অভিনয়ের শুরুতে সাফল্য পেলেও পরে দীর্ঘদিন কাজের অভাবে হতাশায় ভুগেছিলেন ববি দেওল। সেই কঠিন সময়ে মদ্যপানের নেশায় জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পরিবার ও নিজের ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি ফিরে আসেন স্বাভাবিক জীবনে।
বলিউডে এমন অনেক তারকা রয়েছেন, যাঁদের জীবন বাইরের দিক থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, বাস্তবে তাঁদের সংগ্রামের গল্প ততটাই কঠিন। অভিনেতা Bobby Deol-এর জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। একসময় বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে পরিচিত হলেও দীর্ঘ সময় তাঁকে কাজের অভাব, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই কঠিন সময়ে তিনি মদ্যপানের নেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে পরিবার, বিশেষ করে স্ত্রী তান্যা এবং ছেলে আর্যমানের সমর্থন ও একটি ছোট্ট উপলব্ধিই তাঁর জীবনকে বদলে দেয়।
সম্প্রতি ‘অ্যানিম্যাল’ ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয়ের মাধ্যমে আবারও দর্শকদের নজর কেড়েছেন ববি দেওল। ছবিতে তাঁর চরিত্রের সংলাপ খুব কম হলেও অভিনয়ের গভীরতা এবং উপস্থিতি দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে। এরপর ‘দ্য ব্যাডস অফ বলিউড’ সিরিজ়েও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের অধ্যায়, যা বহুদিন জনসমক্ষে আসেনি।
ধর্মেন্দ্রর ছেলে হিসেবে বলিউডে প্রবেশ করলেও ববির কেরিয়ার শুরুটা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। নব্বইয়ের দশকে একের পর এক হিট ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দায় উপস্থিতি দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলিউডের চাহিদা বদলাতে শুরু করে। নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের আগমন এবং ছবির ধরণ পাল্টে যাওয়ার ফলে ববির হাতে কাজ কমতে থাকে।
একটা সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে দীর্ঘদিন তাঁর কাছে কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল না। একজন অভিনেতার কাছে কাজের অভাব শুধু আর্থিক সমস্যা নয়, মানসিক চাপও তৈরি করে। নিজের অস্তিত্ব, প্রতিভা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ববির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল। তিনি ধীরে ধীরে হতাশার মধ্যে ডুবে যেতে থাকেন।
এক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে ববি অকপটে স্বীকার করেন যে তিনি মদের নেশার মধ্যে আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেছিলেন। তাঁর কথায়, মদ্যপান মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে এমনভাবে খেলা করে যে অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না কখন তা অভ্যাস থেকে আসক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ববি জানান, তিনি প্রতিদিন মদ্যপান করতেন এমন নয়, কিন্তু যখনই মদ খেতেন তখন যেন তাঁর ব্যক্তিত্ব বদলে যেত। তিনি নিজেকে আর আগের মতো অনুভব করতেন না। এই পরিবর্তন তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। বাড়ির মানুষ সবসময় আশঙ্কায় থাকতেন, কারণ তাঁরা বুঝতে পারছিলেন যে ববি ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, এমন একটা সময় এসেছিল যখন দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি বাড়িতেই কাটাতেন এবং মদ্যপানের অভ্যাস বেড়ে গিয়েছিল। কাজের অভাব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ তাঁকে আরও বেশি করে নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।
শুধু মানসিক নয়, এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করে সংসারেও। একসময় তাঁর আয় এতটাই কমে যায় যে পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে ওঠে। তখন তাঁর স্ত্রী তান্যা দেওল সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। পরিবারের আর্থিক স্থিতি বজায় রাখতে তিনি কাজ করতে শুরু করেন এবং সমস্ত খরচ সামলান।
এই সময়টাতেই তান্যার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। কিন্তু তান্যা তাঁর স্বামীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ববিকে ছোট করেননি, অপমান করেননি বা তাঁর উপর অতিরিক্ত চাপও সৃষ্টি করেননি।
ববি আজও সেই সমর্থনের জন্য স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর মতে, তান্যা চাইলে খুব সহজেই তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন। কারণ তখন তিনি কর্মহীন, হতাশ এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু তান্যা তা করেননি। বরং ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামলেছেন এবং পরিবারের ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।
ববির বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর মদের প্রতি আকর্ষণের পেছনে পারিবারিক পরিবেশেরও কিছু প্রভাব ছিল। তিনি বলেন, তাঁর বাবা ধর্মেন্দ্র মদ্যপান করতে পছন্দ করতেন এবং ছোটবেলা থেকে সেই পরিবেশ দেখেই বড় হয়েছেন। যদিও এর অর্থ এই নয় যে ধর্মেন্দ্র তাঁকে নেশার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন, তবে মদের প্রতি একটি স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্যতা তাঁর মনে তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে। সেই পরিবর্তনের কারণ ছিলেন তাঁর বড় ছেলে আর্যমান দেওল। একদিন আর্যমান তার মাকে বলছিল, “মা, তুমি রোজ কাজে যাও, আর বাবা তো বাড়িতেই বসে থাকে।” এই সাধারণ কথাটিই ববির জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
একজন বাবা হিসেবে ছেলের মুখে এমন মন্তব্য শুনে তিনি ভীষণভাবে নাড়া খেয়ে যান। তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁর বর্তমান জীবনযাপন শুধু তাঁর নিজের ক্ষতি করছে না, বরং তাঁর সন্তানদের মনেও একটি ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। সেই মুহূর্তে তিনি নিজের জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন।
ববি বুঝতে পারেন, তিনি যে মানুষ হতে চেয়েছিলেন, বর্তমানে তিনি সেই মানুষ নন। একজন দায়িত্বশীল বাবা, স্বামী এবং অভিনেতা হিসেবে তাঁর আরও অনেক কিছু করার আছে। আর সেই উপলব্ধিই তাঁকে নেশার বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি দেয়।
এরপর তিনি ধীরে ধীরে মদ্যপান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে আনতে শুরু করেন। এটা কোনও সহজ প্রক্রিয়া ছিল না। দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে মানসিক দৃঢ়তা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু পরিবারের সমর্থন এবং নিজের ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি সেই কঠিন পথ অতিক্রম করতে সক্ষম হন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই পুরো সময়ে তান্যা কখনও তাঁকে জোর করেননি। তিনি কখনও মদ ছাড়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেননি কিংবা কোনও আল্টিমেটাম দেননি। বরং তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন যে একদিন ববি নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারবেন।
ববির মতে, এই বিশ্বাস এবং ধৈর্যই তাঁকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। কারণ অনেক সময় কোনও মানুষকে বদলানোর জন্য চাপের চেয়ে ভালোবাসা এবং সমর্থন বেশি কার্যকর হয়।
আজ যখন তিনি নিজের জীবনের সেই অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকান, তখন বুঝতে পারেন কতটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে তিনি গিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও অনুভব করেন যে সেই কঠিন অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও শক্তিশালী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
বর্তমানে ববি দেওল আবারও বলিউডে নিজের জায়গা শক্ত করেছেন। ‘অ্যানিম্যাল’-এর সাফল্য তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও জনপ্রিয় করে তুলেছে। একসময় যাঁকে অনেকে ভুলতে বসেছিলেন, তিনিই আজ আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তাঁর এই যাত্রা শুধু একজন অভিনেতার কেরিয়ারের উত্থান-পতনের গল্প নয়, বরং ব্যক্তিগত সংগ্রাম, পরিবারে ভালোবাসা এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। নেশার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে জীবন শুরু করা যে সম্ভব, ববি দেওলের গল্প তারই প্রমাণ।
আজ তিনি শুধু সফল অভিনেতা নন, বরং এমন একজন মানুষ যিনি নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করেছেন, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং জীবনের দ্বিতীয় সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আর সেই কারণেই তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের গল্প বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।এখন ববি দেওল তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা সময় পার করছেন। ‘অ্যানিম্যাল’-এর সাফল্যের পর একাধিক বড় প্রজেক্টের প্রস্তাবও তাঁর কাছে এসেছে। দর্শকরাও তাঁকে নতুনভাবে গ্রহণ করেছেন। একসময় যে অভিনেতা কাজের অভাবে হতাশায় ভুগছিলেন, আজ তিনিই আবার বলিউডে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। ববি মনে করেন, জীবনে খারাপ সময় আসতেই পারে, কিন্তু সেই সময়কে হার মানিয়ে এগিয়ে যাওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় প্রমাণ করে যে পরিবার পাশে থাকলে এবং নিজের উপর বিশ্বাস না হারালে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি থেকেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। স্ত্রী তান্যা ও ছেলে আর্যমানের সমর্থন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, যা তিনি আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।