লুকাস পাকেতা ও মারকুইনহসরা মাঠে নামলেও ব্রাজিলের খেলায় দেখা গেল না চেনা ছন্দ বা সাম্বার ঝলক। হতাশাজনক পারফরম্যান্সে সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যর্থ সেলেসাও।
গ্যালারিতে হলুদ জার্সির ঢেউ ছিল। ঢাক-ঢোল ছিল। সাম্বার ছন্দে নাচতে থাকা সমর্থকদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন ব্রাজিল আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পুরনো জাদু ফিরিয়ে আনতে চলেছে। কিন্তু মাঠের ভিতরে সেই চেনা ব্রাজিল কোথায়? যে ব্রাজিলকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ, যে ব্রাজিল মানেই শিল্প, গতি, পাসিং ফুটবল আর সাম্বা ছন্দ—২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিরুদ্ধে সেই ব্রাজিলকে দেখা গেল না বললেই চলে।
মরক্কোর বিরুদ্ধে ড্র করে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল ব্রাজিল। কাগজে-কলমে ড্র হয়তো খুব খারাপ ফল নয়, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে প্রথম ম্যাচে। কিন্তু যে দলের নাম ব্রাজিল, যে দলের ইতিহাসে পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফি, যে দলকে ঘিরে প্রতিবারই ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন দেখা হয়, তাদের এমন ছন্নছাড়া ফুটবল সমর্থকদের হতাশ করবেই। ম্যাচ শেষে স্কোরলাইন যতটা না আলোচনায়, তার থেকেও বেশি আলোচনায় ব্রাজিলের খেলার ধরন। এই কি সেই সাম্বা ফুটবল? এই কি সেই দল, যাদের দেখে প্রতিপক্ষ ভয়ে নিজেদের কৌশল বদলাতে বাধ্য হত?
কার্লো অ্যান্সেলোত্তির অধীনে ব্রাজিলকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল প্রবল। ক্লাব ফুটবলে অ্যান্সেলোত্তির অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচে তাঁর কৌশল, তারকা ফুটবলারদের ব্যবহার করার দক্ষতা—সব মিলিয়ে সমর্থকরা ভেবেছিলেন, ব্রাজিল হয়তো আবারও নিজেদের পুরনো ছন্দে ফিরবে। কিন্তু মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই সেই আশায় কিছুটা ধাক্কা খেলেন তাঁরা। প্রথমার্ধে ব্রাজিলের খেলায় ছিল না ধার, ছিল না দ্রুততা, ছিল না মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। বরং অনেক সময় মনে হচ্ছিল, মরক্কোই যেন বেশি আত্মবিশ্বাসী, বেশি সংগঠিত এবং পরিকল্পনামাফিক ফুটবল খেলছে।
ব্রাজিলের ফুটবল মানেই সাধারণত বল পায়ে আক্রমণাত্মক মেজাজ, উইং দিয়ে গতি, মাঝমাঠে সৃজনশীলতা এবং সামনে মুহূর্তে ম্যাচ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে সেই ছবিটা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। লুকাস পাকেতা, মারকুইনহসদের খেলা দেখে মনে হয়নি দলটি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নিজেদের আধিপত্য দেখাতে নেমেছে। মাঝমাঠে পাসিং ছিল ধীর, আক্রমণে ছিল অসংগতি, রক্ষণেও বারবার চাপ তৈরি হচ্ছিল। মরক্কো খুব সহজেই ব্রাজিলের বিল্ড-আপ আটকে দিচ্ছিল এবং সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ভয় দেখাচ্ছিল।
ম্যাচের প্রথমার্ধে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন ভিনিসিয়স জুনিয়র। ৩২ মিনিটে তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতায় করা গোলটাই ব্রাজিলকে ম্যাচে বাঁচিয়ে রাখে। বলা যায়, সেই মুহূর্তে ভিনির ‘ম্যাজিক’ না থাকলে ব্রাজিলের জন্য ফল আরও খারাপ হতে পারত। ভিনিসিয়স জুনিয়রের গতি, ড্রিবলিং এবং আত্মবিশ্বাস এখনও ব্রাজিলের আক্রমণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু একটি দলের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন কি শুধু একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? এই প্রশ্নটাই এখন বড় হয়ে উঠছে।
ভিনি গোল করলেন ঠিকই, কিন্তু ব্রাজিলের সামগ্রিক ফুটবল সমর্থকদের তৃপ্ত করতে পারেনি। আক্রমণের সময় খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব ছিল স্পষ্ট। উইং থেকে বারবার বল উঠলেও বক্সের ভিতরে সঠিক জায়গায় ফুটবলারদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। মাঝমাঠ থেকে ফরোয়ার্ড লাইনে বল পৌঁছনোর গতি ছিল মন্থর। প্রতিপক্ষ রক্ষণ ভাঙতে যে সৃজনশীলতা দরকার, সেটাও খুব একটা চোখে পড়েনি। ফলে ভিনির গোল বাদ দিলে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে খুব বেশি আলো দেখা যায়নি।
অন্যদিকে মরক্কো এই ম্যাচে দেখিয়ে দিল, গত কয়েক বছরে তারা কেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক দল হয়ে উঠেছে। তাদের খেলায় ছিল আত্মবিশ্বাস, গতি এবং শৃঙ্খলা। তারা ব্রাজিলকে সম্মান করলেও ভয় পায়নি। বরং ম্যাচের বড় অংশে মরক্কো নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলে গেছে। রক্ষণে তারা কমপ্যাক্ট ছিল, মাঝমাঠে ব্রাজিলকে জায়গা দেয়নি এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে উঠেছে।
মরক্কোর ফুটবলারদের শরীরী ভাষা থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি, তারা লড়তে এসেছে। বড় দলের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রমাণ করতে এসেছে। ব্রাজিলের মতো ঐতিহ্যশালী দলের বিরুদ্ধে ড্র করা মরক্কোর কাছে বড় সাফল্য হলেও, ম্যাচের ছবিটা দেখে বলা যায় তারা আরও বেশি কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিল। ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে মরক্কোর আক্রমণ। বিশেষ করে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে তাদের গতি ব্রাজিলের ডিফেন্সকে অস্বস্তিতে রেখেছিল।
ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হল দলের ছন্দহীনতা। বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ সবসময়ই কঠিন হয়। চাপ থাকে, প্রত্যাশা থাকে, পরিবেশ থাকে ভিন্ন। কিন্তু বড় দলগুলির আসল পরিচয় বোঝা যায় তারা চাপের মুহূর্তে কীভাবে নিজেদের খেলা ধরে রাখে। ব্রাজিল সেই জায়গায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দল হিসেবে তারা এখনও পুরোপুরি তৈরি কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
অ্যান্সেলোত্তির কৌশল নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি কি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী আক্রমণাত্মক ফুটবলকে ধরে রাখতে পারবেন? নাকি ইউরোপীয় কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে ব্রাজিলের স্বাভাবিক ছন্দ মিলিয়ে নতুন কোনও পথ খুঁজছেন? এই ম্যাচে সেই উত্তর পরিষ্কার পাওয়া গেল না। বরং মনে হল, দল এখনও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে পরীক্ষানিরীক্ষার জায়গা খুব কম।
ব্রাজিলের রক্ষণও এদিন খুব আশ্বস্ত করতে পারেনি। মারকুইনহস অভিজ্ঞ হলেও, দলগত রক্ষণে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা গেছে। মরক্কো যখন দ্রুত পাসে আক্রমণে উঠছিল, তখন ব্রাজিলের রক্ষণভাগ মাঝে মাঝে ছন্নছাড়া দেখাচ্ছিল। ফুলব্যাকদের অবস্থান, মাঝমাঠের কভার, সেন্টার-ব্যাকদের যোগাযোগ—সব জায়গাতেই উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও দৃঢ়তা দরকার।
মাঝমাঠে ব্রাজিলের সমস্যা আরও স্পষ্ট। কোনও বড় টুর্নামেন্টে মাঝমাঠই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ঠিক করে। কিন্তু মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্রাজিল সেই নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। পাকেতা বল পায়ে কিছু মুহূর্ত তৈরি করলেও ধারাবাহিকতা ছিল না। বল ধরে রাখা, খেলার গতি বাড়ানো, আক্রমণের পথ তৈরি করা—এই জায়গাগুলিতে ব্রাজিলকে আরও উন্নতি করতে হবে।
সমর্থকদের হতাশার কারণ এখানেই। ব্রাজিলের কাছে মানুষ শুধু জয় চায় না, সুন্দর ফুটবলও চায়। ব্রাজিল নামটা শুধু ফলাফলের সঙ্গে জড়িত নয়, জড়িত ফুটবলের এক বিশেষ সৌন্দর্যের সঙ্গে। পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনাল্ডো, রোনালদিনহো, কাকা, নেইমার—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্রাজিল বিশ্বকে এক ধরনের ফুটবল দেখিয়েছে, যার মধ্যে ছিল শিল্পের ছাপ। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে এই ম্যাচের ব্রাজিলকে মিলিয়ে দেখা কঠিন।
তবে এটাও সত্যি, একটি ম্যাচ দেখে পুরো টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ বিচার করা যায় না। বিশ্বকাপের ইতিহাসে বহু বড় দল প্রথম ম্যাচে ধাক্কা খেয়ে পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ব্রাজিলের হাতে এখনও সময় আছে। অ্যান্সেলোত্তির মতো অভিজ্ঞ কোচ নিশ্চয়ই এই ম্যাচ থেকে শিক্ষা নেবেন। কোথায় সমস্যা, কোন জায়গায় পরিবর্তন প্রয়োজন, কোন ফুটবলারকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে—এসব নিয়ে তাঁকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ভিনিসিয়স জুনিয়র অবশ্য ব্রাজিল সমর্থকদের আশার আলো দেখিয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতা যে কোনও মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাঁকে আরও বেশি সাপোর্ট দরকার। সামনে যদি ভিনি একা হয়ে যান, তাহলে প্রতিপক্ষরা তাঁকে আটকে রাখার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করবে। ব্রাজিলের অন্য আক্রমণাত্মক ফুটবলারদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। আক্রমণে বৈচিত্র্য না থাকলে বড় ম্যাচে সমস্যা বাড়বে।
মরক্কোর বিরুদ্ধে এই ড্র ব্রাজিলের জন্য সতর্কবার্তা। বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু নাম, ইতিহাস বা জার্সির ওজন যথেষ্ট নয়। মাঠে প্রতিটি মিনিটে প্রমাণ করতে হয় কেন আপনি বড় দল। মরক্কো সেই জায়গায় ব্রাজিলকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—বর্তমান ফুটবলে কোনও দলকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সংগঠন, ফিটনেস, কৌশল এবং মানসিক শক্তি—সব মিলিয়ে আজকের ফুটবলে যে কোনও দল বড় দলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
ব্রাজিলের সমর্থকদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই দল কি সত্যিই হেক্সা জয়ের দাবিদার? উত্তর এখনও মেলেনি। প্রথম ম্যাচে যে ফুটবল দেখা গেল, তা দিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন খুব শক্ত ভিত্তি পায় না। তবে ব্রাজিলের দলে প্রতিভার অভাব নেই। সমস্যা হল সেই প্রতিভাকে দলগত ছন্দে রূপান্তর করা। অ্যান্সেলোত্তির সামনে এখন সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের খেলা দেখে মনে হয়েছে, দলটির মধ্যে আত্মবিশ্বাস থাকলেও স্পষ্টতা কম। কখন দ্রুত আক্রমণে উঠতে হবে, কখন বল ধরে রাখতে হবে, কীভাবে প্রতিপক্ষের প্রেস ভাঙতে হবে—এসব জায়গায় আরও পরিকল্পনা দরকার। বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচের মূল্য অনেক। গ্রুপ পর্বে সামান্য ভুলও পরের রাউন্ডের রাস্তা কঠিন করে দিতে পারে। তাই ব্রাজিলকে দ্রুত নিজেদের ভুল শুধরে নিতে হবে।
মরক্কোর প্রশংসা করতেই হবে। তারা শুধু ব্রাজিলকে আটকায়নি, নিজেদের ফুটবলের মানও দেখিয়েছে। আফ্রিকান ফুটবলের শক্তি, কৌশলগত পরিণততা এবং বড় মঞ্চে মানসিক দৃঢ়তার দারুণ উদাহরণ রাখল মরক্কো। তারা জানে কীভাবে বড় দলের বিরুদ্ধে খেলতে হয়, কীভাবে জায়গা বন্ধ করতে হয় এবং কীভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে হয়। এই ড্র তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিল শিবিরে হয়তো স্বস্তি আছে যে তারা হারেনি। কিন্তু সেই স্বস্তির সঙ্গে উদ্বেগও মিশে থাকবে। কারণ বিশ্বকাপে শুধু না হারাই যথেষ্ট নয়, চ্যাম্পিয়ন হতে হলে আধিপত্য দেখাতে হয়। ব্রাজিল সেই আধিপত্য দেখাতে পারেনি। বরং অনেক সময় মরক্কোর সামনে তাদের অস্বস্তিতে দেখা গেছে।
সমর্থকদের আবেগের জায়গাটা আরও গভীর। যারা গ্যালারিতে হলুদ জার্সি পরে এসেছিলেন, যারা ঢাক-ঢোল নিয়ে সাম্বার ছন্দ তুলেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই আরও বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন ব্রাজিল মাঠে নামলেই যেন ফুটবল উৎসব শুরু হয়। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাঁদের মুখে আনন্দের বদলে ছিল প্রশ্ন। এই দল কি সত্যিই সেই ব্রাজিল?
ফুটবল কখনও শুধু স্কোরলাইন নয়। বিশেষ করে ব্রাজিলের ক্ষেত্রে তো নয়ই। ব্রাজিলের ম্যাচ মানেই এক ধরনের আবেগ, এক ধরনের সৌন্দর্য, এক ধরনের ঐতিহ্য। মরক্কোর বিরুদ্ধে সেই ঐতিহ্যের ঝলক দেখা গেল অল্পই। ভিনিসিয়সের গোলটি সুন্দর ছিল, গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেটাই গোটা ম্যাচের একমাত্র বড় আলো হয়ে রইল।
অ্যান্সেলোত্তির সামনে এখন কঠিন কাজ। তাঁকে শুধু দলকে জেতাতে হবে না, ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়াতে হবে, মাঝমাঠকে সক্রিয় করতে হবে, রক্ষণকে স্থির করতে হবে এবং আক্রমণে আরও ধার আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ব্রাজিলকে আবার ব্রাজিলের মতো খেলতে হবে।
এই ম্যাচ থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। প্রথমত, কোনও প্রতিপক্ষকে হালকা নেওয়া চলবে না। দ্বিতীয়ত, শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার উপর নির্ভর করলে বড় টুর্নামেন্ট জেতা কঠিন। তৃতীয়ত, দলগত ছন্দ না থাকলে বড় নামের ফুটবলাররাও অনেক সময় অকার্যকর হয়ে পড়েন। ব্রাজিলের জন্য এই তিনটি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ব্রাজিল সমর্থকদের পুরোপুরি হতাশ হওয়ারও কারণ নেই। বিশ্বকাপ দীর্ঘ টুর্নামেন্ট। প্রথম ম্যাচের পর দল ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অনেক সময় এমন ধাক্কাই বড় দলকে জাগিয়ে তোলে। ব্রাজিলের স্কোয়াডে এখনও ম্যাচ জেতানোর মতো ফুটবলার আছে। ভিনিসিয়স, পাকেতা, অভিজ্ঞ রক্ষণভাগ, এবং অ্যান্সেলোত্তির কৌশল—সব মিলিয়ে ব্রাজিলের সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে মাঠে তার প্রমাণ দিতে হবে। শুধু ইতিহাসের ভরসায় বিশ্বকাপ জেতা যায় না। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন পরিচয় গর্বের, কিন্তু ষষ্ঠবার চ্যাম্পিয়ন হতে হলে বর্তমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথম পরীক্ষায় ব্রাজিল কোনওমতে পাস করল বলা যায়, কিন্তু নম্বর খুব বেশি নয়।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই হলুদ ঢেউ হয়তো ম্যাচের শুরুতে স্বপ্ন দেখেছিল এক নতুন সাম্বা ঝড়ের। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পর সেই স্বপ্নে একটু ধুলো জমল। ড্র হয়তো বিপর্যয় নয়, কিন্তু সতর্ক সংকেত অবশ্যই। ব্রাজিল যদি দ্রুত নিজেদের ভুল শুধরে না নেয়, তাহলে হেক্সা জয়ের স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ ছিল প্রত্যাশা ও বাস্তবতার তীব্র সংঘর্ষ। গ্যালারিতে সাম্বা ছিল, আবেগ ছিল, হলুদ জার্সির সমুদ্র ছিল—কিন্তু মাঠে ব্রাজিলের পরিচিত ফুটবল ছিল না। ভিনিসিয়স জুনিয়রের ম্যাজিক গোল ব্রাজিলকে লজ্জা থেকে বাঁচালেও, দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স অ্যান্সেলোত্তি এবং সমর্থকদের চিন্তায় রাখবে।
এই ড্র ব্রাজিলের জন্য একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে সুযোগও। সতর্কবার্তা এই কারণে যে বিশ্বকাপে নাম আর ইতিহাস দিয়ে কিছুই পাওয়া যায় না। সুযোগ এই কারণে যে এখনও সময় আছে, ভুল শুধরে নেওয়ার রাস্তা খোলা আছে। এখন দেখার, ব্রাজিল এই ধাক্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে সত্যিই সাম্বার ছন্দে ফিরতে পারে কি না। কারণ হেক্সা জিততে হলে শুধু হলুদ জার্সি নয়, মাঠেও দরকার সেই পুরনো ব্রাজিলীয় ঝড়।