বলিউডের ‘ভাইজান’ সলমন খানের আজ বিপুল সম্পত্তি ও খ্যাতি। কিন্তু জানেন কি, একসময় স্কুলের মাইনে দিতে না পারায় শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে? শৈশবের সেই কঠিন সময় পেরিয়ে কী ভাবে কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্যের মালিক হলেন সলমন?
বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী তারকা অভিনেতা সলমন খান। কয়েক দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে একের পর এক সফল ছবি, বিপুল জনপ্রিয়তা এবং বিশাল ভক্তকুল তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রথম সারির তারকাদের মধ্যে জায়গা করে দিয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকেও তাঁর বিপুল আয়। একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে সলমন খানের আনুমানিক সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা।
তবে আজকের এই বিপুল সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। এমন একটি সময়ও সলমনের জীবনে এসেছিল, যখন তাঁর পরিবার সময়মতো স্কুলের ফি দিতে পারত না। শুধু তাই নয়, ফি বাকি থাকার কারণে একবার নয়, একাধিক বার তাঁকে ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। সেই পুরনো দিনের কথা নিজেই জানিয়েছিলেন অভিনেতা।
কাজল এবং টুইঙ্কল খন্নার একটি অনুষ্ঠানে নিজের শৈশবের সেই ঘটনা স্মরণ করেছিলেন সলমন। তাঁর সেই বক্তব্যের সময় উপস্থিত ছিলেন আমির খানও। মজার বিষয় হল, আমিরও একই স্কুলে অল্প সময় পড়াশোনা করেছিলেন এবং তিনিও সেই সময়ের আর্থিক সমস্যার কথা স্মরণ করেন।
ছোটবেলায় সলমন খান যে বেশ দুষ্টু ছিলেন, সে কথা নিজেই একাধিক বার জানিয়েছেন অভিনেতা। স্কুলে দুষ্টুমি করার জন্য তাঁকে প্রায়ই ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। ফলে শিক্ষিকার দেওয়া শাস্তি তাঁর কাছে খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না।
কিন্তু একটি বিশেষ ঘটনার কথা বলতে গিয়ে সলমন জানিয়েছিলেন, সে দিন তাঁর কোনও দোষই ছিল না। তবুও তাঁকে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কারণ ছিল স্কুলের বকেয়া ফি।
সলমনের কথায়, তখন তিনি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তেন। এক দিন তাঁকে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখায় তাঁর বাবা সেলিম খান বিষয়টি জানতে চান। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর মনে হয়েছিল, ছেলে নিশ্চয়ই আবার কোনও দুষ্টুমি করেছে।
কিন্তু শিক্ষিকার সঙ্গে কথা বলার পর বিষয়টি সম্পূর্ণ অন্য রকম বলে জানতে পারেন সেলিম।
সলমনের বর্ণনা অনুযায়ী, সেলিম খান শিক্ষিকাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাঁর ছেলে কী করেছে। উত্তরে শিক্ষিকা জানিয়েছিলেন, সলমনের কোনও দোষ নেই। বরং স্কুলের ফি সময়মতো জমা না পড়ায় তাঁকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
এই উত্তরে সেলিম খানও বেশ অবাক হয়ে যান। তিনি জানতে চান, ফি সময়মতো না দেওয়ার দায় তাঁর কেন?
শিক্ষিকার বক্তব্য ছিল, নির্দিষ্ট সময়ে যে ফি জমা দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ সলমনকে শাস্তি দিয়েছে।
এর পর সেলিম খান নাকি পাল্টা বলেছিলেন, যদি ফি না দেওয়ার জন্য কাউকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়, তা হলে তাঁর ছেলেকে নয়, তাঁকেই দাঁড় করানো উচিত।
ঘটনাটি সলমনের শৈশবের এমন একটি স্মৃতি, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর বিপুল সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করলে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একবার সমস্যার সমাধান হওয়ার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি। সলমন জানিয়েছেন, সেলিম খান প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় করে স্কুলের ফি মিটিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু মাত্র দু’সপ্তাহ পর আবার একই ধরনের ঘটনা ঘটে। ফের ফি বাকি পড়ে যায় এবং ফের সলমনকে স্কুল থেকে বার করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, সলমনের পরিবার তখন আর্থিক ভাবে কতটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। আজ যেখানে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হিসেবে তাঁর নাম উঠে আসে, সেখানে শৈশবে স্কুলের সামান্য ফি সময়মতো দিতে না পারার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের একেবারে ভিন্ন একটি অধ্যায়।
সলমনের সেই পুরনো দিনের কথা শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত আমির খানও নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনিও একই স্কুলে অল্প সময় পড়াশোনা করেছিলেন।
আমির জানান, তাঁদের পরিবারও সবসময় সময়মতো স্কুলের ফি দিতে পারত না। এমনকি সে সময় প্রার্থনার সময় ছাত্রদের নাম ঘোষণা করা হত, যাতে বকেয়া ফি-র বিষয়টি জানানো যায়।
অর্থাৎ শুধু সলমন নয়, সেই সময়ের আরও অনেক পরিবারের মতো তাঁদের পরিবারও আর্থিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।
এই ঘটনা সলমন খানের শৈশবের এমন একটি দিক সামনে আনে, যা সাধারণত তাঁর তারকা-জীবনের আলোচনায় উঠে আসে না।
সলমনের জীবনের আর্থিক সংগ্রামের গল্প বুঝতে হলে তাঁর বাবা সেলিম খানের জীবনের দিকেও তাকাতে হয়।
সেলিম খান পরবর্তীকালে হিন্দি সিনেমার অন্যতম সফল চিত্রনাট্যকার হয়ে ওঠেন। কিন্তু মুম্বইয়ে তাঁর শুরুর দিনগুলি মোটেই সহজ ছিল না।
১৯৬০-এর দশকে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বইয়ে এসেছিলেন সেলিম খান। তখন তাঁর কাছে অর্থ বা প্রতিষ্ঠা—কোনওটাই ছিল না। মেরিন ড্রাইভ এলাকার একটি গেস্টহাউসে থাকতেন তিনি। সেখানে অর্ধেক ঘরের জন্য মাসে ৫৫ টাকা ভাড়া দিতেন।
সেলিমের স্বপ্ন ছিল ১১০ টাকা দিয়ে পুরো ঘর ভাড়া নেওয়া। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি। জীবনের সেই সময় তাঁর কাছে প্রতিটি টাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দিকে সেলিম খান নিজেকে অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর ভাগ্য বদলে যায় লেখালিখির মাধ্যমে।
১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি চিত্রনাট্য লেখায় মন দেন। এরপর জাভেদ আখতারের সঙ্গে তৈরি করেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার জুটি—সেলিম-জাভেদ।
এই জুটি একসঙ্গে একাধিক কালজয়ী ছবির চিত্রনাট্য লেখেন। ‘জ়নজীর’, ‘শোলে’, ‘দিওয়ার’-এর মতো ছবির সঙ্গে তাঁদের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়।
একসময় সেলিম-জাভেদ জুটি হিন্দি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া চিত্রনাট্যকারদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ যে পরিবার একসময় স্কুলের ফি নিয়ে সমস্যায় পড়েছিল, সেই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের একজন হয়ে সলমনও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন।
সলমন খান সরাসরি নায়ক হিসেবে বলিউডে প্রবেশ করেননি। অভিনয়ে আসার আগে তিনি সিনেমার কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করেছিলেন।
শশীলাল কে নায়ারের ‘ফলক’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। এরপর ১৯৮৮ সালে ‘বিবি হো তো অ্যায়সি’ ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড়পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন।
তবে সেই ছবি সলমনকে রাতারাতি তারকা বানায়নি। তাঁর জীবনের আসল পরিবর্তন আসে পরের বছর।
১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় সূরজ বরজাত্যার ‘ম্যায়নে প্যার কিয়া’। এই ছবিতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন সলমন খান। তাঁর বিপরীতে ছিলেন ভাগ্যশ্রী।
ছবিটি বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায়। সলমন রাতারাতি হয়ে ওঠেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তরুণ নায়ক।
কিন্তু ‘ম্যায়নে প্যার কিয়া’-র সাফল্যের পরও তাঁর কেরিয়ার একেবারে মসৃণ পথে এগোয়নি।
সলমন নিজেই এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, ছবি মুক্তির পর প্রায় চার-পাঁচ মাস তিনি কোনও কাজ পাননি। সেই সময় তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো আর কোনও ছবি তাঁর কাছে আসবে না।
‘ম্যায়নে প্যার কিয়া’-র সাফল্যে সলমনের পাশাপাশি ভাগ্যশ্রীর ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ছবির পর ভাগ্যশ্রী অভিনয় ছেড়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
সলমনের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময়ে ছবির সাফল্যের বড় অংশ ভাগ্যশ্রীর দিকেও গিয়েছিল। ফলে পরবর্তী ছবির জন্য সলমনের কাছে কাজ আসতে কিছুটা সময় লাগে।
এই পরিস্থিতিতে তাঁর বাবা সেলিম খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
সলমনের কেরিয়ারে সেই সময় একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সেলিম খান প্রযোজক জিপি সিপ্পীকে একটি ছবির জন্য সলমনকে সই করানোর কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে বলেন।
সেই ঘোষণা একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সলমনের কাছে একের পর এক ছবির প্রস্তাব আসতে শুরু করে।
এর পর ধীরে ধীরে নিজের জায়গা শক্ত করেন তিনি।
প্রথম ছবির জন্য সলমনের পারিশ্রমিক ছিল ৩১,০০০ টাকা। পরে তাঁর নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দেখে সেই পারিশ্রমিক বাড়িয়ে ৭৫,০০০ টাকা করা হয়।
সলমন খানের জীবনের আর একটি আকর্ষণীয় ঘটনা হল তাঁর প্রথম দিকের উপার্জন।
অভিনেতা জানিয়েছেন, মাত্র ১৪ বছর বয়সে মুম্বইয়ের তাজ হোটেলে একটি অনুষ্ঠানে ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবে পারফর্ম করেছিলেন তিনি। সেই কাজের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ৭৫ টাকা।
আজকের দিনে যেখানে একটি ছবির জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ১০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে খবর, সেখানে কেরিয়ারের একেবারে শুরুতে মাত্র ৭৫ টাকা উপার্জনের এই স্মৃতি তাঁর দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজ সলমন খান শুধু অভিনেতা নন, তিনি একটি বিশাল ব্র্যান্ড। সিনেমার পাশাপাশি টেলিভিশন, বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত তিনি।
একাধিক প্রতিবেদনে তাঁর মোট সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও তারকার সম্পত্তির হিসাব বিভিন্ন সূত্রে আলাদা হতে পারে, তবুও তাঁর বিপুল আর্থিক সাফল্য নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
তাঁর জনপ্রিয়তা, দীর্ঘ অভিনয়জীবন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে তিনি ভারতের অন্যতম ধনী অভিনেতা হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে সলমন খান তাঁর পরবর্তী ছবি ‘মাতৃভূমি’-র মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। ছবিটি দীপাবলির পর মুক্তি পেতে পারে বলে খবর রয়েছে। এই ছবিতে তাঁর পারিশ্রমিক ১০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি নয়নতারার সঙ্গে একটি নতুন ছবির কাজও চলছে বলে জানা যাচ্ছে।
অর্থাৎ কয়েক দশক ধরে বলিউডে থাকার পরও সলমন এখনও বড় পর্দায় সক্রিয়। নতুন ছবি, নতুন চরিত্র এবং নতুন প্রকল্প নিয়ে তাঁর কেরিয়ার এগিয়ে চলেছে।
সলমন খানের জীবনের এই ঘটনাগুলি দেখলে তাঁর সাফল্যের পথটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে পরিবার একসময় স্কুলের ফি সময়মতো দিতে পারত না, সেই পরিবারের সন্তান পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এবং ধনী অভিনেতা।
তবে এই যাত্রা রাতারাতি তৈরি হয়নি। শৈশবের আর্থিক টানাপোড়েন, অভিনয়ে আসার আগে ছোট কাজ, প্রথম ছবিতে পার্শ্বচরিত্র, নায়ক হিসেবে প্রথম সাফল্যের পরও কাজের অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাঁকে এগোতে হয়েছে।
আজকের সলমন খানকে দেখলে তাঁর অতীতের সেই দিনগুলির কথা হয়তো অনেকেরই মনে থাকে না। কিন্তু স্কুলের ফি দিতে না পারায় ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট ছেলেটিই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছেন বলিউডের অন্যতম বড় তারকা।
তাঁর জীবনের গল্প তাই শুধু সাফল্যের নয়, বরং সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি কী ভাবে বদলে যেতে পারে, তারও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।