শীতকালে নানা ধরনের অসুখবিসুখের প্রকোপ বাড়ে। তার মধ্যেই একটি গুরুতর ও উপেক্ষিত রোগ হল পালমোনারি হাইপারটেনশন। এটি সাধারণ সর্দি-কাশি বা সামান্য শ্বাসকষ্টের মতো নিরীহ সমস্যা নয়। বরং ধীরে ধীরে এই রোগ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং ফুসফুস ও হৃদ্‌যন্ত্রের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ না হলে পালমোনারি হাইপারটেনশন প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার আশঙ্কাও থাকে।
শীতের সঙ্গে ফুসফুসের বৈরিতা যেন চিরকালীন। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে নানা ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, আর তার মধ্যে শীতকাল ফুসফুসের জন্য সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এই সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়, পরিবেশ শুষ্ক হয়ে ওঠে এবং কুয়াশা ও ধোঁয়াশার কারণে বায়ুদূষণের মাত্রাও বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি তাপমাত্রার হঠাৎ ওঠানামা শ্বাসযন্ত্রকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। ফলে অনেক মানুষেরই শীতে শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়, কাশি বাড়ে বা বুকে অস্বস্তি অনুভূত হয়।
শীতকালে ফুসফুসের সমস্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হল ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস সরাসরি শ্বাসনালিতে প্রভাব ফেলে। এই বাতাস শ্বাসনালির ভিতরের আবরণকে শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তোলে, যার ফলে সামান্য উত্তেজনাতেই কাশি বা শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের হাঁপানি রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে শীতের সময় এই সমস্যা অনেকটাই বেড়ে যায়। ঠান্ডা হাওয়া শ্বাসনালিকে সংকুচিত করে, ফলে বাতাস চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং হঠাৎ করে হাঁপানির আক্রমণ দেখা দিতে পারে।
একইভাবে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি রোগীরাও শীতে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হন। এই রোগে ফুসফুসের বাতাস চলাচলের পথ আগে থেকেই সংকীর্ণ থাকে। শীতের সময় সেই পথ আরও সরু হয়ে যায়, ফলে শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। সামান্য হাঁটাচলা বা দৈনন্দিন কাজ করতেও রোগীর বুক ধড়ফড় করতে থাকে এবং অক্সিজেনের ঘাটতি অনুভূত হয়।
শুধু হাঁপানি বা সিওপিডি নয়, শীতকালে আরও কিছু গুরুতর ফুসফুসের রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ফাইব্রোসিস, অকুপেশনাল লাং ডিজিজ কিংবা পালমোনারি হাইপারটেনশনের মতো রোগগুলি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও এগুলি অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে পালমোনারি হাইপারটেনশনে ফুসফুসের ধমনিতে রক্তচাপ বেড়ে যায়, যার ফলে হৃদ্যন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। শীতের সময় রক্তনালিগুলি সংকুচিত হওয়ায় এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
এর পাশাপাশি শীতকালে সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সংক্রমণের প্রকোপও বৃদ্ধি পায়। এই সংক্রমণগুলি ফুসফুসকে দুর্বল করে তোলে এবং আগে থেকে থাকা শ্বাসযন্ত্রের রোগকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ঠান্ডা লাগা থেকেই গুরুতর শ্বাসকষ্ট বা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সূত্রপাত হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শীতকাল ফুসফুসের জন্য এক কঠিন সময়। তাই এই মরসুমে নিজের শরীরের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘদিনের কাশি বা বুকে অস্বস্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ থাকার সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
বিশেষ করে পালমোনারি হাইপারটেনশন শীতকালে রোগীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে। যাঁদের আগে থেকেই হাঁপানি বা সিওপিডি রয়েছে, অথবা যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের কোনও না কোনও সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেশি। অনেক সময় রোগী নিজেই বুঝতে পারেন না যে তাঁর শ্বাসকষ্টের পেছনে সাধারণ সর্দি-কাশি নয়, বরং একটি গুরুতর রোগ কাজ করছে।
ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ নানা ধরনের হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি। এই রোগে ফুসফুসের বাতাস চলাচলের পথ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তবে এর পাশাপাশি আরেকটি তুলনামূলক কম পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক রোগ হল পালমোনারি হাইপারটেনশন। ‘হাইপারটেনশন’ শব্দটি শুনলেই সাধারণত আমরা উচ্চ রক্তচাপের কথা ভাবি। কিন্তু এখানে রক্তচাপ বাড়ে শরীরের অন্য কোনও ধমনিতে নয়, ফুসফুসের ধমনিতে।
পালমোনারি হাইপারটেনশনে ফুসফুসে রক্ত বহনকারী ধমনিগুলির ভিতরের পথ সরু হয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবে রক্ত চলাচল করতে পারে না। রক্তপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে ধমনির ভিতরে চাপ বাড়তে শুরু করে। এই অতিরিক্ত চাপ সামলাতে গিয়ে হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে হার্টের পেশি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতাও কমতে থাকে। এর ফলে শুধু ফুসফুস নয়, হার্টও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই রোগ বছরের যে কোনও সময়েই হতে পারে। তবে শীতকালে এর প্রকোপ স্পষ্টভাবে বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘পালমোনারি আর্টেরিয়াল হাইপারটেনশন’। শীতের সময় ঠান্ডার প্রভাবে শরীরের রক্তনালিগুলি স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে ফুসফুসের ধমনিতেও। আগে থেকেই যদি ধমনির ভিতরের পথ কিছুটা সরু থাকে, তবে ঠান্ডায় তা আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে রক্তচাপ দ্রুত বাড়তে থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে শীতকালে ফুসফুসের ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। এই রক্ত জমাট বা ক্লট ফুসফুসে রক্ত চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে হঠাৎ ফুসফুস বিকল হওয়া, শ্বাসরোধ, এমনকি হার্ট অ্যাটাক বা আকস্মিক মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই শীতের সময় পালমোনারি হাইপারটেনশনকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
এই রোগের ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায় কারণ এর উপসর্গ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। প্রথম দিকে রোগী তেমন কিছু বুঝতেই পারেন না। শুরুতে ভারী কাজ করতে গেলে বা সিঁড়ি ভাঙার সময় বুক ধড়ফড় করা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেকেই একে সাধারণ দুর্বলতা বা শারীরিক অক্ষমতা বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা বাড়তে থাকে।
পরবর্তী পর্যায়ে রাতে শুয়ে থাকাকালীন হালকা শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এরপর এমন অবস্থাও আসে যখন বিশ্রামের সময়েও শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। রোগী বসে বা শুয়ে থাকলেও বুক ধড়ফড় করতে থাকে, হৃদ্স্পন্দনের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। শ্বাস নিতে যেন অদৃশ্য কোনও ভার বুকের উপর চেপে বসে—এমন অনুভূতি হয়।
এই অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, সামান্য কাজেই শক্তি ফুরিয়ে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে পা ফুলে যায়, বিশেষ করে গোড়ালির কাছে ফোলা স্পষ্ট হয়। দীর্ঘদিন রোগ চললে পেটে জল জমার সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে হাত ও পায়ের নখ, ঠোঁট এবং কখনও কখনও ত্বক নীলচে বর্ণ ধারণ করে। গুরুতর অবস্থায় রোগী আচমকা জ্ঞান হারাতেও পারেন।
শীতকালে এই সমস্যাগুলি আরও বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হল সংক্রমণ। এই সময় সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগের প্রকোপ অনেক বেশি থাকে। এই সংক্রমণগুলি ফুসফুসকে আরও দুর্বল করে তোলে এবং পালমোনারি হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ থেকেই জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
তাই এই রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট, বিশ্রামের সময়েও বুক ধড়ফড় করা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শ্বাস নিতে অসুবিধার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। শ্বাসকষ্ট বেশি হলে অক্সিজেন থেরাপি দেওয়া হয়, যাতে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায়। নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ রয়েছে যা ফুসফুসের ধমনিকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ কমায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধে কাজ না হলে অস্ত্রোপচার বা বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনও হতে পারে।
চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর নিজের সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ডিপ ব্রিদিং, অনুলোম-বিলোম, প্রাণায়াম—এই সব ব্যায়াম চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করলে উপকার পাওয়া যায়। খুব বেশি ঠান্ডায় বেরোনো এড়িয়ে চলা, শরীর গরম রাখা এবং বায়ুদূষণ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করা জরুরি।
শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়া থেকে বাঁচতে টিকা নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই টিকাগুলি সংক্রমণের ঝুঁকি কমিয়ে ফুসফুসকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের ফলো-আপে থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পালমোনারি হাইপারটেনশন এমন একটি রোগ যা নীরবে শরীরের ভিতরে ক্ষতি করে যায় এবং শীতকালে তার ভয়াবহতা বহুগুণ বেড়ে যায়। সময়মতো লক্ষণ চিনে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে এই রোগের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব। কিন্তু অবহেলা করলে তা জীবননাশের কারণও হয়ে উঠতে পারে। তাই শীতের এই মরসুমে শ্বাসকষ্টকে কখনওই হালকাভাবে না নিয়ে সচেতন হওয়াই একমাত্র সুরক্ষার পথ।