Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মুম্বাই থেকে পুনে মাত্র ২০ মিনিটে ভারতের প্রথম হাইপারলুপ ট্রেনের সফল ট্রায়াল রান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন বিপ্লব

ভারতের পরিবহন ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক দিন। মুম্বাই এবং পুনের মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হলো দেশের প্রথম হাইপারলুপ ট্রেনের ট্রায়াল রান। ঘণ্টায় ১২০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলা এই পড বা ক্যাপসুলটি মাত্র ২০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছাল। বিমানের চেয়েও দ্রুত এবং ট্রেনের চেয়েও নিরাপদ এই প্রযুক্তি ভারতের অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার মান বদলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মুম্বাই থেকে পুনে মাত্র ২০ মিনিটে ভারতের প্রথম হাইপারলুপ ট্রেনের সফল ট্রায়াল রান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন বিপ্লব
City & Transport

আজকের দিনটি ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মানুষ যা স্বপ্নেও ভাবেনি তা আজ বাস্তবে পরিণত হলো। মুম্বাই এবং পুনে এই দুটি শহরের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। গাড়িতে যেতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা এবং ট্রেনে লাগে আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু আজ সেই দূরত্ব অতিক্রম করা হলো মাত্র ২০ মিনিটে। বিশ্বাস হচ্ছে না তো কিন্তু এটাই সত্যি। ভারতের প্রথম হাইপারলুপ ট্রেন বা পড আজ সফলভাবে তার যাত্রা শেষ করল। সকাল ১১টায় নভি মুম্বাইয়ের বিশেষ টার্মিনাল থেকে এই হাইপারলুপ ক্যাপসুলটি যাত্রা শুরু করে এবং ঠিক ১১টা ২০ মিনিটে পুনের ওয়াকাড টার্মিনালে পৌঁছায়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী।

হাইপারলুপ কী এবং কীভাবে কাজ করে

হাইপারলুপ হলো পরিবহনের পঞ্চম মোড বা মাধ্যম। এর আগে আমরা সড়কপথ রেলপথ জলপথ এবং আকাশপথ দেখেছি। হাইপারলুপ হলো এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে একটি লম্বা টিউব বা পাইপের ভেতর থেকে বাতাস বের করে ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য অবস্থা তৈরি করা হয়। এর ফলে বায়ুর ঘর্ষণ বা এয়ার রেজিস্ট্যান্স থাকে না। এই টিউবের ভেতরে চৌম্বকীয় শক্তি বা ম্যাগনেটিক লেভিটেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ক্যাপসুল বা পডকে ভাসিয়ে রাখা হয়। কোনো চাকা না থাকায় এবং বায়ুর বাধা না থাকায় এই পডটি বিমানের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটতে পারে। আজকের ট্রায়ালে এই পডটির সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ১২০০ কিলোমিটার যা শব্দের গতির কাছাকাছি।

প্রকল্পের নেপথ্য কাহিনী

২০১৮ সালে এই প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছিল। ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান এবং মহারাষ্ট্র সরকারের যৌথ উদ্যোগে এই কাজ শুরু হয়। আইআইটি বোম্বে এবং আইআইটি মাদ্রাজের একদল তরুণ ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র এই প্রযুক্তির উন্নয়নে সাহায্য করেছেন। করোনা মহামারী এবং নানা আইনি জটিলতায় কাজ কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত দুই বছর ধরে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শেষ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু মাটির নিচ দিয়ে এবং এক্সপ্রেসওয়ের পাশ দিয়ে পিলার তুলে টিউব বসানোর ফলে সেই সমস্যা মেটানো গেছে।

ট্রায়াল রানের অভিজ্ঞতা

আজকের ট্রায়াল রানে কোনো যাত্রী ছিলেন না। তবে ক্যাপসুলের ভেতরে সেন্সর এবং ক্যামেরা বসানো ছিল। লাইভ ভিডিওতে দেখা গেছে ক্যাপসুলটি চোখের পলকে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। যাত্রাপথ মসৃণ বা স্মুথ ছিল কিনা তা দেখার জন্য পডের ভেতরে এক গ্লাস জল রাখা হয়েছিল। অবাক করা বিষয় হলো এত গতিতেও জলের গ্লাস থেকে এক ফোঁটা জলও চলকে পড়েনি। এটি প্রমাণ করে যে যাত্রীরা ভেতরে বসে কোনো ঝাঁকুনি অনুভব করবেন না।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন ভারত আজ প্রযুক্তির সুপারপাওয়ার হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিলাম যে মেক ইন ইন্ডিয়া শুধু স্লোগান নয় এটি একটি বাস্তব আন্দোলন। এই হাইপারলুপ প্রযুক্তি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এটি সৌরশক্তিতে চলে এবং এতে কোনো কার্বন নিঃসরণ হয় না।

অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কর্মসংস্থান

মুম্বাই এবং পুনে হলো মহারাষ্ট্রের দুটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ এই দুই শহরের মধ্যে যাতায়াত করেন। হাইপারলুপ চালু হলে এই দুই শহর কার্যত একটি মেগাসিটিতে পরিণত হবে। একজন মানুষ মুম্বাইয়ে থেকে পুনেতে অফিস করতে পারবেন এবং দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি ফিরতে পারবেন। এর ফলে রিয়েল এস্টেট বা আবাসন শিল্পে জোয়ার আসবে। পুনের মতো শহরে যেখানে জমির দাম মুম্বাইয়ের চেয়ে কম সেখানে মানুষ থাকতে চাইবে। এতে মুম্বাইয়ের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে।

এছাড়াও এই প্রকল্পের ফলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সফটওয়্যার ডেভলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রচুর সুযোগ তৈরি হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার জন্য দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। গোল্ডম্যান স্যাকস এর রিপোর্টে বলা হয়েছে হাইপারলুপ করিডর তৈরির ফলে ভারতের জিডিপিতে আগামী ১০ বছরে অন্তত ২ শতাংশ বৃদ্ধি হতে পারে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এত গতিতে চলা যান কি নিরাপদ। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন হাইপারলুপ ট্রেনের চেয়েও বেশি নিরাপদ। কারণ এটি একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বা ক্লোজড লুপের মধ্যে চলে। বাইরে থেকে কোনো পশু বা মানুষ লাইনে চলে আসার ভয় নেই। আবহাওয়ার কোনো প্রভাব এর ওপর পড়ে না। ঝড় বৃষ্টি বা কুয়াশাতেও হাইপারলুপ তার গতি বজায় রাখতে পারে। প্রতিটি পডে এমার্জেন্সি ব্রেকিং সিস্টেম এবং অক্সিজেন মাস্ক রাখা আছে। ভূমিকম্প নিরোধক প্রযুক্তিতে টিউবগুলো তৈরি করা হয়েছে। আজকের ট্রায়ালে সব ধরনের সুরক্ষা প্রোটোকল কঠোরভাবে মেনে চলা হয়েছে।

ভাড়া এবং সাধারণ মানুষের সাধ্য

news image
আরও খবর

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই রকেটের মতো গতির যানের ভাড়া কত হবে। কোম্পানি জানিয়েছে তারা শুরুতে ভাড়া একটু বেশি রাখবে। বিমানের ইকোনমি ক্লাসের ভাড়ার সমান হতে পারে। তবে তাদের লক্ষ্য হলো এটিকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা। আগামী ৫ বছরের মধ্যে ভাড়া কমিয়ে এসি বাসের ভাড়ার সমান করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোম্পানি জানিয়েছে কার্গো বা মালপত্র পরিবহনের মাধ্যমে তারা আয় বাড়াবে যাতে যাত্রীদের টিকিটের দাম কমানো যায়। অ্যামাজিন বা ফ্লিপকার্টের মতো ই কমার্স কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই এই হাইপারলুপ ব্যবহার করে দ্রুত ডেলিভারি দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মুম্বাই পুনে রুটটি সফল হলে ভারতের অন্যান্য রুটেও হাইপারলুপ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বেঙ্গালুরু থেকে চেন্নাই দিল্লি থেকে মুম্বাই এবং কলকাতা থেকে দিল্লি রুটে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে। কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছাতে যদি মাত্র ২ ঘণ্টা সময় লাগে তবে তা দেশের ব্যবসায়িক মানচিত্র বদলে দেবে। আইআইটি মাদ্রাজের আভিষ্কার হাইপারলুপ টিম ইতিমধ্যেই দেশীয় প্রযুক্তিতে পড তৈরি করছে যা খরচ আরও কমিয়ে দেবে।

যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া

ট্রায়াল সফল হওয়ার খবরে মুম্বাই এবং পুনের বাসিন্দাদের মধ্যে খুশির হাওয়া। পুনের এক আইটি কর্মী বলেন আমি প্রতি সপ্তাহে মুম্বাই যাই। ট্রেনে যেতে খুব কষ্ট হয়। হাইপারলুপ চালু হলে আমার জীবনটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। মুম্বাইয়ের এক ছাত্র বলেন আমি পুনেতে পড়াশোনা করি। হোস্টেলে থাকি। হাইপারলুপ হলে আমি রোজ বাড়ি থেকে যাতায়াত করতে পারব।

পরিবেশবিদদের মতামত

পরিবেশবিদরাও এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন বিমান এবং ডিজেল চালিত গাড়ি প্রচুর দূষণ ছড়ায়। হাইপারলুপ যদি বিমানের বিকল্প হতে পারে তবে তা পরিবেশের জন্য আশীর্বাদ। সৌর প্যানেল দিয়ে ঢাকা টিউবগুলো নিজের বিদ্যুৎ নিজেই তৈরি করে নেবে। এটি একটি সাস্টেনেবল বা টেকসই মডেল। তবে তারা সতর্ক করেছেন যে নির্মাণের সময় যাতে বন্যপ্রাণীদের চলাচলের করিডর নষ্ট না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।

বিশ্বের নজর ভারতের দিকে

আমেরিকা এবং ইউরোপেও হাইপারলুপ নিয়ে গবেষণা চলছে কিন্তু ভারত প্রথম বাণিজ্যিক ট্রায়াল রান শেষ করে সবাইকে চমকে দিয়েছে। এলন মাস্ক যিনি হাইপারলুপের ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন তিনিও টুইট করে ভারতকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ভার্জিন গ্রুপের রিচার্ড ব্র্যানসন বলেছেন ভারত দেখাল যে তারা ঝুঁকি নিতে ভয় পায় না। এই সাফল্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অনুপ্রেরণা।

চ্যালেঞ্জ এবং বাধা

অবশ্যই সব কিছু এত সহজ ছিল না। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভ ছিল। কিন্তু সরকার তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজনকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমস্যা মিটিয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। ভ্যাকুয়াম টিউব লিক করা বা পডের গরম হয়ে যাওয়া নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় ইঞ্জিনিয়াররা তাদের মেধা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করেছেন।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখটি ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে এক মাইলফলক। চাকা আবিষ্কারের পর মানুষ গতির প্রেমে পড়েছিল। বাষ্পীয় ইঞ্জিন থেকে বুলেট ট্রেন আর আজ হাইপারলুপ মানুষের সেই গতির নেশা নতুন মাত্রা পেল। মুম্বাই থেকে পুনে ২০ মিনিটে যাওয়া এখন আর কোনো জাদুকরের গল্প নয় এটি বিজ্ঞানের দান। এই প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচাবে শক্তি বাঁচাবে এবং জীবনকে আরও গতিময় করে তুলবে। ভারত আজ প্রমাণ করল যে তারা কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশ নয় তারা প্রযুক্তির উদ্ভাবকও হতে পারে। হাইপারলুপের এই সফল যাত্রা আগামী দিনের উন্নত এবং আত্মনির্ভর ভারতের দিকে আমাদের আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। এখন শুধু অপেক্ষা কবে আমরা সাধারণ মানুষ এই পডে চড়ে নিমেষের মধ্যে এক শহর থেকে অন্য শহরে পৌঁছে যাব। সেই দিন আর বেশি দূরে নয়।

Preview image