বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে আজ জেলা শাসক, জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিক ও জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়। আবেদনের মূল দাবি ছিল বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে বসবাসকারী পথশিশুদের অবিলম্বে পুনর্বাসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সোসাইটির সম্পাদক প্রলয় মজুমদার জানান, ২০১৫ সালের শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অধিকার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। অথচ স্টেশন এলাকায় থাকা বহু শিশু বাধ্য হয়ে ভিক্ষা বা শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, যা শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন। দিনের আলোয় এমন পরিস্থিতি প্রকাশ্যে থাকলেও প্রশাসনিক উদ্যোগ না থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই পত্র প্রদান করা হয়।
বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা জেলার পথশিশুদের ভবিষ্যৎ এবং সুরক্ষার প্রশ্নে একটি জরুরি আবেদন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সোসাইটির পক্ষ থেকে জেলা শাসক, জেলা সমাজ কল্যান আধিকারিক এবং জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক পত্র প্রদান করা হয়েছে যেখানে বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে বসবাসরত পথশিশুদের অবিলম্বে পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপটি শুধুমাত্র একটি সামাজিক সংগঠনের দায়িত্ববোধের পরিচয় নয়, বরং এটি সমাজের প্রতি একটি আয়নার মতো কাজ করে যেখানে আমরা আমাদের সবচেয়ে অসহায় শিশুদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রকৃত চিত্র দেখতে পাই।
সোসাইটির সম্পাদক প্রলয় মজুমদার এই পত্রের মাধ্যমে যে বিষয়গুলি তুলে ধরেছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং আইনগতভাবে সুদৃঢ়। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে ২০১৫ সালের শিশু সুরক্ষা আইন অনুসারে প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার এবং স্বাস্থ্যের অধিকার সুনিশ্চিত হওয়া একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। এই আইনটি শুধুমাত্র কাগজে কলমে একটি আইনি দলিল নয়, বরং এটি প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকারের সংরক্ষণ এবং তাদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য একটি সাংবিধানিক গ্যারান্টি। শিশুরা যেহেতু জাতির ভবিষ্যৎ এবং আগামীর নাগরিক, তাই তাদের সুরক্ষা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রতিটি সভ্য সমাজের প্রথম কর্তব্য।
বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে যে শিশুরা বসবাস করছে তারা আমাদের সমাজব্যবস্থার সবচেয়ে অবহেলিত এবং প্রান্তিক অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এই শিশুগুলি প্রতিদিন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয় যা আমাদের সামাজিক বিবেকের প্রতি একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে, এই কোমলমতি শিশুরা তাদের শৈশব হারিয়ে ফেলছে। তারা ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের আত্মসম্মানবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং তাদের মানসিক বিকাশে গভীর আঘাত হানে। অনেক সময় তারা শ্রমিক হিসাবেও কাজ করতে বাধ্য হয়, যা শিশুশ্রম আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
এই পথশিশুদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি অত্যন্ত করুণ এবং মানবেতর। তারা যেখানে ঘুমায়, খায় এবং বসবাস করে সেই পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পরিষ্কার পানীয় জলের অভাব, স্যানিটেশন সুবিধার অনুপস্থিতি, চিকিৎসা সেবার অপ্রাপ্যতা এবং পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই শিশুরা বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে থাকে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। শীতকালে ঠান্ডা, গ্রীষ্মকালে প্রখর রোদ এবং বর্ষাকালে বৃষ্টির হাত থেকে তাদের কোন সুরক্ষা নেই। এই কঠোর আবহাওয়ায় তারা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এই শিশুদের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। শিক্ষা শুধুমাত্র সাক্ষরতা নয়, এটি একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির মূল ভিত্তি। যখন এই শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে ভিক্ষা করতে বা শ্রম করতে বাধ্য হয়, তখন তারা কেবল শিক্ষাগত সুযোগ হারায় না, বরং তাদের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়। শিক্ষার অভাব তাদের দারিদ্র্যের চক্রে আটকে রাখে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই দুর্দশা চলতে থাকে।
প্রলয় মজুমদার যখন বলেন যে কোনভাবেই শিশুর সুরক্ষা যাতে বিঘ্নিত না হয় তাও সুনিশ্চিত করা দরকার, তখন তিনি শিশু সুরক্ষার একটি বিস্তৃত ধারণার কথা বলছেন। সুরক্ষা মানে শুধু শারীরিক নিরাপত্তা নয়, এর সাথে জড়িত আছে মানসিক, আবেগিক এবং সামাজিক সুরক্ষাও। রেলওয়ে স্টেশনের মতো জনবহুল এবং অসুরক্ষিত জায়গায় শিশুরা বিভিন্ন ধরনের শোষণ, নির্যাতন এবং অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তারা মাদকাসক্তি, যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন এবং মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের সহজ লক্ষ্য হতে পারে। এই অসহায় শিশুরা সমাজের অপরাধীচক্রের দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হতে পারে এবং অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সমাজের এই অন্ধকারতম দিকটি প্রকাশ্য দিবালোকে সবার চোখের সামনে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক উদাসীনতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশন একটি ব্যস্ত যাতায়াত কেন্দ্র যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। এই স্টেশনে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রেলওয়ে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন সবাই উপস্থিত থাকেন এবং এই পথশিশুদের দুর্দশা তাদের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে। তবুও কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া প্রমাণ করে যে আমাদের সিস্টেমে একটি গুরুতর সংবেদনশীলতার ঘাটতি রয়েছে। এই নিষ্ক্রিয়তা শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি মানবিক ব্যর্থতাও।
প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যখন এই ধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালন করে এবং শিশুদের অধিকার রক্ষার জন্য সোচ্চার হয়, তখন এটি সমাজের অন্যান্য সংগঠন এবং নাগরিকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। সোসাইটি শুধুমাত্র সমস্যা চিহ্নিত করেনি, বরং সমাধানের জন্য সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। এই পদ্ধতি দেখায় যে সংগঠনটি পেশাদার এবং দায়িত্বশীল পন্থায় কাজ করছে।
পুনর্বাসনের দাবি শুধুমাত্র শিশুদের স্টেশন থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি নয়, এটি তাদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ব্যবস্থা করার দাবি। পুনর্বাসন মানে তাদের একটি নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করা যেখানে তারা থাকতে পারবে, শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে, স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলি পূরণ হবে। এর সাথে সাথে তাদের মানসিক পুনর্বাসনও প্রয়োজন যাতে তারা তাদের অতীতের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে এবং একটি স্বাভাবিক জীবনের দিকে ফিরে যেতে পারে। পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় তাদের পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের চেষ্টা করা উচিত যদি তা সম্ভব হয় এবং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে হয়।
জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিট, জেলা সমাজ কল্যান আধিকারিক এবং জেলা শাসকের কাছে এই পত্র প্রেরণ করা হয়েছে কারণ তারাই এই বিষয়ে প্রধান দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ। জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটের দায়িত্ব হল সমস্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সংকটাপন্ন শিশুদের চিহ্নিত করা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সমাজ কল্যান বিভাগের কাজ হল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এবং জেলা শাসক সামগ্রিক প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন। এই তিন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া পথশিশুদের কার্যকর পুনর্বাসন সম্ভব নয়।
এই পত্রের মাধ্যমে যে দাবি করা হয়েছে তা অবিলম্বে কার্যকর করা উচিত কারণ প্রতিটি দিন যা যাচ্ছে তা এই শিশুদের জীবনে আরও ক্ষতির কারণ হচ্ছে। শৈশব একটি অমূল্য সময় যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। যে শিশুরা আজ স্টেশনে ভিক্ষা করছে বা শ্রম করছে, তারা তাদের মূল্যবান শৈশবের প্রতিটি মুহূর্ত হারাচ্ছে। তাদের জন্য আমাদের সমাজের এবং প্রশাসনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এই শিশুরা আমাদের সমাজের সন্তান এবং তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। যদি আমরা আজ এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা শুধু কিছু শিশুকে হতাশ করব না, বরং আমাদের সমাজের মূল্যবোধ এবং মানবিকতার প্রশ্নেও ব্যর্থ হব।
বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে আজ জেলা শাসক, জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিক ও জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়। আবেদনের মূল দাবি ছিল বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে বসবাসকারী পথশিশুদের অবিলম্বে পুনর্বাসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সোসাইটির সম্পাদক প্রলয় মজুমদার জানান, ২০১৫ সালের শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অধিকার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। অথচ স্টেশন এলাকায় থাকা বহু শিশু বাধ্য হয়ে ভিক্ষা বা শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, যা শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন। দিনের আলোয় এমন পরিস্থিতি প্রকাশ্যে থাকলেও প্রশাসনিক উদ্যোগ না থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই পত্র প্রদান করা হয়।