রণবীর অভিনীত ‘ধুরন্ধর’ ছবিকে ঘিরে ফের বিতর্ক। এবার ছবির শিল্প নির্দেশকের বিরুদ্ধে উঠল শ্লীলতাহানির অভিযোগ, যা নিয়ে সরগরম বলিউড মহল।
বলিউডের অন্যতম চর্চিত ছবি ‘ধুরন্ধর’ ঘিরে বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। ছবির সাফল্যের আনন্দ এখনও পুরোপুরি ম্লান হয়নি, তার মধ্যেই একের পর এক আইনি জটিলতা ও গুরুতর অভিযোগে ফের শিরোনামে উঠে এল এই সিনেমা। প্রথমে অভিনেতা রণবীর সিংহকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ‘ফেডারেশন অফ ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িজ়’ বা FWICE-এর তরফে তাঁকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছিল বলিউডে। আর এবার আরও বড় অভিযোগ উঠল ‘ধুরন্ধর’ ছবির শিল্প নির্দেশক জন জোসেফের বিরুদ্ধে। কাজ দেওয়ার নাম করে এক তরুণীকে ধর্ষণ ও শারীরিক হেনস্থার অভিযোগে সরগরম গোটা বিনোদন জগৎ।
চণ্ডীগড় পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। অভিযোগকারিণী তরুণীর দাবি, জন জোসেফ তাঁকে কাজের বিষয়ে আলোচনা করার কথা বলে চণ্ডীগড়ের সেক্টর ১৭ এলাকার একটি বিলাসবহুল হোটেলে ডেকে পাঠান। সেই সময় ‘ধুরন্ধর’ ছবির শুটিং চলছিল চণ্ডীগড়ে। তরুণী জানান, প্রথমে তিনি বিষয়টিকে সম্পূর্ণ পেশাগত বৈঠক বলেই মনে করেছিলেন। কারণ, এর আগে ছবির শুটিং চলাকালীন প্রোডাকশন টিমের সদস্য হিসেবে জন জোসেফের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। সেই সূত্রেই ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ এবং ভবিষ্যতে আরও কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন অভিযুক্ত।
অভিযোগ অনুযায়ী, হোটেলের ঘরে ঢোকার পর প্রথমে কাজ নিয়েই আলোচনা শুরু হয়। তরুণীর দাবি, কিছু সময় পর জন জোসেফ তাঁকে মদ্যপান করার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। প্রথমে আপত্তি করলেও পরে পরিস্থিতির চাপে কিছুটা পানীয় গ্রহণ করেন তিনি। এরপরই আচমকা অসুস্থ বোধ করতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে অচৈতন্য হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ। তরুণীর দাবি, সেই পানীয়ে কোনও ধরনের মাদক মেশানো ছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অচৈতন্য অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাঁর সঙ্গে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন জন জোসেফ। বাধা দিতে গেলে তাঁকে মারধরও করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে, বিনোদন জগতের অন্দরমহলে কাজের সুযোগ দেওয়ার নামে তরুণ-তরুণীদের প্রতারণা, হেনস্থা বা শোষণের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও একাধিক অভিনেত্রী ও কর্মী ‘কাস্টিং কাউচ’ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। ফলে ‘ধুরন্ধর’ ছবির সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে চলচ্চিত্র জগতের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে।
তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৭৪, ৭৯, ১২৩ এবং ১২৬(২)-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করেছে চণ্ডীগড় পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সমস্ত প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ, ফোন কল রেকর্ড, মেসেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, ঘটনার সময় হোটেলে উপস্থিত কর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
তবে এই ঘটনায় একটি বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয় ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল। এত দীর্ঘ সময় পরে অভিযোগ দায়েরের কারণ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। যদিও আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যৌন হেনস্থা বা ধর্ষণের মতো ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই মানসিক চাপ, ভয়, সামাজিক লজ্জা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার আশঙ্কায় অভিযোগ জানাতে দেরি হয়। বিশেষ করে বিনোদন জগতের মতো প্রতিযোগিতামূলক জায়গায় কাজ হারানোর ভয় অনেককে দীর্ঘ সময় চুপ থাকতে বাধ্য করে।
অভিযোগকারিণীর দাবি, ঘটনার পরে জন জোসেফ তাঁকে ভয় দেখাতে শুরু করেন। তাঁর ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। এমনকি, ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয় বলে দাবি তরুণীর। ফলে আতঙ্ক ও মানসিক চাপে দীর্ঘদিন বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে পারেননি তিনি। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে পুলিশের দ্বারস্থ হন।
চণ্ডীগড় পুলিশ ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত শিল্প নির্দেশককে গ্রেফতার করেছিল। যদিও পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে তদন্ত এখনও চলছে এবং পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, জন জোসেফ বা তাঁর আইনজীবীর পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, এই ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই অভিযোগকারিণীর পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন। আবার কেউ কেউ আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত কাউকে দোষী না সাব্যস্ত করার পক্ষেও মত দিয়েছেন। তবে পুরো ঘটনাই এখন ‘ধুরন্ধর’ ছবির ভাবমূর্তির উপর বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ‘ধুরন্ধর’ মুক্তির পর থেকেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ছবির গান, অ্যাকশন এবং রণবীর সিংহের অভিনয় দর্শকদের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে রণবীর ও সারা অর্জুন অভিনীত ‘রান ডাউন সিটি’ গানটির শুটিং হয়েছিল চণ্ডীগড়ে, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরালও হয়। কিন্তু ছবির সাফল্যের মাঝেই একের পর এক বিতর্ক এখন পুরো টিমকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
এর আগেই রণবীর সিংহকে নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে সরব হয়েছিল FWICE। বিভিন্ন ইস্যুতে অভিনেতার বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে তাঁকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে খবর সামনে আসে। যদিও সেই বিতর্ক পুরোপুরি থামার আগেই নতুন এই অভিযোগ ছবির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আরও চাপে ফেলেছে।
চলচ্চিত্র জগতের অন্দরমহলে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। #MeToo আন্দোলনের সময় বহু অভিনেত্রী, মডেল ও কর্মী তাঁদের অভিজ্ঞতা সামনে এনেছিলেন। সেই সময় থেকেই ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তা ও পেশাগত পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ‘ধুরন্ধর’ বিতর্ক সেই পুরনো ক্ষতকেই যেন আবার উস্কে দিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযোগ দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগকারিণীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের মামলায় সামাজিক চাপ ও মানসিক ট্রমা ভুক্তভোগীর উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে গোটা ঘটনার দিকে নজর রয়েছে বলিউড মহল থেকে সাধারণ দর্শক— সকলেরই। তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে, আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ করা হয়, এখন সেটাই দেখার। তবে এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, গ্ল্যামারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার দিকগুলি এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। বিনোদন জগতের চাকচিক্যের পিছনে থাকা ক্ষমতার রাজনীতি, সুযোগের লোভ দেখিয়ে শোষণ এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ আজও উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে রয়েছে।
এই ঘটনার পর থেকেই চলচ্চিত্র জগতের কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নতুন শিল্পী, মডেল এবং অভিনয়ে সুযোগ খুঁজতে আসা তরুণ-তরুণীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। অভিযোগকারিণীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে প্রথমে বড় সুযোগের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। বলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আশায় বহু নতুন মুখ বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা বা টিমের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। সেই সুযোগকেই অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন বলেই অভিযোগ উঠছে।
সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। বহু নেটিজেন অভিযোগকারিণীর সাহসের প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মুখ খোলা সহজ নয়। আবার অন্য একাংশের মত, তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বলা উচিত নয়। ফলে ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই ধরনের মতামতই সামনে এসেছে। তবে অধিকাংশেরই দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য সামনে আসা প্রয়োজন।
চণ্ডীগড় পুলিশের ভূমিকাও এখন নজরে রয়েছে। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই হোটেলের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগকারিণীর মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং ঘটনাস্থলের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে ছবির ইউনিটের একাধিক সদস্যকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
এদিকে, ‘ধুরন্ধর’ ছবির প্রযোজনা সংস্থার তরফে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনও বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইন্ডাস্ট্রির একাংশ মনে করছে, এত বড় অভিযোগের পর প্রযোজনা সংস্থার দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত। কারণ এই ধরনের ঘটনা শুধু একটি ছবির নয়, পুরো বিনোদন জগতের ভাবমূর্তির উপর প্রভাব ফেলে।
ঘটনার জেরে রণবীর সিংহের নামও আবার শিরোনামে উঠে এসেছে। যদিও এই অভিযোগের সঙ্গে অভিনেতার সরাসরি কোনও যোগের কথা সামনে আসেনি, তবুও ছবিকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক তাঁর নতুন প্রজেক্টগুলির উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন সকলের নজর তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই।