Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে জোকোভিচের ‘চাপের সার্ভ’-এ মেসির দুরন্ত রিটার্ন

৩৯ বছর বয়সেও থামার কোনও ইঙ্গিত নেই নোভাক জোকোভিচ ও লিয়োনেল মেসির। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে মুখোমুখি হয়ে চাপ সামলানো ও দীর্ঘ সাফল্যের রহস্য নিয়ে কথা বললেন দুই কিংবদন্তি।

বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের দুই মহাতারকা মুখোমুখি হলে সেই মুহূর্ত সাধারণ কোনও সাক্ষাৎ থাকে না। একজন টেনিস কোর্টের কিংবদন্তি, অন্যজন ফুটবল মাঠের বিস্ময়। একজন ২৪টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম সফল টেনিস খেলোয়াড় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অন্যজন দীর্ঘ সময় ধরে ফুটবলবিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন নিজের অসাধারণ প্রতিভা, সাফল্য, নেতৃত্ব এবং শান্ত স্বভাব দিয়ে। তাঁরা হলেন নোভাক জোকোভিচ এবং লিয়োনেল মেসি। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে এই দুই কিংবদন্তির কথোপকথন তাই স্বাভাবিকভাবেই ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি করেছে বিশেষ আগ্রহ।

এ বার প্রশ্নকর্তার ভূমিকায় দেখা গেল নোভাক জোকোভিচকে। আর তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিলেন লিয়োনেল মেসি। তবে প্রশ্নটি কোনও সাধারণ প্রশ্ন ছিল না। পেশাদার খেলোয়াড়দের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—চাপ সামলানো—নিয়েই মেসির কাছে জানতে চাইলেন জোকোভিচ। দীর্ঘ কেরিয়ারে সাফল্য, ব্যর্থতা, প্রত্যাশা, সমালোচনা এবং অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মুখোমুখি হওয়া মেসি কীভাবে মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করেন, সেটিই জানতে চেয়েছিলেন সার্বিয়ান টেনিস তারকা।

মেসিকে সামনে পেয়ে জোকোভিচ প্রশ্ন করেন, “তুমি কী করে চাপ উপেক্ষা করে নিজের খেলার দক্ষতা বজায় রাখতে শিখলে?” বিশ্বের অন্যতম সফল টেনিস খেলোয়াড়ের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে প্রথমে হেসে ফেলেন মেসি। কারণ জোকোভিচ নিজেও এমন একজন ক্রীড়াবিদ, যিনি বহু বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রবল চাপ সামলে সাফল্য অর্জন করেছেন। গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনাল, দীর্ঘ ম্যাচ, ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচানো কিংবা দর্শকদের বিপুল প্রত্যাশা—সবকিছুর মধ্যেই অসাধারণ মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

তবু জোকোভিচের প্রশ্নের মধ্যে ছিল গভীর কৌতূহল। প্রতিটি ক্রীড়াবিদের চাপ সামলানোর পদ্ধতি আলাদা। টেনিসে একজন খেলোয়াড়কে কোর্টে একাই নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অন্যদিকে ফুটবলে ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দল, কৌশল, সতীর্থ এবং প্রতিপক্ষের ভূমিকা থাকে। কিন্তু খেলার ধরন আলাদা হলেও জোকোভিচ এবং মেসির মতো তারকাদের উপর প্রত্যাশার চাপ প্রায় একই রকম। তাঁদের প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি ভুল নিয়ে আলোচনা হয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।

জোকোভিচের প্রশ্নের জবাবে মেসি বলেন, “আমি চাপ নিয়ে কখনও খুব বেশি ভাবি না। আমি এটাকে সব সময় খুব স্বাভাবিক বিষয় হিসাবেই দেখেছি। খেলতে যাওয়া, উপভোগ করা এবং প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকা। আমরা প্রতিযোগিতা ভালবাসি। সব সময় জিততে চাই। দেখ, ফুটবল একটা খেলা। আমাদের প্রতিপক্ষও জেতার জন্য মাঠে নামে। সব সময় জেতা সম্ভব হয় না।”

মেসির এই সহজ উত্তরটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারের অভিজ্ঞতা এবং মানসিক পরিণতির পরিচয়। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবলার হওয়া সত্ত্বেও তিনি খেলাকে জীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ হিসাবেই গ্রহণ করেন। মাঠে নামার আগে অতিরিক্ত চাপ, ভয় কিংবা সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে বেশি চিন্তা না করে তিনি খেলা উপভোগ করার উপর গুরুত্ব দেন। তাঁর কাছে প্রতিযোগিতা মানে শুধু জয় নয়, বরং নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার সুযোগ।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দীর্ঘ সময় ধরে খেলতে হলে শুধু দক্ষতা থাকলেই হয় না। প্রয়োজন হয় মানসিক স্থিরতা, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ব্যর্থতার পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস। মেসির কথায় পরিষ্কার, তিনি চাপকে সম্পূর্ণভাবে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন না। বরং চাপকে প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক অংশ হিসাবেই মেনে নেন। এই গ্রহণযোগ্যতাই তাঁকে কঠিন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে সাহায্য করে।

একজন খেলোয়াড় যখন মনে করেন যে তাঁকে প্রতিটি ম্যাচেই জিততে হবে, তখন তাঁর উপর মানসিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। একটি ভুল পাস, গোলের সুযোগ নষ্ট করা কিংবা ম্যাচে পরাজয় তাঁর আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু মেসি মনে করেন, প্রতিপক্ষও জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নামে। তাই প্রতিটি ম্যাচে জয় নিশ্চিত নয়। এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারলে পরাজয় সামলানো সহজ হয় এবং পরবর্তী ম্যাচের জন্য নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করা যায়।

মেসি আরও বলেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি শিখেছি, জয়ের থেকে হারের সংখ্যাই বেশি হয়। এই উপলব্ধি আমাকে একজন ব্যক্তি এবং খেলোয়াড় হিসাবে পরিণত হতে সাহায্য করেছে।”

এই বক্তব্যটি শুধু ফুটবল কিংবা পেশাদার খেলাধুলার ক্ষেত্রেই নয়, সাধারণ জীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাফল্যের গল্প যত বেশি আলোচিত হয়, ব্যর্থতার মুহূর্তগুলো অনেক সময় ততটাই আড়ালে থেকে যায়। একজন সফল ক্রীড়াবিদের জীবনে ট্রফি, পুরস্কার এবং স্মরণীয় জয়ের পাশাপাশি বহু পরাজয়, হতাশা এবং সমালোচনার ইতিহাস থাকে। মেসির মতে, সেই পরাজয়গুলোই তাঁকে আরও পরিণত করেছে।

কোনও বড় খেলোয়াড় জন্মের পর থেকেই চাপ সামলানোর কৌশল জানেন না। বয়স, অভিজ্ঞতা, জয়, পরাজয় এবং কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই সেই ক্ষমতা তৈরি হয়। মেসিও জানিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝেছেন যে প্রতিযোগিতামূলক জীবনে সব সময় জয় পাওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকবার লক্ষ্য পূরণ হবে না। কখনও দুর্দান্ত খেলেও হারতে হবে। আবার কখনও প্রত্যাশিত ছন্দে না থেকেও দল জিতে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই খেলার সৌন্দর্য।

news image
আরও খবর

মেসির বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে—ফলাফলের চেয়ে খেলার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া। মাঠে নামা, খেলা উপভোগ করা, প্রতিযোগিতার উত্তেজনার মধ্যে থাকা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করাই তাঁর কাছে প্রধান বিষয়। জয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রতিযোগী হিসাবে তিনিও সব সময় জিততে চান। কিন্তু জয়কেই একমাত্র মাপকাঠি করে তুললে খেলার আনন্দ হারিয়ে যেতে পারে।

এই দর্শন মেসির মাঠের আচরণেও বহুবার প্রতিফলিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও তাঁকে সাধারণত শান্ত থাকতে দেখা যায়। প্রতিপক্ষের কড়া মার্কিং, দর্শকদের প্রত্যাশা কিংবা ম্যাচের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নিজের খেলার ধরন ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর শরীরী ভাষায় অতিরিক্ত উত্তেজনা খুব কমই দেখা যায়। যেন তিনি জানেন, একটি মুহূর্ত কিংবা একটি ম্যাচ দিয়ে কোনও খেলোয়াড়ের সম্পূর্ণ কেরিয়ার বিচার করা যায় না।

অন্যদিকে নোভাক জোকোভিচও চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে ক্রীড়াজগতের অন্যতম বড় উদাহরণ। বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরও তিনি ফিরে এসেছেন। দীর্ঘ র‌্যালি, শারীরিক ক্লান্তি, দর্শকদের প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিপক্ষের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মধ্যেও তাঁকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে দেখা যায়। তাই তাঁর মুখ থেকে চাপ সামলানোর প্রশ্ন আসা এই কথোপকথনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

জোকোভিচ হয়তো জানতে চেয়েছিলেন, ফুটবলের মতো দলগত খেলায় মেসি কীভাবে নিজের উপর থাকা বিপুল প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। কারণ মেসি মাঠে নামলে কোটি কোটি সমর্থক তাঁর কাছ থেকে বিশেষ কিছু প্রত্যাশা করেন। তিনি গোল করবেন, গোলের সুযোগ তৈরি করবেন, দলকে নেতৃত্ব দেবেন এবং কঠিন মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেবেন—এমন প্রত্যাশা প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই থাকে। এত বড় প্রত্যাশা যে কোনও খেলোয়াড়ের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

কিন্তু মেসির উত্তর ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও বাস্তববাদী। তিনি চাপকে ভয় পাওয়ার বিষয় হিসাবে দেখেন না। বরং মাঠে নামা এবং প্রতিযোগিতা করাকে নিজের পছন্দের কাজের অংশ মনে করেন। খেলোয়াড়েরা প্রতিযোগিতা ভালবাসেন বলেই বছরের পর বছর অনুশীলন করেন, নিজেদের শারীরিক এবং মানসিকভাবে তৈরি করেন এবং বারবার কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়ান।

মেসির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতার আনন্দকে ধরে রাখতে পারাই চাপ সামলানোর অন্যতম বড় উপায়। যখন কোনও খেলোয়াড় শুধু ফলাফলের কথা ভাবেন, তখন তাঁর মন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন তিনি বর্তমান মুহূর্ত, বলের গতি, সতীর্থের অবস্থান এবং নিজের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে মনোযোগ দেন, তখন চাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে।

বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে এই মানসিকতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ফাইনাল মানেই প্রত্যাশার সর্বোচ্চ স্তর। একটি ম্যাচের ফলেই নির্ধারিত হয় কে ট্রফি তুলবে এবং কে হতাশ হয়ে মাঠ ছাড়বে। ফুটবলারদের উপর থাকে দেশ, সমর্থক, পরিবার এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণের চাপ। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত চিন্তা খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক পারফরম্যান্সে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

মেসির মতে, এই ধরনের বড় ম্যাচেও খেলাকে খেলা হিসাবেই দেখতে হবে। প্রতিপক্ষও জিততে এসেছে এবং দুই দলই নিজেদের সর্বোচ্চটা দেবে। ফলে শেষ পর্যন্ত একটি দলই জয় পাবে। কিন্তু পরাজিত দল চেষ্টা করেনি—এমন নয়। এই উপলব্ধি খেলোয়াড়কে ফলাফলের ভয় থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়।

মেসির জীবনে জয় যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে কঠিন পরাজয়। জাতীয় দল এবং ক্লাব ফুটবলে তাঁকে বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হারতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেও কখনও দল কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। আবার তাঁকে ঘিরে সমালোচনা হয়েছে, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং বড় ম্যাচে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অভিযোগও শুনতে হয়েছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করেছে।

তিনি যে বলেছেন জয়ের তুলনায় হারের সংখ্যা বেশি, সেটি আসলে প্রতিযোগিতামূলক জীবনের কঠিন সত্য। একজন খেলোয়াড় বহু প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও প্রতিবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারেন না। অধিকাংশ প্রতিযোগিতাতেই শেষ পর্যন্ত কোনও না কোনও পর্যায়ে তাঁকে হারতে হয়। তবু একজন চ্যাম্পিয়নকে আলাদা করে তাঁর ব্যর্থতার অনুপস্থিতি নয়, বরং ব্যর্থতার পর ফিরে আসার ক্ষমতা।

Preview image