যানজটের শহর কলকাতায় আজ এক নতুন যুগের সূচনা হলো। নিউ টাউন থেকে কলকাতা বিমানবন্দর পর্যন্ত চালু হলো ভারতের প্রথম ড্রোন-ভিত্তিক ‘উড়ন্ত ট্যাক্সি’ পরিষেবা। মাত্র ১০ মিনিটে এই পথ পাড়ি দেওয়া যাবে। ২০২৮ সালের মধ্যে এই পরিষেবা মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুতেও চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কলকাতা ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
কলকাতা মানেই কি কেবল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা হাওড়া ব্রিজ। কলকাতা মানেই কি ট্রামের ধীর গতি আর উত্তর কলকাতার সরু গলি। এতদিন হয়তো উত্তরটা হ্যাঁ ছিল। কিন্তু আজ থেকে এই শহরের সংজ্ঞাই বদলে গেল। যে শহর এশিয়ার প্রথম ট্রাম চালিয়েছিল যে শহর ভারতের প্রথম মেট্রো রেলের সাক্ষী ছিল সেই শহরই আজ আবার ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাল। যানজটের শহর হিসেবে কলকাতার যে দুর্নাম ছিল তা ঘুচে গিয়ে আজ থেকে এই শহর পরিচিত হলো গতির শহর হিসেবে। কারণ আজ সকালেই নিউ টাউনের বিশ্ব বাংলা গেটের কাছে তৈরি আধুনিক ভার্টিপোর্ট থেকে ডানা মেলল ভারতের প্রথম উড়ন্ত ট্যাক্সি বা এয়ার ট্যাক্সি। নিউ টাউন থেকে কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত যে রাস্তা গাড়িতে যেতে সময় লাগত প্রায় দেড় ঘণ্টা আজ সেই পথ উড়ন্ত ট্যাক্সিতে পার হতে সময় লেগেছে মাত্র ১০ মিনিট।
পরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন বিপ্লব
আজকের দিনটি ভারতের পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এতদিন আমরা সায়েন্স ফিকশন মুভি বা বিদেশি কার্টুনে উড়ন্ত গাড়ি দেখতাম। সেই কল্পবিজ্ঞান আজ কলকাতার বুকে বাস্তবে রূপ নিল। এই পরিষেবার পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে স্কাই শাটল। সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত এই এয়ার ট্যাক্সিগুলো দেখতে অনেকটা বিশাল ড্রোন বা ছোট হেলিকপ্টারের মতো। তবে হেলিকপ্টারের মতো এতে অত শব্দ হয় না এবং এটি পরিবেশবান্ধব। একে বলা হয় ইভিটোল বা ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেক অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং ভেহিকল। অর্থাৎ এটি হেলিকপ্টারের মতোই সোজা ওপরে উঠতে এবং নিচে নামতে পারে। এর জন্য কোনো বিশাল রানওয়ের প্রয়োজন হয় না।
নিউ টাউন থেকে বিমানবন্দর মাত্র ১০ মিনিটে
কলকাতা শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ট্রাফিক জ্যাম। বিশেষ করে অফিস টাইমে ইএম বাইপাস বা ভিআইপি রোড দিয়ে বিমানবন্দর পৌঁছানো একপ্রকার যুদ্ধ জয়ের সমান। অনেক সময় জ্যামের কারণে যাত্রীদের ফ্লাইট মিস করার ঘটনাও ঘটে। এই সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান হিসেবেই এই এয়ার ট্যাক্সি পরিষেবা চালু করা হয়েছে। আজ উদ্বোধনী যাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী এবং কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক। সকাল ১০টায় নিউ টাউনের স্মার্ট সিটি ভার্টিপোর্ট থেকে একটি এয়ার ট্যাক্সি আকাশে ওড়ে। যাত্রীরা জানান যে ওপর থেকে কলকাতা শহরকে দেখার অভিজ্ঞতা ছিল এক কথায় অসাধারণ। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা বিমানবন্দরের টার্মিনালের কাছে তৈরি বিশেষ ল্যান্ডিং প্যাডে অবতরণ করেন। যেখানে সড়কপথে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগত সেখানে মাত্র ১০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছানো যেন এক জাদুকরী ব্যাপার।
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার খুঁটিনাটি
এই এয়ার ট্যাক্সিগুলো তৈরি করেছে একটি আন্তর্জাতিক এভিয়েশন কোম্পানি এবং ভারতের একটি স্টার্টআপ সংস্থার যৌথ উদ্যোগে। প্রতিটি পডে বা ট্যাক্সিতে চালকসহ মোট চারজন যাত্রী বসার ব্যবস্থা রয়েছে। ভবিষ্যতে এগুলো সম্পূর্ণ চালকবিহীন বা অটোনমাস করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই যানগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক ডিস্ট্রিবিউটেড ইলেকট্রিক প্রোপালশন প্রযুক্তি। এতে একাধিক ছোট ছোট রোটর বা পাখা থাকে যা একে আকাশে ভাসিয়ে রাখে। নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো কারণে একটি বা দুটি মোটর বিকল হয়ে যায় তবুও বাকি মোটরগুলো নিরাপদে যানটিকে মাটিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এ ছাড়া জরুরি অবস্থার জন্য প্রতিটি ট্যাক্সিতে ব্যালিস্টিক প্যারাশুট যুক্ত করা হয়েছে।
শব্দদূষণ রোধে বিশেষ প্রযুক্তি
হেলিকপ্টারের শব্দ শহরের আবাসিক এলাকার জন্য বিরক্তিকর হতে পারে। কিন্তু এই এয়ার ট্যাক্সিগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে আল্ট্রা কোয়ায়েট প্রযুক্তি। সাধারণ হেলিকপ্টারের তুলনায় এগুলো ১০০ গুণ কম শব্দ করে। মাটি থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ ফুট ওপর দিয়ে ওড়ার সময় নিচে শব্দ প্রায় শোনাই যায় না। তাই শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে গেলেও মানুষের কোনো অসুবিধা হবে না। এটি সম্পূর্ণ ব্যাটারি চালিত হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ বা ধোঁয়া নেই বললেই চলে। অর্থাৎ এটি কেবল সময়ই বাঁচাবে না পরিবেশকেও রক্ষা করবে।
ভাড়া ও সাধারণ মানুষের নাগাল
আপাতত এই পরিষেবার ভাড়া সাধারণ অ্যাপ ক্যাব বা ট্যাক্সির তুলনায় কিছুটা বেশি। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে নিউ টাউন থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যাত্রার জন্য মাথাপিছু ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩০০০ টাকা। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি এটি কেবল শুরু। আগামী দিনে যখন এয়ার ট্যাক্সির সংখ্যা বাড়বে এবং আরও বেশি মানুষ এটি ব্যবহার করা শুরু করবে তখন ভাড়া অনেকটাই কমে আসবে। তাদের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে এর ভাড়া সাধারণ উবার বা ওলার প্রিমিয়াম রাইডের সমান করে তোলা। বর্তমানে যারা জরুরি ভিত্তিতে বিমানবন্দর পৌঁছাতে চান বা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ যাদের সময়ের মূল্য অনেক বেশি তাদের জন্যই মূলত এই পরিষেবা চালু করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও কর্মসংস্থান
এই প্রকল্প কেবল যাত্রীদের সুবিধাই দেবে না বরং রাজ্যের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখবে। এয়ার ট্যাক্সি রক্ষণাবেক্ষণ ভার্টিপোর্ট পরিচালনা এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য প্রচুর দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে। এর ফলে রাজ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এভিয়েশন সেক্টরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তা ছাড়া কলকাতার মতো শহরে এমন আধুনিক পরিষেবা চালু হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আকৃষ্ট হবে। এটি প্রমাণ করে যে কলকাতা প্রযুক্তি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভারতের অন্যান্য মেট্রো শহরের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অন্যান্য শহরে সম্প্রসারণ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্থার সিইও জানান যে কলকাতার সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। খুব শীঘ্রই শহরের আরও কয়েকটি রুটে যেমন হাওড়া স্টেশন থেকে বিমানবন্দর এবং সেক্টর ফাইভ থেকে দক্ষিণ কলকাতা পর্যন্ত এয়ার ট্যাক্সি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৮ সালের মধ্যে ভারতের আরও দুটি ব্যস্ত শহর মুম্বাই এবং বেঙ্গালুরুতে এই পরিষেবা চালু করা হবে। মুম্বাইয়ের ট্রাফিক জ্যাম বিশ্বখ্যাত। সেখানেও এই উড়ন্ত ট্যাক্সি বিপ্লব ঘটাতে পারে।
যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া
প্রথম দিনের যাত্রীরা তাদের উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে পারেননি। এক যাত্রী বলেন আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে মাত্র ১০ মিনিটে নিউ টাউন থেকে এয়ারপোর্ট চলে এসেছি। ওপর থেকে ভিক্টোরিয়া আর গঙ্গার দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা ভোলার মতো নয়। মনে হচ্ছিল যেন ভবিষ্যতের কোনো শহরে চলে এসেছি। আরেকজন কর্পোরেট যাত্রী বলেন আমার মতো যাদের প্রায়ই মিটিংয়ের জন্য ফ্লাইটে যাতায়াত করতে হয় তাদের জন্য এটি আশীর্বাদ। রাস্তায় জ্যামে বসে থাকার চেয়ে এই টাকা খরচ করা অনেক বেশি লাভজনক।
চ্যালেঞ্জ ও আবহাওয়া
অবশ্য সব কিছুই যে মসৃণ হবে তা নয়। কলকাতার আবহাওয়া বিশেষ করে কালবৈশাখী ঝড় এবং বর্ষাকালে ভারি বৃষ্টি এই পরিষেবার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সংস্থা জানিয়েছে যে খারাপ আবহাওয়ায় উড়ান বাতিল বা স্থগিত রাখা হবে। এ ছাড়া শহরের আকাশে ড্রোনের আনাগোনা বাড়লে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বা এটিসি-র ওপর চাপ বাড়বে। এর জন্য আলাদা একটি লো অল্টিটিউড এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে যা প্রতিটি এয়ার ট্যাক্সির গতিপথ রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করবে এবং সংঘর্ষ এড়াবে।
উপসংহার
এক সময় পালকি আর ঘোড়ার গাড়ি ছিল কলকাতার প্রধান বাহন। তারপর এল হাতে টানা রিকশা ট্রাম বাস এবং মেট্রো। আর আজ এল উড়ন্ত ট্যাক্সি। এই বিবর্তন কেবল যানবাহনের নয় এটি একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার গল্প। কলকাতা আজ দেখিয়ে দিল যে ঐতিহ্যকে ধারণ করেও আধুনিকতার শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। ট্রামের ঘণ্টা আর এয়ার ট্যাক্সির মৃদু গুঞ্জন এখন থেকে এই শহরে পাশাপাশি চলবে। যানজটের শহর তকমা ঘুচিয়ে কলকাতা এখন পরিচিত হবে গতির শহর বা ফিউচার সিটি হিসেবে। আকাশের নীল ক্যানভাসে আজ যে নতুন ডানা মেলল তা আগামী দিনে আমাদের জীবনযাত্রার মানচিত্রটাই বদলে দেবে। হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসের জন্য আর বাসের পাদানিতে ঝুলতে হবে না বরং বাড়ির ছাদ থেকেই উড়ন্ত ট্যাক্সিতে চড়ে সোজা অফিসের ছাদে নামা যাবে। স্বপ্নটা বড় কিন্তু আজ থেকে তা আর অসম্ভব নয়।