেষ করার অধিকার মানুষের নেই। আবার অন্য অংশ মনে করে, মানুষের স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায় যখন সে নিজের জীবন ও মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। “গুজ়ারিশ” এই দ্বন্দ্বের কোনও সরল সমাধান দেয় না। বরং দর্শকদের সামনে এই প্রশ্ন রেখে যায়, যাতে প্রত্যেকে নিজের মতো করে ভাবতে পারে।

ছবিটির আরেকটি শক্তিশালী দিক হল মানবিক সম্পর্কের গভীরতা। সোফিয়া—যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন Aishwarya Rai Bachchan—ইথানের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি কেবল একজন নার্স নন; তিনি ইথানের আশ্রয়, বন্ধু এবং নীরব সহযাত্রী। প্রতিদিন তিনি ইথানের যত্ন নেন, তাঁর সঙ্গে হাসেন, কখনও তাঁর দুঃখ ভাগ করে নেন। কিন্তু যখন ইথান মৃত্যুর অধিকার চাইতে শুরু করেন, তখন সোফিয়ার মনেও শুরু হয় এক গভীর দ্বন্দ্ব। তিনি ইথানকে হারাতে চান না, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন—এই দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কতটা সত্য।

এই দ্বিধা আসলে আমাদের প্রত্যেকের দ্বিধা। আমরা প্রিয় মানুষকে হারাতে চাই না, কিন্তু একই সঙ্গে আমরা চাই না যে সে অবিরাম যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকুক। এই মানবিক টানাপোড়েন ছবিটিকে আরও গভীর করে তোলে।

ছবির ভিজ্যুয়াল ভাষাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভন্সালীর স্বাক্ষরধর্মী নান্দনিকতা ছবির প্রতিটি ফ্রেমে স্পষ্ট। আলো-ছায়ার খেলা, পুরোনো ইউরোপীয় ধাঁচের বাড়ির আবহ, এবং ইথানের বন্দি জীবনের নিঃসঙ্গতা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক কাব্যিক অথচ বিষণ্ণ পরিবেশ। মনে হয় যেন সময় এখানে থেমে গেছে। বাইরের পৃথিবী এগিয়ে চলেছে, কিন্তু ইথানের জীবন আটকে আছে এক স্থির মুহূর্তে।

ইথানের রেডিয়ো শো-ও ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। বিছানায় শুয়ে থেকেও তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, জীবন নিয়ে ভাবতে শেখান, কখনও কৌতুক করেন। যেন তিনি নিজেই নিজের যন্ত্রণা লুকিয়ে অন্যদের সাহস জোগান। এই দ্বৈততা—অন্তরের যন্ত্রণা এবং বাইরের হাসি—মানবজীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

ছবির শেষ অংশে পরিচালক ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি ধোঁয়াশা রেখে দেন। ইথান তাঁর কাঙ্ক্ষিত মুক্তি পেলেন কি না, তা স্পষ্ট করে দেখানো হয় না। এই অস্পষ্ট সমাপ্তি আসলে ছবির দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ জীবনের অনেক প্রশ্নের মতোই এই প্রশ্নেরও কোনও চূড়ান্ত উত্তর নেই। প্রত্যেক মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং অনুভূতির ভিত্তিতে এর উত্তর খুঁজে নেয়।

২০১০ সালে এই ধরনের একটি বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা ছিল যথেষ্ট সাহসের কাজ। সেই সময় ভারতে নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনাও খুব সীমিত ছিল। তাই ছবির উপসংহারকে খানিকটা অস্পষ্ট রাখা ছিল এক ধরনের বাস্তবিক সিদ্ধান্তও। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও “গুজ়ারিশ” দর্শকদের মনে এমন একটি প্রশ্ন তুলে দেয়, যা সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে মনে থেকে যায়।

আজ এত বছর পরে এই ছবির দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়—এটি কেবল একটি সময়ের গল্প নয়। এটি এমন একটি মানবিক প্রশ্নের গল্প, যা ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক থাকবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু সেই বেঁচে থাকার মান কতটা মর্যাদাপূর্ণ—সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইথান মাসকারেনহাসের চরিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন শুধু শ্বাস নেওয়ার নাম নয়। জীবন মানে অনুভব করা, চলাফেরা করা, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের মর্যাদা বজায় রাখা। যখন সেই সবকিছু হারিয়ে যায়, তখন মানুষ নিজের অস্তিত্বের অর্থ নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।

“গুজ়ারিশ” তাই শেষ পর্যন্ত একটি গভীর মানবিক গল্প—যেখানে মৃত্যু কোনও অন্ধকার সমাপ্তি নয়, বরং কখনও কখনও মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। এই ধারণা সবাই গ্রহণ করবে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ছবিটি আমাদের সেই ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

এই কারণেই এত বছর পরেও “গুজ়ারিশ” শুধু একটি সিনেমা হিসেবে নয়, বরং একটি দার্শনিক অভিজ্ঞতা হিসেবে মনে থেকে যায়। এটি আমাদের শেখায়—জীবনকে ভালোবাসতে, যন্ত্রণাকে বুঝতে এবং মানুষের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে। আর হয়তো এটাই এই ছবির সবচেয়ে বড় আবেদন—একটি নীরব কিন্তু গভীর ‘গুজ়ারিশ’, যাতে আমরা জীবন ও মৃত্যুর মতো জটিল প্রশ্নগুলিকে আরও মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে শিখি।

Preview image