Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে আছি, নতুন কী করা যায় ভাবি’, বাকি শুধু একটি চরিত্র: প্রসেনজিৎ

জন্মদিনে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অকপট আড্ডা—নতুন ছবির চরিত্র বাছাই থেকে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জ, উঠে এল নানা অজানা কথা।

‘নিজেকে ভাঙাচোরারও তো একটা শেষ আছে’, নতুন চরিত্রের সন্ধানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়

টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র জগতে কয়েক দশকের পথচলা। অসংখ্য চরিত্র, বিভিন্ন ধরনের ছবি এবং একাধিক প্রজন্মের দর্শকের ভালবাসা—সব মিলিয়ে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নাম বাংলা ছবির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। একটা সময়ের ‘রোম্যান্টিক হিরো’ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে একের পর এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে ভেঙেছেন তিনি। এখন বয়স ৬৪। তবুও নতুন চরিত্রের সন্ধান থামেনি। বরং যত বেশি চরিত্র করেছেন, ততই নতুন কিছু করার চ্যালেঞ্জ যেন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে তাঁর কাছে।

নিজের চরিত্র বাছাই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রসেনজিৎ নিজেই বললেন, ‘‘সেটাই চিন্তার। এত চরিত্র করে ফেলেছি। এখন ভাবতে হয়, নতুন আর কী করব!’’ তাঁর কথায় যেমন দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনই রয়েছে এখনও নতুন কিছু করে দেখানোর অদম্য ইচ্ছা।

নতুন চরিত্র খোঁজাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

একজন অভিনেতা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করলে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—এর পর কী? দর্শক তাঁকে বহু রকম চরিত্রে দেখেছেন। ফলে নতুন কোনও চরিত্রে অভিনয় করতে গেলেই আগের কাজগুলির সঙ্গে তুলনা চলে আসার সম্ভাবনা থাকে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সেই চ্যালেঞ্জ কম নয়।

বহু বছর ধরে বাংলা ছবির অন্যতম পরিচিত মুখ তিনি। তাঁর অভিনয়জীবনে যেমন বাণিজ্যিক ছবির জনপ্রিয় চরিত্র রয়েছে, তেমনই রয়েছে অন্য ধারার সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতা। সময়ের সঙ্গে নিজের অভিনয়ের ধরনেও পরিবর্তন এনেছেন তিনি।

চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাই শুধু গল্প পছন্দ হলেই হয় না। সেখানে নতুন কিছু করার সুযোগ রয়েছে কি না, দর্শক তাঁকে নতুন ভাবে দেখতে পাবেন কি না—সেই ভাবনাও কাজ করে। তাঁর কথায়, নতুন চরিত্র করার ইচ্ছা একেবারেই কমেনি। বরং এখনও মনে হয়, এমন কিছু করা দরকার যা আগে করা হয়নি।

তবে সেই কাজটা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে বলেই মনে করেন অভিনেতা। কারণ তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ইতিমধ্যেই অসংখ্য চরিত্র পর্দায় এসেছে।

‘ভাঙাচোরারও তো একটা সীমা আছে’

নিজেকে অভিনেতা হিসাবে ভাঙাগড়া করার কথা প্রসেনজিৎ বহু বার বলেছেন। একই ধরনের চরিত্রে আটকে না থেকে নিজেকে নানা ভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সাম্প্রতিক সময়েও সেই চেষ্টা দেখা গিয়েছে। একই সময়ের পরিসরে তাঁকে এক ছবিতে রকস্টারের চরিত্রে এবং অন্য ছবিতে চিকিৎসকের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। চরিত্র দুটির মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই রয়েছে যথেষ্ট পার্থক্য। একজন অভিনেতার কাছে এই ধরনের রূপান্তর যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই কঠিন।

প্রসেনজিৎও স্বীকার করছেন, কাজটি সহজ নয়। তাঁর কথায়, ‘‘খুবই কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে। সহজে আর এ রকম চরিত্র আসছে না, যা আগে করিনি। ভাঙাচোরারও তো একটা সীমা আছে।’’

এই বক্তব্যের মধ্যে দীর্ঘ অভিনয়জীবনের একটি বাস্তবতাও উঠে আসে। একজন অভিনেতা যত বেশি চরিত্র করেন, তাঁর সামনে নতুন চরিত্রের পরিসর ততই যেন সংকুচিত হতে থাকে। যে ধরনের চরিত্র আগে করেছেন, তার কাছাকাছি কিছু এলে সেটিকে আবার নতুন ভাবে কী করে উপস্থাপন করা যায়, সেটিও হয়ে ওঠে বড় প্রশ্ন।

বছরে দু’টি ছবি, আর বাকি ছবিতে অন্য প্রসেনজিৎ

নিজের কাজের ধরন নিয়েও একটি ভারসাম্যের কথা জানিয়েছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর মতে, শুধুমাত্র নিজেকে ভাঙার চেষ্টা করলে সবসময় তা সম্ভব নয়। একজন অভিনেতার পেশাগত দিকটিও মাথায় রাখতে হয়।

তাই বছরে অন্তত দু’টি ছবি বাণিজ্যিক দিকটি মাথায় রেখে করার কথা ভাবেন তিনি। ‘কাকাবাবু’-র মতো ছবি তার উদাহরণ হতে পারে। পাশাপাশি আরও এক বা দু’টি ছবিতে নিজের অভিনয়ের অন্য দিকটি তুলে ধরতে চান।

অর্থাৎ, দর্শক যেন এক দিকে পরিচিত প্রসেনজিৎকে দেখতে পান, আবার অন্য দিকে এমন একজন অভিনেতাকেও দেখতে পান যাঁকে আগে সে ভাবে দেখা যায়নি।

এই ভারসাম্য বজায় রাখাটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব ছবিতেই যদি একেবারে ‘অন্য প্রসেনজিৎ’ হওয়ার চেষ্টা করেন, তা হলে বাণিজ্যিক দিকটি কতটা সামলানো যাবে, সেই প্রশ্নও রয়েছে।

তাঁর বক্তব্য, ‘‘কারণ, সবটাই যদি অন্য প্রসেনজিৎ করতে যাই, তা হলে আমার চলবে কী করে?’’

এই কথার মধ্যেই তাঁর কাজের দর্শন অনেকটা স্পষ্ট। দর্শকের প্রত্যাশা, ছবির বাজার এবং নিজের শিল্পীসত্তা—তিনটির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করেই এগোতে চান তিনি।

এখনও বাকি অনেক চরিত্র

তবে এত চরিত্র করার পরেও প্রসেনজিৎ মনে করেন না যে তাঁর জন্য আর কোনও নতুন চরিত্র বাকি নেই। বরং তাঁর কাছে আসা চিত্রনাট্যগুলিতে এখনও এমন কিছু থাকে, যেখানে নতুন ভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

তিনি মনে করেন, তাঁকে নিয়ে কেউ খুব সাধারণ চরিত্র ভাবেন না। পরিচালক বা লেখকেরা যখন তাঁর কাছে কোনও চরিত্র নিয়ে আসেন, তখন সাধারণত সেখানে অভিনেতা হিসাবে নতুন কিছু করার জায়গা থাকে।

এই কারণেই এখনও নতুন চরিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ অটুট।

একজন অভিনেতার কাছে এমন চরিত্রের গুরুত্ব আলাদা, যা শুধুমাত্র গল্পের প্রয়োজনে নয়, অভিনয়ের দিক থেকেও নতুন কিছু করার সুযোগ দেয়। প্রসেনজিৎ সেই ধরনের কাজের অপেক্ষাতেই থাকেন।

‘দ্য গডফাদার’-এর মার্লন ব্র্যান্ডোর চরিত্র করার ইচ্ছা

বিশ্ব সিনেমার বেশ কিছু কালজয়ী চরিত্র অভিনেতাদের কাছে আজও স্বপ্নের মতো। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও তেমনই একটি চরিত্র রয়েছে।

‘দ্য গডফাদার’-এ মার্লন ব্র্যান্ডোর অভিনীত চরিত্রটি করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘গডফাদারে মার্লন ব্র্যান্ডোর চরিত্রটা করার ইচ্ছা নিশ্চয়ই আছে!’’

news image
আরও খবর

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে একই গল্প বা একই চরিত্র পুনরায় করার কথা বলছেন তিনি। বরং ওই ধরনের গভীরতা ও ব্যাপ্তি রয়েছে এমন একটি চরিত্রে অভিনয়ের আকাঙ্ক্ষার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন অভিনেতা।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পরেও এমন চরিত্রের প্রতি আকর্ষণ থাকা দেখিয়ে দেয়, এখনও অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ খোঁজার ইচ্ছা রয়েছে।

রোম্যান্টিক প্রসেনজিৎ কি আর ফিরবেন?

বাংলা ছবির দর্শকের কাছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রোম্যান্টিক চরিত্রের সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। তাঁর অভিনয়জীবনের একটা বড় সময় জুড়ে প্রেমের গল্প এবং রোম্যান্টিক চরিত্র বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিল।

কিন্তু এখন সেই ধরনের চরিত্রে ফিরবেন কি না, প্রশ্ন উঠলে তাঁর উত্তর একেবারে সরাসরি ‘না’ নয়। তিনি মনে করেন, রোম্যান্টিক চরিত্র করা সম্ভব, কিন্তু তা আগের মতো হলে চলবে না।

নতুন কিছু থাকতে হবে। একই ধরনের প্রেমের গল্প বা একই রকম চরিত্র বার বার করার ইচ্ছা তাঁর নেই।

‘দৃষ্টিকোণ’-এর মতো ছবিতে প্রেম ও সম্পর্কের অন্য রকম দিক নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তাই ভবিষ্যতে রোম্যান্টিক চরিত্রে ফিরলেও সেখানে নতুন কোনও মাত্রা থাকা জরুরি বলে মনে করেন অভিনেতা।

অতীতের জনপ্রিয় চরিত্রের পুনরাবৃত্তির চেয়ে যা এখনও করা হয়নি, সেটাই তাঁর কাছে বেশি আকর্ষণীয়।

‘ডাক্তার কাকু’ নিয়ে বিশেষ যত্ন

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘ডাক্তার কাকু’ ছবিটিও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ছবিতে তাঁর চরিত্রটি আগের অনেক কাজের থেকে আলাদা।

একজন অভিনেতার কাছে নতুন চরিত্র মানে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়। চরিত্রের মানসিকতা, আচরণ, কথা বলার ধরন এবং গল্পের মধ্যে তার অবস্থান—সব মিলিয়ে চরিত্রকে তৈরি করতে হয়।

‘ডাক্তার কাকু’-র ক্ষেত্রেও সেই কারণেই বিশেষ যত্ন নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কাছে ছবিটি একান্ত কাছের বলেও উল্লেখ করেছেন।

বাংলা ছবির দর্শক নিয়ে নতুন ভাবনা

শুধু নিজের চরিত্র নয়, বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর মতে, বাংলা ছবিতে বিভিন্ন ধরনের কাজ হচ্ছে। তিনি নিজেও সেই বৈচিত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর সহকর্মীরাও বিভিন্ন ধরনের গল্প ও চরিত্র নিয়ে কাজ করছেন।

তবে বাংলা সিনেমা নিয়ে সমাজের একটি অংশের মধ্যে যে ধারণা তৈরি হয়েছে—নতুন কিছু হচ্ছে না—সেটিও তাঁর নজর এড়ায়নি।

এই পরিস্থিতি বদলানোর দায়িত্বও ইন্ডাস্ট্রির মানুষদেরই নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। শুধু ভাল ছবি তৈরি করলেই হবে না, সেই ছবি আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে।

মাল্টিপ্লেক্সের পাশাপাশি সাধারণ দর্শকের কাছেও পৌঁছনোর ভাবনা

বর্তমানে বাংলা ছবির দর্শক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মাল্টিপ্লেক্সের প্রসঙ্গ প্রায়ই আসে। কিন্তু প্রসেনজিৎ মনে করেন, শুধুমাত্র মাল্টিপ্লেক্সের দর্শককে মাথায় রেখে বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব নয়।

তাঁর মতে, যাঁরা নিয়মিত মাল্টিপ্লেক্সে যান না, তাঁদের কাছেও বাংলা ছবি পৌঁছনো প্রয়োজন। সেই দর্শকদের জন্য সাধারণ সিনেমা হলের গুরুত্ব রয়েছে।

এক সময়ে বাংলা ছবির শো হাউসফুল যাওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, সেই দর্শকদের আবার সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

অর্থাৎ, বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনায় শুধু অভিনেতা হিসাবে নিজের কাজ নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রির দর্শকভিত্তি নিয়েও চিন্তা রয়েছে।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পরেও নতুনের সন্ধান

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবন যত দীর্ঘ হয়েছে, তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জও যেন তত বেড়েছে। এক সময় যে চরিত্র সহজে নতুন মনে হত, আজ তার কাছাকাছি অনেক চরিত্রই তিনি করে ফেলেছেন। ফলে নতুন কিছু করার জন্য তাঁকে আরও বেশি করে ভাবতে হচ্ছে।

তবুও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহে ভাটা পড়েনি। বরং নতুন চরিত্রের সন্ধান এখনও তাঁর ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নিজের জনপ্রিয়তাকে শুধুমাত্র অতীতের সাফল্যের উপর দাঁড় করিয়ে না রেখে বর্তমানের কাজের মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে চান তিনি। এক দিকে বাণিজ্যিক ছবির প্রয়োজনীয়তা, অন্য দিকে অভিনয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা—এই দুইয়ের মাঝেই নিজের জায়গা তৈরি করে চলেছেন।

৬৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও তাই তাঁর প্রশ্নটা একই—‘‘নতুন আর কী করব?’’

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হয়তো এখন তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই কারণেই আগামী দিনে পর্দায় তাঁকে ঠিক কোন নতুন রূপে দেখা যাবে, তা নিয়ে দর্শকের কৌতূহলও থেকেই যায়।

Preview image