Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেসিকে ঘিরে বিশ্বজোড়া উন্মাদনা, মাঠে এবার থাকবে বিশেষ ‘মেসি ক্যাম’

চোটের চিন্তা থাকলেও আর্জেন্টিনা শিবিরে স্বস্তির খবর। পারদেস, নিকোলাস গঞ্জালেস ও দিবু মার্তিনেজের মাঠে ফেরা স্কালোনির দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।

ভাবছিলাম, কলকাতা হলে কী হত? নিউ জার্সির প্রিন্সটনে যেখানে আছি, সেখান থেকে গাড়িতে মাত্র কুড়ি মিনিট গেলেই 112 Mercer Street। বাইরে থেকে দেখলে একেবারে সাধারণ একটি আবাসিক বাড়ি। না আছে বিশাল গেট, না আছে পর্যটকদের লাইন, না আছে স্মৃতিস্তম্ভের মতো কোনও বাহারি আয়োজন। অথচ এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কের শেষ জীবনের ইতিহাস। এখানেই জীবনের শেষ বছরগুলি কাটিয়েছিলেন স্যর আলবার্ট আইনস্টাইন।

প্রথম দেখায় বাড়িটি যেন নিজেকে আড়াল করে রাখে। রাস্তা দিয়ে যে কেউ হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতে পারেন, কিন্তু বুঝতেই পারবেন না, মানবসভ্যতার চিন্তার জগৎকে পাল্টে দেওয়া এক মানুষ একসময় এই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতেন, এই জানালার পাশে বসে হয়তো ভাবনায় ডুবে থাকতেন, এই পথেই হয়তো হেঁটে যেতেন প্রিন্সটনের শান্ত রাস্তায়। আইনস্টাইনের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা এলোমেলো চুল, গভীর চোখ, মৃদু হাসি আর সেই বিখ্যাত সূত্র—E=mc²। কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের বাড়ি এতটাই সাধারণ, এতটাই নিঃশব্দ যে তা যেন মানুষটিকেই নতুন করে চিনতে শেখায়।

আইনস্টাইন বিশ্বখ্যাত ছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকম সাদাসিধে। খ্যাতির আলো তাঁর পিছু ছাড়েনি, কিন্তু তিনি নিজে কখনও সেই আলোকে নিজের চারপাশে সাজিয়ে রাখতে চাননি। প্রিন্সটনের এই বাড়ির ক্ষেত্রেও তাঁর ইচ্ছা ছিল স্পষ্ট—এটি যেন জাদুঘর না হয়, জনতার ভিড়ের কেন্দ্র না হয়, তাঁর স্মৃতিকে যেন প্রদর্শনীতে পরিণত করা না হয়। Institute for Advanced Study-র তথ্য অনুযায়ী, আইনস্টাইন তাঁর বাড়িকে কোনও পাবলিক shrine বা museum বানানোর পক্ষে ছিলেন না। আজও বাড়িটি private residence হিসেবেই রয়ে গেছে।

এই জায়গাটাতেই অবাক লাগে। পৃথিবীর অন্য কোনও শহরে হলে হয়তো এই বাড়িকে ঘিরে তৈরি হয়ে যেত পর্যটন শিল্প। বড় বড় ফলক বসত, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দিকনির্দেশক বোর্ড থাকত, সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য লাইন পড়ত, দোকানে বিক্রি হত আইনস্টাইনের ছবি-ছাপা মগ, টি-শার্ট, চাবির রিং। হয়তো বাড়ির সামনে সেলফি পয়েন্ট বানানো হত, কোনও এক কোণায় বসানো হত তাঁর মূর্তি। আর কলকাতা হলে? প্রশ্নটা আরও কৌতূহল জাগায়।

কলকাতা স্মৃতিকে ভালবাসে। কলকাতা মানুষকে মনে রাখে, আবার কখনও কখনও স্মৃতিকে উৎসবেও পরিণত করে। রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, বিদ্যাসাগর, সত্যজিৎ—যে কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত কোনও বাড়ি, রাস্তা, বস্তু বা আসন থাকলে তাকে ঘিরে আবেগ জমে ওঠে। মিছিল, মালা, বক্তৃতা, স্মরণসভা, পোস্টার, ব্যানার—সব মিলিয়ে স্মৃতি এখানে অনেক সময় জনজীবনের অংশ হয়ে যায়। তাই ভাবছিলাম, কলকাতার কোনও গলিতে যদি আইনস্টাইনের শেষ জীবনের বাড়ি থাকত, তাহলে দৃশ্যটা কেমন হত?

সম্ভবত বাড়ির সামনে সারাক্ষণ লোকজন ভিড় করত। কেউ বলত, “এখানেই বসে আপেক্ষিকতার কথা ভেবেছিলেন।” কেউ বলত, “এই দরজাটা দেখুন, ইতিহাসের দরজা।” গাইডরা হয়তো গল্প বানিয়ে বলত, “এই বারান্দায় বসেই তিনি একদিন বিশ্বজগতের রহস্য নিয়ে ভাবছিলেন।” বাড়ির সামনে চায়ের দোকানে লেখা থাকত—“আইনস্টাইন টি স্টল।” পাশে হয়তো থাকত “রিলেটিভিটি ফুচকা”, “জিনিয়াস কফি কর্নার” বা “E=mc² রোল সেন্টার।” শোনায় মজার, কিন্তু এই মজার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের স্মৃতিচর্চার ধরন।

আমরা স্মৃতিকে দৃশ্যমান করতে চাই। আমরা চাই, ইতিহাস চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকুক। বাড়ি মানেই শুধু বাড়ি নয়, স্মৃতির শরীর। মূর্তি মানেই শুধু পাথর নয়, শ্রদ্ধার প্রকাশ। কিন্তু প্রিন্সটনের 112 Mercer Street যেন অন্য কথা বলে। এখানে স্মৃতিকে নীরব থাকতে দেওয়া হয়েছে। এখানে ইতিহাসকে বাজারে তোলা হয়নি। এখানে মানুষটির ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে তাঁর খ্যাতির থেকেও বড় করে দেখা হয়েছে।

এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের। আইনস্টাইনের মতো মানুষকে নিয়ে পর্যটন কেন্দ্র বানানো কঠিন কিছু ছিল না। তাঁর নামই যথেষ্ট। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসত, টিকিট কেটে বাড়ির ভেতর ঢুকত, তাঁর ঘর, তাঁর টেবিল, তাঁর চেয়ার দেখত। কিন্তু তা হয়নি। কারণ মানুষটির ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। তিনি চাননি মৃত্যুর পর তাঁর বাড়ি লোকদেখানো শ্রদ্ধার জায়গা হয়ে উঠুক।

এই বাড়ির নীরবতা তাই কেবল স্থাপত্যের নীরবতা নয়, এটি এক ধরনের নৈতিক অবস্থান। খ্যাতিমান মানুষকে কীভাবে মনে রাখতে হয়, সেই প্রশ্নের এক গভীর উত্তর যেন লুকিয়ে আছে এখানে। সব স্মৃতিকে কি মূর্তিতে বাঁধতেই হবে? সব মহত্ত্বকে কি পর্যটন পণ্যে পরিণত করতেই হবে? কোনও মানুষ কি তাঁর নিজের অনুপস্থিতিতেও নিজের ব্যক্তিগত পরিসরের অধিকার রাখেন না?

প্রিন্সটনের রাস্তায় হাঁটলে এই উত্তরটা আরও স্পষ্ট হয়। শহরটি শান্ত, মার্জিত, শিক্ষিত পরিবেশে ভরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহ, পুরনো বাড়ি, সবুজ গাছ, ধীর রাস্তা—সব মিলিয়ে এখানে এক ধরনের সংযম আছে। সেই সংযমের মধ্যেই আইনস্টাইনের বাড়ি দাঁড়িয়ে। বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না, অথচ না বোঝাটাই যেন এখানে সবচেয়ে বড় বোঝা। কারণ প্রতিটি ইতিহাসকে চিৎকার করে নিজের পরিচয় দিতে হয় না। কিছু ইতিহাস নিঃশব্দে থাকে, আর সেই নীরবতাই তাকে বড় করে তোলে।

news image
আরও খবর

আইনস্টাইন শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিংশ শতকের চিন্তার এক প্রতীক। আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিয়ে তিনি সময়, স্থান, আলো, ভর ও শক্তি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের এই বাড়ি আমাদের অন্য এক আপেক্ষিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়—খ্যাতি আর সরলতার আপেক্ষিকতা, স্মৃতি আর ব্যক্তিগত ইচ্ছার আপেক্ষিকতা, জনতার আবেগ আর ব্যক্তির নীরবতার আপেক্ষিকতা।

আমরা অনেক সময় ভাবি, বড় মানুষ মানেই বড় বাড়ি, বড় স্মৃতিসৌধ, বড় আয়োজন। কিন্তু 112 Mercer Street-এর সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, বড়ত্বের সঙ্গে বাহুল্যের কোনও বাধ্যতামূলক সম্পর্ক নেই। যে মানুষ মহাবিশ্বের গভীরতম সূত্র নিয়ে ভাবতে পারেন, তাঁর বাসস্থানও হতে পারে অত্যন্ত সাধারণ। আর সেই সাধারণত্বই হয়তো তাঁকে আরও অসাধারণ করে তোলে।

এখানে এসে মনে হয়, আইনস্টাইনকে বোঝার জন্য তাঁর বাড়ির ভেতরে ঢোকার দরকার নেই। বাইরে দাঁড়িয়ে, দূর থেকে দেখে, তার নীরবতাকে অনুভব করাই যথেষ্ট। কারণ এই বাড়ি দর্শনার্থীকে চমকে দেয় না, বরং থামিয়ে দেয়। প্রশ্ন করতে শেখায়—আমরা কাকে কীভাবে মনে রাখি? শ্রদ্ধা কি সবসময় প্রকাশ্য হতে হবে? নীরব সম্মান কি কখনও কখনও মূর্তির চেয়েও বড় নয়?

আমেরিকার মানুষদের অনেক সময় নিরাসক্ত বলে মনে হয়। তারা অতীতকে আবেগে ভাসিয়ে রাখে না, অন্তত সব জায়গায় নয়। কিন্তু এই নিরাসক্তির মধ্যেও এক ধরনের গভীর সম্মান থাকে। আইনস্টাইনের বাড়ির ক্ষেত্রে সেটাই দেখা যায়। তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে, তাঁর গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে, বাড়িটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও মানা হয়েছে; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে অতিক্রম করে বাড়িটিকে জনতার সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়নি। National Park Service-র তথ্য অনুযায়ী, 112 Mercer Street আইনস্টাইনের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর বাড়ি ছিল এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের National Historic Landmark হিসেবেও স্বীকৃত।

এই ভারসাম্যটাই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ইতিহাসের স্বীকৃতি, অন্যদিকে ব্যক্তিগত মর্যাদার রক্ষা। আমাদের দেশে অনেক সময় এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। কোনও বিখ্যাত মানুষ কোথাও গিয়েছেন শুনলেই সেই জায়গাকে ঘিরে দাবি শুরু হয়। তাঁর নামে রাস্তা, পার্ক, মূর্তি, সভাঘর, স্মৃতি ফলক—সবকিছু একসঙ্গে চাই। এতে আবেগ থাকে, কিন্তু কখনও কখনও সেই আবেগ ব্যক্তির নিজস্বতা ঢেকে দেয়।

কলকাতা হলে কী হত—এই প্রশ্ন তাই শুধু রসিকতা নয়। এটি আমাদের স্মৃতিবোধের প্রশ্ন। আমরা কি ইতিহাসকে সম্মান করি, না ইতিহাসকে ব্যবহার করি? আমরা কি মহৎ মানুষকে মনে রাখি, না তাঁদের নামে নিজেদের আবেগের মঞ্চ বানাই? আমরা কি তাঁদের কাজ বুঝতে চাই, না তাঁদের মুখচ্ছবি দিয়ে অনুষ্ঠান সাজাই?

আইনস্টাইনের বাড়ির সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, কোনও কোনও স্মৃতি দূর থেকে দেখাই ভাল। কাছ থেকে ছুঁতে গেলেই হয়তো তার মর্যাদা নষ্ট হয়। যেমন কোনও মহান সুরকে অযথা শব্দে ঢেকে দিলে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়, তেমনই কোনও মহান মানুষের স্মৃতিকে অতিরিক্ত আয়োজনের মধ্যে ফেললে তার সরলতা হারিয়ে যেতে পারে।

প্রিন্সটনের এই বাড়ি তাই পর্যটন কেন্দ্র না হয়েও এক গভীর পর্যটন অভিজ্ঞতা দেয়। এখানে টিকিট নেই, গাইড নেই, মিউজিয়ামের কাচঘেরা প্রদর্শনী নেই। আছে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাধারণ বাড়ি। কিন্তু সেই সাধারণ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ইতিহাস কখনও কখনও সবচেয়ে বড় হয় তখনই, যখন সে নিজেকে ছোট করে রাখে।

 

Preview image