ভারতীয় ক্রিকেটে আলোচনা তুঙ্গে বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মা কি সত্যিই টেস্ট দলে ফিরে আসছেন? এই জল্পনাকে আরও উসকে দিলেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক কেভিন পিটারসন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই গুঞ্জন যদি সত্যি হয়, তাহলে ভারতীয় ক্রিকেটকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। তাঁর মতে, কোহলি ও রোহিতের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা টেস্ট ফরম্যাটে ফিরে এলে দলের অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা ও বড় ম্যাচের প্রস্তুতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। পিটারসন জানান, টেস্ট ক্রিকেটই আসল ক্রিকেট, আর এই ফরম্যাটে বড় তারকাদের উপস্থিতি খেলাটিকে আরও মর্যাদা দেয়। কোহলি ও রোহিত বহু বছর ধরে ভারতের সাফল্যের মূল স্তম্ভ। তাঁদের অভিজ্ঞতা তরুণ ক্রিকেটারদের শেখার অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং দলের ব্যাটিং অর্ডারকে আরও শক্তিশালী করবে। ভারতীয় ক্রিকেটে সাম্প্রতিক প্রজন্ম বদলের প্রক্রিয়া চললেও, পিটারসন মনে করেন যে বড় ম্যাচ জিততে গেলে সিনিয়রদের উপস্থিতি অমূল্য। কোহলি রোহিত টেস্টে ফিরলে ভারতের ব্যাটিং আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে দলের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এই মন্তব্যের পর ক্রিকেট মহলে জল্পনা, উত্তেজনা ও প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে।
ভারতীয় ক্রিকেটে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুই মহাতারকা—বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মা। সাম্প্রতিক রিপোর্ট ও গুঞ্জনে উঠে এসেছে, দুই কিংবদন্তি ব্যাটার নাকি টেস্ট ক্রিকেটে ফিরতে পারেন আসন্ন সিরিজগুলোয়। যদিও বিসিসিআই কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি, তবে ক্রিকেট মহলে এই খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই জল্পনাকে নতুন মাত্রা দিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক মহাতারকা কেভিন পিটারসন।
পিটারসন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—
“যদি কোহলি ও রোহিত সত্যিই টেস্টে ফিরতে চান, তাহলে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এমন মানের খেলোয়াড়েরা যখন ফিরে আসে, তা দেশের ক্রিকেটকে নতুন শক্তি দেয়।”
এই মন্তব্যের পর পুরো ক্রিকেটবিশ্বের দৃষ্টি আবার ঘুরে গেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। কারণ কোহলি ও রোহিত কেবল ব্যাটসম্যান নন—তাঁরা এক যুগের প্রতীক, ভারতীয় ক্রিকেটের স্তম্ভ এবং ম্যাচ উইনার। রেড–বল ক্রিকেটে তাঁদের উপস্থিতি দলের মানসিক স্থিতি, ব্যাটিং অর্ডারের দৃঢ়তা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নতিতে বিশাল ভূমিকা রাখে। বর্তমানে যখন ভারত ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (WTC) সাইকেলে কঠিন লড়াইয়ের মুখে, তখন এই দুই মহাতারকার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন কেবল একটি খবর নয়, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের 'গেম চেঞ্জার' হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে।
এই প্রতিবেদনে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে—পিটারসনের মন্তব্যের গভীরতা, কেন এই প্রত্যাবর্তন এত গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের বর্তমান টেস্ট দলে এর প্রভাব কী হতে পারে এবং WTC-তে ভারতের সম্ভাবনা কেমন হবে।
কেভিন পিটারসন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম ব্যতিক্রমী ব্যাটসম্যান এবং একজন স্পষ্টবাদী বিশ্লেষক। তাঁর মতামত মানেই ক্রিকেটবিশ্বে আলোড়ন। কোহলি-রোহিতের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল খুবই দৃঢ় এবং কৌশলগত:
১. কোহলি–রোহিত টেস্ট ক্রিকেটের সম্পদ: পিটারসনের মতে, “এমন দুই ব্যাটসম্যান টেস্ট দলে ফিরে এলে দল শুধু শক্তিশালী নয়, আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।” তাঁর মতে, এই দুইজনের মতো 'সুপারস্টারদের' উপস্থিতি টেস্ট ক্রিকেটের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য জরুরি।
২. অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই (Irreplaceable Experience): তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যে পরিস্থিতিতে তরুণরা সংগ্রাম করে, সেখানে কোহলি–রোহিতের মতো অভিজ্ঞরা ম্যাচ পড়ে নিতে পারে এবং জয়ের রাস্তা খুলে দিতে পারে।” বিদেশের কঠিন পিচে, যেখানে মানসিক দৃঢ়তা সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেখানে তাঁদের 'মেন্টাল টাফনেস' অমূল্য।
৩. দলের ব্যালান্স সম্পূর্ণ বদলে যাবে: পিটারসনের দাবি, কোহলি ও রোহিত ফিরলে ব্যাটিং অর্ডারে স্থিতিশীলতা (Stability) আসবে।
* রোহিত শর্মা: শুরুতে তাঁর উপস্থিতি ইনিংসকে গাইড করতে সাহায্য করবে এবং দ্রুত রান তোলার ভিত গড়বে।
* বিরাট কোহলি: মধ্যমণি হয়ে তিনি কঠিন পরিস্থিতিতে বড় ইনিংস গড়বেন।
৪. বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বড় সুবিধা: তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “ভারতের লক্ষ্য যদি আবার WTC ফাইনালে পৌঁছানো হয়, তাহলে সিনিয়রদের দক্ষতা ও মস্তিষ্ক খুব জরুরি।”
এই প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব বহুস্তরীয়, যা কেবল পয়েন্ট টেবিলের বাইরেও দলের সামগ্রিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করবে।
বিরাট কোহলি: ৮৬ টেস্টে ২৯টি শতরান (Century), এবং কঠিন পরিস্থিতিতে রান করার রেকর্ড তাঁকে সর্বকালের সেরাদের একজন করেছে।
রোহিত শর্মা: ওপেনার হিসেবে ৪০+ গড়, বিশেষত ঘরের মাঠে তাঁর দ্বিশতরান করার রেকর্ড তাঁকে ব্যতিক্রমী করেছে।
প্রমাণিত পারফরম্যান্স: অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা—সব জায়গায় তাঁদের ম্যাচ জেতানোর অভিজ্ঞতা ভারতকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছে।
বর্তমানে ভারতের টপ–অর্ডার একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে:
শুভমন গিলের ফর্মে ধারাবাহিকতার অভাব।
যশস্বী জেসওয়াল নতুন হলেও তাঁর অভিজ্ঞতা কম।
শ্রেয়স আইয়ার, পূজারা, রাহানের মতো নামগুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মুখে।
এই অস্থিরতার মাঝে কোহলি ও রোহিতই দলের মেরুদণ্ড (Backbone) হতে পারেন, যা দলকে একটি শক্ত ভিত দেবে।
জেসওয়াল, গিল, সারফরাজ, রুটুরাজ—এই তরুণরা যদি ড্রেসিং রুমে কোহলি–রোহিতের সঙ্গে থাকে, তবে তাদের উন্নতি হবে দ্রুত। এই 'মেন্টরশিপ' (Mentorship) অমূল্য:
ম্যাচ রিডিং ও কৌশল: কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে ইনিংস বিল্ডিং করতে হয়।
ফিটনেস ও মানসিক দৃঢ়তা: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমানের ফিটনেস রুটিন ও মানসিক স্থিতি।
অনেকেই মনে করেন ভারতীয় ক্রিকেটে একটি “জেনারেশন শিফট”–এর নীতি চলছে। তবে পিটারসনের মতে, এই নীতিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে:
“জেনারেশন শিফট মানে সিনিয়রদের বাদ দেওয়া নয়, বরং তাঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণদের মিশিয়ে ভারসাম্য (Balance) তৈরি করা।”
এই ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারতের জন্য সেরা মিশ্রণ কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি:
| ব্যাটিং স্লট | সম্ভাব্য খেলোয়াড় | ভূমিকা |
| ওপেনার | রোহিত শর্মা, যশস্বী জেসওয়াল/শুভমন গিল | দৃঢ় শুরু ও গাইড করা |
| ৩ নং | বিরাট কোহলি | দলের অ্যাঙ্কর এবং স্থিতিশীলতা |
| ৪, ৫, ৬ নং | জেসওয়াল/গিল/সারফরাজ/ঋষভ পন্ত | আক্রমণাত্মক খেলা ও স্কোরিংয়ে গতি যোগ করা |
এই ব্যাটিং লাইন–আপ বিশ্বের যেকোনো দলের বিপক্ষে সক্ষম এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের একটি আদর্শ মিশ্রণ তৈরি করতে পারে।
আজকের ক্রিকেট টি–২০, আইপিএল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ভরপুর। টেস্ট ক্রিকেটে দর্শক সংখ্যা কমছে—এটা অস্বীকার করা যায় না।
পিটারসনের এই মন্তব্যটি শুধুমাত্র ভারতের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ:
“টেস্ট বাঁচবে সুপারস্টারদের জন্যই। কোহলি–রোহিতদের মতো খেলোয়াড়েরা খেললে ফরম্যাট বাঁচবে, গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।”
তাঁর বক্তব্য ক্রিকেট প্রশাসন ও ভক্তদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যে, টেস্ট ক্রিকেটের আবেদন ধরে রাখতে শীর্ষ তারকাদের নিয়মিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২০২৩ সালের ফাইনালের হার এখনো ভারতের মনে ব্যথা দিয়েছে। ২০২৫ সালের ফাইনাল চোখের সামনে। WTC-এর নতুন সাইকেলে ভারতকে কঠিন সিরিজের সম্মুখীন হতে হবে—অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড। এই সিরিজগুলো জেতার জন্য প্রয়োজন:
অভিজ্ঞতা ও মেন্টাল টাফনেস: বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার মানসিক শক্তি।
বড় ইনিংস: ম্যাচ জেতানোর মতো বড় সেঞ্চুরি করার ক্ষমতা।
কোহলি–রোহিতই এই তিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তাঁদের প্রত্যাবর্তন ভারতের 'পয়েন্ট পারসেন্টেজ' (Points Percentage) বাড়িয়ে WTC ফাইনালের পথ মসৃণ করতে পারে।
পিটারসনের মন্তব্যের কারণে এই জল্পনা এখন আর শুধু গুঞ্জন নয়, এটি একটি বাস্তবসম্মত আলোচনায় পরিণত হয়েছে:
১. বিশ্লেষণ ও অভিজ্ঞতা: তিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং নিখুঁত বিশ্লেষক, যিনি ভারতীয় ক্রিকেটকে খুব ভালো বোঝেন এবং আইপিএলে বহু বছর খেলেছেন।
২. প্রভাব: তাঁর মন্তব্য অকারণে হয় না, তিনি যখন কোনো বিষয়ে গুরুত্ব দেন, তখন ক্রিকেট প্রশাসনও সতর্ক হয়।
তাই কোহলি–রোহিতের টেস্টে ফেরার সম্ভাবনা এখন আরও জোরালো হয়েছে।
কেভিন পিটারসনের মন্তব্য ভারতীয় ক্রিকেটে একটি বড় বার্তা দিয়েছে—এমন দুই মহাতারকার টেস্টে ফেরা হলে সেটাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সময়ই বলে দেবে তাঁরা ফিরছেন কি না, কিন্তু যদি ফেরেন—
ভারতের ব্যাটিং হবে আরও শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল।
দলের অভিজ্ঞতা হবে সমৃদ্ধ, যা তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে।
WTC–এর লড়াই পাবে নতুন মাত্রা এবং জনপ্রিয়তাও বাড়বে।
কোহলি ও রোহিত ভারতের ক্রিকেটের আত্মা—তাঁদের প্রত্যাবর্তন মানে একটি যুগের পুনর্জন্ম এবং ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটের সোনালি ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন আশা।