মেঘালয়ের মৌসিনরামে গত এক দশকে বার্ষিক বৃষ্টি ১,৪০০ মিলিমিটার কমেছে। আগে যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ছিল ১০,২০০ মিমি, এখন তা ৮,৮০০ মিমিতে নেমেছে, যা দূষণ ও পরিবেশ পরিবর্তনের প্রভাবকে নির্দেশ করছে।
পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট অথচ অনন্য এক জনপদ মৌসিনরাম। মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড়ে অবস্থিত এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র ও সর্বাধিক বর্ষণবহুল স্থান হিসেবে। বছরের পর বছর অঝোর ধারায় বৃষ্টি মৌসিনরামের প্রকৃতি, জীবনযাপন ও পরিবেশকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সেই চেনা পরিচয়ে ধীরে ধীরে ফাটল ধরছে। বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাবে কমছে মৌসিনরামের বৃষ্টিপাত।
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এক দশকে মৌসিনরামে বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় এক হাজার চারশো মিলিমিটার কমে গিয়েছে। এক সময় যেখানে গড় বার্ষিক বৃষ্টি ছিল প্রায় দশ হাজার দুইশো মিলিমিটার, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় আট হাজার আটশো মিলিমিটারে। এই বিপুল পরিবর্তন স্বাভাবিক নয় বলেই মত গবেষকদের। তাঁদের দাবি, এর মূল কারণ বায়ুমণ্ডলে দূষণকারী কণার মাত্রা বৃদ্ধি।
ধুলো, জৈববস্তু পোড়ানো, যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম বায়ুবাহিত কণা মিলিয়ে যে এরোসল তৈরি হয়, তার পরিমাণ গত দশ বছরে প্রায় পনেরো শতাংশ বেড়েছে। এই এরোসল কণাগুলি মেঘ তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। সাধারণভাবে বৃষ্টির জন্য প্রয়োজন জলীয় বাষ্প ও মেঘ গঠনের অনুকূল পরিবেশ। কিন্তু অতিরিক্ত এরোসল কণা সেই প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে।
গরমকালে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে প্রচুর জলীয় বাষ্প জমা হয়, যার সঙ্গে মিশে যায় এরোসল কণা। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই কণার ঘনত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে তা বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এর ফলে মেঘের মধ্যে থাকা জলকণাগুলি একত্রিত হতে পারে না। ছোট ছোট মেঘ তৈরি হলেও সেগুলি মিলিত হয়ে ভারী মেঘে পরিণত হতে ব্যর্থ হয়। ফলস্বরূপ বৃষ্টি কমে যায়।
এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। বঙ্গোপসাগর থেকে আগত জলীয় বাষ্পই মূলত মৌসিনরামের প্রবল বৃষ্টির উৎস। কিন্তু দূষণের কারণে সেই জলীয় বাষ্পের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নয়াদিল্লির জাতীয় ভৌত গবেষণাগারের প্রধান বিজ্ঞানী ও এরোসল বিশেষজ্ঞ সুমিত মিশ্র জানিয়েছেন, দূষণ সরাসরি বৃষ্টির প্রবাহে প্রভাব ফেলছে। তাঁর নেতৃত্বে গবেষকরা ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নাসার পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যানও।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শীতকাল ও প্রাক বর্ষা সময়ে বাতাসে এরোসলের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই দূষণকারী কণাগুলি বায়ুমণ্ডলের নিম্ন স্তরে তাপ আটকে রাখে, যার ফলে তাপমাত্রা সামান্য হলেও বৃদ্ধি পায়। গবেষকদের মতে, উষ্ণতার হার প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ থেকে শূন্য দশমিক শূন্য সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। এই সামান্য তাপমাত্রা বৃদ্ধি মেঘ গঠনের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয়।
অসমের তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রতিভা ডেকার গবেষণাতেও উঠে এসেছে আরও এক উদ্বেগজনক দিক। পশ্চিম গারো পাহাড় এলাকায় জৈববস্তু পোড়ানোর ফলে সূক্ষ্ম কণার দূষণ বাড়ছে, যা গোটা মেঘালয় অঞ্চলের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এই দূষণ যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে শুধু মৌসিনরাম নয়, আশপাশের পাহাড়ি এলাকাতেও বৃষ্টির ধরণ বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পৃথিবীর অন্যতম বর্ষণবহুল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত মৌসিনরামে বৃষ্টির এই ধারাবাহিক হ্রাস প্রকৃতি ও মানবজীবনের জন্য স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই পরিবর্তন আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা
এই প্রেক্ষাপটে ভারতে পরিবহণ ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা বায়ুদূষণের অন্যতম বড় উৎস। শহর ও পাহাড়ি অঞ্চলে যান চলাচলের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এরোসলের পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পুরনো ও দূষণকারী যানবাহনের ওপর কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবহণ ক্ষেত্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মৌসিনরামের মতো সংবেদনশীল প্রাকৃতিক এলাকাতেও গভীর ছাপ ফেলবে।
আগামী দিনে আবহাওয়ার পরিবর্তন ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা, আবার কোথাও স্বাভাবিক বর্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলসম্পদ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের উপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবহণ ও শিল্প থেকে নির্গত দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বন সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই পরিবর্তন আরও তীব্র হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়নের পথ না বেছে নিলে ভবিষ্যতে ভারতের আবহাওয়া আরও অনিশ্চিত ও চরম হয়ে উঠতে পারে, যার মূল্য দিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতে পরিবহণ ব্যবস্থার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা বর্তমানে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। শহর থেকে শুরু করে পাহাড়ি ও পরিবেশ সংবেদনশীল অঞ্চল পর্যন্ত যান চলাচলের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এরোসলের মাত্রাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো, গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং পুরনো ও অতিরিক্ত দূষণকারী যানবাহনের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। পরিবহণ ক্ষেত্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু বড় শহরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মৌসিনরামের মতো প্রাকৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকাতেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা বাড়বে।
আগামী দিনে আবহাওয়ার পরিবর্তন ভারতের জন্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে। কোথাও অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও স্বাভাবিক বর্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়বে জলসম্পদ, কৃষি উৎপাদন এবং জীববৈচিত্র্যের উপর। বিজ্ঞানীদের মত, পরিবহণ ও শিল্প থেকে নির্গত দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বন সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়িত না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়নের পথ না বেছে নিলে ভারতের আবহাওয়া আরও অনিশ্চিত ও চরম রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব আগামী প্রজন্মকে বহন করতে হবে। অসমের তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রতিভা ডেকার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, পশ্চিম গারো পাহাড়ে জৈববস্তু পোড়ানোর ফলে সূক্ষ্ম কণা দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। গারো পাহাড় এলাকার পরিবেশ পরিবর্তনে তা প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।