লম্বা ছুটি কিংবা সফরের পর হঠাৎ করে পুরনো রুটিনে ফেরা মোটেই সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে যখন তা নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে জড়িত, তখন আলসেমি ও ক্লান্তি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে ধীরে ধীরে ছন্দে ফেরার সঠিক কৌশল জানা থাকলে কাজটা অনেকটাই সহজ হয়। জেট ল্যাগ ও ভ্রমণের ধকল কাটিয়ে কীভাবে আবার ফিটনেস রুটিনে ফেরা যায়, তারই বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেছেন সোহা আলি খান। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই শেখা যেতে পারে, কীভাবে প্রথম ধাপটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যায়।
কাজের তাগিদে হোক কিংবা নিছক বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে—লম্বা সফর বা ছুটির পরে আবার পুরনো ছন্দে ফেরা মোটেই সহজ কাজ নয়। ভ্রমণের সময় দৈনন্দিন জীবনের বহু নিয়মই ভেঙে যায়। ঘুমের সময় এলোমেলো হয়ে পড়ে, খাওয়ার অভ্যাসে আসে অনিয়ম, আর শরীরচর্চার মতো নিয়মিত অভ্যাস প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ছুটি শেষে বাড়ি ফিরে হঠাৎ করেই যখন আবার সেই পুরনো শৃঙ্খলায় ফিরতে হয়, তখন শরীর ও মন—দু’টিকেই বেশ চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তাঁদের কাছেও ছুটির পরে আবার জিমমুখী হওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। সফরের ক্লান্তি, জেট ল্যাগ, শরীরের ভারী ভাব—এই সব মিলিয়ে আলসেমি যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি যাঁদের শরীরচর্চা অত্যন্ত প্রিয়, তাঁরাও প্রথম কয়েক দিন ব্যায়াম শুরু করতে অনীহা বোধ করেন। মনে হয়, আজ নয়—কাল থেকে শুরু করব। কিন্তু সেই ‘কাল’ আর আসে না। এভাবেই ধীরে ধীরে পুরনো অভ্যাস থেকে আরও দূরে সরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে শরীর ও মন—দু’টিকেই ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা। হঠাৎ করে নিজেকে কঠোর নিয়মের মধ্যে ফেলে দেওয়া অনেক সময় উল্টো ফল দিতে পারে। শরীরচর্চায় ফিরতে গেলে প্রয়োজন ধৈর্য, সঠিক পরিকল্পনা এবং নিজের শরীরের ক্ষমতা বোঝার মানসিকতা।
এই প্রসঙ্গেই সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন অভিনেত্রী সোহা আলি খান। লম্বা ছুটি কাটিয়ে বিদেশ ভ্রমণ শেষে কী ভাবে আবার শরীরচর্চার রুটিনে ফিরেছেন, সেই অভিজ্ঞতা তিনি নিজেই ভাগ করে নিয়েছেন অনুরাগীদের সঙ্গে। তাঁর এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যাঁরা ছুটির পরে নিজেকে আবার ফিটনেসের ছন্দে ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ভ্রমণের পরে শরীরচর্চায় ফেরার পথে সবচেয়ে বড় বাধা মানসিক ক্লান্তি। নতুন জায়গায় ঘোরা, সময়ের পার্থক্য, লাগাতার যাতায়াত—এই সবের প্রভাব সরাসরি পড়ে শরীরের উপর। ফলে বাড়ি ফিরে শরীরচর্চার কথা ভাবলেই অনেকের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়। তবে এই সময়েই নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি। শুরুটা ছোট হলে ক্ষতি নেই—গুরুত্বপূর্ণ হল শুরু করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ বিরতির পরে শরীরচর্চায় ফিরতে গেলে প্রথমেই লক্ষ্য রাখা উচিত শরীরকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করার দিকে। হালকা ব্যায়াম, কম সময়ের শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম—এই তিনের সমন্বয়েই আবার পুরনো ছন্দে ফেরা সম্ভব। একই সঙ্গে দরকার সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমের রুটিনে ফেরার চেষ্টা।
সোহা আলি খানের অভিজ্ঞতাও সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। ছুটি কাটিয়ে ফিরে তিনি যে ভাবে ধীরে ধীরে শরীরচর্চায় মন দিয়েছেন, তা দেখিয়ে দেয়—লম্বা বিরতির পরে ফিটনেসে ফেরা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। নিজের শরীরের কথা শুনে, তাড়াহুড়ো না করে, ধাপে ধাপে এগোলেই আবার ফিরে পাওয়া যায় সেই পুরনো এনার্জি ও ছন্দ।
ছুটির পরে শরীরচর্চায় ফেরা মানে শুধুই ব্যায়াম নয়—এটি নিজের যত্নে ফিরে আসার একটি প্রক্রিয়া। আর সেই পথে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে এমন বাস্তব অভিজ্ঞতাই।
ভ্রমণ মানেই দৈনন্দিন জীবনের ছন্দে ছেদ। সময়ের পার্থক্যের কারণে ঘুমের ঘড়ি বিগড়ে যায়। খাবার হয় অনিয়মিত সময়ে, অনেক সময় ভারী বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হয়। হাঁটাচলা বেশি হলেও, তা কখনওই পরিকল্পিত শরীরচর্চার বিকল্প নয়। এই সব কারণে পেশির উপর চাপ কমে যায়, স্নায়ু–পেশির সংযোগ কিছুটা শিথিল হয়, শরীরের সহনশীলতাও কমতে থাকে।
ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত শরীরচর্চা করলে শরীর একটি নির্দিষ্ট অভ্যাসের মধ্যে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে কয়েক সপ্তাহ ব্যায়াম বন্ধ থাকলে সেই অভ্যাসে ছেদ পড়ে। ফলে আবার শুরু করতে গেলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে—যার প্রকাশ ঘটে আলসেমি, ব্যথা বা ক্লান্তির মাধ্যমে।
সম্প্রতি জাপানে বেড়াতে গিয়েছিলেন সোহা আলি খান। সফরের নানা মুহূর্তের ছবি তিনি ভাগ করে নিয়েছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ছুটি কাটিয়ে ফিরে এসে খুব বেশি দেরি না করেই তিনি আবার শরীরচর্চায় মন দেন। জিমে ফিরে তাঁর প্রথম দিনের ব্যায়ামের ছবিও অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নেন অভিনেত্রী।
সেই ছবিতে দেখা যায়, তিনি করছেন ‘সার্কিট স্ট্রেংথ ট্রেনিং’। এই ধরনের শরীরচর্চায় একাধিক ব্যায়াম পরপর করা হয়, মাঝখানে খুব বেশি বিরতি থাকে না। এর ফলে অল্প সময়ে সারা শরীরের পেশিগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। হার্ট রেট বাড়ে, ঘাম হয়, এবং শরীর ধীরে ধীরে তার কর্মক্ষমতা ফিরে পায়।
লম্বা বিরতির পরে হঠাৎ করে ভারী ওজন তোলা বা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যায়াম শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিষয়টি ভালভাবেই বোঝেন সোহা। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ব্যায়াম না করার পরে শরীরচর্চা শুরু করা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলির একটি। তাই তিনি এমন একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন, যা একদিকে শরীরকে সক্রিয় করবে, আবার অন্যদিকে অতিরিক্ত চাপও দেবে না।
সার্কিট স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ে সাধারণত স্কোয়াট, লাঞ্জ, পুশ-আপ, প্ল্যাঙ্ক, হালকা ওজন নিয়ে বিভিন্ন ব্যায়াম একসঙ্গে করা হয়। এতে শরীরের প্রধান পেশিগুলি ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। একই সঙ্গে কার্ডিও ও স্ট্রেংথ—দু’ধরনের উপকারই পাওয়া যায়।
অভিনেত্রীর কথায়, এই ধরনের ব্যায়াম জেট ল্যাগ কাটাতেও সাহায্য করে। শরীরের রক্তসঞ্চালন বাড়ে, ঘুমের ছন্দ ঠিক হতে শুরু করে, এবং মানসিক ক্লান্তিও অনেকটা কমে।
৪৭ বছর বয়সেও যে ফিটনেস ধরে রাখা সম্ভব, তার জীবন্ত উদাহরণ সোহা আলি খান। নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত আহার এবং সঠিক বিশ্রামের ফলে তিনি নিজেকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পেরেছেন। তাঁর মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরচর্চা আরও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। তবে তা হতে হবে নিজের শরীরের ক্ষমতা বুঝে।
ফিটনেস প্রশিক্ষক গরিমা গয়াল এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নিয়মিত ব্যায়াম করা কেউ যদি হঠাৎ করে দীর্ঘ সময় শরীরচর্চা বন্ধ রাখেন, তার প্রভাব সরাসরি পেশি ও স্নায়ুর উপর পড়ে। বেড়াতে যাওয়ার সময় খাওয়াদাওয়া, ঘুম—সব কিছুই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যও কিছুটা নষ্ট হয়।
এই অবস্থায় আবার শরীরচর্চা শুরু করতে গেলে তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। শরীরকে প্রস্তুত করার জন্য কিছুটা সময় দিতে হয়। নইলে চোট লাগার আশঙ্কা থাকে।
ধরা যাক, কেউ নিয়মিত ১৬ কেজি ওজন তুলে ব্যায়াম করতেন। কিন্তু ২০-৩০ দিনের ছুটিতে সেই অভ্যাস একেবারেই বন্ধ ছিল। এখন যদি তিনি ফিরে এসে প্রথম দিনেই একই ওজন নিয়ে ব্যায়াম করতে চান, তবে পেশিতে টান লাগতে পারে, হাঁপিয়ে পড়তে পারেন, এমনকি গুরুতর চোটও লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ব্যায়াম না করলে পেশির শক্তি এবং সহনশীলতা কমে যায়। তাই আগের স্তরে ফিরতে হলে ধাপে ধাপে এগোনোই একমাত্র নিরাপদ পথ।
ফিটনেস প্রশিক্ষক অনিকেত বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, লম্বা বিরতির পরে শরীরচর্চা শুরু করার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
প্রথমেই দরকার ওয়ার্ম-আপ। হালকা জগিং, জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁটা, হাত-পা নাড়ানো—এই সবের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা বাড়াতে হবে। এতে পেশি নমনীয় হয় এবং চোটের আশঙ্কা কমে।
প্রথম তিন থেকে চার দিন আধ ঘণ্টার বেশি ব্যায়াম না করাই ভাল। এতে শরীর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়। হঠাৎ বেশি সময় ব্যায়াম করলে গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে, যার ফলে আবার শরীরচর্চায় ছেদ পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
ওজন নিয়ে ব্যায়াম করার ক্ষেত্রে অবশ্যই কম ওজন থেকে শুরু করতে হবে। ধীরে ধীরে ওজন বাড়ালে শরীর সেই চাপ নিতে শিখে নেয়।
ব্যায়ামের শুরুতে ডায়নামিক স্ট্রেচিং অত্যন্ত জরুরি। এতে পেশির সঙ্কোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে রক্তসঞ্চালন ভাল হয়। শরীরচর্চার শেষে স্ট্যাটিক স্ট্রেচিং করলে শরীর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয় এবং পেশির ব্যথা কমে।
শরীরচর্চায় ফেরার ক্ষেত্রে শুধু শরীর নয়, মন তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে—কেন শরীরচর্চা শুরু করেছিলেন, কী ভাবে তা আপনাকে ভাল রেখেছিল। ছোট লক্ষ্য স্থির করলে কাজটা সহজ হয়। প্রথম দিন জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানোর প্রয়োজন নেই। শুধু উপস্থিত হওয়াটাই বড় সাফল্য।
এই জায়গাতেই সোহা আলি খানের অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, লম্বা ছুটির পরে শরীরচর্চায় ফেরা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সঠিক পদ্ধতি, ধৈর্য এবং নিজের শরীরের প্রতি সচেতন থাকলেই আবার ফিটনেসের ছন্দে ফেরা যায়।