মরসুম বদলের সময়ে শিশুদের জ্বর, সর্দি কাশি, পেটখারাপ বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে পারে সাধারণ ঠান্ডা-গরম ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে লক্ষণ দেখে ভাইরাসজনিত জ্বর কি না বোঝা জরুরি তবেই সময়মতো সুরক্ষা ও চিকিৎসা সম্ভব
মরসুম বদল মানেই আবহাওয়ায় হঠাৎ হঠাৎ ওঠানামা। কখনও ভোরবেলায় হিমেল ঠান্ডা, কখনও দুপুরে উষ্ণতা, আবার সন্ধ্যে নামতেই তাপমাত্রা কমে যাওয়া এই সব মিলেমিশে থাকে এক অস্থির পরিবেশ। বছরের এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি নাজেহাল হয় শিশুরা। জন্মের পর থেকে প্রায় পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত হয় না, ফলে আবহাওয়ার সামান্য পাল্টাতেই ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া বা পরিবেশগত অ্যালার্জেনদের আক্রমণের সামনে তারা হয়ে ওঠে খুবই দুর্বল। সেই কারণেই এই সময়টাতে ছোটদের মধ্যে জ্বর, সর্দিকাশি, নাক বন্ধ, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ডায়েরিয়া, বমি এমনকি হাঁপানির অ্যাটাকও অত্যন্ত সাধারণ।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডিসেম্বর–জানুয়ারির জাঁকিয়ে শীত আসার আগেই নভেম্বর থেকেই ভাইরাল সংক্রমণের উৎপাত শুরু হয়। পরিবেশ ঠান্ডা হতে থাকে, বাতাসে ধুলো, ধোঁয়া, পরাগরেণুর উপস্থিতি বাড়ে, সেই সঙ্গে শীতে সক্রিয় হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া। এর ওপর দূষণ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও ঘরের ভিতরের নোংরা বায়ু সব মিলিয়ে সংক্রমণ ছড়ায় দ্রুতগতিতে। ঘরোয়া অসতর্কতা, শিশুর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং একঘেয়েমি খাবারদাবার ছোটদের শরীরে নতুন অসুখের পথ খুলে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন শিশুর জ্বর বা সর্দিকাশি মানেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো উচিত নয়। বরং নিয়ম মেনে পর্যবেক্ষণ, সঠিক পরিচর্যা, উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন মতো চিকিৎসকের পরামর্শ এই চারটি নিয়মই এই সময়ে শিশুদের সুরক্ষার প্রধান হাতিয়ার।
এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে জানানো হল কেন মরসুম বদলের সময়ে সংক্রমণ বাড়ে, কোন ভাইরাস-বপ্রধান রোগগুলি বেশি দেখা দেয়, কী কী লক্ষণ লক্ষ্য করতে হবে, কীভাবে ঘরোয়া পরিচর্যা করবেন এবং কখন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়া জরুরি।
মরসুম বদলের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে আমাদের শ্বাসযন্ত্রে। হঠাৎ তাপমাত্রার কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া নাকে, গলায় ও ফুসফুসে থাকা শ্লেষ্মা পাতলা বা ঘন করে দেয়। ফলস্বরূপ ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া খুব সহজেই শরীরের ভিতরে ঢুকে পড়ে।
শীতকালে বাতাস ভারী হয়ে আসে। ধুলোবালি, ধোঁয়া, পোলেন, মশার কয়েল বা ধূপ সবকিছুই বাতাসে স্থির হয়ে থাকে বেশি সময় ধরে। দূষণের এই অতিরিক্ত উপস্থিতি শিশুদের শরীরে অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে হিউম্যান রেসপিরেটরি সিন্সিটিয়াল ভাইরাস (RSV), ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, অ্যাডেনোভাইরাস, রাইনোভাইরাস এই সময়ে দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। শীতে ভাইরাসের জীবক্ষমতা বেশি থাকে ফলে সংক্রমণও তাড়াতাড়ি ছড়ায়।
ঠান্ডার কারণে শিশুরা ঘরের ভিতরে বেশি সময় কাটায়। একই বিছানায় ঘুমানো, একই খেলনা ব্যবহার, একই বোতল, চামচ সব মিলিয়ে জীবাণু ছড়ায় দ্রুত। ডে কেয়ার, স্কুল অথবা প্লে-স্কুলেও এই সময় সংক্রমণ ছড়ায় বেশি।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন মরসুম বদলের সময়ে শিশুদের জ্বর, সর্দিকাশি, হুইজিং, শ্বাসকষ্ট এই সবের অন্যতম প্রধান কারণ RSV ভাইরাস। জন্মের এক মাস পর থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।
লক্ষণ
ঘন সর্দি
কাশি ও বুক থেকে শব্দ
দ্রুত শ্বাস নেওয়া
খাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া
অস্থিরতা
ঝুঁকিপূর্ণ:
৩–৬ মাস বয়সের শিশু
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল
জন্মগত হৃদরোগ বা ফুসফুসের সমস্যা রয়েছে যাদের
উচ্চ জ্বর, শরীর ব্যথা, গলাব্যথা, ক্লান্তি সব মিলিয়ে শিশুদের অত্যন্ত ভোগায়।
নাক দিয়ে জল পড়া, হাঁচি, সর্দি এই ভাইরাসই এর মূল কারণ।
ডায়েরিয়া, বমি, পেটব্যথা ছোটদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ।
টনসিলাইটিস
স্ট্রেপ থ্রোট
নিউমোনিয়া
স্কিন ইনফেকশন
জ্বর শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই সময় কিছু লক্ষণ দেখলেই অবহেলা নয়
তাপমাত্রা ১০০°F-এর ওপরে তিন দিনের বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ
মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া
নাক ফুলে ওঠা
বাচ্চা যদি নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছে
একটুও দেরি করা যাবে না।
দিনে ৫ বারের কম প্রস্রাব হলে শরীরে পানিশূন্যতার ইঙ্গিত।
অতিরিক্ত ঘুম, অস্থিরতা, খাবার এড়িয়ে যাওয়া ভাইরাল বা ব্যাক্টেরিয়াল সংক্রমণের লক্ষণ।
মরসুম বদলের সময়ে শিশুদের ডায়েরিয়া খুবই সাধারণ। উষ্ণ শীতের টানাপোড়েন, নোংরা পানি, দূষিত খাবার এবং সংক্রমণের ফলে পেটের গোলমাল হয়।
বারবার পাতলা পায়খানা
বমি
পেট ব্যথা
চোখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া
প্রস্রাব কম হওয়ার লক্ষণ
ওআরএস খাওয়ান (বয়স অনুযায়ী পরিমাণ)
স্যুপ, ডাবের জল, পাতলা খিচুড়ি
দুধ এড়িয়ে হালকা খাবার
পরিষ্কার পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে
১২ ঘণ্টা ধরে প্রস্রাব না হলে
বাচ্চার বয়স ৬ মাসের কম হলে
বমি না থামলে
RSV বা ধুলো, ধোঁয়ার কারণে এই সময়ে হাঁপানি বাড়তে পারে।
ঘরে ধূপ, ধুনো, মশার কয়েল জ্বালানো
পরিবারের কারও ধূমপান
পুরনো কার্পেট/অবহেলায় থাকা কুশন
ইনহেলার হাতের কাছে রাখুন
এয়ার পিউরিফায়ার থাকলে ফিল্টার পরিষ্কার রাখুন
এয়ারকন্ডিশনারের ফিল্টার নিয়মিত ধোবেন
ঘর আলাদা রাখুন ধুলো–ময়লা থেকে মুক্ত
খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর, বাইরে থেকে এলে।
রোজ খাবার বানানোর সময় পরিষ্কার জল
কালো রঙা প্লাস্টিকের পাত্র এড়িয়ে চলুন
৫ বছর বয়স পর্যন্ত ফুটানো পানি সবচেয়ে ভাল
শিশুর খেলনা, বোতল, পেসিফায়ার নিয়মিত স্যানিটাইজ করুন।
এক ঘণ্টার বেশি আগে কাটা ফল শিশুকে দেবেন না।
৩–৪ মাস বাদে ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করা জরুরি।
কাটিং বোর্ড ধুয়ে ব্যবহার
কাঁচা ও রান্না করা খাবারের জন্য আলাদা পাত্র
দরজা–জানালা খুলে দিন
ভেজা কাপড়ে ধুলো পরিষ্কার
এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার
ভাইরাল সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না
নিজে থেকে বাচ্চাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না
ভুল মাত্রা বা সময় দিলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়
ব্যাক্টেরিয়াল সংক্রমণের প্রমাণ থাকলে
দীর্ঘস্থায়ী কাশি–জ্বর
কানে ব্যথা বা পুঁজ
নিউমোনিয়ার প্রমাণ
স্যুপ
খিচুড়ি
ডালভাত
গরম দুধ (যদি ল্যাকটোজ সমস্যা না থাকে)
কমলালেবু, লেবু
গাজর, বিট, পালং
ডিম
দই
মধু (এক বছরের বেশি বয়সে)
বাদাম কিশমিশ
শীতকালে শিশুরা কম পানি খায় ডিহাইড্রেশন বাড়ে।
সারা দিনে অল্প অল্প করে তরল দিন।
কিন্তু RSV বা ইনফ্লুয়েঞ্জা হঠাৎ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
রাস্তাঘাটের খাবার, দুধ জমা আইটেম সবকিছুই বিপজ্জনক।
ঘুম কম হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ৩০–৪০% কমে যায়।
শিশু শ্বাস নিতে পারছে না
নীলচে ঠোঁট বা নখ
খুব বেশি ঘাম
খাওয়ার সম্পূর্ণ অনাগ্রহ
ঘন ঘন বমি
খিঁচুনি
এই অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
মরসুম বদলের সময়ে শিশুদের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া খুবই সাধারণ, কিন্তু সঠিক পরিচর্যা, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, নিয়ম মেনে খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং সতর্কতা এই সব একসঙ্গে করলে শিশুকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখা যায়। চিকিৎসকেরা বলছেন অযথা ভয় নয়, আবার অবহেলাও নয়।
লক্ষণ বুঝে সময়মতো ব্যবস্থা নিলেই বাচ্চা সুস্থ থাকবে এবং পরিবারের চিন্তাও অনেকটাই কমবে।