ইয়াশস্বী জয়সওয়াল ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন সেনসেশন। তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিং, শুদ্ধ টেকনিক এবং দুঃসাহসিক স্ট্রোকপ্লে খুব কম সময়েই তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। তবে তাঁর এই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের মধ্যেই এমন একটি শট রয়েছে যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি পেসার ডেল স্টেইন। স্টেইনের মতে, জয়সওয়ালের পেটেন্ট রিস্কি অ্যাটাকিং শট যা তিনি বারবার খেলতে ভালোবাসেন তাঁকে বিপদে ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষ বোলাররা ওই শটটাই টার্গেট করে তাঁর উইকেট তুলে নিচ্ছে। স্টেইন বলেন, জয়সওয়াল অত্যন্ত প্রতিভাবান। তবে কিছুদিনের জন্য ওই শটটা কমানোই ভালো। হয়তো সচেতনভাবে ওকে সেটি এড়িয়ে যেতে হবে। স্টেইনের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই ক্রিকেটমহলে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ বলছেন, এটি অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের সৎ পরামর্শ আবার কেউ মনে করছেন, জয়সওয়ালের স্বাভাবিক খেলা পরিবর্তন করা উচিত নয়। যাই হোক, এতটুকু নিশ্চিত একজন তরুণ প্রতিভার প্রতি স্টেইনের এমন পরামর্শ তাঁর সম্ভাবনাকেই আরও উজ্জ্বল করে তুলে ধরছে। কারণ সমালোচনার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে উন্নতির ইঙ্গিত।
বিশেষ প্রতিবেদক: ক্রিকেট কৌশল ডেস্ক
মুম্বাই, বুধবার: ভারতীয় ক্রিকেটে যশস্বী জয়সওয়াল নামটির উত্থান ধূমকেতুর মতোই দ্রুত এবং উজ্জ্বল। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর দুঃসাহসিক ব্যাটিং, পজিটিভ অ্যাটিটিউড এবং নির্ভীক স্ট্রোকপ্লে তাঁকে ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে। টেস্ট থেকে টি-টোয়েন্টি—উভয় ফরম্যাটেই তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিং প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সক্ষম। তবে এই প্রতিভাবান বাঁ-হাতি ওপেনারকে নিয়ে এবার এক গুরুতর কৌশলগত উদ্বেগ প্রকাশ করলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বকালের অন্যতম সেরা পেসার ডেল স্টেইন।
স্টেইনের স্পষ্ট অভিমত, জয়সওয়ালের একটি বিশেষ 'পেটেন্ট' বা নিজস্ব অ্যাটাকিং শট বর্তমানে তাঁর জন্য একটি বিরাট দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। বোলাররা এই শটকে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে ফেলেছেন এবং সেই অনুযায়ী ফিল্ড সাজিয়ে তাঁকে বারবার ফাঁদে ফেলছেন। এর ফলস্বরূপ, প্রতিবারই তাঁর উইকেট খোয়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে। স্টেইন মনে করেন, ক্যারিয়ার দীর্ঘ ও সুরক্ষিত করতে হলে জয়সওয়ালকে এই মুহূর্তে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
স্টেইনের পরামর্শটি ক্রিকেট মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে:
“কিছুদিনের জন্য শটটা বন্ধ রাখতে হবে বা অন্তত কমাতে হবে। তাঁকে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কখন সেই শট খেলবে এবং কখন নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বোলাররা যখন একজন ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা ধরে ফেলে, তখন তার থেকে সরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
ঠিক কোন শটটি নিয়ে এত সমস্যা? স্টেইনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জয়সওয়ালের অফসাইডে ফ্লোটিং লেংথ বল উঠিয়ে মারার স্টেপ-আউট শটটিই (The Step-Out Floating Off-Drive) এখন তাঁর গলার কাঁটা।
বোলারদের কৌশল:
ডেলিভারি: বোলাররা এখন বুদ্ধি করে শর্ট-অফ-লেংথ (Short-of-a-length) বা কিছুটা অ্যাঙ্গেল-অ্যাক্রস ডেলিভারি (Angle-Across Delivery) করছেন, যা ব্যাটারের কাছ থেকে দূরে সরে যায়।
ফিল্ডিং সেট-আপ: এর সঙ্গে সঙ্গে ফিল্ডিং সাজানো হচ্ছে—গভীর কভার (Deep Cover) এবং ডিপ পয়েন্ট (Deep Point) ফিল্ডারকে বাউন্ডারিতে রেখে।
ফাঁদ: জয়সওয়াল তাঁর স্বভাবজাত আক্রমণাত্মক মেজাজে সেই শট খেলতে গিয়ে জোরের বদলে উচ্চতা দিয়ে ফেলছেন, আর বল সোজাসুজি ক্যাচ হয়ে যাচ্ছে বাউন্ডারি ফিল্ডারদের হাতে।
স্টেইনের মতে, “এটি বিশেষ করে ম্যাচ-সিচুয়েশনের বাইরে গিয়ে অযথা ঝুঁকি তৈরি করছে। একজন সেট ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে এমন শট আশা করা যায় না। তাঁর উচিৎ ছিল ঝুঁকি কমিয়ে স্থিতিশীলতা বেছে নেওয়া।” তিনি আরও যোগ করেন যে এই শটটি যখন কাজ করে, তখন দেখতে খুবই সুন্দর লাগে, কিন্তু যখন কাজ করে না, তখন উইকেটের চেয়ে মূল্যবান কিছু দিতে হয় না।
ডেল স্টেইন শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নন, বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা পেস বোলার হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
৪০০+ টেস্ট উইকেট: তাঁর রয়েছে ৪০০-এরও বেশি টেস্ট উইকেট। প্রতিটি উইকেটের পেছনেই ছিল ব্যাটসম্যানকে মানসিক ও কৌশলগতভাবে পরাস্ত করার গভীর জ্ঞান।
ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা বোঝার ক্ষমতা: স্টেইনের বোলিং ছিল গতি, সুইং এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত মিশ্রণ। তিনি জানতেন কোন ব্যাটসম্যানের কোন শটটি বিপদের কারণ।
মাইক্রো-অ্যানালাইসিস: তাঁর পর্যবেক্ষণগুলি কেবল খেলার উপরিতলের বিশ্লেষণ নয়, বরং এটি একজন বোলারের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাটসম্যানের মানসিকতা এবং শট সিলেকশনের মাইক্রো-অ্যানালাইসিস।
তিনি যখন বলেন, “জয়সওয়ালের ক্ষমতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁকে জানতে হবে কখন আগ্রাসন থামিয়ে স্থিরতা বেছে নিতে হয়,” তখন এটি কেবল একটি উপদেশ থাকে না, এটি একটি কৌশলগত সতর্কতা হয়ে দাঁড়ায়।
স্টেইনের মন্তব্যে ক্রিকেটমহলে এখন আলোচনা চলছে যে—তরুণ প্রতিভা কি নিজের স্বাভাবিক খেলা পরিবর্তন করবে, নাকি ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝে তাঁর আগ্রাসন কমিয়ে দেবে?
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, “খেলোয়াড়দেরকে সব সময় নিজের খেলা রি-অ্যাডজাস্ট করতে হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, যেখানে প্রতিপক্ষ দলগুলি ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করে আপনার দুর্বলতা সেকেন্ডের মধ্যে ধরে ফেলে।”
এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য যে প্রায় সব কিংবদন্তি ক্রিকেটারকেই ক্যারিয়ারের কোনো না কোনো পর্যায়ে তাদের খেলার 'পেটেন্ট শট' পরিবর্তন বা সাময়িকভাবে বাদ দিতে হয়েছে:
শচীন টেন্ডুলকার: ১৯৯০-এর দশকে শচীন টেন্ডুলকার কাভার ড্রাইভ খেলতে গিয়ে প্রায়শই আউট হতেন। এরপর তিনি নিজের শট সিলেকশনে পরিবর্তন আনেন, বিশেষ করে ২০০৪ সালে সিডনিতে তিনি অফসাইডে কোনো ড্রাইভ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ২s৪ রানের ঐতিহাসিক ইনিংস খেলেন।
বিরাট কোহলি: একসময় অফ-স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা মারার দুর্বলতা ছিল তাঁর। পরে তিনি সেটি নিয়ন্ত্রণ করে নিজের টেকনিককে আরও নিখুঁত করেন।
জয়সওয়ালকেও এখন এই একই বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এমন একটি পর্যায়, যেখানে দুর্বলতা বারবার প্রদর্শিত হতে থাকলে সেটি আর দুর্বলতা থাকে না, সেটি একটি নিশ্চিত উইকেটের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
এটি পরিষ্কার যে স্টেইন কেবল সমালোচনা করার জন্য এই মন্তব্য করেননি; বরং তাঁর বক্তব্যে জয়সওয়ালের প্রতি গভীর প্রশংসা এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে।
স্টেইন অকপটে বলেন: “জয়সওয়াল ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। তাঁর দক্ষতা, মানসিকতা ও আগ্রাসন—সবই আছে। তাঁর মধ্যে বিরাট এক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। তবে দীর্ঘ এবং সফল ক্যারিয়ার গড়তে হলে তাঁকে নিজের শট-সিলেকশন নিখুঁত করতে হবে।”
অন্যান্য ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও স্টেইনের বক্তব্যকে সমর্থন করছেন। তাঁদের দাবি:
দ্রুত আউট হওয়া: জয়সওয়াল বিগত কয়েকটি ম্যাচে ভালো শুরু করেও দ্রুত আউট হচ্ছেন, যা দলের মিডল অর্ডনে চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রেডিক্টেবল শট: তাঁর নির্দিষ্ট এই শটটি এখন প্রতিপক্ষ বোলারদের কাছে সম্পূর্ণ প্রেডিক্টেবল বা পূর্বাভাসযোগ্য।
পরিকল্পিত ফাঁদ: প্রতিপক্ষ দলগুলি এখন প্রথম থেকেই জয়সওয়ালের জন্য সেই বিশেষ ফাঁদ সাজাচ্ছে।
এই কারণে সাময়িকভাবে শটটি বাদ দিলে বোলারদের কৌশলকে চ্যালেঞ্জ জানানো যাবে এবং জয়সওয়ালের ব্যাটিংয়ে নতুনত্ব আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ ক্রিকেটাররা প্রায়ই একটি সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক ভুল করে থাকেন:
একটি শট যখন তাঁকে পরিচিতি দেয় বা প্রচুর রান এনে দেয়, তখন তাঁরা ভাবতে শুরু করেন যে সবসময় সেই শট দিয়েই তাঁরা সফল হবেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ডেটা এবং ভিডিও অ্যানালাইসিসের যুগে, বোলাররা দুর্বলতা দেখলে বারবার সেই একই ফাঁদ পাতেন।
জয়সওয়ালও এখন সেই ফাঁদের মধ্যেই আছেন। তাঁকে বুঝতে হবে, “আগ্রাসন ভালো, কিন্তু আত্মঘাতী আগ্রাসন নয়।” তাঁর এখনকার প্রয়োজন—তাঁর ব্যাটিংয়ে একটি 'প্ল্যান বি' (Plan B) এবং প্রয়োজনে সাময়িকভাবে 'পেটেন্ট শট'টি ভাঁজ করে রাখা।
ক্রিকেটে একটি ছোট কৌশলগত সিদ্ধান্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
দল যখন চাপে থাকে, তখন অপ্রয়োজনীয় রিস্কি শট এড়িয়ে যাওয়া।
পিচ বাউন্সি থাকলে আগ্রাসন কমিয়ে টেকনিকের উপর ভরসা করা।
সুইং পিচে রুটিন শটগুলি বাদ দেওয়া।
জয়সওয়ালেরও এই মুহূর্তে প্রয়োজন স্টেইনের কথাটিকে মাথায় রেখে মাঠের পরিস্থিতি (Match Situation) এবং পিচের চরিত্র (Pitch Condition) বোঝার ক্ষমতা আরও শানিত করা। আগ্রাসী হওয়া জরুরি, কিন্তু কখন সেই আগ্রাসনকে স্থিতিশীলতার মোড়কে মুড়ে দিতে হয়, তা শেখা আরও জরুরি।
ডেল স্টেইনের মন্তব্য মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। প্রতিক্রিয়া এসেছে মিশ্র:
সমর্থকরা: অনেকে স্টেইনের অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শকে সমর্থন করছেন এবং বলছেন, "বোলাররা যখন প্রস্তুত থাকে, শট বদলানোই বুদ্ধিমানের কাজ।"
ভক্তরা: আবার কিছু ভক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলছেন, "ওই শটটাই জয়সওয়ালকে জয়সওয়াল বানিয়েছে! নিজের স্বাভাবিক খেলা বন্ধ করা উচিত নয়।"
বিশ্লেষক মহল: বিশ্লেষক মহল এই আলোচনাকে ক্রিকেটের কৌশলগত বিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছে।
ডেল স্টেইনের মতো একজন কিংবদন্তির পক্ষ থেকে এই ধরনের বিশদ সমালোচনা মানেই যে জয়সওয়াল খারাপ খেলছেন, তা নয়। বরং এটি পরোক্ষভাবে তাঁর বিশাল প্রতিভারই স্বীকৃতি। কারণ ছোট বা সাধারণ ক্রিকেটারদের ওপর এত গভীর বিশ্লেষণ হয় না।
যশস্বী জয়সওয়ালের হাতে এখনো বিশাল সময়। তাঁর সামনে এখন দুটি পথ খোলা:
১. দৃঢ়তা: স্টেইনের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে নিজের স্বাভাবিক খেলায় স্থির থাকা এবং ঝুঁকি বজায় রাখা। ২. বিবর্তন: স্টেইনের পরামর্শ মেনে নিজের শট সিলেকশন উন্নত করা, দুর্বলতাকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা আরও শানিত করা।
যদি তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন এবং নিজের খেলাকে বিবর্তিত করতে পারেন, তবে ভারতীয় ক্রিকেটে আগামী দশক তাঁরই হবে। তাঁর সামনে এখন সুযোগ রয়েছে প্রমাণ করার যে তিনি কেবল একজন আক্রমণাত্মক ব্যাটার নন, বরং একজন বুদ্ধিমান এবং বিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার। এখন দেখার বিষয়, স্টেইনের এই কড়া পরামর্শে জয়সওয়াল কি তাঁর কৌশল বদলাবেন, নাকি নিজস্ব আগ্রাসনে ভরসা রেখে এগিয়ে যাবেন।