এখনও দ্রুত দৌড়োতে পারছেন না মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। তাই তাঁকে খেলিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না চেন্নাই সুপার কিংস কর্তৃপক্ষ। দলের সঙ্গে সব জায়গায় যাচ্ছেনও না ভারতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক।
ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি শুধুমাত্র একজন সফল অধিনায়ক নন, তিনি কোটি কোটি মানুষের আবেগের নাম। মাঠের ভেতরে তাঁর শান্ত স্বভাব, কঠিন পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দলের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে তিনি “ক্যাপ্টেন কুল” হিসাবেই পরিচিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স যেমন বেড়েছে, তেমনই শরীরের উপর চাপও বেড়েছে। বর্তমানে পায়ের চোটের কারণে তিনি পুরোপুরি ফিট নন বলেই জানা গিয়েছে। সেই কারণেই আইপিএলের অর্ধেক মরসুম কেটে গেলেও এখনও চেন্নাই সুপার কিংসের জার্সিতে মাঠে নামতে পারেননি ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। যদিও ব্যাটিং কিংবা উইকেটকিপিংয়ে তাঁর বিশেষ সমস্যা হচ্ছে না, কিন্তু দ্রুত দৌড়তে পারছেন না বলেই তাঁকে নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
ধোনির অনুপস্থিতিতে চেন্নাই সুপার কিংসের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হলেও তাঁকে নিয়ে আগ্রহ একটুও কমেনি। কারণ ধোনি শুধু ক্রিকেটার নন, তিনি ভারতীয় ক্রীড়া জগতের এক বিশাল ব্র্যান্ড। মাঠের বাইরে তাঁর জনপ্রিয়তা এখনও আকাশছোঁয়া। তাই চোটের কারণে মাঠে নামতে না পারলেও তিনি খবরের শিরোনামে রয়েছেন অন্য একটি বড় কারণে। সম্প্রতি জানা গিয়েছে যে ভারতীয় আয়কর দফতরের বিহার-ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি আয়কর প্রদানকারী ব্যক্তিগত করদাতা হয়েছেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এই অঞ্চলে ব্যক্তিগত করদাতাদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন তিনি। এই তথ্য সামনে আসতেই ধোনিকে নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে।
ভারতীয় আয়কর বিভাগের বিহার-ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের প্রিন্সিপাল চিফ কমিশনার ডি সুধাকর রাও জানিয়েছেন যে চলতি অর্থবর্ষে এই অঞ্চলে মোট ব্যক্তিগত কর আদায়ের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঝাড়খণ্ড থেকেই সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। আর এই বিশাল করদাতাদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ধোনি। যদিও তিনি ব্যক্তিগত ভাবে কত টাকা আয়কর দিয়েছেন সেই অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এই তথ্যই প্রমাণ করে দেয় যে ক্রিকেট মাঠের বাইরেও তাঁর আর্থিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী।
মহেন্দ্র সিংহ ধোনির জীবনযাত্রা বরাবরই সাধারণ মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার। রাঁচির ছোট শহর থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। জীবনের শুরুতে তিনি ভারতীয় রেলের টিকিট পরীক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। সেই সময় কেউ ভাবতেও পারেননি যে একদিন এই মানুষটিই ভারতকে বিশ্বকাপ জেতাবেন এবং দেশের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবেন। ধোনির এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে অসীম পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর শৃঙ্খলা। আর সেই কারণেই আজ তিনি শুধু ক্রিকেটার নন, সফল উদ্যোক্তা ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত।
ক্রিকেট থেকে বিপুল আয় করার পাশাপাশি ধোনির রয়েছে একাধিক ব্যবসায়িক বিনিয়োগ। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, ফিটনেস ব্র্যান্ড, স্পোর্টস টিম, রিয়েল এস্টেট এবং কৃষি সংক্রান্ত উদ্যোগেও বিনিয়োগ করেছেন তিনি। ফলে ক্রিকেট না খেললেও তাঁর আয়ের পরিমাণ কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই কারণেই আয়কর প্রদানের তালিকায় তিনি শীর্ষস্থানে উঠে এসেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ধোনির জনপ্রিয়তা যে কতটা গভীর, তা বোঝা যায় আইপিএলের প্রতিটি মরসুমে। তিনি মাঠে নামলেই স্টেডিয়ামে “ধোনি ধোনি” ধ্বনি শোনা যায়। চেন্নাইয়ের সমর্থকরা তাঁকে দেবতার মতো সম্মান করেন। শুধু চেন্নাই নয়, গোটা ভারতবর্ষেই তাঁর অসংখ্য ভক্ত রয়েছে। এমনকি বিদেশেও তাঁর জনপ্রিয়তা বিস্তৃত। আইপিএলে তিনি শেষ দিকে ব্যাট করতে নামলেও দর্শকদের উন্মাদনা থাকে তুঙ্গে। তাই তাঁর চোটের খবর সমর্থকদের কিছুটা চিন্তায় ফেলেছে।
তবে ধোনির কাছের মহল সূত্রে জানা যাচ্ছে যে তিনি নিয়মিত ফিটনেস ট্রেনিং চালিয়ে যাচ্ছেন। দ্রুত সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করছেন। চিকিৎসক এবং ফিজিওদের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে অনুশীলন করছেন তিনি। কারণ ধোনি জানেন যে আইপিএলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর অভিজ্ঞতা দলের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চেন্নাই সুপার কিংসের ড্রেসিংরুমে তাঁর উপস্থিতিই অনেক বড় শক্তি। তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য তিনি এখনও পথপ্রদর্শক।
ভারতীয় ক্রিকেটে ধোনির অবদান নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তাঁর নেতৃত্বেই ভারত ২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১১ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছিল। বিশ্বের একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে আইসিসির তিনটি বড় ট্রফি জয়ের নজির রয়েছে তাঁর নামে। এছাড়া টেস্ট ক্রিকেটেও ভারতকে এক নম্বর স্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। উইকেটের পিছনে তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আজও কিংবদন্তির পর্যায়ে রয়েছে।
অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞের মতে, ধোনির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মানসিক দৃঢ়তা। ম্যাচ যত কঠিন হতো, তিনি তত বেশি শান্ত থাকতেন। চাপের মুখে কীভাবে ম্যাচ শেষ করতে হয় তা তিনি বহুবার দেখিয়েছেন। তাঁর হেলিকপ্টার শট আজও ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় শট হিসেবে বিবেচিত হয়। তরুণ ক্রিকেটাররা এখনও তাঁর ভিডিও দেখে শেখার চেষ্টা করেন।
ধোনির আয়কর প্রদানের খবর সামনে আসার পর সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। অনেকেই বলেছেন যে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ধোনি সবসময় উদাহরণ তৈরি করেন। একজন সৎ করদাতা হিসেবে তাঁর এই ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেয়। কারণ দেশের উন্নয়নের জন্য কর প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন তারকা ক্রিকেটার হিসেবে ধোনির এই ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে।
ভারতের বহু তারকা খেলোয়াড় এবং অভিনেতার বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে কর সংক্রান্ত বিতর্ক সামনে আসে। কিন্তু ধোনির ক্ষেত্রে বরাবরই দেখা গিয়েছে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি। তিনি কখনও অযথা বিতর্কে জড়াতে পছন্দ করেন না। নিজের ব্যক্তিগত জীবনও অনেকটাই গোপন রাখেন। পরিবার, বাইক, পোষ্য প্রাণী এবং কৃষিকাজ নিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসেন তিনি। রাঁচির ফার্মহাউসে তাঁর সাধারণ জীবনযাত্রা বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা।
ধোনির কৃষির প্রতি আগ্রহও এখন আলোচনার বিষয়। অবসর জীবনে তিনি জৈব চাষ এবং কৃষি উৎপাদনে মন দিয়েছেন। বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফল এবং দুগ্ধ উৎপাদনের কাজও করছেন। স্থানীয় মানুষদের কর্মসংস্থান তৈরিতেও তিনি ভূমিকা নিচ্ছেন বলে জানা যায়। ফলে শুধুমাত্র ক্রিকেট নয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ধীরে ধীরে বাড়ছে।
আইপিএলে ধোনির ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন জল্পনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন এটাই হয়তো তাঁর শেষ মরসুম হতে পারে। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন যে তিনি পুরোপুরি ফিট হয়ে আরও এক বা দুই মরসুম খেলতে পারেন। তবে ধোনি নিজে এ বিষয়ে কখনও স্পষ্ট মন্তব্য করেননি। তিনি বরাবরই নিজের সিদ্ধান্ত গোপন রাখতে পছন্দ করেন। তাই সমর্থকরা এখনও আশায় রয়েছেন যে তাঁকে আরও কিছুদিন মাঠে দেখা যাবে।
চেন্নাই সুপার কিংসের সাফল্যের সঙ্গে ধোনির নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর নেতৃত্বে দলটি একাধিকবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দলের প্রতি তাঁর নিবেদন এবং ক্রিকেট সম্পর্কে গভীর জ্ঞান চেন্নাইকে সবসময় শক্তিশালী করে তুলেছে। তরুণ ক্রিকেটারদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা বিশাল। রবীন্দ্র জাডেজা, ঋতুরাজ গায়কোয়াড়, শিবম দুবে সহ একাধিক ক্রিকেটার ধোনির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন বলে জানিয়েছেন।
ধোনির এই নতুন রেকর্ড প্রমাণ করে দেয় যে তিনি শুধু মাঠের নায়ক নন, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। সবচেয়ে বেশি আয়কর প্রদানকারী হওয়া শুধুমাত্র উচ্চ আয়ের প্রতীক নয়, এটি দায়িত্ববোধেরও পরিচয়। দেশের প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করার ক্ষেত্রে ধোনি আবারও উদাহরণ তৈরি করলেন।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে ধোনি শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটার নন, তিনি সফলতা এবং অধ্যবসায়ের প্রতীক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে কীভাবে সাফল্য পাওয়া যায়, ধোনির জীবন সেই শিক্ষাই দেয়। ছোট শহর থেকে উঠে এসে বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করা এবং পরে ব্যবসা ও সামাজিক ক্ষেত্রেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু ধোনি সেটাই করে দেখিয়েছেন।