Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নেশনস লিগে ভারত-পাক ছায়া! ইজ়রায়েলিদের সঙ্গে করমর্দন প্রত্যাখ্যান আয়ারল্যান্ডের

উয়েফা নেশনস লিগে ভারত-পাক দ্বৈরথের ছায়া। ইজ়রায়েলের ফুটবলারদের সঙ্গে করমর্দন প্রত্যাখ্যান করলেন আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা।

ক্রীড়াক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আঁচ নতুন কিছু নয়। মাঠের লড়াই অনেক সময়ই মাঠের বাইরে বিদ্যমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামাজিক অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রতীকী রূপ ধারণ করে। ক্রিকেট বিশ্বে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতা যেমন বারবার দ্বিপাক্ষিক সিরিজ স্থগিত করেছে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে তৈরি করেছে থমথমে পরিবেশ, এবার ঠিক তেমনই এক নাটকীয় পরিস্থিতির সাক্ষী রইল ইউরোপীয় ফুটবলের আধুনিক মঞ্চ। উয়েফা নেশনস লিগের (UEFA Nations League) গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইজ়রায়েলের ফুটবলারদের সঙ্গে প্রথাগত করমর্দন (Handshake) এড়িয়ে গেলেন আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা। কোনো শারীরিক সহিংসতা বা উচ্চবাচ্য না ঘটিয়ে কেবল নীরব শরীরী ভাষার মাধ্যমে যে তীব্র কূটনৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তোলা সম্ভব, আইরিশ ফুটবলাররা বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে তা স্পষ্ট করে দিলেন।

কিক-অফের আগের শীতল পরিবেশ ও করমর্দন প্রত্যাখ্যান

আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম ও সৌজন্যবিধি অত্যন্ত স্পষ্ট। ম্যাচ শুরুর আগে ফিফা (FIFA) এবং উয়েফা (UEFA)-র ফেয়ার প্লে নীতির অংশ হিসেবে দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয় এবং উভয় দলের খেলোয়াড়রা সারিবদ্ধভাবে হেঁটে একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করেন। এটি দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং খেলাধুলার নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।

তবে এই ম্যাচের কিক-অফের মুহূর্তে পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। জাতীয় সঙ্গীত শেষ হওয়ার পর যখন দুই দল প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী হাত মেলানোর কথা, ঠিক তখনই আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা নিজেদের হাত গুটিয়ে নেন। ইজ়রায়েলের খেলোয়াড়রা একে একে হেঁটে এগিয়ে গেলেও আইরিশ শিবিরের একাধিক ফুটবলার স্পষ্টভাবেই হাত মেলানো থেকে বিরত থাকেন। কোনো উসকানিমূলক আচরণ বা গালিগালাজ নয়, সম্পূর্ণ নীরব ও দৃঢ় অবস্থান নিয়ে তারা এই কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখেন। রেফারি ও ম্যাচ অফিশিয়ালদের সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশন ধারাভাষ্যকারদের মধ্যেও দৃশ্যমান স্তব্ধতা তৈরি হয়। পেশাদার ফুটবলে এ ধরনের নীরব অথচ সুদৃঢ় রাজনৈতিক বয়কট সাম্প্রতিক সময়ে বিরল।

প্রতিবাদের ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

এই প্রতিবাদের শিকড় কেবল ফুটবলের মাঠের সাধারণ উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক পটভূমি ও মানবিক ক্ষোভ।

  • গাজ়া ভূখণ্ডের মানবিক সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে গাজ়া ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র সামরিক অভিযান এবং এর ফলে সাধারণ নারী ও শিশুদের প্রাণহানি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদ এবং মানবিক সহায়তার সংকট বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীদের ক্ষুব্ধ করেছে।

  • আয়ারল্যান্ডের ঐতিহাসিক সহানুভূতি: পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে আয়ারল্যান্ডের জনমত ঐতিহাসিকভাবেই যেকোনো আধিপত্যবাদ ও দখলের বিরুদ্ধে সোচ্চার। নিজেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস এবং যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক লড়াইয়ের স্মৃতি আইরিশ জনগণকে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি স্বভাবসুলভ সহানুভূতিশীল করে তুলেছে।

  • রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নীতিগত অবস্থান: স্পেন এবং নরওয়ের মতো দেশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আয়ারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটির সংসদ ও নীতি-নির্ধারকদের মধ্যেও ইজ়রায়েলের সামরিক নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা রয়েছে। ফলে আইরিশ খেলোয়াড়দের মাঠের এই পদক্ষেপটি কোনো বিচ্ছিন্ন আবেগ নয়, বরং পুরো আয়ারল্যান্ডের সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক মনোভাবেরই একটি সরাসরি বহিঃপ্রকাশ।

মাঠের বাইরে বিক্ষোভ, কঠোর নিরাপত্তা ও সমর্থকদের অবস্থান

ম্যাচটি যে কেবল ৯০ মিনিটের একটি ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, তা স্পষ্ট বোঝা গেছে মাঠের বাইরের পরিবেশ দেখেই। ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই স্টেডিয়াম সংলগ্ন রাস্তায় সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীদের ব্যাপক জমায়েত লক্ষ্য করা যায়।

  1. যুদ্ধবিরোধী স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড: হাজার হাজার সমর্থক ফিলিস্তিনের লাল-সবুজ-সাদা-কালো পতাকা, প্ল্যাকার্ড এবং যুদ্ধবিরোধী ব্যানার হাতে মিছিল করেন। ব্যানারে লেখা ছিল শান্তি, সুবিচার এবং গাজ়ায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি।

  2. নিরাপত্তার কড়া বলয়: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে কোনো অবনতি না ঘটে, সেজন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন পুরো এলাকাকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে ফেলেছিল। ড্রোন নজরদারি, ডগ স্কোয়াড এবং বিশেষ দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন ছিল স্টেডিয়ামের প্রতিটি প্রবেশদ্বারে। দর্শকদের ব্যাগ ও ব্যানার পরীক্ষা করা হয় অত্যন্ত কঠোরভাবে।

    news image
    আরও খবর
  3. আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার ওপর চাপ: ইউরোপের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং সমর্থক গোষ্ঠী প্রশ্ন তোলে, যেখানে অতীতে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়াকে উয়েফা ও ফিফার সমস্ত টুর্নামেন্ট থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল, সেখানে ইজ়রায়েলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দ্বিমুখী নীতি কেন বজায় থাকবে? এই বিতর্কের চাপ সরাসরি গিয়ে পড়েছিল ম্যাচ আয়োজকদের ওপর।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বয়কট ও প্রতিবাদের দীর্ঘ ঐতিহ্য

ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনীতির প্রবেশকে অনেকে নেতিবাচক চোখে দেখলেও, ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায় খেলাধুলা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বারবার একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

  • বর্ণবাদ ও দক্ষিণ আফ্রিকা: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী ব্যবস্থার (Apartheid) বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল। প্রায় তিন দশক ধরে অলিম্পিক, টেস্ট ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে একঘরে করে রাখা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত দেশটিতে বর্ণবাদ অবসানের আন্দোলনে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করে।

  • ১৯৬৮ সালের মেক্সিকো অলিম্পিক: অ্যাথলেট টমি স্মিথ এবং জন কার্লোস পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে কালো গ্লাভস পরা মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তুলেছিলেন (Black Power Salute)। সেই ঘটনা ক্রীড়া ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে রয়েছে।

  • ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সমীকরণ: দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট কূটনীতি বা রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব সবচেয়ে পরিচিত। ২০০৮ সালের মুম্বই হামলার পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সিরিজ হয়নি। যখনই আইসিসি বা এশিয়া কাপের মতো মঞ্চে দুই দেশ মুখোমুখি হয়, তখনই দুই দেশের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা, করমর্দন এবং আচরণ কূটনীতির সূক্ষ্ম আতশকাচের নিচে বিচার করা হয়।

নেশনস লিগে আয়ারল্যান্ড ও ইজ়রায়েলের ম্যাচটি সেই পুরোনো ইতিহাসের আধুনিক রূপ হিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছে।

'খেলা ও রাজনীতি আলাদা রাখা উচিত'—এই যুক্তির বাস্তবতা

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তাদের সংবিধানে বারবার উল্লেখ করে থাকে যে ফুটবলকে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। উয়েফার নিয়মাবলীতেও মাঠে রাজনৈতিক স্লোগান বা ব্যানার প্রদর্শন নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে কি ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব?

আধুনিক সমাজের অধিকাংশ বিশ্লেষক ও খেলোয়াড়দের মতে, বৈশ্বিক মানবিক সংকট বা গণহত্যার মতো নির্মম বাস্তবতার সামনে কোনো সংবেদনশীল মানুষ সম্পূর্ণ নীরব থাকতে পারে না। ক্রীড়াবিদরা সমাজেরই অংশ; বিশ্বজুড়ে তাদের লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে। যখন কোনো একটি অঞ্চলে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেবল খেলে যাওয়া এবং করমর্দন করার মতো প্রতীকী সৌজন্য প্রদর্শনকে অনেকে সেই অন্যায়ের প্রতি সম্মতি হিসেবে গণ্য করেন। আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা করমর্দন না করে মূলত বার্তা দিয়েছেন—খেলার মাঠ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয় এবং বিশ্বশান্তির প্রশ্নে ফুটবলারদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে।

সমসাময়িক তাৎপর্য

নেশনস লিগের এই ঘটনাটি বিশ্ব ফুটবল মহলে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। খেলোয়াড়রা আর নিছক বিনোদনকারী পুতুল নন, তারা সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেদের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান প্রকাশ করতে পারেন। যদিও উয়েফা এই ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো দিকগুলো খতিয়ে দেখতে পারে, তবে এই নীরব করমর্দন বর্জনের ঘটনা ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। ভারত-পাক দ্বৈরথের রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো ইউরোপের ফুটবলেও এখন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত সরাসরি প্রবেশ করেছে, যা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং খেলাধুলা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকা আজ প্রায় অসম্ভব।

 আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কূটনীতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

এই ম্যাচের পরিবেশ ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মনে করিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের সেইসব ঐতিহাসিক মুহূর্তকে, যেখানে কূটনীতি এবং খেলাধুলা একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

Preview image