Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সমকামী বিয়ের বাস্তবতা পর্দায় সাহসী চরিত্র ফুটিয়ে তুললেন লিলি চক্রবর্তী

সমকামী দাম্পত্য নিয়ে কখনও বিশেষ মাথা ঘামাননি লিলি চক্রবর্তী। তবে সমাজে এমন বহু যুগলকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েন, একসঙ্গে থাকা আর শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর মনে। নতুন ছবিতে সেই সাহসী বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী।

সমকামী বিয়ের বাস্তবতা পর্দায় সাহসী চরিত্র ফুটিয়ে তুললেন লিলি চক্রবর্তী
Tollywood News

ষাট বছর আগে সমাজ কেমন ছিল? তখনকার দিনের মানুষ কতটা আধুনিক ছিলেন? তৃতীয় লিঙ্গ, রূপান্তরকামী কিংবা সমকামী—এই তিনটি সত্ত্বার অস্তিত্ব আজকের মতোই তখনও ছিল। তবে তাঁদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কি বদলেছে? পরিচয়, সম্পর্ক, বিয়ে এবং সামাজিক স্বীকৃতি—এ সবকিছুতেই কি বাস্তব কোনও অগ্রগতি হয়েছে? নাকি ছুতমার্গ, গোপন বিরোধিতা এবং নীরব বিচ্ছেদ আজও সমাজের বুননে রয়ে গিয়েছে?

এই জটিল প্রশ্নগুলোকেই সামনে আনতে চলেছেন পরিচালক অভিজ্ঞান মুখোপাধ্যায়। তাঁর নতুন অ্যান্থোলজি ‘অনুমানের ভিত্তিতে’ চারটি ভিন্ন গল্পে নির্মিত হলেও, একটি গল্প বিশেষভাবে আলোচনা তৈরি করেছে ইতিমধ্যেই। সেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমকামী সম্পর্ক—যা সমাজে এখনও উচ্চারণ করতে গেলে বহু মানুষের গলায় কাঁপন ধরে। সেই সাহসী চরিত্রেই অভিনয় করছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী। ৮৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও ভয়ের সামনে মাথা নত করেননি তিনি; বরং নিজের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের মতোই বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকেও সামনে এনেছেন অকপটে।

আনন্দবাজার ডট কম তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিল—সমাজে এখনও সমকামীদের নিয়ে ছুতমার্গ দেখা যায়। তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি কী? কোনও আপত্তি আছে কি? বর্ষীয়ান অভিনেত্রী একটুও থেমে না থেকে বলেন, “এ বিষয়ে কোনও দিনই মাথা ঘামাইনি। হ্যাঁ, দেখেছি এ রকম যুগলকে। পরে যদিও তাঁরা আলাদা হয়ে গিয়েছেন। তাঁদের আলাদা বিয়ে হয়েছে। দিব্য সংসার করেছেন তাঁরা। পুরনো কথা মনেও রাখেননি।” তাঁর এই সরল কথা একদিকে যেমন সমাজকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে, অন্যদিকে মানবসম্পর্কের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকেও সামনে আনে।

সমকামী বিবাহ সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট মত, সমকামী বিয়েতে দুই পুরুষ বা দুই নারী একত্রবাস করবেন। এর বেশি আর কী?সমাজ যেখানে সম্পর্কের গভীরতা বুঝে ওঠার আগেই ছুঁড়ে দেয় অবাঞ্ছিত প্রশ্ন, সেখানে লিলির এই সহজ দৃষ্টিভঙ্গি যেন বহু মানুষের অব্যক্ত কথাকে প্রকাশ করে দেয়। তাঁর মতে, দুটি মানুষ যদি স্বেচ্ছায় এবং পরস্পরকে সম্মান করে একত্রে থাকতে চান, তাহলে সেটাই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। লিঙ্গ, যৌনতা বা সমাজের মানদণ্ড সেখানে মুখ্য নয়।

অভিজ্ঞানের ছবিতে লিলি চক্রবর্তীকে দেখা যাবে তাঁর এক বান্ধবীর সঙ্গে প্রান্তবয়সে পুনর্মিলনের গল্পে। দু’জন প্রেমিকাই বহু বছর পরে আবার মুখোমুখি হবেন। ফিরে দেখবেন তাঁদের ফেলে আসা দিন, অপূর্ণ অনুভূতি, সেই সময়ের সমাজের বাঁধাধরা রীতি এবং ব্যক্তিগত সংগ্রাম। এই চরিত্রে লিলির উপস্থিতি যেন নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মিল খুঁজে পায়। কারণ তিনি নিজে স্বীকার করেছেন, জীবনে এমন সমকামী দম্পতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে যারা আবার ভেঙে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনেও ফিরে গেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়কে আরও বাস্তব করে তুলবে—এমনটাই আশা সিনেমাপ্রেমীদের।

পরিচালক অভিজ্ঞান মুখোপাধ্যায়ের দাবি, এই ছবিতে লিলির চরিত্র শুধু সম্পর্কের দিক থেকেই নয়, ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও ব্যতিক্রমী। তিনি এই ছবিতে একজন ফুড ব্লগার! বয়সের বেড়াজাল ভেঙে নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন করেন তিনি। রান্না, লেখা এবং জীবনের প্রতি তাঁর সহজ ভালোবাসা গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করবে। প্রশ্ন উঠতেই অভিনেত্রী হেসে বলেন, বাড়িতে নাইটি পরে আছি, এ রকম দেখানো হবে শুনেছি। বাকিটা শাড়িতেই সাজব। তাঁর এই মজার উত্তর মন জয় করে নেয় সকলের।

সমকামী সম্পর্ক নিয়ে এ দেশে বিতর্ক নতুন নয়। আইনগত লড়াইয়ে বহু বাধা অতিক্রম করে সমকামীদের অধিকার স্বীকৃতি পেলেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আজও সন্তোষজনক নয়। পরিবারের চাপ, সমাজের দৃষ্টি, রীতি-নীতির অচলাবস্থা—এই সবকিছুর মাঝে বহু মানুষ আজও নিজেদের প্রকৃত ভালোবাসা লুকিয়ে বাঁচতে বাধ্য হন। অভিজ্ঞান মুখোপাধ্যায়ের নতুন অ্যান্থোলজি ‘অনুমানের ভিত্তিতে’ সেই লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণা, দ্বিধা, ভয় এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকেই সামনে আনতে চলেছে।

ছবিটির অন্যতম শক্তি হল এর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে সমকামিতা কেবল একটি যৌন অভিমুখ নয়, বরং গভীর আবেগ, সম্পর্ক, স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সংগ্রামকে তুলে ধরে। চারটি ভিন্ন গল্পের সমাহারে গড়ে ওঠা এই অ্যান্থোলজির একটি গল্পে দেখা যাবে দুই নারীর প্রান্তবয়সে এসে ফেলে আসা ভালোবাসাকে নতুন করে ফিরে দেখার যাত্রা। সেই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী, যিনি তাঁর ৮৪ বছর বয়সেও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে এই চরিত্রে অভিনয় করছেন।

ছবিতে সমকামী সম্পর্কের বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে পরিচালক প্রশ্ন তুলেছেন—সমাজ আসলে কতটা বদলেছে? ষাট বছর আগের পৃথিবীতে সমকামী মানুষ ছিলেন, আজও আছেন। তবে তাঁদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কি সত্যিই আধুনিক হয়েছে? মানুষ কি সত্যিই স্বাধীনভাবে নিজের সম্পর্ক বেছে নিতে পারছে? নাকি শুধু আধুনিকতার মুখোশ পরে আমরা আগের মতোই সংকীর্ণ?

news image
আরও খবর

লিলি চক্রবর্তী নিজেও বাস্তব জীবনে এমন অনেক সমকামী যুগলকে দেখেছেন বলে জানান। তাঁদের সম্পর্কে ওঠানামা, বিচ্ছেদ, আলাদা পথে চলা—সবই তাঁর কাছে জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। তাই এই গল্পে অভিনয় করতে তাঁর কোনও মানসিক দ্বিধা ছিল না। বরং চরিত্রকে বাস্তব ধার দেওয়ার জন্য নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকেই কাজে লাগিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, “দুই মানুষ যদি একসঙ্গে থাকতে চান, তাতেই সম্পর্কের মূল পূর্ণতা। এর বেশি কিছু নিয়ে অযথা জটিলতা তৈরির কোনও মানে নেই।”

সমাজের চোখে সমকামী সম্পর্ক এখনও অনেক সময় ‘ট্যাবু। পরিবারের কাছেও গ্রহণযোগ্য না হওয়ার ভয় মানুষের মনকে আরও সংকুচিত করে। ‘অনুমানের ভিত্তিতে’ সেই অন্ধকার জায়গায় আলো ফেলবে—যেখানে সম্পর্কের গভীরতা, স্মৃতির টান, পুরনো দিনের পরিচয় এবং অসমাপ্ত অনুভূতি মিলেমিশে এক মানবিক গল্পের জন্ম দেয়।

ছবিতে লিলি চক্রবর্তীর চরিত্র একজন অভিজ্ঞ ফুড ব্লগার—যিনি জীবনের শেষ প্রান্তেও নিজের স্বাধীনতা, সরলতা এবং জীবনযাপনের প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছেন। তাঁর দৈনন্দিন পোশাক-পরিচ্ছদ সাধারণ, আচার-আচরণে নেই কোনও আড়ম্বর। তিনি নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেন এক শান্ত, সুষম এবং মননশীল জীবনের দিকে। তবে এই নীরব জীবনের ভিতরেই লুকিয়ে আছে অগোছালো স্মৃতি, অনুচ্চারিত অনুভূতি এবং বহুদিনের অপ্রকাশিত ভালোবাসা।

এমন সময় তাঁর জীবনে ফিরে আসে এক পুরনো বান্ধবী—যিনি একই সঙ্গে তাঁর প্রেমিকা ছিলেন বহু বছর আগে। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁদের পুনর্মিলন কেবল আবেগের দ্বারই খুলে দেয় না, খুলে দেয় আত্মঅন্বেষণের পথও। তাঁরা ফিরে তাকান অতীতে—যেখানে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কঠোর, সম্পর্ক ছিল নিষিদ্ধ, আর দুই নারীর ভালোবাসা ছিল সাহসের বিষয়। সেই সব স্মৃতি আবার ভেসে ওঠে আজকের দিনে, যখন তাঁরা দু’জনেই জীবনের শেষ অধ্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। দুই মানুষের আভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, ফেলে আসা ভুল-ঠিক, অপূর্ণ ইচ্ছে এবং না বলা কথাগুলোই তাঁদের পুনর্মিলনকে আরও গভীর করে তোলে।

এই অংশে দর্শক উপলব্ধি করবেন—বয়স যতই বাড়ুক, হৃদয়ের বয়স কখনও বাড়ে না। স্মৃতি, ভালোবাসা, ব্যথা—এসবই মানুষের চরিত্রকে গড়ে তোলে এবং চিরকাল তরুণ রেখেই এগিয়ে নিয়ে যায়। লিলি চক্রবর্তীর নিখুঁত অভিনয় সেই আবেগকে যে কতটা বাস্তব করে তুলবে, তা ভাবতেই দর্শকরা উৎসুক হয়ে উঠছেন।

অন্যদিকে, ছবিটির বৃহত্তর প্রশ্ন সমাজকে সরাসরি আঘাত করে। সম্পর্কের স্বাধীনতা কি সত্যিই অর্জিত হয়েছে? আদালত যখন সমকামীদের অধিকার স্বীকৃতি দেয়, তখন সমাজ কি সেই পথ অনুসরণ করে? নাকি বাহ্যিক আধুনিকতার আড়ালে আজও লুকিয়ে আছে কুসংস্কার, ঘৃণা এবং সংকীর্ণতা? পরিচালক অভিজ্ঞান মুখোপাধ্যায়ের 'অনুমানের ভিত্তিতে' এই প্রশ্নগুলোকেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

ষাট বছর আগের সমাজ থেকে আজকের সমাজ—ভিন্নতার আড়ালে মিল কোথায়? মানুষের মন কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু পরিবর্তনের ভান করছে? চলচ্চিত্রটি সেই অদৃশ্য দ্বন্দ্বকেই তুলে ধরে—যেখানে ব্যক্তিগত ভালোবাসা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার সংঘর্ষে জন্ম নেয় বাস্তব মানবিক নাটক।

সিনেমাপ্রেমীরা ইতিমধ্যেই অপেক্ষা করছেন এই সাহসী প্রয়াসের জন্য। কারণ এখানে শুধু সমকামী সম্পর্ক নয়, তুলে ধরা হচ্ছে মানুষের অনুভূতির গভীরতা, স্মৃতির টান, অতীতের দায় এবং বর্তমানের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। একটি সম্পর্কের গল্পই হয়ে ওঠে বৃহত্তর সমাজের আয়না—যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের মতো করে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়।

অবশেষে, ‘অনুমানের ভিত্তিতে’ শুধুই একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি সমাজের ও মানুষের মানসিকতার বিবর্তনকে তুলে ধরার এক সংবেদনশীল প্রচেষ্টা। দর্শকের মনে এটি নিঃসন্দেহে গভীর ছাপ ফেলবে—আর প্রশ্ন তুলবে, আমরা কি সত্যিই আধুনিকতায় পৌঁছেছি, নাকি এখনো পরিবর্তনের পথে প্রথম ধাপেই থেমে আছি?

Preview image