ইউরোপীয়দের আগ্রাসনে আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতার অগণিত নিদর্শন হারিয়ে গেলেও রয়ে গিয়েছে তাদের জ্ঞানের বিস্ময় সেই যুগেই সূর্যগ্রহণের দিন-ক্ষণ নির্ভুলভাবে গণনা করা হত একটিও ভুল ছাড়া। বিজ্ঞানীরা এখন খুঁজে পাচ্ছেন সেই প্রাচীন মায়া সভ্যতার গণনার গোপন রহস্যের সূত্র।
প্রাচীন মায়া সভ্যতা আজও বিশ্ববিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময়। হাজার হাজার বছর আগে আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই তারা যে সূক্ষ্ম মহাকাশ গণনা করত, তা আজকের বিজ্ঞানীদেরও হতবাক করে দিয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সভ্যতার মানুষজন এমন এক পদ্ধতিতে সূর্যগ্রহণের দিন ও সময় নির্ধারণ করতেন, যা প্রায় নিখুঁত। সম্প্রতি আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ অ্যালব্যানির ভাষাবিদ জন জাস্টসন এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্কের প্রত্নতত্ত্ববিদ জাস্টিন লোরি মায়া সভ্যতার সেই রহস্যময় গণনাপদ্ধতির হদিস পেয়েছেন।
ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের আক্রমণে মায়া সভ্যতার বহু মূল্যবান নিদর্শন ধ্বংস হয়ে গেলেও, টিকে আছে কিছু বিরল প্রমাণ তার মধ্যে অন্যতম ড্রেসডেন কোডেক্স একটি ৭৮ পৃষ্ঠার প্রাচীন পুঁথি, যেখানে লেখা আছে জ্যোতির্বিদ্যা, ঋতুচক্র, চিকিৎসা এবং ধর্মীয় আচারবিধি সংক্রান্ত তথ্য। এখান থেকেই জানা যায়, মায়া গণকরা সূর্যগ্রহণের সময়, দিন এবং স্থায়িত্ব এমন নিখুঁতভাবে হিসাব করতেন যে কখনও ভুল হত না। তাঁদের ক্যালেন্ডারে ৭০০ বছরের সূর্যগ্রহণের পূর্বাভাস লিপিবদ্ধ থাকত—যা আধুনিক বিজ্ঞানের নির্ভুল হিসাবের সঙ্গেও মেলে।
তাঁদের পদ্ধতি অনুযায়ী, গ্রহণের পূর্বাভাসের জন্য ‘চন্দ্রমাস’ বা চাঁদের ঘূর্ণনচক্রের ওপর নির্ভর করা হত। একটি চন্দ্রমাসের দৈর্ঘ্য ধরা হত প্রায় ২৯.৫ দিন, এবং ৪০৫ চন্দ্রমাসের একটি সম্পূর্ণ চক্রের পর আবার নতুন হিসাব শুরু হতো বলে এত দিন ধারণা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মায়ারা ৪০৫ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন না—বরং ৩৫৮তম মাসেই নতুন চক্র শুরু করতেন। এতে গ্রহণের সময় ও পূর্বাভাসের মধ্যে ব্যবধান থাকত মাত্র ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট, যা আধুনিক কালের মানদণ্ডেও বিস্ময়কর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিচ্যুতি সংশোধন করতে তাঁরা কখনও ২২৩তম চন্দ্রমাসেও নতুন ছক শুরু করতেন, ফলে পরবর্তী গ্রহণের সময়ের পার্থক্য সর্বাধিক ১০ ঘণ্টা ১০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।
এই সূক্ষ্ম হিসাবের ফলে ৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১১৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টানা প্রায় ৮০০ বছরের সূর্যগ্রহণের পূর্বাভাস তারা সঠিকভাবে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আধুনিক গবেষকেরা এই হিসাবের সঙ্গে বর্তমান বৈজ্ঞানিক ক্যালেন্ডারের তুলনা করে দেখেন—১৩৪ বছরের ব্যবধানে মায়াদের গণনায় ভুলের পরিমাণ মাত্র ৫১ মিনিট!
তবে এই নির্ভুল পূর্বাভাস মায়াদের কাছে কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রয়োগ ছিল না; ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীকও। সূর্যগ্রহণকে তাঁরা দেবতার দুর্বলতা হিসেবে দেখতেন। তাই প্রতিবার গ্রহণের সময় সূর্যদেবকে শক্তিশালী করতে রক্ত উৎসর্গ, উপাচার ও যজ্ঞের আয়োজন করতেন। এই সিদ্ধান্ত নিতেন সমাজের পুরোহিত ও শাসকেরা।
আজকের বিজ্ঞানের চোখে মায়া সভ্যতার এই সাফল্য কেবল প্রাচীন জ্ঞানের নিদর্শন নয়, বরং মানবজাতির মহাকাশ-চিন্তার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। প্রযুক্তিহীন যুগে আকাশ-গণনায় এমন নির্ভুলতা অর্জন তাঁদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের গভীর উপলব্ধির প্রমাণ। আধুনিক গবেষকরা মনে করেন, মায়া সভ্যতার মানুষ কেবল সংখ্যা নয়, মহাবিশ্বের সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগের মাধ্যমেই এই সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছিলেন—যেখানে বিজ্ঞান আর বিশ্বাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।