মেক্সিকো সিটির এক বাজারে ভেষজ ওষুধের পাশাপাশি বিক্রি হয় তাবিজ, ধূপ এবং জাদুবিদ্যার নানা সামগ্রী। বিচিত্র পসরা আর ক্রেতাদের ভিড়ে বাজারটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকবিশ্বাসের এক আকর্ষণীয় ছবি তুলে ধরে। কেউ আসেন প্রচলিত ভেষজ উপাদানের খোঁজে, কেউ আবার ধর্মীয় আচার বা লোকজ বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত জিনিস কিনতে। কী কী পাওয়া যায় এই বাজারে, আর কেন এটি এত পরিচিত? জেনে নিন ছবিতে ছবিতে।
মেক্সিকো সিটির বাজার মানেই খাবার, পোশাক আর রঙিন হস্তশিল্প—এমন ধারণা নিয়ে ঘুরতে বেরোলে মেরকাদো দে সোনোরা চমকে দিতে পারে। এখানে মাটির পাত্র বা উৎসবের সাজসজ্জার দোকানের পাশাপাশি রয়েছে ভেষজ উদ্ভিদ, তাবিজ, ধূপ, রঙিন মোমবাতি এবং নানা লোকাচারে ব্যবহৃত সামগ্রীর পসরা। এই বাজারের নাম শুনলে অনেকের মনে প্রথমেই ‘জাদুবিদ্যার বাজার’-এর ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু সোনোরার আসল গল্প আরও বিস্তৃত। এটি যেমন স্থানীয় মানুষের কেনাকাটার জায়গা, তেমনই মেক্সিকোর লোকবিশ্বাস, উৎসব, ঐতিহ্য ও ব্যবসার এক মিলনস্থল।
একটি বাজারকে ঘিরে এত কৌতূহল কেন? কারণ সোনোরায় পাশাপাশি দেখা যায় এমন সব জিনিস, যেগুলিকে আমরা সাধারণত আলাদা জগতে রাখি। এক দোকানে নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী, অন্য দোকানে গাছের পাতা; একটু এগোলেই ধর্মীয় প্রতীক বা সৌভাগ্যের আশায় কেনা কোনও তাবিজ। কোনও ক্রেতার কাছে এগুলি পরিচিত পারিবারিক রীতির অংশ, আবার বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থীর কাছে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।
এই বৈপরীত্যই মেরকাদো দে সোনোরাকে আলোচনায় রেখেছে। তবে বাজারের কোনও জিনিসকে ঘিরে প্রচলিত বিশ্বাস আর প্রমাণিত সত্যকে এক করে দেখলে ভুল হবে। বিশেষ করে ভেষজের চিকিৎসাগত ব্যবহার বা কোনও আচার অনুষ্ঠানের ফল সম্পর্কে বিক্রেতা ও ক্রেতাদের দাবিকে তাঁদের বিশ্বাস হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক কেন্দ্রের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, মেরসেদ এলাকার কাছে সোনোরা বাজারের অবস্থান। শহরের সরকারি পর্যটন নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাজারটির ভবন চালু হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে। সেই সময় শহরে জনসাধারণের জন্য বাজার ভবন গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছিল। সোনোরা সেই বৃহত্তর নগরজীবনেরই অংশ হয়ে ওঠে।
বাজারের পরিচিতি অবশ্য এক দিনে তৈরি হয়নি। শুরু থেকেই এখানে মাটির পাত্র, উৎসবের সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি হত। সময়ের সঙ্গে ভেষজ ও আচার অনুষ্ঠানের উপকরণ বিক্রির জন্য বিশেষ খ্যাতি পায় সোনোরা। এখন অনেক দর্শনার্থী এই পসরার টানেই বাজারে আসেন। তবু জায়গাটি কেবল ঘুরে দেখার জন্য সাজানো কোনও প্রদর্শনী নয়। দোকানদারদের ব্যবসা, স্থানীয় ক্রেতাদের প্রয়োজন এবং প্রতিদিনের কেনাকাটার ভিড়—সব মিলিয়েই বাজারটি চলে।
এই বিষয়টি মাথায় রাখলে সোনোরাকে বোঝা সহজ হয়। কোনও পর্যটকের কাছে রঙিন মোমবাতি বা তাবিজ বিরল জিনিস মনে হতে পারে। স্থানীয় ক্রেতার কাছে সেটিই হয়তো চেনা দোকান থেকে কেনা নিয়মিত প্রয়োজনের সামগ্রী। একই জায়গাকে দুই মানুষ দুইভাবে দেখছেন। বাজারের গল্প তৈরি হচ্ছে সেই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে।
সোনোরা নিয়ে খবর বা ভ্রমণকাহিনিতে সাধারণত জাদুবিদ্যার সামগ্রীর কথাই বেশি আসে। তাতে মনে হতে পারে, পুরো বাজার জুড়ে শুধু রহস্যময় পণ্য বিক্রি হয়। বাস্তবে এখানে পণ্যের ধরন অনুযায়ী দোকানগুলির অবস্থান অনেকটা ভাগ করা। মাটির পাত্র, উৎসবের সাজ, গাছপালা ও ভেষজ—বিভিন্ন ধরনের পসরা রয়েছে। বাজারের দীর্ঘ পথটির পিছনের দিকে ভেষজ, ‘বোটানিকা’ এবং লোকবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত সামগ্রীর দোকানগুলি বেশি দেখা যায় বলে মেক্সিকো সিটির সরকারি পর্যটন নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে।
ফলে সোনোরা দেখতে গেলে কেবল একটি অংশ দেখে পুরো বাজারের পরিচয় নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। ভেষজের দোকান যেমন তার খ্যাতির কেন্দ্রে, তেমনই মাটির জিনিস বা উৎসবের সামগ্রীও বাজারটির চরিত্র গড়ে তুলেছে। এই নানা ধরনের ব্যবসা একই ছাদের নীচে থাকার কারণেই সোনোরা একটি জীবন্ত শহুরে বাজার।
বাজারের ক্রেতারাও এক ধরনের নন। কেউ নির্দিষ্ট একটি পণ্য কিনতে যান। কেউ দোকান ঘুরে দেখেন, দাম জিজ্ঞাসা করেন, তারপর সিদ্ধান্ত নেন। কারও আগ্রহ স্থানীয় কারুশিল্পে, কারও ভেষজে, কারও আবার লোকবিশ্বাসের সামগ্রীতে। বাজারের পরিচিতি যতই রহস্যকে ঘিরে তৈরি হোক, তার নিয়মিত জীবন চলে এই বিচিত্র চাহিদার উপর নির্ভর করে।
সোনোরা বাজারের সবচেয়ে পরিচিত অংশগুলির একটি হল ভেষজের দোকান। বিভিন্ন অঞ্চলের গাছের পাতা, ফুল ও অন্যান্য উদ্ভিদজাত সামগ্রী এখানে আসে। মেক্সিকো সিটির সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু ঔষধি গাছপালা আসে পুয়েবলা, মোরেলোস এবং মেক্সিকো রাজ্যের মতো এলাকা থেকে। অর্থাৎ বাজারের একটি দোকানের পেছনেও রয়েছে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের ব্যবস্থা।
ভেষজের প্রতি মানুষের আগ্রহকে কেবল কেনাবেচার বিষয় হিসেবে দেখলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। বহু পরিবারে গাছগাছড়া নিয়ে অভিজ্ঞতা ও ব্যবহারবিধি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসে। কোনও পাতা কেনা মানে তাই অনেক সময় একটি পরিচিত পারিবারিক পদ্ধতির কাছে ফিরে যাওয়া। দোকানদারের কাছেও পণ্যের নামের পাশাপাশি তার প্রচলিত ব্যবহার জানানো ব্যবসার অংশ হতে পারে।
মেক্সিকো সিটির সরকারি পর্যটন নির্দেশিকা কয়েকটি উদ্ভিদের স্থানীয় ব্যবহার বা প্রচলিত দাবির কথাও তুলে ধরে। তবে বাজারে কোনও উদ্ভিদকে নির্দিষ্ট অসুখের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে—এই তথ্য আর সেটি সেই অসুখ সারায়—এই সিদ্ধান্ত এক নয়। লোকজ চিকিৎসার ইতিহাস বোঝার জন্য বাজার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; চিকিৎসার কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন আলাদা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
এই পার্থক্য বিশেষভাবে জরুরি, কারণ একটি বাজারে একই ভেষজ নিয়ে ভিন্ন মানুষের ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কেউ ব্যবহার করতে চান কোনও পারিবারিক রীতি মেনে, কেউ সংগ্রহ করতে চান গবেষণা বা কৌতূহল থেকে। বাইরে থেকে আসা মানুষ হয়তো আগে কখনও সেই গাছের নামই শোনেননি। সোনোরার ভেষজের পসরা তাই উদ্ভিদের তালিকা ছাড়িয়ে মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও অভ্যাসের গল্পও বলে।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড হিস্ট্রি বা আইএনএএইচ-এর একটি গবেষণাতেও সোনোরা বাজারের ভেষজ বিক্রেতা এবং গাছ সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠীর কথা এসেছে। এতে বোঝা যায়, বাজারের তাক পর্যন্ত কোনও পণ্য পৌঁছনোর আগে তার সঙ্গে চাষ, সংগ্রহ, পরিবহণ ও বিক্রির নানা মানুষের কাজ জড়িয়ে থাকে।
সোনোরা বাজারের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হল ভেষজ এবং লোকবিশ্বাসের সামগ্রীর পাশাপাশি অবস্থান। আধুনিক শহুরে চোখে এই দুই ধরনের জিনিস আলাদা মনে হতে পারে। কিন্তু ঐতিহ্যগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে গাছগাছড়া, ধর্মীয় আচরণ এবং বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান বহু সময় একে অপরের সঙ্গে মিশে থেকেছে। মেক্সিকো সিটির সরকারি পর্যটন নির্দেশিকাও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা, বিশ্বাস ও কৃষিকাজের এই সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।
একটি গাছের পাতা কারও কাছে ঘরোয়া উপাদান, অন্য কারও কাছে আচার অনুষ্ঠানের অংশ। একটি মোমবাতি সাধারণ আলো জ্বালানোর জিনিস হতে পারে, আবার নির্দিষ্ট বিশ্বাসের অনুসারীর কাছে তার রং বা ব্যবহার আলাদা অর্থ বহন করতে পারে। পণ্য একই ধরনের হলেও ক্রেতার উদ্দেশ্য বদলালে তার অর্থও বদলে যায়। সোনোরার দোকানগুলিতে সেই অর্থের ভিন্নতা চোখে পড়ে।
এখানে তাবিজ, ধর্মীয় প্রতীক এবং নানা আচার অনুষ্ঠানের সামগ্রী বিক্রির কথা সরকারি পর্যটন নির্দেশিকায় রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্বাস ও চর্চা এক বাজারে উপস্থিত থাকার কারণে সোনোরাকে একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা মতের বাজার বলে চিহ্নিত করা কঠিন। বরং এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে বহু লোকাচারের প্রয়োজনীয় জিনিস একসঙ্গে পাওয়া যায়।
কোনও দোকানে সৌভাগ্যের প্রতীক, কোথাও রঙিন মোমবাতি, কোথাও সুগন্ধি বা ধূপ—এই পসরা অনেক ক্রেতার ব্যক্তিগত আশা ও উদ্বেগের সঙ্গেও যুক্ত। মানুষ অসুবিধার সময়ে পরিচিত বিশ্বাসের আশ্রয় খোঁজেন। কেউ সুস্থতা চান, কেউ সম্পর্কের জটিলতা কাটাতে চান, কেউ জীবনে মঙ্গল কামনা করেন। সেই আশা পণ্যের গায়ে লেখা থাকে না; কিন্তু কেনার সিদ্ধান্তে তার প্রভাব থাকতে পারে।
এখানেই দায়িত্বশীলভাবে বাজারের গল্প বলা দরকার। ক্রেতা কোনও সামগ্রীতে বিশ্বাস করেন, দোকানদার সেটি বিক্রি করেন—এগুলি বাস্তব সামাজিক ঘটনা। কিন্তু সেই সামগ্রীর অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে, এমন দাবি প্রমাণ ছাড়াই সত্য হিসেবে লেখা ঠিক নয়। সোনোরার আকর্ষণ ব্যাখ্যা করতে অলৌকিক ঘটনাকে সত্য প্রমাণ করার প্রয়োজনও নেই। মানুষের বিশ্বাস কীভাবে একটি বাজারের পণ্য ও ব্যবসার ধরন তৈরি করে, সেটিই যথেষ্ট আকর্ষণীয় বিষয়।
‘রহস্যময় বাজার’ কথাটি পাঠকের কৌতূহল জাগায়। কিন্তু বাজারে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাছে এটি কর্মস্থল। প্রতিদিন দোকান খোলা, পণ্য সাজানো, ক্রেতাকে জিনিস দেখানো, বিক্রি শেষে নতুন পণ্য আনার ব্যবস্থা করা—এসব দিয়েই তাঁদের সময় কাটে। কোনও সামগ্রী বাইরের মানুষের চোখে যত অস্বাভাবিকই লাগুক, বিক্রেতার কাছে সেটি তাঁর ব্যবসার অংশ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি বাজারটিকে অন্যভাবে দেখতে সাহায্য করে। একটি ভেষজের দোকান মানে কেবল পাতা ভর্তি প্যাকেট নয়; তার সঙ্গে রয়েছে কোথা থেকে পণ্য এল, কোন সময়ে পাওয়া গেল, ক্রেতারা কী খোঁজেন, সেই হিসাব। উৎসবের সামগ্রীর দোকান মানে শুধু রঙিন সাজ নয়; কোন উৎসবের আগে কী চাহিদা বাড়ে, সেটিও জানা। এই দৈনন্দিন কাজের মধ্যে দিয়েই সোনোরার পরিচিতি টিকে আছে।
সরকারি নথিতে সোনোরা বাজারের পণ্যের ধরন হিসেবে ঘরোয়া সামগ্রী, ফুল, ভেষজ এবং ধর্মীয় বা গূঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত জিনিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাজারের অর্থনৈতিক ভিত্তি একটি মাত্র পণ্যের উপর দাঁড়িয়ে নেই। নানা ধরনের দোকান একে অপরের পাশাপাশি ব্যবসা চালাচ্ছে।
মেক্সিকোর উৎসব সংস্কৃতির সঙ্গে সোনোরা বাজারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত ‘ডে অফ দ্য ডেড’ উপলক্ষে ব্যবহৃত সামগ্রী কেনার পরিচিত জায়গাগুলির একটি এটি। মেক্সিকো সিটির সরকারি পর্যটন নির্দেশিকায় এই উৎসবের পণ্যের পাশাপাশি আলেব্রিহেস নামে রঙিন কল্পপ্রাণীর শিল্পকর্ম এবং ‘জুডাস’ মূর্তি বিক্রির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
উৎসবের সামগ্রী বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তুলে ধরে। এখানে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পাশাপাশি রয়েছে পরিবারের প্রস্তুতি, পাড়া বা সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান এবং শিল্পীর কাজ। একটি সাজসজ্জার জিনিস কিনে কেউ বাড়িতে নিয়ে যান; অন্য কোনও জিনিস ব্যবহৃত হয় নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে। পণ্যগুলি দোকানে পাশাপাশি রাখা থাকলেও প্রতিটির সামাজিক অর্থ আলাদা।
এই উৎসবের দিকটি না দেখলে সোনোরাকে শুধু তাবিজ ও জাদুবিদ্যার সামগ্রীর বাজার মনে হতে পারে। অথচ তার পসরায় কারুশিল্পেরও জায়গা আছে। শিল্পকর্মের রং, আকৃতি বা তৈরির পদ্ধতি বাজারকে দৃশ্যত আকর্ষণীয় করে তোলে। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, লোকসংস্কৃতি শুধু বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রকাশ ঘটে শিল্প, সাজসজ্জা এবং সম্মিলিত উদ্যাপনেও।
জাদুঘরে কোনও পুরনো বস্তু কাচের বাক্সের ভিতর রাখা থাকে। বাজারে সেই ধরনের অনেক সাংস্কৃতিক চিহ্ন ব্যবহার ও কেনাবেচার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে। সোনোরার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এখানে কোনও প্রতীক কেবল দেখার জন্য নেই—কেউ তা কিনছেন, বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন, নিজের অভ্যাস বা অনুষ্ঠানের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন।
বাজারের এই চলমান চরিত্রই তাকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৫০-এর দশকে তৈরি একটি বাজার ভবনে আজও মানুষ নানা প্রয়োজন নিয়ে আসেন। পুরনো পণ্যের পাশাপাশি নতুন ক্রেতার চাহিদাও জায়গা পায়। কোনও আচার একইভাবে চলতে পারে, কোনওটির ব্যবহার বা অর্থ সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। ফলে সোনোরা একেবারে অতীতে আটকে থাকা জায়গা নয়; বর্তমান শহুরে জীবনের মধ্যেই তার ঐতিহ্য টিকে আছে।
এই কারণেই বাজারের কোনও দোকানকে শুধু ‘অদ্ভুত’ বললে তার গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি তাবিজের পেছনে বিশ্বাস, একটি ভেষজের পেছনে পারিবারিক স্মৃতি, একটি শিল্পকর্মের পেছনে তৈরির দক্ষতা থাকতে পারে। সব ক্রেতা বা বিক্রেতার অভিজ্ঞতা এক নয়। তবু তাঁদের বিচিত্র উদ্দেশ্য বাজারের একই পরিসরে মিলিত হয়।
সোনোরা বাজার নিয়ে আলোচনায় প্রাণী বিক্রির প্রসঙ্গও দীর্ঘদিন ধরে এসেছে। তবে এই বিষয়ে পুরনো বর্ণনাকে বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। মেক্সিকো সিটি সরকারের ২০২৬ সালের এক ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রাণী বিক্রি বন্ধ করে ব্যবসার ধরন বদলেছেন এমন দোকানদারদের সহায়তা ও ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে বাজারের সেই অংশেও পরিবর্তন ঘটছে।
এটি সোনোরাকে বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বহুদিনের পরিচিত বাজার হলেও তার নিয়ম, ব্যবসার ধরন এবং পণ্যের তালিকা সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। কোনও পর্যটন নির্দেশিকায় পুরনো সময়ের যে বিবরণ রয়েছে, তা সব ক্ষেত্রে আজকের প্রতিটি দোকানের ছবি নাও হতে পারে। তাই বাজারটি নিয়ে লিখতে গেলে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান পরিবর্তনকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দোকানদারদের দিক থেকেও পরিবর্তন সহজ বিষয় নয়। একটি ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে যে পণ্য বিক্রি করেছে, সেই পণ্য ছেড়ে অন্য কাজে যাওয়া মানে নতুন সরবরাহ, নতুন ক্রেতা এবং নতুন হিসাব তৈরি করা। সরকারের সহায়তার ঘোষণাটি তাই শুধু বাজারের নিয়ম বদলের খবর নয়; এর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জীবিকাও জড়িয়ে আছে।
সোনোরা বাজারে কেউ গেলে তাঁর প্রথম কৌতূহল হয়তো থাকবে ভেষজ আর তাবিজের দোকান ঘিরে। কিন্তু একটু মন দিয়ে দেখলে অন্য অনেক প্রশ্নও সামনে আসে। দোকানগুলি কেন নির্দিষ্ট জায়গায়? কোন পণ্য স্থানীয় প্রয়োজন মেটায়, আর কোনটি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি টানে? একই জিনিসের অর্থ বিক্রেতা ও ক্রেতার কাছে কি এক? এই প্রশ্নগুলি বাজারটিকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থীর কাছে সোনোরা অচেনা জগৎ মনে হতে পারে। সেই অচেনা অনুভূতি স্বাভাবিক। তবে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস বা ব্যবহারের কোনও জিনিসকে কেবল চমক হিসেবে দেখলে তাঁদের অভিজ্ঞতা আড়ালে চলে যায়। বাজার ঘুরে দেখার সময় মনে রাখা দরকার, এটি মানুষের নিয়মিত কেনাকাটা ও কাজের জায়গা।
সোনোরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এই বহুস্তরীয় পরিচয়। একই বাজার এক ব্যক্তির কাছে উৎসবের কেনাকাটার জায়গা, অন্যজনের কাছে ভেষজের ঠিকানা, তৃতীয়জনের কাছে লোকবিশ্বাস সম্পর্কে জানার সুযোগ। একটি বাজার যে এত ভিন্ন প্রয়োজনকে জায়গা দিতে পারে, সেটিই তাকে বিশেষ করে তুলেছে।
সোনোরা বাজারের ভেষজ ও আচার অনুষ্ঠানের সামগ্রী নিয়ে লিখতে গেলে একটি সীমারেখা স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। কেউ কোনও উদ্ভিদকে নির্দিষ্ট রোগের উপকারে আসে বলে বিশ্বাস করতে পারেন। কেউ ভাবতে পারেন, একটি তাবিজ তাঁকে মঙ্গল এনে দেবে। এই বিশ্বাসগুলি মানুষের সংস্কৃতি ও আচরণ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশ্বাসের অস্তিত্ব কোনও চিকিৎসাগত বা অলৌকিক দাবির প্রমাণ নয়।
তাই বাজারটির গল্প সবচেয়ে ভালোভাবে বলা যায় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাঁরা কী খোঁজেন, কী কেনেন, কেন সেই জিনিস তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ—এসব প্রশ্নের উত্তর বাজারের সামাজিক পরিচয় তুলে ধরে। অন্যদিকে কোনও পণ্যের ক্ষমতা নিশ্চিত করে বলা পাঠককে ভুল ধারণা দিতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে এমন ভুল ধারণার বাস্তব প্রভাব থাকতে পারে।
সোনোরা সম্পর্কে সরকারি পর্যটন তথ্যেও কয়েকটি ভেষজ ও প্রাণীজাত পণ্যের প্রচলিত ব্যবহারের উল্লেখ আছে। সেগুলিকে স্থানীয় দাবি হিসেবেই বোঝা উচিত। একটি বাজার কী বিক্রি করে, তা জানা আর কোনও চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকর কি না, তা জানা—দুটি আলাদা বিষয়।
মেক্সিকো সিটিতে বহু বাজার রয়েছে। তা হলে সোনোরা এত মানুষের কৌতূহল জাগায় কেন? একটি কারণ অবশ্যই তার অস্বাভাবিক মনে হওয়া পণ্যের সমাহার। সাধারণ বাজারে যেখানে এক ধরনের কেনাকাটার প্রত্যাশা থাকে, এখানে সেখানে ভেষজ, মাটির পাত্র, উৎসবের শিল্পকর্ম এবং লোকবিশ্বাসের সামগ্রী পাশাপাশি পাওয়া যায়।
আরেকটি কারণ বাজারটির গল্প বলার ক্ষমতা। একটি রঙিন মোমবাতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তার ব্যবহার সম্পর্কে কথা শুরু হতে পারে। কোনও ভেষজ নিয়ে জানতে চাইলে সামনে আসতে পারে তার উৎস বা প্রচলিত ব্যবহার। কোনও শিল্পকর্ম দেখলে উৎসবের প্রসঙ্গ উঠতে পারে। অর্থাৎ এখানে জিনিসপত্রের সঙ্গে নানা ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অর্থ জড়িয়ে রয়েছে।
তবে সোনোরার জনপ্রিয়তার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। জায়গাটিকে কেবল বিচিত্র পণ্যের প্রদর্শনী হিসেবে দেখালে সেখানে কাজ করা মানুষের বাস্তব জীবন চোখ এড়িয়ে যায়। আবার বাজারের সব দাবি যাচাই ছাড়াই সত্য বলে ধরলে পাঠকের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছতে পারে। সোনোরাকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হল কৌতূহল ধরে রাখা, পাশাপাশি তথ্য ও বিশ্বাসের পার্থক্যটিও স্পষ্ট রাখা।
মেরকাদো দে সোনোরার আকর্ষণ শুধু এই নয় যে সেখানে ভেষজের পাশে তাবিজ বা জাদুবিদ্যার সামগ্রী বিক্রি হয়। বাজারটি দেখায়, একটি শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি কীভাবে প্রতিদিনের কেনাবেচার মধ্যে জায়গা করে নেয়। এখানে উৎসবের প্রস্তুতি আছে, শিল্পীর কাজ আছে, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পণ্য আছে, ক্রেতাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস আছে। আর আছে সেই সব দোকানদারের কাজ, যাঁরা বাজারটিকে চালু রেখেছেন।
দূর থেকে সোনোরাকে রহস্যময় মনে হতে পারে। কাছে গেলে বোঝা যায়, রহস্যের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে পরিচিত মানবিক চাহিদা—সুস্থ থাকার আশা, উৎসবের আনন্দ, সংসারের প্রয়োজন এবং জীবিকা অর্জনের চেষ্টা। মেক্সিকো সিটির এই বাজার তাই কেবল অদ্ভুত সামগ্রীর ঠিকানা নয়; এটি শহরের মানুষের জীবন ও বিশ্বাসকে জানারও একটি জানালা।