ভিক্টর ব্যানার্জির এই উক্তিটি বার্ধক্যের নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং জীবনের প্রতি এক অনন্য দর্শনের প্রতিফলন। তিনি বলছেন যে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে লাঠি ভর করে যখন মানুষ হাঁটে, তখন তার মেজাজ এতটাই খিটখিটে হয়ে যায় যে নিরীহ ব্যাঙকেও লাথি মারতে পারে। এই অসহায় এবং বিরক্তিকর বার্ধক্যে না পৌঁছানোর জন্য তিনি হাস্যরসের সাথে বলছেন আবোল তাবোল খাওয়ার কথা, যাতে সুখে মরে যাওয়া যায়। এখানে স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রচলিত ধারণাকে একরকম উল্টে দিয়ে তিনি বলতে চাইছেন যে দীর্ঘায়ু পাওয়ার চেয়ে সুখী এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে জীবন কাটানো এবং মৃত্যুবরণ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি জীবনের গুণমান বনাম দৈর্ঘ্য নিয়ে এক গভীর কিন্তু রসাত্মক মন্তব্য।
বাংলা চলচ্চিত্র এবং থিয়েটারের কিংবদন্তি অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জির এই মন্তব্যটি কেবলমাত্র একটি সরল বাক্য নয়, বরং এটি জীবন সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধির প্রকাশ। তাঁর এই কথাগুলোতে লুকিয়ে আছে বার্ধক্যের নিষ্ঠুর বাস্তবতা, মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন এবং জীবনযাপনের স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে এক অনন্য চিন্তাভাবনা। ভিক্টর ব্যানার্জি, যিনি সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি 'শতরঞ্জ কে খিলাড়ি' এবং ডেভিড লিনের 'প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া'র মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বিশ্বমঞ্চে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তিনি তাঁর এই উক্তির মাধ্যমে জীবনের শেষ পর্যায় সম্পর্কে এক তিক্ত সত্য তুলে ধরেছেন।
"ধুঁকতে ধুঁকতে লাঠি নিয়ে ঘুরে বেড়ালে ব্যাঙেও লাথি মারবে" এই বাক্যাংশটি অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং প্রতীকী। এখানে বার্ধক্যের সেই অসহায় অবস্থার কথা বলা হয়েছে যখন একজন মানুষ তার শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যখন হাঁটার জন্য লাঠির সাহায্য নিতে হয়, যখন প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে এক যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। "ধুঁকতে ধুঁকতে" শব্দযুগলটি সেই কষ্টকর শ্বাসপ্রশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস নেওয়াই যেন এক সংগ্রাম। আর এই অবস্থায় যখন কেউ লাঠি ভর করে হাঁটে, তখন তার মানসিক অবস্থাও বদলে যায়। বয়সের ভারে নুব্জ হয়ে পড়া মানুষ তার চারপাশের ছোট ছোট বিষয়েও বিরক্ত হতে শুরু করে। এমনকি একটি নিরীহ ব্যাঙ যদি তার পথে আসে, তাকেও সে লাথি মারতে পারে। এটি আসলে সেই মানসিক হতাশা এবং ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ যা বার্ধক্যের সাথে সাথে অনেক মানুষের মধ্যে দেখা দেয়।
এই প্রসঙ্গে আমরা বার্ধক্যের মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে ভাবতে পারি। যখন একজন মানুষ তার সক্ষমতা হারাতে থাকে, যখন সে অন্যদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। যে মানুষটি একসময় স্বাধীনভাবে সবকিছু করতে পারত, সে এখন সাহায্য ছাড়া সাধারণ কাজগুলোও সম্পন্ন করতে পারে না। এই হতাশা এবং ক্ষোভ অনেক সময় তাকে খিটখিটে, রাগী এবং অসহিষ্ণু করে তোলে। পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই বয়স্ক মানুষদের এই পরিবর্তিত আচরণ লক্ষ্য করেন। যে মানুষটি একসময় অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং প্রেমময় ছিলেন, তিনি বার্ধক্যে এসে কঠোর এবং সমালোচনামূলক হয়ে উঠতে পারেন। ভিক্টর ব্যানার্জির উক্তিতে এই মানসিক পরিবর্তনের একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে।
কিন্তু ভিক্টর ব্যানার্জির মূল বক্তব্য এখানেই শেষ নয়। তিনি বলছেন, "সে বয়সে যেন পৌঁছাতে না হয় মানুষকে।" এটি একটি অত্যন্ত সাহসী এবং বিতর্কিত উক্তি। তিনি মূলত বলতে চাইছেন যে বার্ধক্যের সেই অসহায়, নির্ভরশীল এবং কষ্টকর পর্যায়ে পৌঁছানোর চেয়ে বরং আগেই মৃত্যু হওয়া শ্রেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের কাছে হয়তো নেতিবাচক মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে মানবিক মর্যাদা এবং জীবনের গুণমানের প্রশ্ন। ভিক্টর ব্যানার্জি চান না যে একজন মানুষ তার জীবনের শেষ দিনগুলো এমন অবস্থায় কাটাক যেখানে সে তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে, যেখানে সে অন্যদের বোঝা হয়ে গেছে, যেখানে তার অস্তিত্ব কেবলমাত্র শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এই প্রসঙ্গে "ইউথানেসিয়া" বা "মরণের অধিকার" নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে বিতর্ক চলছে, তার কথা মনে পড়ে। পৃথিবীর অনেক দেশে এখন আইনসম্মতভাবে মানুষকে তার জীবন শেষ করার অধিকার দেওয়া হচ্ছে, যদি সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে এবং অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছে। সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, কানাডার মতো দেশে এই অধিকার স্বীকৃত। এই দেশগুলোতে মানুষ বিশ্বাস করে যে জীবনযাপনের যেমন অধিকার আছে, তেমনি মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করারও অধিকার থাকা উচিত। ভিক্টর ব্যানার্জির মন্তব্যেও এই দর্শনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি চান না যে একজন মানুষ তার মানবিক মর্যাদা হারিয়ে, কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হোক।
এবার আসি তাঁর সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং হাস্যরসাত্মক মন্তব্যে, "তাই আবোল তাবোল খাওয়া উচিত… সুখে যাতে মরতে পারি।" এই বাক্যটিতে ভিক্টর ব্যানার্জির জীবনদর্শনের সারমর্ম প্রকাশ পেয়েছে। "আবোল তাবোল খাওয়া" মানে স্বাস্থ্যবিধি বা চিকিৎসকের পরামর্শ না মেনে নিজের ইচ্ছামতো খাওয়াদাওয়া করা, জীবনকে উপভোগ করা, নিয়মকানুনের বেড়াজাল থেকে মুক্ত থাকা। আমাদের সমাজে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যতালিকায় নিষেধাজ্ঞার পরিমাণও বাড়তে থাকে। ডাক্তাররা বলেন এটা খাবেন না, ওটা খাবেন না, লবণ কম খান, চিনি এড়িয়ে চলুন, তেলমশলা বাদ দিন। এভাবে জীবন হয়ে ওঠে নানা নিষেধের সমষ্টি। কিন্তু ভিক্টর ব্যানার্জি প্রশ্ন করছেন, এই দীর্ঘায়ুর কী মূল্য যদি জীবনের সমস্ত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে বাঁচতে হয়?
তাঁর এই মন্তব্যে এক ধরনের বিদ্রোহ আছে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আছে। তিনি বলতে চাইছেন যে জীবনের গুণমান তার দৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নব্বই বছর বেঁচে থাকার চেয়ে সত্তর বছর পূর্ণভাবে, আনন্দের সঙ্গে বাঁচা অনেক ভালো। এই দর্শন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘায়ু-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত। আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষকে যেকোনো মূল্যে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু সেই জীবনযাপনের মান কেমন হবে, সেই প্রশ্ন অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। একজন মানুষ হয়তো নানা ওষুধের সাহায্যে, যন্ত্রের সাহায্যে বেঁচে আছেন, কিন্তু সেটা কি প্রকৃত অর্থে জীবন, নাকি নিছক অস্তিত্ব?
ভিক্টর ব্যানার্জি যখন বলছেন "সুখে যাতে মরতে পারি", তখন তিনি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছেন না, বরং একটি সুন্দর মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করছেন। একটি মৃত্যু যেখানে তিনি তার প্রিয় খাবারগুলো উপভোগ করেছেন, যেখানে তিনি তার ইচ্ছামতো জীবনযাপন করেছেন, যেখানে তিনি কারও বোঝা হননি, যেখানে তিনি তার মর্যাদা বজায় রেখেছেন। এটি এক ধরনের "সুন্দর মৃত্যু" বা "গুড ডেথ"-এর ধারণা যা মানুষের চিরকালের আকাঙ্ক্ষা। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনেও এই ধারণা রয়েছে। যোগশাস্ত্রে "ইচ্ছামৃত্যু"-র কথা বলা হয়েছে, যেখানে একজন যোগী তার ইচ্ছামতো দেহত্যাগ করতে পারেন। ভীষ্ম পিতামহ মহাভারতে শরশয্যায় শুয়ে নিজের মৃত্যুর শুভ সময় বেছে নিয়েছিলেন। এই সব উদাহরণে মৃত্যুর উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা প্রকাশ পায়।
ভিক্টর ব্যানার্জির এই উক্তি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে আমরা কেন বাঁচতে চাই এবং কীভাবে বাঁচতে চাই। জীবনের উদ্দেশ্য কি শুধুমাত্র দিন গুনে কাটানো, নাকি প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলা? আমাদের সমাজে বৃদ্ধদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত, তাতে তাদের প্রায়ই শিশুর মতো দেখা হয়। তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, তাদের পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব দেওয়া হয় না। "তোমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়" বলে তাদের প্রিয় খাবার থেকে বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যিনি সারাজীবন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছেন, তাকে কি এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো "অটোনমি" বা স্বায়ত্তশাসনের ধারণা। চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রে এটি একটি মৌলিক নীতি। প্রতিটি মানুষের নিজের শরীর এবং জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু বাস্তবে, বিশেষত বার্ধক্যে, এই অধিকার প্রায়ই অস্বীকার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা এবং চিকিৎসকরা "তোমার ভালোর জন্য" বলে সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন। ভিক্টর ব্যানার্জির মন্তব্য এই প্রথার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। তিনি বলছেন, আমার জীবন, আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত।
তাঁর এই হাস্যরসাত্মক কিন্তু গভীর মন্তব্যের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ দিকও প্রতিফলিত হয়। বাঙালি সংস্কৃতিতে খাদ্যের একটি বিশেষ স্থান আছে। আমাদের সমস্ত উৎসব, আনন্দ, দুঃখ সবকিছুতেই খাদ্য জড়িত। রসগোল্লা, সন্দেশ, মাছভাত, ইলিশ, চিংড়ি মালাইকারি এসব শুধু খাবার নয়, এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। একজন বাঙালির কাছে এই খাবারগুলো থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানো। ভিক্টর ব্যানার্জি হয়তো এই কথাই বলতে চাইছেন যে এই আনন্দগুলো ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ।
তবে এই দর্শনের সমালোচনাও সম্ভব। কেউ বলতে পারেন যে এটি এক ধরনের নিরাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। বার্ধক্যও জীবনের একটি স্বাভাবিক এবং মূল্যবান পর্যায়। অনেক মানুষ বার্ধক্যে এসেও অত্যন্ত সুখী এবং পরিপূর্ণ জীবনযাপন করেন। তারা নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটান, তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করেন, নতুন শখ আবিষ্কার করেন। বার্ধক্য মানেই অসহায়ত্ব নয়। অনেক বয়স্ক মানুষ শারীরিকভাবে সক্রিয় এবং মানসিকভাবে প্রাণবন্ত থাকেন। তাছাড়া, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জেরিয়াট্রিক কেয়ার (বৃদ্ধদের বিশেষ পরিচর্যা) বার্ধক্যের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত করেছে।
কিন্তু ভিক্টর ব্যানার্জি সম্ভবত সেই চরম বার্ধক্যের কথা বলছেন যেখানে মানুষ তার সমস্ত স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে কষ্টের। তিনি হয়তো ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার বা অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের কথা ভাবছেন যেখানে একজন মানুষ তার পরিচয় পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থায় জীবনযাপন সত্যিই অত্যন্ত কঠিন, শুধু রোগীর জন্য নয়, তার পরিবারের জন্যও। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর মন্তব্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত, ভিক্টর ব্যানার্জির এই উক্তি আমাদের জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের মূল্য তার দৈর্ঘ্যে নয়, তার গভীরতায়। প্রতিটি মুহূর্তকে পূর্ণভাবে বাঁচা, নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন করা, এবং মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করা প্রতিটি মানুষের অধিকার হওয়া উচিত। তাঁর কথায় যে হাস্যরস এবং হালকা ভাব আছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য এবং মানবিক দর্শন যা আমাদের সবার জন্য প্রযোজ্য।