Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেট্রোয় বসে লেখা ‘হইহই করব বলে’ গানেই পুজোমাতো বাংলা, তবু কেন বিপাকে শিল্পী রোহিত?

এ বছরের পুজোয় নস্ট্যালজিয়াকে ছাপিয়ে বাঙালির মুখে মুখে ফিরেছে ‘হইহই করব বলে’ গানটি। মেট্রোয় বসে লেখা এই জনপ্রিয় গানের জন্মবৃত্তান্ত ঘিরে শ্রোতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রবল কৌতূহল।

হইহই করব বলে’ গানে মাতল বাংলা! পুজো শেষেও কেন সবার মুখে এই গান?

দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ত্রয়োদশী। প্যান্ডেলের আলো ধীরে ধীরে নিভছে, প্রতিমা বিসর্জনের পর শহর ও পাড়ার রাস্তায় ফিরছে স্বাভাবিক ছন্দ। অফিস খুলেছে, স্কুল-কলেজেও শুরু হয়েছে নিয়মিত ব্যস্ততা। কিন্তু বাঙালির মন থেকে এখনও যেন বিদায় নিতে পারেনি পুজোর আনন্দ। তারই অন্যতম প্রমাণ, এ বছরের জনপ্রিয় পুজোর গান—‘হইহই করব বলে, কোমর দুলে, দু’হাত তুলে...’। পুজো শেষ হলেও এই গানের সুর এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের মনে। কেউ কাজের ফাঁকে গুনগুন করছেন, কেউ আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় গানটির সঙ্গে রিল তৈরি করে ভাগ করে নিচ্ছেন নিজেদের আনন্দের মুহূর্ত।

এ বছরের দুর্গাপুজোয় পাড়ার প্যান্ডেল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই গানটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। গানটির ছন্দ, নাচের উপযোগী সুর এবং উৎসবের সঙ্গে মানানসই কথার কারণে বহু মানুষের কাছে এটি পুজোর আনন্দ প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। শুধু কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহরেই নয়, প্রবাসে থাকা বাঙালিদের পুজো উদ্‌যাপনেও এই গানের উপস্থিতি চোখে পড়েছে। ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া নানা রিল সেই জনপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পুজো শেষ, তবু গানের রেশ কাটছে না

বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি আবেগ, স্মৃতি, বন্ধুত্ব, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর আনন্দে মেতে ওঠার এক বিশেষ উপলক্ষ। পুজোর কয়েকটি দিন ঘিরে তৈরি হয় অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতি। নতুন পোশাক, প্যান্ডেল হপিং, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রাত জেগে ঠাকুর দেখা এবং পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ।

এই পরিবেশে গানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও কোনও গান পুজোর নির্দিষ্ট মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কোনও গান শোনামাত্র মনে পড়ে যায় প্যান্ডেলের ভিড়, আলোর ঝলকানি কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো রাতের কথা। আবার কিছু গান এমনভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নেয় যে উৎসব শেষ হওয়ার পরেও সেগুলির আবেদন কমে না।

‘হইহই করব বলে’ গানটির ক্ষেত্রেও সেই রকম একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পুজোর দিনগুলিতে গানটি শুনে যাঁরা আনন্দ করেছেন, তাঁদের অনেকেই উৎসব শেষ হওয়ার পরেও সেই সুরের সঙ্গে নিজেদের সংযোগ ধরে রেখেছেন। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও গানটি মনে পড়ে যাওয়া কিংবা অজান্তেই গুনগুন করে ওঠা আসলে পুজোর রেশ থেকে যাওয়ারই একটি পরিচিত উদাহরণ।

প্যান্ডেল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্র গানের ছন্দ

বর্তমান সময়ে কোনও গান জনপ্রিয় হয়ে উঠলে তার প্রচার আর শুধুমাত্র রেডিয়ো, টেলিভিশন বা মঞ্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে একটি গান খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম রিলস, ফেসবুকের ভিডিও এবং ইউটিউব শর্টসের মতো স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্ল্যাটফর্ম গানের জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

‘হইহই করব বলে’ গানটিকে ঘিরেও সেই ডিজিটাল প্রবণতা নজরে এসেছে। পুজোর প্যান্ডেলে বন্ধুদের সঙ্গে নাচ, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তৈরি ভিডিও কিংবা পুজোর সাজে ছোট ছোট মুহূর্তের ছবি—বিভিন্ন ধরনের কনটেন্টে এমন গানের ব্যবহার সহজেই দর্শকদের আকর্ষণ করতে পারে।

একটি গান যখন মানুষের দৈনন্দিন কনটেন্টের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার পরিচিতি আরও বাড়ে। কেউ হয়তো প্রথমে প্যান্ডেলে গানটি শুনেছেন। পরে বন্ধুর শেয়ার করা রিল দেখে আবার গানটি শুনেছেন। এরপর নিজেও একই গানের সঙ্গে ভিডিও বানিয়েছেন। এভাবেই একটি গান শ্রোতা থেকে দর্শক এবং দর্শক থেকে কনটেন্ট নির্মাতার কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, বর্তমান যুগে গানের জনপ্রিয়তা শুধু তার সুর বা কথার উপর নির্ভর করে না। গানটি কতটা সহজে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কেন সহজ ছন্দের গান দ্রুত জনপ্রিয় হয়?

পুজোর গান নিয়ে বাঙালির আবেগ দীর্ঘদিনের। একসময় পুজোর আগে নতুন অ্যালবাম প্রকাশের জন্য শ্রোতারা অপেক্ষা করতেন। ক্যাসেট, সিডি, রেডিয়ো এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে নতুন গান পরিচিতি পেত। এখন সেই জায়গার অনেকটাই নিয়েছে অনলাইন মিউজিক প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়া। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু পুজোর নতুন গান নিয়ে কৌতূহল এখনও রয়ে গিয়েছে।

সহজে মনে থাকার মতো সুর এবং ছন্দ কোনও গানকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যে গান শুনে সহজে তাল মেলানো যায়, তার সঙ্গে নাচের ভিডিও তৈরি করাও সুবিধাজনক। ‘হইহই করব বলে, কোমর দুলে, দু’হাত তুলে’—এই কথার মধ্যেই নাচ এবং আনন্দের একটি স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে। কথাগুলির সঙ্গে শরীরী ভঙ্গির সম্পর্ক থাকায় শ্রোতার কাছে গানের ভাবটি সহজে পৌঁছতে পারে।

এ ধরনের গান সাধারণত দলগত আনন্দের পরিবেশেও মানিয়ে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে পুজো কাটানো হোক কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উৎসব উদ্‌যাপন—একটি পরিচিত ছন্দের সঙ্গে সবাই সহজেই যুক্ত হতে পারেন। গানের জনপ্রিয়তা বাড়ার ক্ষেত্রে এই অংশগ্রহণের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্য কোনও গানের জনপ্রিয়তার পিছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। সুর, কথা, গায়কির ধরন, প্রচার, ভিডিওর উপস্থাপনা এবং শ্রোতাদের ব্যক্তিগত পছন্দ—সবকিছু মিলেই একটি গানকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাই শুধুমাত্র একটি কারণ দিয়ে কোনও গানের সাফল্য ব্যাখ্যা করা যায় না।

পুজোর গান নিয়ে বাঙালির আবেগ আলাদা

বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে গানের গুরুত্ব বরাবরই বিশেষ। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, আধুনিক বাংলা গান, ব্যান্ডের গান, লোকসংগীত কিংবা চলচ্চিত্রের গান—বিভিন্ন ধারার সঙ্গেই বাঙালির আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। দুর্গাপুজোর সময় সেই আবেগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পুজোর গান অনেকের কাছে শুধুই বিনোদন নয়; এটি উৎসবের স্মৃতি ধরে রাখার একটি মাধ্যম। ছোটবেলায় শোনা কোনও পুজোর গান বহু বছর পরেও মনে পড়ে যেতে পারে। কোনও সুর শুনলে মনে পড়ে যায় পুরনো পাড়ার প্যান্ডেল, স্কুলের বন্ধু কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো বিশেষ মুহূর্ত। নতুন প্রজন্মের কাছেও নতুন গান একইভাবে স্মৃতি তৈরির সুযোগ করে দেয়।

প্রতি বছর পুজোর সময় নতুন গান প্রকাশিত হয়। কিছু গান দ্রুত জনপ্রিয় হয়, কিছু গান নির্দিষ্ট শ্রোতাদের মধ্যে পরিচিতি পায়, আবার কিছু গান দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনে থেকে যায়। কোনও গানকে ঘিরে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যত বাড়ে, সেটি উৎসবের স্মৃতির সঙ্গে তত বেশি জড়িয়ে যেতে পারে।

‘হইহই করব বলে’ গানটি নিয়ে বর্তমান আগ্রহও সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রবণতার মধ্যে পড়ে। পুজোর কয়েকটি দিনে গানটি যাঁদের আনন্দের সঙ্গী হয়েছে, তাঁদের কাছে উৎসব শেষ হলেও তার সুর মনে থেকে যাওয়া স্বাভাবিক।

প্রবাসের বাঙালিদের পুজোতেও গানের উপস্থিতি

বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এখন শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের বিভিন্ন শহরে সীমাবদ্ধ নন। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা এবং নানা ব্যক্তিগত কারণে বহু বাঙালি দেশের বাইরে বসবাস করেন। তাঁদের কাছেও দুর্গাপুজো একটি বিশেষ আবেগের সময়। বিদেশের বিভিন্ন শহরে আয়োজিত দুর্গাপুজোয় একত্রিত হন বাঙালিরা। পুজোর আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাওয়াদাওয়া এবং পরিচিত বাংলা গানের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখেন।

এই ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমের গুরুত্বও অনেক। দূরে থেকেও সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে পরিবারের সদস্য, বন্ধু এবং পরিচিতদের পুজোর মুহূর্ত দেখা যায়। একটি জনপ্রিয় বাংলা গান বিভিন্ন দেশের বাঙালিদের একই সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

‘হইহই করব বলে’ গানটির সঙ্গে প্রবাসী বাঙালিদের নাচের ভিডিও এবং রিলের উল্লেখ এই দিকটিকেই সামনে আনে। একটি গান যখন ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে মানুষের উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার আবেদন শুধু একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তবে এই ধরনের ভিডিওর সংখ্যা বা দর্শকসংখ্যা যাচাই না করে গানটির বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দাবি করা ঠিক হবে না।

ইনস্টাগ্রাম রিল কীভাবে বাড়ায় গানের জনপ্রিয়তা?

ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মে ছোট ভিডিওর মাধ্যমে খুব সহজেই একটি গানের নির্দিষ্ট অংশ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেক সময় পুরো গান শোনার আগেই শ্রোতারা তার জনপ্রিয় অংশটির সঙ্গে পরিচিত হন। সেই অংশটি যদি আকর্ষণীয় হয়, তবে তাঁরা পুরো গানটি শুনতে আগ্রহী হতে পারেন।

পুজোর সময় এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। কারণ, উৎসবের পোশাক, আলো, সাজসজ্জা, বন্ধুদের সঙ্গে নাচ এবং প্যান্ডেলের দৃশ্য—সবকিছুই ভিডিও তৈরির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। এর সঙ্গে মানানসই একটি ছন্দময় গান যুক্ত হলে ভিডিওটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

একই গানের সঙ্গে বিভিন্ন মানুষ যখন নিজেদের মতো করে ভিডিও তৈরি করেন, তখন গানটি নানা রকম উপস্থাপনার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কারও ভিডিওতে থাকে বন্ধুদের দল, কারও ভিডিওতে পরিবারের সদস্যরা, আবার কেউ হয়তো পুজোর স্মৃতির সংকলন তৈরি করেন। এই বৈচিত্র্য একটি গানের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

তবে রিলের সংখ্যা বা ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি সবসময় গানের সামগ্রিক জনপ্রিয়তার নির্ভুল পরিমাপ নয়। তবুও সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কোনও গানের প্রতি আগ্রহ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

news image
আরও খবর

উৎসবের গান আর নাচ—একই সুতোয় বাঁধা আনন্দ

দুর্গাপুজোর সঙ্গে নাচের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, দলগত পরিবেশনা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ নেচে ওঠা—বিভিন্নভাবে পুজোর আনন্দ প্রকাশ পায়। সেই কারণে নাচের উপযোগী গান সহজেই উৎসবের আবহের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

‘হইহই করব বলে’ গানের কথায় হাত তোলা ও কোমর দোলানোর উল্লেখ থাকায় গানটির সঙ্গে নাচের একটি সরাসরি যোগ তৈরি হয়। এই ধরনের কথার সঙ্গে শ্রোতারা সহজে শরীরী ভঙ্গি মিলিয়ে নিতে পারেন। ফলে গানটি শুধু শোনার জন্য নয়, বরং অংশগ্রহণের জন্যও উপযোগী হয়ে উঠতে পারে।

পুজোর সময় মানুষের ব্যস্ততা থাকলেও আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করার ইচ্ছা কমে না। বন্ধুদের সঙ্গে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছোট্ট নাচের দৃশ্য সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম হতে পারে। গানটি যদি পরিচিত হয়, তাহলে ভিডিওর দর্শকদের কাছেও মুহূর্তটির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা সহজ হয়।

এখানেই একটি জনপ্রিয় পুজোর গানের বিশেষত্ব। সেটি মঞ্চের পরিবেশনা থেকে বেরিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত উদ্‌যাপনের অংশ হয়ে ওঠে।

পুজো শেষ হলেও স্মৃতি থেকে যায়

দুর্গাপুজোর দিনগুলি দ্রুত কেটে যায়। ষষ্ঠী থেকে দশমী—কয়েক দিনের আনন্দের পর আবার শুরু হয় দৈনন্দিন জীবন। প্যান্ডেলের আলো নিভে যায়, নতুন পোশাক তুলে রাখা হয় আলমারিতে, আর অফিস ও পড়াশোনার ব্যস্ততা ফিরে আসে। কিন্তু পুজোর স্মৃতি একদিনে মুছে যায় না।

কোনও ছবি, কোনও গন্ধ, কোনও পরিচিত রাস্তা কিংবা একটি গান সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। পুজোর গান এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, কারণ সুর ও কথার সঙ্গে মানুষের আবেগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে গান প্যান্ডেলে শুনে কেউ বন্ধুদের সঙ্গে নেচেছেন, সেই গান পরে ফোনে বাজলেও তাঁর মনে পড়ে যেতে পারে সেই মুহূর্ত।

এই কারণেই পুজো শেষ হওয়ার পরেও কিছু গান মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। কেউ গানটি শুনে পুরনো ভিডিও দেখেন, কেউ আবার নতুন রিল তৈরি করেন। অন্যদিকে, কেউ কোনও বিশেষ কারণ ছাড়াই কাজের ফাঁকে গানটি গুনগুন করে ওঠেন।

‘হইহই করব বলে’ গানটির ক্ষেত্রেও পুজোর পর এমন আগ্রহের কথা উঠে আসছে। এটি শুধু একটি গানের সুর মনে থাকার ঘটনা নয়; বরং সদ্য কাটানো উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আনন্দেরও প্রতিফলন।

বাংলা গানের জগতে নতুন মাধ্যমের প্রভাব

বাংলা গানের জগৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। একসময় নতুন গান শোনার জন্য শ্রোতাদের নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা অ্যালবামের অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নতুন গান দ্রুত প্রকাশিত হয় এবং শ্রোতারা নিজেদের পছন্দমতো গান শুনতে পারেন। একই সঙ্গে শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় গান ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করার প্রবণতা শিল্পীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। কোনও গানের একটি অংশ জনপ্রিয় হলে আরও বেশি মানুষ মূল গানটি খুঁজে শুনতে পারেন। গান নিয়ে আলোচনা, নাচের ভিডিও এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে শ্রোতারাই প্রচারের একটি অংশ হয়ে ওঠেন।

তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অল্প সময়ের ভিডিওতে গানের একটি অংশ জনপ্রিয় হলেও পুরো গানটি কতটা শোনা হচ্ছে, তা আলাদা বিষয়। একইভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা পাওয়া মানেই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত নয়। কোনও গান মানুষের মনে কতদিন জায়গা করে থাকবে, তা সময়ই নির্ধারণ করে।

তবুও পুজোর মতো বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এই মাধ্যমের সাহায্যে একটি গান খুব দ্রুত পরিচিতি পেতে পারে এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে।

শিল্পীর কাছে শ্রোতাদের ভালোবাসার গুরুত্ব

একটি গান তৈরি হওয়ার পর তার প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় শ্রোতাদের কাছে পৌঁছনোর মাধ্যমে। শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের পরিশ্রমের পর গানটি মানুষের জীবনে কীভাবে জায়গা করে নেবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে শ্রোতাদের গ্রহণযোগ্যতার উপর।

কোনও গান যখন মানুষ নিজের আনন্দের মুহূর্তে ব্যবহার করেন, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেন কিংবা বারবার শুনতে চান, তখন সেটি শিল্পীর কাজের প্রতি তাঁদের আগ্রহের পরিচয় দেয়। পুজোর গানগুলির ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অল্প সময়ের মধ্যে গানকে উৎসবের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।

‘হইহই করব বলে’ গানটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ তাই বাংলা পুজোর গানের বর্তমান প্রবণতা বোঝার একটি উদাহরণ। তবে গানটির শিল্পী, প্রকাশের ইতিহাস, আনুষ্ঠানিক স্ট্রিমিং পরিসংখ্যান বা বাণিজ্যিক সাফল্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনও নির্দিষ্ট দাবি করা উচিত নয়।

সামনে কী? আগামী পুজোতেও কি থাকবে এই গানের রেশ?

পুজোর গান নিয়ে মানুষের আগ্রহ প্রতি বছরই নতুন করে তৈরি হয়। কোনও বছর একটি গান বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়, পরের বছর আবার নতুন কোনও গান সেই জায়গা করে নেয়। কিছু গান সাময়িকভাবে আলোচনায় থাকে, আবার কিছু গান দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পছন্দের তালিকায় থেকে যায়।

‘হইহই করব বলে’ গানটি আগামী বছরগুলিতেও একইভাবে জনপ্রিয় থাকবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে এ বছরের পুজোর স্মৃতির সঙ্গে গানটি যাঁদের মনে জড়িয়ে গিয়েছে, তাঁদের কাছে এটি বিশেষ হয়ে থাকতে পারে। পুরনো পুজোর ভিডিওতে গানটি আবার শোনা গেলে সেই স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসতে পারে।

গানের জনপ্রিয়তা টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুরের আবেদন, শ্রোতাদের ব্যক্তিগত পছন্দ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার এবং পরবর্তী সময়ে গানটি কতটা শোনা হচ্ছে—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে গানটির প্রতি মানুষের আগ্রহ কীভাবে বদলায়, সেটিই দেখার বিষয়।

শেষ কথা

দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাঙালির উৎসবের আনন্দ একদিনে শেষ হয় না। প্যান্ডেলের স্মৃতি, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, নতুন পোশাকের ছবি এবং প্রিয় গান—সবকিছু মিলিয়েই পুজোর রেশ থেকে যায় আরও কিছুদিন।

‘হইহই করব বলে, কোমর দুলে, দু’হাত তুলে’ গানটি এ বছরের পুজোয় বহু মানুষের নজর কেড়েছে বলে যে আলোচনা উঠে এসেছে, তা বাংলা গানের সঙ্গে উৎসবের সম্পর্ককে আরও একবার সামনে আনে। পাড়ার প্যান্ডেল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার রিল, পরিচিত মহলের গুনগুনানি থেকে প্রবাসের বাঙালিদের উদ্‌যাপন—গানটি ঘিরে আগ্রহের নানা ছবি দেখা যাচ্ছে।

বাঙালির কাছে পুজোর গান মানে শুধু কয়েক মিনিটের সুর নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, স্মৃতি এবং একসঙ্গে আনন্দ করার অভিজ্ঞতা। তাই পুজো শেষ হলেও কোনও পরিচিত সুর কানে বাজলে মন আবার ফিরে যেতে পারে সেই আলোকোজ্জ্বল দিনগুলিতে। আপাতত ‘হইহই করব বলে’ গানটির ক্ষেত্রেও সেই উৎসবের রেশই যেন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে।

 

 

Preview image