Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১৮ বছর ট্রফি নেই, মুম্বই-চেন্নাই-কলকাতাকে টপকে আইপিএলের সেই দলই সবচেয়ে ধনী! বাজারদর বেড়ে দাঁড়াল ৯২১৫ কোটি টাকা

আইপিএলের প্রথম বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস। তার পর আর ট্রফি জিততে পারেনি তারা। কিন্তু তার প্রভাব দলের বাজারদরে পড়েনি। মুকেশ অম্বানীর মুম্বই ইন্ডিয়ান্স বা শাহরুখ খানের কলকাতা নাইট রাইডার্স নয়, আইপিএলের সবচেয়ে ধনী দল হতে চলেছে রাজস্থান রয়্যালস। তারাই প্রথম দল যারা ‘বিলিয়ন-ডলার’ দলের তকমা পেতে চলেছে। অর্থাৎ, এই দলের বাজারদর হবে ৯২১৫ কোটি টাকা।

২০০৮ সালে আইপিএলের প্রথম মরসুমে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রাজস্থান। শেন ওয়ার্নের নেতৃত্বে দলের সেই সাফল্যের পর থেকে গত ১৮ বছর ট্রফি নেই। মাঝে এক বার ফাইনাল খেললেও ট্রফি জেতা হয়নি। তার পরেও তাদের বাজারদরে প্রভাব পড়েনি। এই দল কিনতে বেশ কয়েকটি সংস্থা আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে দলের বাজারদর এতটা বেড়ে গিয়েছে।

রাজস্থানের অন্যতম মালিক এমার্জিং মিডিয়া ভেঞ্চার্স। সঙ্গে রেডবার্ড ক্যাপিটাল পার্টনার ও টাইগার গ্লোবাল সংস্থাও রয়েছে। গত কয়েক মাসে টাইমস ইন্টারনেট, ব্ল্যাকস্টোন কর্পোরেশন ও কার্লাইল গ্রুপ রাজস্থানের মালিকানা কিনতে হয়েছে। আগ্রহ দেখিয়েছেন আমেরিকার বিনিয়োগকারী কাল সোমানিও। তাঁদের মধ্যে যে সংস্থাই রাজস্থানের নতুন মালিক হোক না কেন, সেই দলের বাজারদর ৯২১৫ কোটি টাকা হতে চলেছে।

রাজস্থানের মালিকানা বিক্রির বিষয়টি দেখেছে রেইনে গ্রুপ। ইংল্যান্ডের দুই ফুটবল ক্লাব চেলসি ও ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের অংশ বিক্রির বিষয়টিও তারাই দেখেছিল। আইপিএলের আগামী মরসুমের আগে অবশ্য হাতবদল হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কারণ, নতুন মরসুমের দল গড়েছে এমার্জিং মিডিয়া ভেঞ্চার্স। ফলে এই মরসুমে হয়ে যাওয়ার পর হাতবদল হতে পারে দলের।

রাজস্থানের পরেই হাতবদলের তালিকায় রয়েছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। গত বারের চ্যাম্পিয়ন দলের মালিকানা বদল হতে পারে। বর্তমান মালিক ডিয়াজিও ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি প্রস্তাব পেয়েছে। তবে বেঙ্গালুরুর মালিকানা বদল হলে তার বাজারদর রাজস্থানের থেকেও বেড়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধনী দলের তকমা পেতে পারে বেঙ্গালুরু।

আইপিএল এখন আর শুধু একটি ক্রিকেট লিগ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ গ্লোবাল স্পোর্টস বিজ়নেস মডেল। সেই মডেলের মধ্যেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা, বিনিয়োগ এবং তার হাতবদল। সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্থান রয়্যালস এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মালিকানা বদল নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে—আইপিএলের দলগুলি আজ আন্তর্জাতিক কর্পোরেট দুনিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় সম্পদ।

রাজস্থান রয়্যালসের মালিকানা বিক্রির বিষয়টি দেখভাল করছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনিয়োগ ও পরামর্শদাতা সংস্থা রেইনে গ্রুপ। এই নামটি নতুন নয়। এর আগে ইংল্যান্ডের দুই ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব—চেলসি ও ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের অংশীদারিত্ব বিক্রির প্রক্রিয়াও সামলেছে এই সংস্থাই। ফলে রাজস্থানের সম্ভাব্য হাতবদল যে শুধুই একটি ক্রীড়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্তরের একটি বড় কর্পোরেট লেনদেন—তা সহজেই অনুমেয়।

তবে প্রশ্ন হল, এই হাতবদল ঠিক কবে হবে? আইপিএলের আগামী মরসুম শুরু হওয়ার আগে কি আদৌ মালিকানা বদল সম্ভব? আপাতত সেই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত উত্তর নেই। কারণ, সদ্য সমাপ্ত মেগা নিলামের পর নতুন মরসুমের জন্য দল গড়ার দায়িত্ব সামলেছে এমার্জিং মিডিয়া ভেঞ্চার্স। অর্থাৎ, বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই দল মাঠে নামবে। তাই অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, এই মরসুম শেষ হওয়ার পরই মালিকানা বদলের সম্ভাবনা বেশি।

রাজস্থান রয়্যালস বরাবরই আইপিএলের এক বিশেষ ফ্র্যাঞ্চাইজি। প্রথম মরসুমের চ্যাম্পিয়ন দল হওয়ার পাশাপাশি কম বাজেটে দল গড়ে সাফল্য পাওয়ার যে মডেল তারা তৈরি করেছে, তা বহু বছর ধরেই প্রশংসিত। ক্রিকেটিং দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজস্থান বরাবরই “স্মার্ট ফ্র্যাঞ্চাইজি” হিসেবে পরিচিত। এই ব্র্যান্ড ভ্যালুই আজ তাদের বাজারদরকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটার তুলে আনার ক্ষেত্রে রাজস্থানের রেকর্ড ঈর্ষণীয়। যশস্বী জয়সওয়াল থেকে শুরু করে সঞ্জু স্যামসন—এমন একাধিক ভারতীয় প্রতিভার উত্থানে রাজস্থানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে এই দল শুধুই একটি ক্রিকেট টিম নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড অ্যাসেট।

রাজস্থানের পরেই মালিকানা বদলের সম্ভাব্য তালিকায় যে দলটির নাম উঠে আসছে, তা হল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। এবং এখানেই বিষয়টি আরও বেশি চমকপ্রদ হয়ে ওঠে। কারণ, বেঙ্গালুরু শুধু ক্রিকেটের দিক থেকে নয়, বাণিজ্যিক দিক থেকেও আইপিএলের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ডগুলির একটি।

বর্তমানে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মালিকানা রয়েছে আন্তর্জাতিক মদ প্রস্তুতকারী সংস্থা ডিয়াজিওর হাতে। ইতিমধ্যেই নাকি তারা একাধিক প্রস্তাব পেয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু ঘোষণা করা হয়নি, তবু কর্পোরেট মহলে জোর গুঞ্জন—ডিয়াজিও যদি সত্যিই বেঙ্গালুরুর মালিকানা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই দর রাজস্থানের তুলনায় অনেকটাই বেশি হবে।

এর মূল কারণ একাধিক। প্রথমত, বেঙ্গালুরুর ফ্যানবেস। বিরাট কোহলিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আবেগ, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল উপস্থিতি, মার্চেন্ডাইজ বিক্রি—সব মিলিয়ে আরসিবি আইপিএলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগুলির একটি। মাঠে ট্রফি না এলেও ব্র্যান্ড ভ্যালুর নিরিখে তারা বরাবরই শীর্ষে।

news image
আরও খবর

দ্বিতীয়ত, বেঙ্গালুরু শহর নিজেই একটি বড় ফ্যাক্টর। দেশের প্রযুক্তি রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই শহরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উচ্চবিত্ত দর্শক, কর্পোরেট স্পনসর এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। ফলে আরসিবি শুধুই একটি ক্রিকেট দল নয়, বরং একটি প্রিমিয়াম আরবান স্পোর্টস ব্র্যান্ড।

যদি সত্যিই বেঙ্গালুরুর মালিকানা বদল হয়, তবে তারা আইপিএলের সবচেয়ে ধনী দলের তকমাও পেতে পারে। এমনকি মুম্বই ইন্ডিয়ান্স বা চেন্নাই সুপার কিংসকেও ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। কারণ, নতুন বিনিয়োগকারীরা শুধু দল কেনার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কনটেন্ট, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং—সব কিছুর কথাই মাথায় রেখে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে পারেন।

এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে আইপিএলের বদলে যাওয়া চরিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক সময় যেখানে দল কেনা মানে ছিল ক্রিকেটের প্রতি আবেগ, সেখানে এখন তা হয়ে উঠেছে একটি পরিশীলিত আর্থিক সিদ্ধান্ত। বিশ্ব ফুটবলের মতোই আইপিএলেও ফ্র্যাঞ্চাইজি এখন কর্পোরেট পোর্টফোলিওর অংশ।

রেইনে গ্রুপের মতো সংস্থার যুক্ত হওয়া সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত। তারা শুধুই বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে সেতুবন্ধন করে না, বরং ব্র্যান্ড ভ্যালু নির্ধারণ, ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা, মিডিয়া রাইটস, স্পনসরশিপ—সব কিছু বিশ্লেষণ করেই চুক্তির কাঠামো তৈরি করে। ফলে রাজস্থান বা বেঙ্গালুরুর মালিকানা বদল হলে তা হবে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি কর্পোরেট লেনদেন।

তবে এর প্রভাব পড়বে শুধু বোর্ডরুমে নয়, মাঠের বাইরেও। নতুন মালিক মানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ হয়তো আরও বেশি তারকা ক্রিকেটারে বিনিয়োগ করবেন, কেউ আবার যুব ক্রিকেটে জোর দেবেন। কেউ ব্র্যান্ডিং বাড়াবেন, কেউ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন কিছু আনবেন। ফলে দলের পরিচয়েও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে পারে।

ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যেও এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একদিকে উত্তেজনা—নতুন মালিক মানেই বড় বিনিয়োগ, নতুন পরিকল্পনা। অন্যদিকে আশঙ্কা—পুরনো সংস্কৃতি বা পরিচয় হারিয়ে যাবে না তো? বিশেষ করে রাজস্থানের মতো দলের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, কারণ তাদের “আন্ডারডগ” ইমেজই এতদিন তাদের শক্তি ছিল।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজস্থান রয়্যালস ও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর সম্ভাব্য মালিকানা বদল আইপিএলের ইতিহাসে আরেকটি বড় অধ্যায় যোগ করতে চলেছে। এই হাতবদল শুধু টাকার অঙ্কে বড় নয়, তা আইপিএলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও অনেকটাই নির্ধারণ করবে। আগামী মরসুম শেষে এই গুঞ্জন বাস্তবে রূপ নেয় কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে ক্রিকেট বিশ্ব।

এই সম্ভাব্য মালিকানা বদলের প্রভাব আইপিএলের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। কারণ, এক বা দুইটি দলের বাজারদর হঠাৎ বেড়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির মূল্যায়নের উপরও। বিনিয়োগকারীরা তখন আইপিএলকে আরও বড় সুযোগ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রীড়া বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই ভারতের এই লিগের দিকে নজর রাখছে। রাজস্থান ও বেঙ্গালুরুর মতো জনপ্রিয় দলের হাতবদল হলে সেই আগ্রহ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর পাশাপাশি বিসিসিআই ও আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালিকানা বদলের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক দিক নয়, মালিকের বিশ্বাসযোগ্যতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ক্রিকেটের প্রতি দায়বদ্ধতাও খতিয়ে দেখা হয়। ফলে কোনও দল বিক্রি হওয়া মানেই যে সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে যাবে, এমন নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনও হাতবদলই কার্যকর হবে না।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল খেলোয়াড়দের উপর সম্ভাব্য প্রভাব। মালিকানা বদল হলেও বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী খেলোয়াড়দের অবস্থান সাধারণত সুরক্ষিত থাকে। তবে নতুন মালিকের দর্শন অনুযায়ী ভবিষ্যতে দল গঠনের কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে। কেউ হয়তো আক্রমণাত্মক ব্র্যান্ড ক্রিকেটকে গুরুত্ব দেবেন, কেউ আবার দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেবেন। এই পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে মাঠের ফলাফলেও পড়তে পারে।

ফ্যানদের আবেগও এখানে বড় ফ্যাক্টর। বিশেষ করে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর সমর্থকদের মধ্যে দলের মালিকানা বদল নিয়ে আলাদা এক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বহু বছর ধরে ট্রফির স্বপ্ন দেখা এই ফ্যানবেস মনে করছে, যদি নতুন মালিক বড় বিনিয়োগ ও শক্ত পরিকল্পনা নিয়ে আসেন, তবে হয়তো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ধরা দেবে। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি দলের ক্রিকেটীয় ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এই সম্ভাব্য হাতবদল আসলে আইপিএলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই প্রতিফলন। ভারতীয় ক্রিকেট এখন আর শুধু দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, তা বিশ্ব ক্রীড়া অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। রাজস্থান রয়্যালস ও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর ভবিষ্যৎ মালিকানা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা সেই বৃহত্তর ছবিরই অংশ—যেখানে ক্রিকেট, ব্যবসা ও বিনিয়োগ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে।

Preview image