Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কক্সিডাইনিয়ায় ভুগছেন বরুণ ধবন? মেরুদণ্ডের নীচের হাড়ের আঘাত কতটা বিপজ্জনক

‘বর্ডার ২’ ছবির শুটিংয়ে টেলবোনে চোট পান বরুণ ধবন। বিরল এই আঘাত কতটা গুরুতর হতে পারে ও কী চিকিৎসা প্রয়োজন, তা নিয়েই আলোচনা।

‘বর্ডার ২’ ছবির শুটিং চলাকালীন গুরুতর চোট পান বলিউড অভিনেতা বরুণ ধবন। প্রথমে বিষয়টি সাধারণ আঘাত বলে মনে হলেও পরে পরীক্ষায় জানা যায়, তাঁর মেরুদণ্ডের একেবারে নীচের অংশে থাকা টেলবোন বা কক্সিসে চিড় ধরেছে। এই ধরনের আঘাত চিকিৎসাবিজ্ঞানে পরিচিত কক্সিডাইনিয়া নামে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই রোগ খুব বেশি পরিচিত নয়, কিন্তু চিকিৎসকদের মতে এটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এবং সেরে উঠতে সময়ও লাগে।

বরুণ নিজেই জানিয়েছিলেন, আঘাত পাওয়ার পর তাঁর হাঁটাচলা করতে কষ্ট হচ্ছিল, বসতে গেলে কোমরের নীচে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাঁর এই অভিজ্ঞতা থেকেই ফের আলোচনায় এসেছে কক্সিস বা টেলবোনে আঘাত সংক্রান্ত সমস্যা। প্রশ্ন উঠছে—এই চোট কতটা গুরুতর? কী কী লক্ষণ দেখা যায়? কতদিনে সারে? আর কীভাবে চিকিৎসা করা হয়?

এই প্রতিবেদনে সেই সব প্রশ্নেরই বিস্তারিত উত্তর থাকছে।

টেলবোন বা কক্সিস কী?

মানব মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত ছোট ত্রিকোণাকার হাড়টিকে বলা হয় কক্সিস বা টেলবোন। এটি মূলত চার থেকে পাঁচটি ক্ষুদ্র কশেরুকা হাড় একত্র হয়ে তৈরি। যদিও আকারে ছোট, তবে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বসার সময় শরীরের ওজনের ভারসাম্য রক্ষা করতে কক্সিস বড় ভূমিকা নেয়। পাশাপাশি এই হাড়ের সঙ্গে নিতম্ব ও শ্রোণির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পেশি ও লিগামেন্ট যুক্ত থাকে।

চিকিৎসক সুব্রত গড়াই জানাচ্ছেন,
“কক্সিস শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল হাড়গুলির একটি। এখানে আঘাত লাগলে শুধু হাড় নয়, আশপাশের স্নায়ু, পেশি ও লিগামেন্টেও প্রদাহ তৈরি হয়। ফলে ব্যথা হয় মারাত্মক এবং দীর্ঘস্থায়ী।”

কক্সিডাইনিয়া কী?

কক্সিডাইনিয়া হল এমন একটি অবস্থা যেখানে কক্সিস বা টেলবোনে আঘাত, প্রদাহ বা স্থানচ্যুতি হওয়ার ফলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা দেখা দেয়। এটি সাধারণত পড়ে গিয়ে নিতম্বে আঘাত লাগলে, সাইকেল চালাতে গিয়ে ধাক্কা খেলে, প্রসবের সময় চাপ পড়লে কিংবা দীর্ঘ সময় শক্ত জায়গায় বসে থাকলে হতে পারে।

বরুণ ধবনের ক্ষেত্রে শুটিংয়ের সময় শারীরিক স্টান্ট করতে গিয়ে নিতম্বে আঘাত লাগে, যার ফলেই তাঁর কক্সিসে চিড় ধরে এবং কক্সিডাইনিয়ার উপসর্গ দেখা দেয়।

কক্সিডাইনিয়া কতটা গুরুতর হতে পারে?

অনেকে মনে করেন টেলবোনে আঘাত খুব সামান্য বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এটি মারাত্মক যন্ত্রণার কারণ হতে পারে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি ব্যাহত করতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে—

✅ বসা, ওঠা, হাঁটা, এমনকি শুয়ে পড়াও কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে
✅ দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে মানসিক অবসাদ, ঘুমের সমস্যা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে
✅ কিছু ক্ষেত্রে লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া বা হাড় সরে যাওয়ার মতো জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়
✅ খুব বিরল ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলবোনে আঘাত থাকলে রোগী অনেক সময় চেয়ারে বসতে পারেন না, এমনকি নরম গদিতেও বসলে ব্যথা অনুভব করেন। ফলে অফিসের কাজ, গাড়িতে বসে যাতায়াত, এমনকি খাওয়ার সময় বসাও সমস্যার হয়ে ওঠে।

কক্সিডাইনিয়ার লক্ষণ কী কী?

টেলবোনে আঘাত লাগলে সাধারণত নিচের উপসর্গগুলি দেখা যায়—

? শক্ত জায়গায় বসলে বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে তীব্র ব্যথা
? বসা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় হঠাৎ যন্ত্রণা
? হাঁটার সময় কোমরের নীচে অস্বস্তি
? সিঁড়ি ভাঙতে গেলে ব্যথা
? পাশ ফিরে শুলে বা সোজা হয়ে শুলে অস্বস্তি
? প্রস্রাব বা মলত্যাগের সময় ব্যথা
? অনেক ক্ষেত্রে কোমর থেকে পায়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা বা ঝিনঝিন ভাব

বরুণ ধবনের ক্ষেত্রেও এই লক্ষণগুলির বেশিরভাগই দেখা গিয়েছিল বলে জানা গেছে।

কেন টেলবোনে আঘাত সারতে দেরি হয়?

অন্যান্য হাড় ভেঙে গেলে প্লাস্টার বা ব্যান্ডেজ দিয়ে সেটিকে স্থির রাখা যায়। কিন্তু কক্সিসের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়, কারণ—

? বসা ও হাঁটার সময় এই হাড়ের উপর নিয়মিত চাপ পড়ে
? শরীরের এই অংশে রক্ত সঞ্চালন তুলনামূলক কম
? আশপাশে প্রচুর স্নায়ু থাকায় সামান্য প্রদাহও তীব্র যন্ত্রণার কারণ হয়
? বসার সময় পুনরায় চাপ পড়ায় ক্ষত শুকোতে দেরি হয়

এই কারণেই কক্সিডাইনিয়া সেরে উঠতে ৬ সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস, কখনও কখনও আরও বেশি সময়ও লাগতে পারে।

কী কারণে টেলবোনে আঘাত লাগে?

কক্সিসে আঘাত লাগার কয়েকটি সাধারণ কারণ হল—

✔️ পিছলে পড়ে গিয়ে নিতম্বে সরাসরি আঘাত
✔️ সাইকেল বা মোটরবাইক চালানোর সময় দুর্ঘটনা
✔️ খেলাধুলা বা শুটিংয়ের সময় স্টান্ট করতে গিয়ে পড়ে যাওয়া
✔️ গর্ভাবস্থায় বা সন্তান প্রসবের সময় অতিরিক্ত চাপ
✔️ দীর্ঘ সময় শক্ত চেয়ারে বসে থাকা
✔️ অতিরিক্ত ওজনের কারণে কক্সিসে বাড়তি চাপ

বরুণ ধবনের ক্ষেত্রে শুটিংয়ের সময় শারীরিক দৃশ্যের শট দিতে গিয়ে এই আঘাত লাগে বলে জানা গেছে।

কক্সিডাইনিয়ার চিকিৎসা কীভাবে হয়?

চিকিৎসা মূলত রোগীর ব্যথার তীব্রতা, আঘাতের মাত্রা এবং হাড়ের অবস্থানের উপর নির্ভর করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব।

১. বিশ্রাম ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন

রোগীকে যতটা সম্ভব শক্ত জায়গায় বসা এড়িয়ে চলতে বলা হয়। বিশেষ ধরনের ডোনাট কুশন বা মাঝখানে ফাঁকা থাকা নরম বালিশ ব্যবহার করতে বলা হয় যাতে টেলবোনের উপর সরাসরি চাপ না পড়ে।

news image
আরও খবর

২. ব্যথানাশক ও প্রদাহনাশক ওষুধ

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথা কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়।

৩. ফিজিওথেরাপি

বিশেষ ধরনের ব্যায়াম ও থেরাপির মাধ্যমে পেশির জড়তা কমানো হয় এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো হয়।

৪. গরম বা ঠান্ডা সেঁক

ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে গরম বা ঠান্ডা সেঁক কার্যকর হতে পারে।

৫. ইনজেকশন থেরাপি

কিছু ক্ষেত্রে কক্সিসের আশপাশে স্টেরয়েড বা লোকাল অ্যানাস্থেটিক ইনজেকশন দেওয়া হয়।

৬. অস্ত্রোপচার (বিরল ক্ষেত্রে)

যদি দীর্ঘদিন চিকিৎসা করেও ব্যথা না কমে বা হাড় স্থানচ্যুত থাকে, তবে অস্ত্রোপচার করে কক্সিসের অংশবিশেষ অপসারণ করা হতে পারে। তবে এটি খুব বিরল।

কক্সিডাইনিয়া হলে দৈনন্দিন জীবনে কী কী সাবধানতা প্রয়োজন?

চিকিৎসকেরা রোগীদের যেসব পরামর্শ দেন—

✔️ শক্ত চেয়ারে না বসে নরম কুশন ব্যবহার করুন
✔️ দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে না থেকে মাঝে মাঝে উঠে হাঁটুন
✔️ হঠাৎ ঝুঁকে পড়া বা ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন
✔️ গাড়িতে বসার সময় সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখুন
✔️ নিয়মিত ফিজিওথেরাপি করুন
✔️ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যায়াম শুরু করবেন না

কতদিনে সুস্থ হওয়া সম্ভব?

অধিকাংশ রোগী ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করেন। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে বা হাড় স্থানচ্যুত হলে সময় আরও বাড়তে পারে।

চিকিৎসক সুব্রত গড়াই বলেন,
“কক্সিডাইনিয়া রোগীদের ধৈর্য রাখতে হয়। নিয়মিত চিকিৎসা ও সতর্কতা মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই সুস্থ হওয়া সম্ভব।”

মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব

দীর্ঘদিনের ব্যথা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে। বসতে না পারা, ঘুমের সমস্যা, কর্মক্ষমতা হ্রাস—এসব কারণে অনেক রোগীর মধ্যে—

? বিরক্তি
? উদ্বেগ
? হতাশা
? সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা

দেখা যায়। তাই চিকিৎসকেরা কেবল শারীরিক চিকিৎসাই নয়, মানসিক সমর্থনের দিকেও গুরুত্ব দিতে বলেন।

বলিউডে বরুণ ধবনের আঘাত এবং তার প্রভাব

বরুণ ধবন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ও সক্রিয় অভিনেতা। অ্যাকশন দৃশ্য ও নাচে পারদর্শী এই অভিনেতার হঠাৎ এমন আঘাত তাঁর ভক্তদেরও উদ্বিগ্ন করেছে। যদিও তিনি নিজেই জানিয়েছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

এই ঘটনার মাধ্যমে অনেকেই প্রথমবার জানতে পারলেন কক্সিডাইনিয়া নামে এই জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক সমস্যার কথা। চিকিৎসকদের মতে, তারকাদের চোট সংক্রান্ত খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে।

কক্সিডাইনিয়া প্রতিরোধের উপায়

যদিও সব সময় এই সমস্যা এড়ানো সম্ভব নয়, তবে কিছু সাবধানতা মানলে ঝুঁকি কমানো যায়—

✔️ শক্ত জায়গায় দীর্ঘক্ষণ বসা এড়িয়ে চলুন
✔️ সাইকেল চালানোর সময় সঠিক সিট ব্যবহার করুন
✔️ পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে সতর্ক থাকুন
✔️ নিয়মিত ব্যায়াম করে কোমর ও নিতম্বের পেশি শক্ত রাখুন
✔️ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

চিকিৎসকের পরামর্শ কখন জরুরি?

নিচের উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—

❗ বসতে বা উঠতে গেলে তীব্র ব্যথা
❗ কয়েক সপ্তাহেও ব্যথা না কমা
❗ হাঁটাচলায় সমস্যা
❗ প্রস্রাব বা মলত্যাগে যন্ত্রণা
❗ পায়ে ঝিনঝিন ভাব বা অবশতা

এ ক্ষেত্রে দেরি না করে এক্স-রে, এমআরআই বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।

Preview image