সেমিতে উঠলেও মোহনবাগানের পারফরম্যান্সে একাধিক প্রশ্নচিহ্ন। কোচ প্যানাজিওটিসের কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ থাকছেই সবুজ-মেরুন সমর্থকদের।
আইএফএ শিল্ড ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে ১-১ গোলে ড্র করল মোহনবাগান। দুই দলই আগেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলেছিল। ফলে ম্যাচটির ফলাফল সরাসরি পরবর্তী পর্বে ওঠার সমীকরণ বদলে না দিলেও, মোহনবাগানের পারফরম্যান্স নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিল। বিশেষ করে বিদেশি ফুটবলার-সমৃদ্ধ একাদশ নিয়েও নর্থইস্ট ইউনাইটেডের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত দাপট দেখাতে না পারা এবং একাধিক সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা সবুজ-মেরুন শিবিরের জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে থাকল।
ঘরের মাঠে মোহনবাগান তুলনামূলক শক্তিশালী দল নিয়েই মাঠে নামে। সমির জেলকোভিচ, আলবার্তো রড্রিগেজ, ডেজান ড্রাজিচ এবং লি আরউইনের মতো বিদেশি ফুটবলারদের পাশাপাশি লিস্টন কোলাসো ও ছাংতেকেও প্রথম একাদশে রাখা হয়েছিল। জাতীয় দলের দায়িত্বে একাধিক ভারতীয় ফুটবলার না থাকলেও মোহনবাগানের হাতে পর্যাপ্ত শক্তি ছিল। অন্যদিকে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের কোচ পেদ্রো বেনালি একেবারে ভিন্ন কৌশল নেন। প্রথম একাদশে কোনও বিদেশি ফুটবলার না রেখেই ভারতীয় ফুটবলারদের নিয়ে দল সাজান তিনি।
এই পরিস্থিতিতে ম্যাচের শুরু থেকেই প্রত্যাশা ছিল মোহনবাগান আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে। প্রথমার্ধে বল দখল এবং আক্রমণের ক্ষেত্রে সবুজ-মেরুন দল কিছুটা এগিয়েও ছিল। কিন্তু সেই দাপটকে কার্যকর গোলের সুযোগে পরিণত করতে পারেনি তারা। আক্রমণভাগের ফুটবলারদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব বারবার চোখে পড়ে। ডেজান ড্রাজিচ এবং সমির জেলকোভিচের মধ্যে প্রত্যাশিত সমন্বয় দেখা যায়নি। লিস্টন কোলাসোর পারফরম্যান্স নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথমার্ধে মোহনবাগানের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন লি আরউইন। তাঁর শারীরিক গঠন এবং গতি নর্থইস্টের ডিফেন্সকে কয়েকবার সমস্যায় ফেলেছিল। ছাংতেও নিজের গতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আক্রমণের শেষ মুহূর্তে গিয়ে মোহনবাগানের ফুটবলারদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়। ফলে একের পর এক আক্রমণ তৈরি হলেও তা গোলের সামনে গিয়ে কার্যকর হয়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের গোলকিপার দীপেশ ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মোহনবাগানের বেশ কিছু আক্রমণ প্রতিহত করে তিনি দলকে ম্যাচে ধরে রাখেন। দ্বিতীয়ার্ধেও তাঁর পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মিগুয়েলের পেনাল্টি বাঁচিয়ে তিনি নর্থইস্টকে বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেন।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মোহনবাগানের কোচ প্যানাজিওটিস আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করেন। মিগুয়েল এবং জেমি ম্যাকলারেনকে মাঠে নামানো হয়। পরিবর্তনের পর খুব দ্রুতই তার ফল পাওয়া যায়। ডেজান ড্রাজিচের ক্রস থেকে ম্যাকলারেন বলটি হেড করে পিছনের দিকে বাড়িয়ে দেন। সেই বলের দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে লি আরউইন দুর্দান্তভাবে জালে পাঠান। মোহনবাগান ১-০ গোলে এগিয়ে যায়।
গোলের পর কিছু সময়ের জন্য মোহনবাগানের খেলায় ছন্দ ফিরে আসে। কিন্তু সেই আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নর্থইস্ট ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে। ৭০ মিনিটের মাথায় নর্থইস্টের হ্যান্ডবলের কারণে পেনাল্টি পায় মোহনবাগান। ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ ছিল সবুজ-মেরুনের সামনে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি মিগুয়েল। তাঁর নেওয়া পেনাল্টি বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আটকে দেন নর্থইস্টের গোলকিপার দীপেশ।
পেনাল্টি মিসের মাত্র কয়েক মিনিট পরেই ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। ৭৩ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে মোহনবাগানের রক্ষণভাগকে চাপে ফেলে সমতা ফেরায় নর্থইস্ট ইউনাইটেড। ইথিয়ান দুর্দান্তভাবে মোহনবাগানের ডিফেন্স ভেঙে বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন। আলবার্তো রড্রিগেজ এবং রাহুল ভেকেরা তাঁকে আটকাতে পারেননি। গোলকিপার বিশাল কাইথকেও পরাস্ত করে নর্থইস্টের স্ট্রাইকার বল জালে পাঠান। ফলে ১-১ হয়ে যায় ম্যাচ।
সমতা ফেরার পর ম্যাচের শেষদিকে দুই দলই জয়ের সুযোগ তৈরি করে। নর্থইস্টের হয়ে সুহেল আহমেদ ভাট এবং কিয়ান নাসিরিরাও সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কোনও গোল হয়নি। ১-১ ফলেই ম্যাচ শেষ হয়।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আলোচনার জায়গা হয়ে উঠেছে মোহনবাগানের আক্রমণভাগ এবং দলের সামগ্রিক পরিকল্পনা। বিদেশি ফুটবলারদের নিয়ে শক্তিশালী একাদশ নামিয়েও নর্থইস্টের ভারতীয় ফুটবলারদের আটকে দেওয়ার মতো ধারাবাহিক আক্রমণ তৈরি করতে পারেনি সবুজ-মেরুন। বিশেষ করে আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে পাসিং, মুভমেন্ট এবং বোঝাপড়ার অভাব স্পষ্ট ছিল।
ডেজান ড্রাজিচ এবং সমির জেলকোভিচের কাছ থেকে আরও বেশি সৃজনশীলতা প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু ম্যাচে দু’জনের মধ্যে সেই সমন্বয় সবসময় দেখা যায়নি। লিস্টন কোলাসোর ফর্ম নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রথম একাদশে সুযোগ দেওয়া যায় কি না, সেই আলোচনা সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
মোহনবাগানের জন্য আরও একটি চিন্তার বিষয় জেমি ম্যাকলারেনের চোট। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে দলকে এগিয়ে দেওয়ার গোলের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ম্যাচের পর তাঁর চোট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেমিফাইনালের আগে তাঁর ফিটনেস মোহনবাগানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে সমির জেলকোভিচ এবং লিস্টন কোলাসোর ফর্ম নিয়েও দলকে ভাবতে হবে। সেমিফাইনালে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই ধরনের আক্রমণাত্মক সমস্যা দেখা দিলে মোহনবাগানকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে না পারা এবং গোল করার পর দ্রুত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি কোচিং স্টাফের নজরে আসবে।
রক্ষণভাগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নর্থইস্টের সমতা ফেরানোর গোলটি মোহনবাগানের ডিফেন্সের জন্য অস্বস্তিকর। ইথিয়ান প্রায় অনায়াসে বক্সে ঢুকে পড়েন এবং আলবার্তো রড্রিগেজ ও রাহুল ভেকেরা তাঁকে আটকাতে পারেননি। এই ধরনের রক্ষণাত্মক ভুল সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ম্যাচে শুভাশিস বোসের হলুদ কার্ড নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিপক্ষ ফুটবলারের দিকে পা বাড়িয়ে তিনি হলুদ কার্ড দেখেন। পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে কার্ডের রং নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত। ম্যাচের উত্তেজনা এবং হতাশার মধ্যে এই ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে মোহনবাগানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক নর্থইস্ট ইউনাইটেডের পারফরম্যান্স। বিদেশি ফুটবলার ছাড়াই পেদ্রো বেনালির দল মোহনবাগানের মতো শক্তিশালী স্কোয়াডের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। শুধু রক্ষণাত্মকভাবে ম্যাচ খেলে যায়নি তারা, বরং দ্বিতীয়ার্ধে সুযোগ তৈরি করে সমতাও ফেরায়। গোলকিপার দীপেশের পারফরম্যান্সও আলাদা করে উল্লেখযোগ্য।
মোহনবাগান গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনালে উঠেছে। তাই এই ড্রকে শুধুমাত্র ফলাফল দিয়ে বিচার করলে পুরো ছবিটি পাওয়া যাবে না। সেমিফাইনালের আগে দলের কোথায় কোথায় উন্নতি প্রয়োজন, সেই জায়গাগুলি চিহ্নিত করার জন্য এই ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্যানাজিওটিসের সামনে এখন একাধিক প্রশ্ন। সেমিফাইনালে প্রথম একাদশে কারা থাকবেন? লিস্টন কোলাসোকে কি আরও সুযোগ দেওয়া হবে? সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় কি প্রথম একাদশে আসবেন? মিগুয়েলের পেনাল্টি মিসের পর তাঁকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে? জেমি ম্যাকলারেনের চোট কতটা গুরুতর? ডেজান ও সমিরের মধ্যে আক্রমণাত্মক বোঝাপড়া কীভাবে বাড়ানো যায়? রক্ষণভাগে ইথিয়ানের মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সহজে ঢুকে পড়া কীভাবে আটকানো হবে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তরই সেমিফাইনালে মোহনবাগানের পারফরম্যান্সে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রুপ পর্বে নর্থইস্টের বিরুদ্ধে ১-১ ড্র তাই শুধু একটি পয়েন্টের ম্যাচ নয়, বরং সেমিফাইনালের আগে সবুজ-মেরুন শিবিরের জন্য বেশ কিছু বিষয় নতুন করে ভাবার সুযোগও তৈরি করেছে।
আইএফএ শিল্ড ২০২৬-এর পরবর্তী পর্বে মোহনবাগানের সামনে কোন দল আসে, তার উপরও ম্যাচের কৌশল নির্ভর করবে। তবে প্রতিপক্ষ যেই হোক, আক্রমণে ধারাবাহিকতা, সুযোগ কাজে লাগানো, রক্ষণে সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে। নর্থইস্টের বিরুদ্ধে ম্যাচে যে সমস্যাগুলি দেখা গিয়েছে, সেমিফাইনালের আগে সেগুলি সমাধান করাই এখন কোচ প্যানাজিওটিসের অন্যতম প্রধান কাজ।
সবুজ-মেরুন সমর্থকদের জন্য তাই ১-১ ড্র-এর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ফলাফল নয়, বরং দলের খেলার ধরন। শক্তিশালী বিদেশি ফুটবলার থাকা সত্ত্বেও কেন আক্রমণে এতটা ছন্নছাড়া দেখাল দল? কেন সুযোগ তৈরি করেও গোলের সংখ্যা বাড়ল না? কেন পেনাল্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ কাজে লাগানো গেল না? এবং কেন এগিয়ে যাওয়ার পরও নর্থইস্টকে ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হল?
সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় মোহনবাগানের হাতে এখন নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নর্থইস্টের বিরুদ্ধে ম্যাচ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরবর্তী ম্যাচে দল কতটা সংগঠিত ফুটবল খেলতে পারে, সেটাই এখন দেখার। আইএফএ শিল্ড ২০২৬-এর সেমিফাইনাল তাই শুধু পরবর্তী রাউন্ডের ম্যাচ নয়, মোহনবাগানের বর্তমান দলগত ভারসাম্য ও কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে চলেছে।