ভারতের রেল পরিবহনে এক ঐতিহাসিক দিন মুম্বাই এবং আহমেদাবাদের মধ্যে চালু হলো দেশের প্রথম আন্ডারওয়াটার বুলেট ট্রেন সমুদ্রের ২১ কিলোমিটার নিচে দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলা এই ট্রেন যাত্রাপথ কমিয়ে আনল মাত্র ১ ঘণ্টায় জাপানি প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি এই সুড়ঙ্গ রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক বিস্ময় নীল জলরাশির নিচ দিয়ে যাত্রা এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তব
ভারতের পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে আজকের দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আজ সকাল ১০টায় মুম্বাইয়ের বান্দ্রা কুরলা কমপ্লেক্স বা বিকেসি স্টেশনে প্রধানমন্ত্রী এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ভারতের প্রথম হাই স্পিড রেল বা বুলেট ট্রেনের উদ্বোধন করা হলো এই ট্রেনটি কেবল গতির জন্যই বিখ্যাত নয় এর আসল চমক হলো এর যাত্রাপথ মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ যাওয়ার পথে এই ট্রেনটি থানে ক্রিক বা খাঁড়ির নিচে দিয়ে ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ পথে যাবে যা ভারতের প্রথম এবং দীর্ঘতম সমুদ্রগর্ভস্থ রেল টানেল বা আন্ডারওয়াটার টানেল যাত্রীরা জানলার বাইরে তাকালে হয়তো মাছ দেখতে পাবেন না কারণ সুড়ঙ্গটি কংক্রিটের কিন্তু সমুদ্রের নিচে দিয়ে যাওয়ার অনুভূতি এক অন্যরকম রোমাঞ্চ তৈরি করবে
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান
২০১৭ সালে যখন এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনোদিন বাস্তবে পরিণত হবে না জমি অধিগ্রহণ পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ সব বাধা পেরিয়ে আজ ভারত বিশ্বের সেই সব দেশের তালিকায় নাম লেখাল যাদের নিজস্ব বুলেট ট্রেন এবং আন্ডারওয়াটার রেল নেটওয়ার্ক আছে জাপানের শিনকানসেন প্রযুক্তিতে তৈরি এই ট্রেনটি মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্পের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যদিও ট্রেনের কোচ বা বগিগুলো জাপান থেকে এসেছে কিন্তু সুড়ঙ্গ তৈরি এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে তৈরি ন্যাশনাল হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন লিমিটেড বা এনএইচএসআরসিএল এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর বলেন আমরা করোনার সময়ও কাজ থামাইনি দিনরাত এক করে আমাদের শ্রমিক এবং ইঞ্জিনিয়াররা সমুদ্রের নিচে মাটি খুঁড়েছেন আজ তাদের ঘাম এবং রক্তের দাম মিলল
যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা এবং গতি
মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদের দূরত্ব ৫০৮ কিলোমিটার সাধারণ ট্রেন বা মেইল ট্রেনে যেতে সময় লাগে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিমানে লাগে ১ ঘণ্টা কিন্তু বিমানবন্দর যাওয়া এবং আসার সময় ধরলে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লেগে যায় বুলেট ট্রেনে এই পুরো পথটি অতিক্রম করতে সময় লাগবে মাত্র ২ ঘণ্টা আর যদি ট্রেনটি সীমিত স্টপেজে থামে তবে সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার যা একটি বিমানের উড্ডয়ন গতির সমান
আজকের উদ্বোধনী যাত্রায় যারা ছিলেন তাদের একজন হলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী তিনি বলেন যখন ট্রেনটি সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ করল তখন আমরা বুঝতেই পারলাম না কোনো ঝাঁকুনি বা শব্দের পরিবর্তন হলো না ট্রেনটি এত মসৃণভাবে চলছিল যে টেবিলের ওপর রাখা জলের গ্লাস নড়ছিল না সমুদ্রের ৭০ মিটার নিচে দিয়ে যখন আমরা যাচ্ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল আমরা অন্য কোনো গ্রহে আছি যাত্রীরা ট্রেনের ভেতরে থাকা স্ক্রিনে দেখতে পাচ্ছিলেন তারা এখন ঠিক কোথায় আছেন এবং তাদের মাথার ওপর কতটা জল আছে
সুড়ঙ্গ তৈরির চ্যালেঞ্জ এবং প্রযুক্তি
থানে ক্রিকের নিচে ২১ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ তৈরি করা ছিল এই প্রকল্পের সবচেয়ে কঠিন কাজ এর জন্য টিবিএম বা টানেল বোরিং মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে যা বিশ্বের বৃহত্তম এবং শক্তিশালী মেশিনগুলোর মধ্যে একটি এই মেশিনগুলো মাটির নিচে জাইন্টের মতো কাজ করে একদিকে মাটি কাটে এবং অন্যদিকে কংক্রিটের দেওয়াল তৈরি করে এগিয়ে যায় সমুদ্রের নিচে মাটির গঠন বা জিওলজি সব জায়গায় সমান নয় কোথাও নরম কাদা আবার কোথাও শক্ত পাথর ইঞ্জিনিয়ারদের প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হয়েছে যাতে সুড়ঙ্গে ফাটল না ধরে বা জল ঢুকে না যায়
সুড়ঙ্গটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা ভূমিকম্প এবং সুনামির আঘাত সহ্য করতে পারে জাপানে ভূমিকম্প খুব সাধারণ ঘটনা তাই তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই সুড়ঙ্গটিকে সম্পূর্ণ ভূকম্পন প্রতিরোধী করা হয়েছে এছাড়াও সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস চলাচলের জন্য এবং জরুরি অবস্থায় যাত্রীদের বের করে আনার জন্য বিশেষ শ্যাফট বা পথ রাখা হয়েছে প্রতি ২৫০ মিটার অন্তর জরুরি নির্গমন পথ আছে যদি ট্রেনে আগুন লাগে বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় তবে যাত্রীরা কয়েক মিনিটের মধ্যে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যেতে পারবেন
ট্রেনের অন্দরমহল এবং সুযোগ সুবিধা
বুলেট ট্রেনের ভেতরে ঢুকলে মনে হবে আপনি কোনো পাঁচতারা হোটেলের লবিতে বা বিমানের বিজনেস ক্লাসে ঢুকেছেন সিটগুলো ঘোরানো যায় অর্থাৎ আপনি চাইলে জানলার দিকে মুখ করে বা উল্টো দিকে মুখ করে বসতে পারেন প্রতিটি সিটে নিজস্ব এসি ভেন্ট রিডিং লাইট এবং চার্জিং পয়েন্ট আছে ট্রেনের ভেতরে ওয়াইফাই সুবিধা আছে যা দিয়ে আপনি সিনেমা দেখতে বা অফিসের কাজ করতে পারবেন ট্রেনের প্যান্ট্রি কারে জাপানি এবং ভারতীয় খাবারের ফিউশন মেনু রাখা হয়েছে যেমন সুশি এবং ধোকলা বা টেম্পুরা এবং ভাজিয়া
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বা দিব্যাঙ্গ যাত্রীদের জন্য আলাদা কোচ এবং বিশেষ টয়লেট আছে ট্রেনের দরজাগুলো প্ল্যাটফর্মের সাথে এমনভাবে মিশে যায় যে হুইলচেয়ার নিয়ে ওঠা নামা করতে কোনো অসুবিধা হয় না মা ও শিশুদের জন্য আলাদা ফিডিং রুম বা স্তন্যপান কক্ষ রাখা হয়েছে যা ভারতীয় রেলে এই প্রথম
ভাড়া এবং সাধারণ মানুষের সাধ্য
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই বিলাসবহুল ট্রেনের ভাড়া কত রেল মন্ত্রী জানিয়েছেন ভাড়া বিমানের ভাড়ার চেয়ে কম রাখা হয়েছে মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ যেতে ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া হবে ৩০০০ টাকা এবং এক্সিকিউটিভ ক্লাসের ভাড়া হবে ৫০০০ টাকা শুরুতে মনে হতে পারে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে কিন্তু সময়ের মূল্য যাদের কাছে বেশি তাদের জন্য এটি লাভজনক একজন ব্যবসায়ী সকালে মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ গিয়ে কাজ সেরে বিকেলের মধ্যে ফিরে আসতে পারবেন যা সাধারণ ট্রেনে সম্ভব নয় রেল মন্ত্রক জানিয়েছে ভবিষ্যতে যাত্রী সংখ্যা বাড়লে ভাড়া কমানোর কথা ভাবা হবে
অর্থনৈতিক প্রভাব এবং করিডর উন্নয়ন
এই বুলেট ট্রেন করিডরটি মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের অর্থনীতিতে এক বিশাল গতি আনবে এই দুই রাজ্যের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য এবং পর্যটন বাড়বে ভাপি এবং আনন্দ এর মতো ছোট শহরগুলো এখন মুম্বাই এবং আহমেদাবাদের উপনগরী বা স্যাটেলাইট টাউনে পরিণত হবে অনেকে কম ভাড়ায় ভাপিতে থেকে মুম্বাইয়ে অফিস করতে পারবেন রিয়েল এস্টেট বা আবাসন শিল্পে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে স্টেশনের আশেপাশের জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে
গোল্ডম্যান স্যাকস এর রিপোর্টে বলা হয়েছে এই করিডর চালু হওয়ার ফলে ভারতের জিডিপিতে প্রতি বছর প্রায় ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি হতে পারে নতুন শিল্প এবং কলকারখানা গড়ে উঠবে যা লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করবে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি বা জাইকা যারা এই প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছে তারা বলেছে এটি ভারত এবং জাপানের বন্ধুত্বের প্রতীক
পরিবেশগত সুবিধা
বুলেট ট্রেন হলো পরিবহনের সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব মাধ্যম এটি বিদ্যুতে চলে তাই কোনো ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ হয় না বিমান বা গাড়ির তুলনায় এর কার্বন ফুটপ্রিন্ট অনেক কম একটি বিমান যাত্রায় যে পরিমাণ দূষণ হয় বুলেট ট্রেনে তার ১০ ভাগের ১ ভাগ দূষণ হয় ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে নেট জিরো বা কার্বন মুক্ত দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে এই বুলেট ট্রেন সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে রাস্তার ওপর গাড়ির চাপ কমবে ফলে ট্রাফিক জ্যাম এবং শব্দদূষণ কমবে
নিরাপত্তা এবং যাত্রী সুরক্ষা
জাপানের শিনকানসেন ট্রেনের নিরাপত্তার রেকর্ড বিশ্ববিখ্যাত গত ৫০ বছরে সেখানে একজন যাত্রীরও মৃত্যু হয়নি ভারত সেই একই নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলছে ট্রেনের লাইনে সেন্সর বসানো আছে যা বৃষ্টি ঝড় বা লাইনে কোনো বাধা থাকলে আগে থেকেই ট্রেনকে সতর্ক করে দেবে এবং ট্রেনটি অটোমেটিক ব্রেক কষে থামিয়ে দেবে এই পুরো লাইনটি এলিভেটেড বা মাটির ওপরে পিলারের ওপর তৈরি হয়েছে এবং দুপাশে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা আছে যাতে মানুষ বা পশু লাইনে চলে আসতে না পারে শুধুমাত্র সমুদ্রের নিচের অংশটি টানেলের মধ্যে দিয়ে গেছে
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
মুম্বাই আহমেদাবাদ রুটটি সফল হলে ভারতের অন্যান্য রুটেও বুলেট ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে দিল্লি থেকে বারাণসী দিল্লি থেকে অমৃতসর মুম্বাই থেকে নাগপুর এবং চেন্নাই থেকে মহীশূর রুটে সমীক্ষা বা সার্ভে চলছে রেল মন্ত্রক জানিয়েছে ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে দেশের ১০টি প্রধান রুটে বুলেট ট্রেন চলবে তখন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী যেতে সময় লাগবে মাত্র ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ভারত তখন প্রকৃত অর্থেই এক সুতোয় গাঁথা হবে
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
পাকিস্তান এবং চীনের সংবাদমাধ্যমগুলো ভারতের এই সাফল্যকে গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে চীনের গ্লোবাল টাইমস লিখেছে ভারত যে এত দ্রুত এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারবে তা আমরা ভাবিনি এটি এশিয়ার শক্তিসাম্যে ভারতের অবস্থান জোরদার করবে আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলো ভারতকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং তাদের হাই স্পিড রেল প্রযুক্তিতে ভারতের সাথে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে
সাধারণ মানুষের উল্লাস
আজকের উদ্বোধনী যাত্রায় টিকিট পাওয়ার জন্য অনলাইনে লক্ষ লক্ষ মানুষ চেষ্টা করেছিলেন যারা টিকিট পেয়েছেন তারা নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন আহমেদাবাদের এক ছাত্র বলেন আমি জাপানের কার্টুনে বুলেট ট্রেন দেখতাম আজ নিজের দেশে সেই ট্রেনে চড়তে পেরে গর্ব হচ্ছে মুম্বাইয়ের এক হীরা ব্যবসায়ী বলেন আমার ব্যবসা সুরাটে কিন্তু থাকি মুম্বাইয়ে এখন আমি রোজ লাঞ্চ করতে বাড়ি ফিরতে পারব
উপসংহার
২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি দিনটি প্রমাণ করল যে ভারত আর পিছিয়ে নেই আমরা এখন মাটির নিচ দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে আকাশ ছোঁয়া গতিতে ছুটতে পারি বুলেট ট্রেন কেবল একটি ট্রেন নয় এটি ভারতের প্রগতি এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক এই ট্রেন আমাদের শেখায় যে স্বপ্ন দেখলে তা পূরণ করা সম্ভব সমুদ্রের বাধা আজ আর বাধা নয় তা এখন আমাদের বন্ধু প্রযুক্তি এবং প্রকৃতির এই মেলবন্ধন আমাদের জীবনযাত্রাকে আরও সহজ এবং সুন্দর করে তুলবে মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ এখন আর দূরের শহর নয় তারা এখন প্রতিবেশী এই প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে জয় হিন্দ