জুহুর রাস্তায় এক তরুণীকে দেখে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিলোত্তমা সোম। সমাজমাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মহিলাদের নিরাপত্তাহীনতা ও সতর্ক হয়ে বাঁচার কথা তুলে ধরলেন অভিনেত্রী।
মুম্বইয়ের জুহুর ব্যস্ত রাস্তা। ট্র্যাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে নিজের ফোন দেখছিলেন এক তরুণী। চারপাশে গাড়ি, পথচারী, ব্যস্ততা— সব মিলিয়ে দৃশ্যটি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। এমন একটি মুহূর্তই অবশ্য অভিনেত্রী তিলোত্তমা সোমের মনে তৈরি করেছিল অস্বস্তি। কারণ, তাঁর নজরে পড়েছিল কয়েক জন পুরুষের দৃষ্টি ওই তরুণীর দিকে। সরাসরি কোনও আপত্তিকর ঘটনা ঘটেনি, কেউ তরুণীকে বিরক্তও করেননি। তবু কেন যেন অভিনেত্রীর মনে হচ্ছিল, মেয়েটির নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এই ছোট্ট ঘটনাই পরে তিলোত্তমার মনে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। কেন একজন মহিলা কোনও সাধারণ জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের ফোন দেখতে গেলেও তাঁকে চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে? কেন কোনও দৃশ্যমান বিপদ না থাকলেও মনে হতে পারে, যে কোনও মুহূর্তে কিছু ঘটে যেতে পারে? সমাজমাধ্যমে নিজের সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করে মহিলাদের প্রতিনিয়ত সতর্ক হয়ে বেঁচে থাকার মানসিক চাপের কথাই তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী।
তিলোত্তমার বর্ণনা অনুযায়ী, জুহুর সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে কয়েক জন পুরুষ তাকাচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কারও দৃষ্টি হয়তো কয়েক মুহূর্ত বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু তাতে সরাসরি আপত্তিকর কিছু ছিল না। ঘটনাটি এমনও নয় যে, তরুণীকে ঘিরে কোনও ঝামেলা তৈরি হয়েছিল। তারপরও তিলোত্তমার মনে হয়েছিল, মেয়েটিকে ফোন থেকে চোখ তুলে চারপাশটা এক বার দেখতে বলা উচিত।
আবার একই সঙ্গে তাঁর মনে হচ্ছিল, মেয়েটিরও তো নিজের মতো করে থাকার অধিকার রয়েছে। সে হয়তো কাজের ফাঁকে একটু ফোন দেখছে, নিজের চিন্তায় রয়েছে কিংবা স্রেফ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুটা সময় কাটাচ্ছে। সেই নির্ভার মুহূর্তটুকু উপভোগ করার অধিকারও তার রয়েছে। ফলে তিলোত্তমার মনে তৈরি হয় এক ধরনের দ্বন্দ্ব— সতর্ক করবেন, নাকি মেয়েটিকে সম্পূর্ণ নিজের মতো থাকতে দেবেন?
এই দ্বিধার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তিলোত্তমার নজরে আসে, এক ব্যক্তি তরুণীর খুব কাছ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। সেই মুহূর্তে অভিনেত্রীর মনে হয়েছিল, গাড়ি থেকে নেমে মেয়েটির কাছে গিয়ে কথা বলবেন। প্রয়োজনে তাঁকে সাবধানও করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তা করেননি। নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, ‘‘কিচ্ছু এমন হয়নি।’’ অর্থাৎ বাস্তবে কোনও অপরাধ বা আপত্তিকর ঘটনা ঘটেনি। তবু সেই দৃশ্য তাঁর মন থেকে মুছে যায়নি।
তিলোত্তমার এই অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর মানসিক উদ্বেগ। তাঁর বক্তব্য শুধু ওই নির্দিষ্ট তরুণীকে নিয়ে নয়। বরং তিনি যে প্রশ্নটি তুলেছেন, তা আরও বড়— কোনও বিপদ না ঘটলেও কেন একজন মহিলাকে সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখে চলতে হবে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে নিজের একটি দুঃস্বপ্নের কথাও জুড়েছেন অভিনেত্রী। কয়েক দিন আগে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর পরিচিত এক জনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। সেই স্বপ্ন থেকে ঘুম ভাঙার পর তাঁর মাথায় অন্য একটি প্রশ্ন আসে। হাসপাতালের বিছানায় অচেতন অবস্থায় থাকা কোনও মহিলা কি সত্যিই নিরাপদ? তিনি যখন নিজের চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন নন, তখনও কি তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আশঙ্কা তৈরি হতে পারে?
তিলোত্তমার লেখায় মূলত এই ভয়টাই বারবার ফিরে এসেছে। বিপদ ঘটার পর নয়, বিপদ ঘটার আগেই একজন মহিলাকে কেন সতর্ক হতে হয়? কেন রাস্তায় একা দাঁড়ানো, গণপরিবহণে যাতায়াত করা, অপরিচিত জায়গায় থাকা কিংবা এমনকি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে শুয়ে থাকার মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়?
অভিনেত্রীর মতে, জুহুর সেই রাস্তায় বাস্তবে কিছুই ঘটেনি। কিন্তু সমাজের অন্য কোথাও, অন্য কোনও মহিলার সঙ্গে হয়তো এমন ঘটনা ঘটছে। সেই খবর, সেই অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের বাস্তবতা ধীরে ধীরে মানুষের মনের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা তৈরি করে। ফলে কোনও ঘটনা না ঘটলেও আশঙ্কা থেকে যায়।
তিলোত্তমার বক্তব্যে উঠে এসেছে ‘কিছুই হয়নি, কিন্তু তাও ভয় করছিল’— এই অনুভূতি। তাঁর লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। ভয়টি কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার ফল নয়, বরং বহু অভিজ্ঞতা, খবর এবং সামাজিক বাস্তবতার সম্মিলিত প্রভাব। একজন মহিলা যখন বাইরে বেরোন, তখন তাঁর চারপাশে কী হচ্ছে, কে তাঁকে দেখছে, কে কতটা কাছে আসছে— এমন অনেক বিষয়ই অজান্তে নজরে রাখতে হয়।
এই মানসিকতার সঙ্গে তাঁর নিজের অতীত অভিজ্ঞতারও যোগ রয়েছে। দিল্লিতে দীর্ঘদিন গণপরিবহণে যাতায়াতের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন তিলোত্তমা। দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে চলাফেরা করার অভিজ্ঞতা কী ভাবে একজন মানুষের চারপাশের মানুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে, সেই কথাই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।
গণপরিবহণের মতো জায়গায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে অপরিচিত মানুষ, ভিড়, যাতায়াতের চাপ এবং নানা ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘদিন এমন পরিবেশের মধ্যে থাকলে চারপাশ সম্পর্কে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে ওঠা স্বাভাবিক বলেই নিজের লেখায় ইঙ্গিত করেছেন অভিনেত্রী।
তবে তিলোত্তমার এই বক্তব্য নিয়েও সমাজমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া এসেছে। এক অনুরাগী মন্তব্য করেন, অভিনেত্রীর উদ্বেগের সমস্যা থাকতে পারে এবং তাঁর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সেই মন্তব্যের জবাবও দিয়েছেন তিলোত্তমা।
অভিনেত্রী জানান, উদ্বেগ বর্তমানে একটি বড় সমস্যা এবং এই অনুভূতিকে হালকা করে দেখা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি যে অস্বস্তির কথা বলেছেন, সেটিকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ভয় হিসেবে দেখছেন না। বরং সামাজিক পরিবেশ এবং মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও তিনি এই অনুভূতিকে যুক্ত করছেন।
তিলোত্তমা আরও জানিয়েছেন, ওই তরুণীকে নিজের গাড়িতে তুলে নেওয়ার কথাও তাঁর মাথায় এসেছিল। অর্থাৎ পরিস্থিতি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো উচিত কি না। কিন্তু সেখানেও তৈরি হয় অন্য ধরনের দ্বিধা। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মহিলা হঠাৎ কোনও অচেনা ব্যক্তির কাছ থেকে গাড়িতে তুলে নেওয়ার প্রস্তাব পেলে সেটিকে কী ভাবে নেবেন, সেটিও ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। ফলে সাহায্য করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তিনি কিছু বলেননি।
এই ঘটনাটি তাই তিলোত্তমার কাছে শুধু একটি রাস্তার দৃশ্য হয়ে থাকেনি। বরং তা মহিলাদের নিরাপত্তা, সামাজিক আচরণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একজন মহিলা যেন নিজের মতো করে একটি সাধারণ মুহূর্ত কাটাতে পারেন— সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আবার একই সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়, সেই প্রশ্নই তিলোত্তমার লেখায় বারবার উঠে এসেছে।
তাঁর বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— সব পুরুষের আচরণকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়। জুহুর সেই ঘটনায় কোনও পুরুষ সরাসরি ওই তরুণীকে বিরক্ত করেননি। কোনও অপরাধও ঘটেনি। কিন্তু তবুও তিলোত্তমার মনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁর উদ্বেগের জায়গাটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা নয়; বরং এমন একটি সামাজিক বাস্তবতা, যেখানে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা অনেক সময় দৃশ্যমান ঘটনার আগেই তৈরি হয়ে যায়।
এই অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে লেখার মাধ্যমে অভিনেত্রী আসলে নিজের মনের সেই দ্বন্দ্বটিই সামনে এনেছেন। সতর্ক থাকা এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে সীমারেখা কোথায়? নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে চলতে গিয়ে একজন মানুষ কতটা নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন? আবার অতিরিক্ত নির্ভার থাকলে কোনও সম্ভাব্য ঝুঁকি উপেক্ষিত হয়ে যায় কি না— এমন প্রশ্নও তাঁর লেখার সূত্রে সামনে এসেছে।
তিলোত্তমার এই সমাজমাধ্যমের পোস্ট তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মহিলাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি পরিচিত বাস্তবতার কথাও সামনে এনেছে। অনেক সময় কোনও নির্দিষ্ট ঘটনা না ঘটলেও আশঙ্কা থেকে যায়। সেই আশঙ্কা কখনও কোনও পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে আসে, কখনও অন্য কারও সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার খবর থেকে, আবার কখনও শুধুই চারপাশের পরিবেশ থেকে।
সম্প্রতি তিলোত্তমাকে দর্শক দেখেছেন ‘ইক্কা’ ছবিতে। অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজমাধ্যমেও বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করতে দেখা যায় তাঁকে। এবার জুহুর একটি সাধারণ দৃশ্যকে কেন্দ্র করে তাঁর এই দীর্ঘ ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, তিলোত্তমা সোমের এই বক্তব্যের কেন্দ্রে কোনও নির্দিষ্ট অপরাধের ঘটনা নেই। বরং রয়েছে এমন এক মানসিক অবস্থার কথা, যেখানে ‘‘কিছুই হয়নি’’ জানার পরও মন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারে না। তাঁর প্রশ্নও তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার দিকে— একজন মহিলা কেন শুধুমাত্র স্বাভাবিকভাবে নিজের মতো করে বাঁচার সময়টুকুতেও সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রাখবেন?
এই প্রশ্নের কোনও সহজ উত্তর নেই। তবে তিলোত্তমার জুহুর অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, কখনও কখনও একটি একেবারে সাধারণ দৃশ্যও মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ভয়, উদ্বেগ এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে পারে।