নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জের পাবাখালিতে মাথাভাঙ্গা চূর্ণী ও ইছামতির মিলনস্থলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সুগার মিলের দূষিত জলের কারণে বিপর্যস্ত মৎস্যজীবী ও নদীপাড়ের মানুষ ডবল ইঞ্জিন সরকার আসার পর এবার সমস্যার সমাধানের আশায় বুক বাঁধছেন এলাকাবাসী।
নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জের পাবাখালি বহুদিন ধরেই ইতিহাস ও ভৌগোলিক গুরুত্বের জন্য পরিচিত। এখানেই মিলিত হয়েছে মাথাভাঙ্গা, চূর্ণী ও ইছামতি নদী। বাংলাদেশের দিক থেকে প্রবেশ করা মাথাভাঙ্গা নদী পাবাখালিতে এসে চূর্ণী ও ইছামতির সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। চূর্ণী নদী কৃষ্ণগঞ্জ, হাঁসখালি, রানাঘাট হয়ে পায়রাডাঙ্গার দিকে গিয়ে গঙ্গায় মিশেছে। অন্যদিকে পাবাখালি থেকেই উৎপত্তি হয়ে বনগাঁ ও বসিরহাটের দিকে প্রবাহিত হয়েছে ইছামতি নদী।
কিন্তু এই ঐতিহাসিক নদী মিলনস্থল আজ দীর্ঘদিন ধরে চরম দূষণের শিকার। অভিযোগ, বাংলাদেশের দর্শনায় অবস্থিত কেরো অ্যান্ড কোম্পানির সুগার মিল থেকে প্রতি বছর খরার মরশুমে— বিশেষ করে ফাল্গুন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে— দূষিত বর্জ্য জল ছাড়া হয় মাথাভাঙ্গা নদীতে। সেই দূষিত জল চূর্ণী ও ইছামতিতেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নদীর জল কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে ওঠে। মারা যায় মাছ, পোকামাকড় ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী। নদীর জল পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ে পশুপাখিও।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই দূষিত জলে স্নান করলে চর্মরোগ দেখা দেয়। এমনকি নদীর জল রিভার পাম্পের মাধ্যমে কৃষিজমিতে ব্যবহার করলেও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীর ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করা হাজার হাজার মৎস্যজীবী কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আগে যেখানে নদী থেকে প্রচুর দেশি মাছ মিলত, এখন সেখানে মাছের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এই সমস্যার বিরুদ্ধে বহু বছর ধরেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে নদিয়া জেলা ১৮ই আগস্ট পরিচালন সমিতি এবং মাথাভাঙ্গা ও চূর্ণী নদী বাঁচাও কমিটি। সংগঠনের সদস্যরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। এমনকি দূষিত নদীর জল জারে ভরে প্রধানমন্ত্রী দফতরেও পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি সংগঠনের সদস্যদের।
মাথাভাঙ্গা ও চূর্ণী নদী বাঁচাও কমিটির সম্পাদক স্বপন ভৌমিক জানান, তারা ট্রাইব্যুনাল কোর্টেও মামলা করেছিলেন। আদালতের নির্দেশ ছিল ভারত সরকার যেন বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানোর ব্যবস্থা করে এবং দূষিত জল ছাড়া বন্ধ করায় উদ্যোগী হয়। যদিও দীর্ঘদিন কেটে গেলেও বাস্তবে সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্বপনবাবুর দাবি, সাংসদ জগন্নাথ সরকারকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার এলেই দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। বর্তমানে রাজ্যে বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন নদীপাড়ের মানুষ।
কৃষ্ণগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি অমিত দাস বলেন, আগে কেন্দ্র ও রাজ্যে আলাদা দল ক্ষমতায় থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি। এখন একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।
স্থানীয় মৎস্যজীবী ভানু হালদার বলেন, নদীতে মাছ মরে যাওয়ার ফলে বহু মানুষ কাজ হারিয়ে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। যদি দূষিত জল বন্ধ করা যায়, তাহলে হাজার হাজার মৎস্যজীবী আবার নদীর ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জের পাবাখালি এলাকা বহু বছর ধরেই মাথাভাঙ্গা, চূর্ণী ও ইছামতি নদীর দূষণ সমস্যায় জর্জরিত। একসময় এই নদীগুলিই ছিল সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা। নদীর মাছ বিক্রি করে সংসার চলত হাজার হাজার মৎস্যজীবীর। নদীর জল ব্যবহার হতো কৃষিকাজে, গৃহস্থালির কাজে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নদীতে দূষিত জল প্রবেশ করায় সেই চিত্র আজ প্রায় বদলে গিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশের দর্শনায় অবস্থিত কেরো অ্যান্ড কোম্পানির সুগার মিল থেকে প্রতি বছর খরার মরশুমে বিপুল পরিমাণ দূষিত বর্জ্য জল মাথাভাঙ্গা নদীতে ছাড়া হয়। সেই জল পরে চূর্ণী ও ইছামতি নদীতেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নদীর জল দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে ওঠে এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। বহু সময় দেখা গিয়েছে নদীতে ভেসে উঠছে মৃত মাছ। শুধু মাছ নয়, বিভিন্ন জলজ প্রাণীও মারা যাচ্ছে এই দূষণের কারণে। নদীর জল পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে পশুপাখিও।
এই দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষিক্ষেত্রেও। বহু কৃষকের দাবি, নদীর জল রিভার পাম্পের মাধ্যমে জমিতে দেওয়ার পর ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে নদীর জলে স্নান করলে চর্মরোগ ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। ফলে নদীপাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই সমস্যা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে আসছেন। নদিয়া জেলা ১৮ই আগস্ট পরিচালন সমিতি এবং মাথাভাঙ্গা-চূর্ণী নদী বাঁচাও কমিটির পক্ষ থেকে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এমনকি দূষিত নদীর জল জারে ভরে প্রধানমন্ত্রী দফতরেও পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি সংগঠনের সদস্যদের। আদালতের দ্বারস্থও হয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। ট্রাইব্যুনাল কোর্টের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি কমিটির সদস্যদের। কিন্তু বাস্তবে এখনও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন নদীপাড়ের মানুষ। স্থানীয় বিজেপি নেতা রূপ কুমার ঘোষের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য সরকার সমস্যাটিকে গুরুত্ব দেয়নি বলেই নদীর এই অবস্থা হয়েছে। তাঁর দাবি, বারবার আন্দোলন, স্মারকলিপি ও অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকরী কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে এখন রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার ক্ষমতায় আসায় তিনি আশাবাদী যে দ্রুত সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। তাঁর মতে, কেন্দ্র ও রাজ্য একই রাজনৈতিক দলের হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয় অনেক সহজ হবে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
রূপ কুমার ঘোষ আরও বলেন, নদী শুধু জলধারা নয়, নদী মানে এই এলাকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। একসময় যে নদী হাজার হাজার পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিত, আজ সেই নদীই অভিশাপে পরিণত হয়েছে। তাই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা বলে দূষিত জল ছাড়া বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অন্যদিকে কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার বিধায়ক সুকান্ত বিশ্বাসও বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, এই সমস্যা সম্পর্কে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে মৌখিকভাবে অবগত করেছেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে তিনি দাবি করেন। সুকান্ত বিশ্বাসের মতে, নদী দূষণের এই সমস্যা শুধু পরিবেশগত নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে। তাই দ্রুত সমাধানের জন্য সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
স্থানীয় মৎস্যজীবীদের কথায় ফুটে উঠছে দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা। একসময় নদীতে মাছ ধরেই যাদের সংসার চলত, আজ তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে যাচ্ছেন। নদীতে মাছ না থাকায় জীবিকা হারিয়েছেন বহু মানুষ। নদীপাড়ের বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, নদী বাঁচলে তবেই বাঁচবে এলাকার অর্থনীতি। তাই তারা এখন নতুন সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
পাবাখালির তিন নদীর মিলনস্থল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দূষণের কারণে সেই নদীগুলির অস্তিত্বই আজ সংকটের মুখে। পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। নদীর জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই— বহু প্রতিশ্রুতি, আন্দোলন এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর সত্যিই কি ডবল ইঞ্জিন সরকার মাথাভাঙ্গা, চূর্ণী ও ইছামতির দূষণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারবে? সীমান্তবর্তী এলাকার হাজার হাজার মানুষ এখন সেই উত্তরের অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন। নদীকে ঘিরে তাদের নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা— আবার কি আগের মতো প্রাণ ফিরে পাবে মাথাভাঙ্গা, চূর্ণী ও ইছামতি?